বিজ্ঞাপন

মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা : রাজনীতির ঊর্ধ্বে এক চিরন্তন শিক্ষা

মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা : রাজনীতির ঊর্ধ্বে এক চিরন্তন শিক্ষা

রাজনীতির ময়দান সাধারণত প্রতিদ্বন্দ্বিতা, কৌশল ও ক্ষমতার হিসাব-নিকাশের জন্য পরিচিত। কিন্তু এই কঠিন বাস্তবতার মাঝেও কিছু মানবিক দৃশ্য মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী ছাপ ফেলে যায়।

রাজনীতির ইতিহাসে অনেক বক্তৃতা, অনেক স্লোগান এবং অসংখ্য প্রতিশ্রুতি সময়ের স্রোতে হারিয়ে যায়। কিন্তু কিছু দৃশ্য, কিছু মুহূর্ত মানুষের স্মৃতিতে অমলিন হয়ে থাকে—কারণ সেগুলো ক্ষমতার নয়, মানবিকতার গল্প বলে।

আজ থেকে প্রায় ৩৫ বছর আগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিয়ে তার পুত্র বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঢাকা-৫ আসনের বিমানবন্দর নিকটবর্তী কাওলার, আশকোনার ভোটারদের কাছে মায়ের জন্য সমর্থন ও দোয়া চেয়েছিলেন।

সেই সময় একজন সন্তানের কণ্ঠে মায়ের প্রতি বিশ্বাস, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সেই আবেদন ছিল রাজনীতির কঠোর বাস্তবতার মধ্যেও এক নির্মল মানবিক প্রকাশ। দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলার পরও তার ধারাবাহিকতা অনেকের চোখে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছানো অনেকের পক্ষেই সম্ভব হয়, কিন্তু ক্ষমতার চেয়ারে বসেও পারিবারিক মূল্যবোধ, বিশেষ করে মা-বাবার প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধাবোধ অটুট রাখা সবসময় সহজ নয়। রাজনৈতিক মতাদর্শ বা দলীয় অবস্থান ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু একজন সন্তানের কাছে মা-বাবার মর্যাদা সর্বজনীন। সমাজের নৈতিক ভিত্তি মূলত এই পারিবারিক মূল্যবোধের ওপরই দাঁড়িয়ে থাকে।

সময়ের প্রবাহে রাজনৈতিক অবস্থান, ক্ষমতার পালাবদল কিংবা জাতীয় নেতৃত্বের ভূমিকা বদলাতে পারে। কিন্তু একজন সন্তানের কাছে মায়ের মর্যাদা কখনো বদলায় না। কারণ পৃথিবীর সব পরিচয়ের আগে মানুষ একজন সন্তান, আর সেই পরিচয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকেন মা-বাবা।

বাংলাদেশের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও সামাজিক কাঠামোর মূল ভিত্তিই হলো পরিবার। এই পরিবারে মা-বাবা শুধু অভিভাবক নন; তারা সন্তানদের প্রথম শিক্ষক, প্রথম পথপ্রদর্শক এবং জীবনের প্রথম আশ্রয়। একজন মানুষ যত বড় অর্জনই করুক না কেন, তার চরিত্র, নৈতিকতা ও মানবিকতার বীজ রোপিত হয় পারিবারিক শিক্ষার মধ্য দিয়েই। তাই মা-বাবার প্রতি সম্মান কেবল সামাজিক দায়িত্ব নয়, এটি আত্মপরিচয় ও কৃতজ্ঞতারও প্রকাশ।

ক্ষমতা মানুষকে প্রভাবশালী করে, কিন্তু মূল্যবোধ মানুষকে মহৎ করে। রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব, রাজনৈতিক সংগ্রাম কিংবা জনজীবনের ব্যস্ততার মধ্যেও যারা মা-বাবার প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসাকে ধারণ করেন, তারা সমাজের সামনে এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।

রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতেই পারে, কিন্তু পারিবারিক মূল্যবোধের প্রশ্নে সমাজের সব স্তরের মানুষের অবস্থান এক ও অভিন্ন হওয়া উচিত।

বর্তমান বিশ্ব দ্রুত বদলাচ্ছে। প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে সহজ করেছে, কিন্তু একই সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রে সম্পর্কের উষ্ণতাও কমিয়ে দিয়েছে। পরিবারে একসঙ্গে বসে কথা বলার সংস্কৃতি দুর্বল হচ্ছে, প্রবীণদের অভিজ্ঞতার মূল্যায়ন কমছে, আর ব্যক্তিকেন্দ্রিক জীবনযাত্রা অনেক তরুণকে পারিবারিক বন্ধন থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। এই বাস্তবতায় মা-বাবার প্রতি দায়িত্ববোধ ও শ্রদ্ধার চর্চা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

সমাজে যখন জাতীয় পর্যায়ের কোনো নেতা প্রকাশ্যে তার মা-বাবার প্রতি ভালোবাসা ও সম্মান প্রদর্শন করেন, তখন তা শুধু একটি ব্যক্তিগত অনুভূতির প্রকাশ থাকে না; এটি তরুণ প্রজন্মের জন্যও একটি শক্তিশালী বার্তা হয়ে ওঠে।

তারা উপলব্ধি করতে শেখে যে সাফল্য, খ্যাতি কিংবা ক্ষমতা অর্জনের পরও শেকড়কে ভুলে যাওয়া যায় না। বরং মানুষের প্রকৃত মহত্ত্ব প্রকাশ পায় তখনই, যখন সে নিজের উৎসকে সম্মান করতে জানে।

আজকের তরুণদের জন্য এই শিক্ষা বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। আধুনিক হওয়া মানে নিজের সংস্কৃতি ও পারিবারিক মূল্যবোধ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া নয়। প্রযুক্তির সঙ্গে এগিয়ে যেতে হবে, বিশ্বমানের জ্ঞান অর্জন করতে হবে, কিন্তু একই সঙ্গে মা-বাবার প্রতি শ্রদ্ধা, প্রবীণদের প্রতি সম্মান এবং পারিবারিক বন্ধনের শক্তিকেও ধারণ করতে হবে। কারণ যে সমাজ তার প্রবীণদের সম্মান করে, সেই সমাজই নৈতিকভাবে শক্তিশালী ও ভবিষ্যৎমুখী হয়ে ওঠে।

মা-বাবার প্রতি ভালোবাসা কোনো রাজনৈতিক বিষয় নয়; এটি মানবতার মৌলিক শিক্ষা। পৃথিবীর কোনো পদ, কোনো ক্ষমতা কিংবা কোনো অর্জন মায়ের নিঃস্বার্থ ভালোবাসার সমতুল্য হতে পারে না।

একজন সন্তানের জীবনের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়, সবচেয়ে বড় প্রেরণার উৎসস্থল হলো তার মা। রাজনৈতিক অঙ্গনের নানা পরিবর্তনের মধ্যেও যখন আমরা মা-সন্তানের এই বন্ধনের প্রকাশ দেখি, তখন তা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—সব পরিচয়ের ঊর্ধ্বে মানুষ প্রথমে একজন সন্তান।

আমাদের জাতীয় জীবনে আজ যখন মূল্যবোধের প্রশ্নটি বারবার আলোচনায় আসে, তখন পারিবারিক শিক্ষার গুরুত্ব নতুন করে উপলব্ধি করা প্রয়োজন। রাষ্ট্রের শক্তি অর্থনীতি বা অবকাঠামোর ওপর দাঁড়ালেও জাতির আত্মিক শক্তি গড়ে ওঠে পরিবার থেকে। আর সেই পরিবারের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন মা-বাবা।

রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবার—এই তিন স্তম্ভের মধ্যে পরিবারের ভিত্তি সবচেয়ে শক্তিশালী হলে জাতিও শক্তিশালী হয়। নতুন প্রজন্মের প্রতি তাই আমাদের আহ্বান—স্বপ্ন দেখো, সাফল্যের শিখরে পৌঁছানোর জন্য নিরলস পরিশ্রম করো, বিশ্বজয়ের প্রস্তুতি নাও; কিন্তু মা-বাবার হাতটি কখনো ছেড়ে দিও না। কারণ জীবনের দীর্ঘ পথচলায় মানুষ যত দূরেই যাক না কেন, তার সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ, সবচেয়ে গভীর প্রেরণা এবং সবচেয়ে নিঃস্বার্থ ভালোবাসার নাম—মা।

মো. কামরুল ইসলাম : ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, ঢাকা পোস্ট