বিজ্ঞাপন

বাজেটে সুশাসন ও জনপ্রশাসন : উন্নত রাষ্ট্র বিনির্মাণে বাংলাদেশের করণীয়

বাজেটে সুশাসন ও জনপ্রশাসন : উন্নত রাষ্ট্র বিনির্মাণে বাংলাদেশের করণীয়

বাংলাদেশের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা এবং অভ্যন্তরীণ উন্নয়ন চাহিদার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন। ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার এ বাজেট অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রণীত হয়েছে। তবে উন্নয়নের এই অভিযাত্রায় একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে, সুশাসন ও কার্যকর জনপ্রশাসন ছাড়া কি টেকসই উন্নয়ন সম্ভব?

বিশ্বব্যাংক, জাতিসংঘ এবং ওইসিডি-এর বিভিন্ন গবেষণা বিশ্লেষণ করলে প্রতীয়মান হয় যে, দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক উন্নয়ন, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার অন্যতম পূর্বশর্ত হলো কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক জনপ্রশাসন। অর্থাৎ উন্নয়ন শুধু অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে অর্জিত হয় না; বরং দক্ষ প্রশাসন, স্বচ্ছ সিদ্ধান্ত গ্রহণ, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ এবং নাগরিকমুখী সেবার মাধ্যমে উন্নয়নকে টেকসই করা সম্ভব।

বাংলাদেশের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, পেনশন এবং প্রশাসনিক পরিচালন ব্যয়ের জন্য প্রায় ১.৬৬ লাখ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে।

জনপ্রশাসন সংশ্লিষ্ট পরিচালন ব্যয় ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা প্রশাসনিক কাঠামোর সম্প্রসারণ এবং সরকারি সেবা প্রদানের ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিফলন। কিন্তু আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, প্রশাসনিক ব্যয় বৃদ্ধি করলেই সুশাসন নিশ্চিত হয় না; বরং প্রয়োজন দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও ফলাফলভিত্তিক ব্যবস্থাপনা।

এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সিঙ্গাপুর সুশাসনের এক অনন্য উদাহরণ। স্বাধীনতার পর দেশটি জনপ্রশাসনকে রাষ্ট্রীয় উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করে। মেধাভিত্তিক নিয়োগ, উচ্চ বেতন কাঠামো, কঠোর শৃঙ্খলা এবং দুর্নীতির প্রতি জিরো টলারেন্স সিঙ্গাপুরকে বিশ্বের অন্যতম কার্যকর প্রশাসনিক রাষ্ট্রে পরিণত করেছে। বর্তমানে দেশটি বিশ্বব্যাংকের সরকারি কার্যকারিতার সূচকে শীর্ষস্থানীয় দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম।

একইভাবে দক্ষিণ কোরিয়া প্রশাসনিক আধুনিকায়ন ও ডিজিটাল গভর্ন্যান্সের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা বৃদ্ধি করেছে। সরকারি সেবার ডিজিটাল রূপান্তর, নাগরিক সেবার গতি বৃদ্ধি এবং প্রশাসনিক ব্যয় হ্রাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ডিজিটাল গভর্ন্যান্স সেখানে কেবল প্রযুক্তি নয়; এটি প্রশাসনিক সংস্কৃতির অংশ।

অন্যদিকে, পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত ‘ডিজিটাল ইন্ডিয়া’ কর্মসূচির মাধ্যমে সরকারি সেবা, পরিচয় ব্যবস্থাপনা এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকে প্রযুক্তিনির্ভর করেছে। বাংলাদেশের আগামী দিনের মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও এসব অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষার উৎস হতে পারে।

বিশ্বব্যাংকের বিশ্বব্যাপী গভর্নেন্স ইন্ডিকেটর এবং জাতিসংঘের ই-গভর্নমেন্ট ডেভেলপমেন্ট ইনডেক্স-এর তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সুশাসন ও প্রশাসনিক দক্ষতার সঙ্গে অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটি শক্তিশালী ইতিবাচক সম্পর্ক বিদ্যমান।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বাংলাদেশের উন্নয়ন অভিযাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। কিন্তু উন্নয়নের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে সুশাসন ও জনপ্রশাসনের গুণগত উন্নয়নের ওপর।

সিঙ্গাপুর, ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড এবং কানাডার মতো দেশগুলো সরকারি কার্যকারিতা, আইনের শাসন এবং দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ সূচকে ধারাবাহিকভাবে শীর্ষস্থানীয় অবস্থানে রয়েছে। একইসঙ্গে মাথাপিছু আয়, মানব উন্নয়ন সূচক এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতার ক্ষেত্রেও তারা অগ্রগামী।

ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড এবং সুইডেন দীর্ঘদিন ধরে সুশাসনের বৈশ্বিক সূচকে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে। এসব দেশে সরকারি ব্যয়ের একটি বড় অংশ প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো, স্থানীয় সরকার শক্তিশালীকরণ এবং উন্মুক্ত তথ্য ব্যবস্থাপনার জন্য বরাদ্দ করা হয়। ডেনমার্ক বর্তমানে বিশ্বের সর্বনিম্ন দুর্নীতিগ্রস্ত দেশগুলোর অন্যতম, যা শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এবং জবাবদিহিমূলক শাসন ব্যবস্থার ফল।

এক্ষেত্রে, এস্তোনিয়ার অভিজ্ঞতাও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ছোট রাষ্ট্র হওয়া সত্ত্বেও দেশটি প্রায় সম্পূর্ণ ডিজিটাল প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। জন্মনিবন্ধন, কর প্রদান, ব্যবসা নিবন্ধন থেকে শুরু করে ভোটদান পর্যন্ত অধিকাংশ সেবা ডিজিটাল মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। ফলে প্রশাসনিক ব্যয় কমেছে এবং নাগরিক সন্তুষ্টি বৃদ্ধি পেয়েছে।

অন্যদিকে, উত্তর আমেরিকার দেশগুলোয় প্রশাসনিক দক্ষতা মূল্যায়নের জন্য ফলাফলভিত্তিক ব্যবস্থাপনা অনুসরণ করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রে সরকারি সংস্থাগুলোর কার্যকারিতা মূল্যায়নের জন্য নিয়মিত পারফরম্যান্স অডিট পরিচালিত হয়।

কানাডা “ফলাফল-ভিত্তিক ব্যবস্থাপনা” পদ্ধতির মাধ্যমে সরকারি ব্যয়ের কার্যকারিতা মূল্যায়ন করে থাকে। ফলে বাজেট বরাদ্দ এবং কর্মসম্পাদনের মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক স্থাপন করা সম্ভব হয়।

বাংলাদেশ এক দশকে ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। ২০২৪ সালের জাতিসংঘ ই-গভর্নমেন্ট জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় ই-গভর্ন্যান্স উন্নয়নের ক্ষেত্রে ইতিবাচক অগ্রগতি প্রদর্শন করেছে। তবে অনলাইন সেবার গুণগত মান, আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়, তথ্য নিরাপত্তা এবং নাগরিক অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে এখনো উল্লেখযোগ্য উন্নয়নের সুযোগ রয়েছে।

এদিকে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের দুর্নীতি ধারণা সূচক ২০২৪ অনুযায়ী, ডেনমার্ক ৯০ স্কোর নিয়ে বিশ্বের সবচেয়ে স্বচ্ছ দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। অন্যদিকে বাংলাদেশের স্কোর এখনো তুলনামূলকভাবে নিম্ন পর্যায়ে রয়েছে, যা প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এখনো বাজেট বরাদ্দ ও সেবার ফলাফলের মধ্যে সুস্পষ্ট সম্পর্ক সবক্ষেত্রে দৃশ্যমান নয়। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের ব্যয় বৃদ্ধি পেলেও নাগরিক সেবার গুণগত উন্নয়ন সমানভাবে প্রতিফলিত হয় না। ফলে জনপ্রশাসনে কর্মদক্ষতা মূল্যায়ন, ফলাফলভিত্তিক বাজেটিং এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি।

বর্তমান বাজেটে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি এবং প্রশাসনিক সংস্কারের ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। তবে সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

প্রথমত, জনপ্রশাসনের ডিজিটাল রূপান্তরে আরও বিনিয়োগ করতে হবে। শুধু প্রযুক্তি অবকাঠামো নয়, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং সাইবার নিরাপত্তাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

দ্বিতীয়ত, কর্মসম্পাদনভিত্তিক বাজেটিং চালু করা প্রয়োজন। এতে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি বৃদ্ধি পাবে এবং বাজেটের কার্যকারিতা মূল্যায়ন সহজ হবে।

তৃতীয়ত, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে অধিক বিনিয়োগ প্রয়োজন। উন্নত দেশগুলোর অভিজ্ঞতার আলোকে দেখা যায়, সেবা যত বেশি স্থানীয় পর্যায়ে বিকেন্দ্রীকরণ করা যায় বা নাগরিকের দোরগোড়ায় পৌঁছানো যায়, তত বেশি নাগরিক সন্তুষ্টি অর্জন সম্ভব হয়।

চতুর্থত, তথ্য অধিকার, ই-প্রকিউরমেন্ট, সামাজিক নিরীক্ষা এবং স্বাধীন নিরীক্ষা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। কারণ সুশাসনের মূল ভিত্তি হলো স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা।

বাজেটের আর্থিক বরাদ্দের পাশাপাশি প্রশাসনিক সংস্কার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। তাহলেই বাংলাদেশ অদূর ভবিষ্যতে একটি দক্ষ, অন্তর্ভুক্তিমূলক, জবাবদিহিমূলক এবং নাগরিকবান্ধব উন্নত রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে সক্ষম হবে।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বাংলাদেশের উন্নয়ন অভিযাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। কিন্তু উন্নয়নের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে সুশাসন ও জনপ্রশাসনের গুণগত উন্নয়নের ওপর। বিশ্বের সফল রাষ্ট্রগুলোর অভিজ্ঞতা আমাদের শেখায় যে প্রশাসনিক দক্ষতা, ডিজিটাল রূপান্তর, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা টেকসই উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি।

তাই বাজেটের আর্থিক বরাদ্দের পাশাপাশি প্রশাসনিক সংস্কার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। তাহলেই বাংলাদেশ অদূর ভবিষ্যতে একটি দক্ষ, অন্তর্ভুক্তিমূলক, জবাবদিহিমূলক এবং নাগরিকবান্ধব উন্নত রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে সক্ষম হবে।

তথ্যঋণ:

১। Ministry of Finance, Government of Bangladesh. (2026). Budget Speech and Budget Documents FY 2026–27;

২। Reuters. (2026). Bangladesh unveils $77 billion budget, eyes 6.5% growth;

৩। The Daily Star. (2026). Largest Budget in the Works;

৪। World Bank. (2025). Worldwide Governance Indicators (WGI);

৫। World Bank. (2024). GovTech Maturity Index;

৬। United Nations. (2024). United Nations E-Government Survey 2024;

৭। OECD. (2025). Government at a Glance 2025;

৮। Transparency International. (2025). Corruption Perceptions Index 2024;

৯। World Economic Forum. (2025). Global Competitiveness Report;

১০। Asian Development Bank (ADB). (2025). Public Sector Management and Governance Reports;

১১। Centre for Policy Dialogue (CPD). (2026). Recommendations on National Budget FY2026–27।

আবু সাঈদ মো. নাজমুল হায়দার : সহযোগী অধ্যাপক, লোক প্রশাসন বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]