শব্দ ও ভাষার মাধ্যমে মানুষের মনের চিন্তা, অনুভূতি, কল্পনা, অভিজ্ঞতা ও জীবনবোধের যে নান্দনিক প্রকাশ ঘটে, তাই তো সাহিত্য। এটা লিখিত বা মুখের ভাষার এক শিল্পিত প্রকাশ, যা কেবল তথ্য নয়, পাঠকের হৃদয় স্পর্শ করে, আনন্দ দেয় ও চিন্তার খোরাক জোগায়। সাহিত্যকে সাধারণত মানব ও সমাজজীবনের দর্পণ হিসেবে গণ্য করা হয়।
ক্রীড়াসাহিত্য সাহিত্যেরই একটি বিশেষ ধারা, যেখানে খেলাধুলাকে কেন্দ্র করে লেখা হয় বিভিন্ন ধরনের সৃজনশীল ও হৃদয়গ্রাহী রচনা। খেলার বর্ণনা বা নিয়মকানুনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে খেলোয়াড়দের অধ্যবসায়, জয়-পরাজয়ের আবেগ ও গভীরতর দিকগুলো শিল্পসম্মতভাবে তুলে ধরা হয়।
ফুটিয়ে তোলা হয় খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত সংগ্রাম, মানসিক টানাপোড়েন ও জীবনবোধ। খেলার মাধ্যমে সমাজের শ্রেণিভেদ, জাতীয়তাবাদ ও সংস্কৃতির মতো বিষয়গুলোও উঠে আসে।
সাহিত্য মানুষের জীবন, মনের কথা আর কল্পনাকে সুন্দর করে সাজিয়ে সমাজের প্রকৃত ছবিটা দেখায়। সাহিত্যের একটি বিশেষায়িত শাখা হিসেবে ক্রীড়াসাহিত্যে স্থান পায় খেলাধুলা, খেলোয়াড়দের জীবনসংগ্রাম, ক্রীড়াবিদদের মন-মানসিকতা ও ম্যাচের রোমাঞ্চ।
সাহিত্যে মানবজীবনের হাসি-কান্না, প্রেম-বিরহ, সামাজিক-রাজনৈতিকসহ সব ধরনের বিষয়ের প্রতিফলন ঘটে। ক্রীড়াসাহিত্যের মূল বিষয়বস্তু কোনো নির্দিষ্ট খেলা, খেলোয়াড়ের প্রশিক্ষণ, মাঠের ভেতর-বাইরের নানান অনুষঙ্গ ও ক্রীড়াঙ্গনের সঙ্গে সম্পৃক্ত বিভিন্ন ঘটনা বা দুর্ঘটনা।
উরুগুয়ের প্রখ্যাত লেখক এদুয়ার্দো গালিয়ানো ফুটবল নিয়ে যে টুকরো টুকরো ছবি এঁকেছেন, তা চিরায়ত হয়ে আছে। তার ফুটবল বিষয়ক বিখ্যাত বই ‘সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো’-তে লিখেছেন, ‘গোল হলো ফুটবলের চরম পুলক। আর চরম পুলকের মতোই আধুনিক জীবনে গোলও ক্রমশ বিরল হয়ে উঠছে’।
কিংবা ১৯৬৯ সালে উরুগুয়ের ক্লাব পেনারোল এবং এস্তুদিয়ান্তেসের মধ্যে একটি ফুটবল ম্যাচের সময় আক্রমণভাগের খেলোয়াড় পেদ্রো রোচার পারফরম্যান্সের বর্ণনা, ‘পেদ্রো রোচা ঘাসের বুকে সাপের মতো বয়ে যেতেন। তিনি খেলতেন আনন্দে আর সেই আনন্দ ছড়িয়ে পড়ত চারদিকে—খেলার আনন্দ, গোলের আনন্দ। বলের সঙ্গে তিনি যা ইচ্ছে তাই করতেন। আর বলটি, মুগ্ধ প্রেমিকার মতো, তার সবকিছুই বিশ্বাস করত’।
এ প্রসঙ্গে কিছুদিন আগে সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপের সেমিফাইনালে নেপালের বিপক্ষে ঋতুপর্ণা চাকমার ‘অলিম্পিক গোল’টির কথা মনে পড়ে যায়। সাংবাদিকতার দৃষ্টিকোণ থেকে এ গোলটির যেমন গুরুত্ব আছে, তেমনিভাবে এর সাহিত্য মূল্যকে অস্বীকার করা যাবে না।
ক্রীড়াসাহিত্যের ভাষায়, ‘গোয়ার সবুজ ঘাসের ক্যানভাস তখন এক চরম মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের রণক্ষেত্র। ঘড়ির কাঁটায় প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ের শেষ মুহূর্ত। গ্যালারির নেপালি সমর্থকদের উল্লাস আর ১-০ গোলের ব্যবধানে পিছিয়ে থাকা বাংলাদেশের মেয়েদের চোখে তখন ঘুরে দাঁড়ানোর ব্যাকুল তৃষ্ণা। ঠিক এমন এক মেঘাচ্ছন্ন মুহূর্তে কর্নার ফ্ল্যাগের কোণে বলটি বসালেন লাল-সবুজের অন্যতম সেরা উইঙ্গার ঋতুপর্ণা চাকমা। তিনি যখন শটটি নেওয়ার জন্য দৌড় শুরু করলেন, পুরো স্টেডিয়াম যেন এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। তার বাঁ-পায়ের জাদুকরী ছোঁয়ায় বলটি যখন শূন্যে ভেসে উঠল, সেটি কেবল একটি সাধারণ ক্রস ছিল না, তা ছিল বাতাসে আঁকা এক নিখুঁত জ্যামিতিক কাব্য। বলটি বাতাসে এক অলৌকিক বাঁক নিয়ে গোলপোস্টের অভিমুখে ধেয়ে যেতে থাকে।’
ক্রীড়াসাহিত্য সাহিত্যেরই একটি বিশেষ ধারা, যেখানে খেলাধুলাকে কেন্দ্র করে লেখা হয় বিভিন্ন ধরনের সৃজনশীল ও হৃদয়গ্রাহী রচনা। খেলার বর্ণনা বা নিয়মকানুনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে খেলোয়াড়দের অধ্যবসায়, জয়-পরাজয়ের আবেগ ও গভীরতর দিকগুলো শিল্পসম্মতভাবে তুলে ধরা হয়।
গালিয়ানোর অক্ষম অনুসরণে এ লেখায় খানিকটা অতিশয়োক্তি আর মনের মাধুরী মিশিয়ে আলপনার ছোঁয়া দেওয়া হয়েছে। আলপনার এই কারুকাজই ক্রীড়াসাহিত্যের অংশ। তার সঙ্গে বাস্তবের সম্পর্ক থাকার কোনো দায় নেই। রাঙামাটির দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে আসা সংগ্রামী নারী ঋতুপর্ণা চাকমার জীবনে রয়েছে ক্রীড়াসাহিত্যের পর্যাপ্ত রসদ।
সাহিত্য মানুষকে গভীর আনন্দ দেয় ও জীবন সম্পর্কে সচেতন করে। ক্রীড়াসাহিত্য সাধারণত খেলাধুলার প্রতি ভালোবাসা বৃদ্ধি করে, ক্রীড়াবিদদের জীবনের পেছনের ঘটনাবলী তুলে ধরে ও পাঠকদের অনুভবে পৌঁছে দেয় খেলার রোমাঞ্চ। সাহিত্যে থাকে শব্দের ছবি, কথার সুর আর ভাবনার গভীরতা। ক্রীড়াসাহিত্যের ক্ষেত্রেও একই ধারা অনুসরণ করা হলেও ভাষা তুলনামূলক সহজ, গতিশীল ও উত্তেজনাপূর্ণ হয়, যাতে পাঠক বিষয়ের সঙ্গে সহজেই একাত্ম অনুভব করতে পারেন।
ক্রিকেট সাহিত্যের জনক হিসেবে পরিচিত স্যার নেভিল কার্ডাস সেই কবেই লিখেছেন, ‘বহু বছর পরে আমরা আর স্কোরলাইন কিংবা ফলাফল মনে রাখি না, আমাদের কল্পনা আর স্মৃতির ভেতর বেঁচে থাকেন সেই মানুষগুলোই।’
সাম্প্রতিক বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়া ওয়ান ডে সিরিজে সফরকারী দলের ওপেনার ম্যাথু শর্ট বাংলাদেশের পেসার তাসকিন আহমেদ-এর বিপক্ষে পর পর দুই ইনিংসে শূন্য রানে আউট হয়ে অবাক হয়ে যান। নেভিল কার্ডাসের ধারা অনুসারে এ বিষয়ে আবেগ ও কল্পনাশক্তির দুর্বল প্রয়াস, ‘প্রথম ম্যাচের দুঃস্বপ্ন পেছনে ফেলে দ্বিতীয় ওয়ানডের শুরুতে আবার ব্যাট হাতে শর্ট। তাসকিন আবারও বল হাতে প্রস্তুত। এবার হয়তো নিজেকে কিছুটা প্রস্তুত রেখেছেন অজি ওপেনার। তাসকিন তার রানআপ শেষ করে হাত থেকে মুক্ত করলেন এক মায়াবী ডেলিভারি। বলটি পিচে পড়ে কিছুটা সুইং করে হালকা বাইরের দিকে যাওয়ার ভান করল। ম্যাথু শর্ট ভাবলেন, বলটি বাইরে চলে যাচ্ছে, তাই উইকেটরক্ষকের গ্লাভসে জমা পড়ার অপেক্ষায় তিনি ব্যাট উঁচিয়ে বল ছেড়ে দিলেন। কিন্তু বলের চরিত্র তখন অন্যরকম। মায়াবী সুইংয়ে বলটি আচমকা ভেতরে ঢুকে সোজা আঘাত হানল তার স্টাম্পে। দ্বিতীয়বারের মতো এমনভাবে বোকা বনে গিয়ে স্টাম্প ভাঙার শব্দ শুনে ম্যাথু শর্ট যেন এক ঘোরের মধ্যে পড়ে গেলেন। তার বিস্ময় ও হতাশা তখন রূপ নিলো এক অদ্ভুত শূন্যতায়।’
ক্রীড়া সাংবাদিকতায় কেবল ম্যাচের তথ্যসহ সার্বিক চিত্র আর ক্রীড়াসাহিত্যে খেলার আনন্দ-বেদনার অভিব্যক্তি বা মাধুর্য, অন্তর্নিহিত ঘটনা, পর্যবেক্ষণ ও দর্শন ফুটিয়ে তোলা হয়। নেভিল কার্ডাস, এদুয়ার্দো গালিয়ানোরা এ কারণেই ক্রীড়াসাহিত্যে অমর হয়ে আছেন।
তবে সাহিত্য ও ক্রীড়াসাহিত্য উভয়ই মানুষের আবেগ, সংগ্রাম ও হার-জিতের ঘটনাবলী চিত্রিত করে। ভাষার মুনশিয়ানা দিয়ে মানুষের শারীরিক-মানসিক উৎকর্ষ ও দর্শনের সন্ধান এবং জীবনের আশা, হতাশা ও সাফল্য মেলে ধরা হয়। যেকোনো ভালো সাহিত্যে দ্বন্দ্ব ও উত্তেজনার যেমন উপস্থিতি থাকে, তেমনিভাবে ক্রীড়া সাহিত্যেও খেলোয়াড়দের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক সংগ্রাম, ব্যক্তিগত লক্ষ্য ও প্রতিপক্ষের মধ্যকার দ্বন্দ্ব চমৎকারভাবে ফুটে ওঠে। খেলার মাঠে জয়ের পর যে উন্মাদনা বা হারের পর যে বেদনা থাকে, তা নিখুঁতভাবে সাহিত্যের রূপ পায়। ফুটে উঠে খেলোয়াড়দের লড়াকু জীবনের প্রতিচ্ছবি।
আরও পড়ুন
ইংরেজি ক্রীড়াসাহিত্যের পথ ধরে বাংলা ক্রীড়াসাহিত্যের ইতিহাস মূলত ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু হয়। খেলাধুলাকে কেন্দ্র করে আবেগ, জাতীয়তাবাদ ও সাহিত্যরস মিশিয়ে এই ধারার বিকাশ ঘটে। উনিশ শতকের শেষভাগে ও বিংশ শতাব্দীর শুরুতে ক্রীড়া সাংবাদিকতার হাত ধরে এর উন্মেষ ঘটে এবং পরবর্তীকালে তা প্রতিষ্ঠিত হয়। সেই সময় বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় খেলাধুলার বিবরণ ও নিয়মকানুন নিয়ে লেখালেখি শুরু হয়। তার অনেক পরে সূচনা হয় ক্রীড়াসাহিত্যের। তবে বাংলা ক্রীড়াসাহিত্যে ক্রিকেট নিয়ে যতটা চর্চা হয়েছে, সেই তুলনায় অন্য খেলা নিয়ে হয়নি।
বাংলা ক্রীড়াসাহিত্যে উজ্জ্বলতম নাম পশ্চিমবঙ্গের শঙ্করীপ্রসাদ বসু। ক্রিকেটকে কেন্দ্র করে তার লেখা বাংলা ক্রীড়াসাহিত্যের মাইলফলক হয়ে আছে। তার লেখনী শুধু খেলার বিবরণ নয়, তাতে বাঙময় হয়েছে দর্শন, রসবোধ ও নান্দনিকতা।
‘রমণীয় ক্রিকেট’ গ্রন্থে লিখেছেন, “দু’টি মেয়েতে কথা হচ্ছে গ্যালারিতে বসে। মেয়ে দু’টি সাজগোজ ক’রে এসেছে। তারা সাজতে জানে। তারা শুনেছে, কলকাতায় ইদানীং ক্রিকেট নাগরিকতার একটা অঙ্গ। তাই বাধ্য হয়েছে ক্রিকেট-মাঠে আসতে। মেয়েদের নিজস্ব এক ধরনের বিস্ময় ও শিহরণ মেশানো ‘ঈ’ আর ‘কী’র মাঝামাঝি তীক্ষ্ণ কাকলি আছে, বহুবার তার দ্বারা সচকিত সচঞ্চল করেছে আশপাশের ক্রিকেট রসিকদের। যে বরাঙ্গ ডানলোপিলো ছাড়া আশ্রিত হয় না, তা পাঁচ-ঘণ্টার উপর শক্ত কাঠের বেঞ্চকে সহ্য করেছে প্রসন্ন ভব্যতায়। এবার খেলা শেষ হচ্ছে, মাঠের উপর ছায়া নেমেছে, পাঁচদিনের টেস্ট খেলার প্রথম দিনের সমাপ্তি। তখন আসন্ন অন্ধকারের ধূসর আলোতে মাথার দোলনে একটি মেয়ের কানের হীরে ঝিকিয়ে উঠল, আর একটি মধুর বিস্ময়ভরা প্রশ্ন শোনা গেল-আচ্ছা ভাই, কোন্ দল জিতল বল্ তো?”
বাঙালির ফুটবল প্রীতি ও জাতীয়তাবোধ বাংলা সাহিত্যকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। ঔপনিবেশিক আমলে ফুটবল খেলা সাহিত্যিকদের মাঝে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল। কবি কাজী নজরুল ইসলাম, লেখক সৈয়দ মুজতবা আলীর লেখাতেও ফুটে উঠেছে ফুটবলের জয়গান। কলকাতা মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের সাফল্য নিয়ে ফুটবল পাগল কাজী নজরুল ইসলাম ‘মোবারকবাদ’ শিরোনামে লিখেছেন,
এই ভারতের অবনত শিরে তোমরা পরালে তাজ,
সুযোগ পাইলে শক্তিতে মোরা অজেয়, দেখালে আজ!
এ কি অভিনব কীর্তি রাখিলে নিরাশাবাদীর দেশে,
আঁধার গগনে আশার ঈদের চাঁদ উঠিল যে হেসে!
রসিকতার জন্য বিখ্যাত সৈয়দ মুজতবা আলী ‘ময়ূরকণ্ঠী’ গ্রন্থে ‘ফুটবল’ শিরোনামে রম্য রচনায় লিখেছেন, ‘আমি তো খেলার রিপোর্টার নই, তাই কে যে কাকে পাস করলে, কে কখন প্যার্টন উইভ করলে, কে কজন দুশমনকে নাচালে লক্ষ্য করি নি, তবে এটা স্পষ্ট দেখলুম, বলটাই যেন মনস্থির করে ফেলেছে, সবাইকে এড়িয়ে গোখার গোলে ঢুকবেই ঢুকবে। একে পাশ কাটিয়ে, ওর মাথার উপর দিয়ে, কখনো বা তিন কদম পেছিয়ে গিয়ে, কখনো বা কারো দু'পায়ের মধ্যিখানের ফাঁক দিয়ে বলটা হঠাৎ দেখি ধাই করে হাওয়ায় চড়ে গোখা গোলের সামনে! সঙ্গে সঙ্গে আমার হৃৎপিণ্ডটা এক লম্ফ দিয়ে টনসিলে এসে আটকে গিয়েছে বিকৃতস্বরে বেরল 'গো-অ-অ-ল!’
তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে ষাট দশকে চট্টগ্রামের বদরুল হুদা চৌধুরীর হাতে ক্রীড়াসাহিত্যের যাত্রা শুরু হয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে তা বিকশিত হয়েছে। দৈনিক পত্রিকাগুলোতে ক্রীড়া পাতার পাশাপাশি বিভিন্ন ম্যাগাজিন ও বইয়ে খেলার ইতিহাস, আত্মজীবনী ও সাহিত্যধর্মী লেখা প্রকাশিত হয়ে থাকে। প্রকাশিত হচ্ছে ক্রীড়া বিষয়ক চমৎকার সব গ্রন্থ।
বাংলাদেশের ক্রীড়াসাহিত্যের অগ্রণীদের একজন জালাল আহমেদ চৌধুরী ‘বিশ্বকাপ ও কয়েক ছত্র ক্রিকেট’ গ্রন্থে ‘লয়েডের শেষদিন’ শিরোনামে লিখেছেন, “বড় করুণ সেই মহীরুহের পতন, তার অন্তর্ধান। যেন শতাব্দী প্রাচীন এক মহাবৃক্ষকে উপড়ে ফেলেছে ঝড়। উৎপাটিত সেই বৃষস্কন্ধকে ইতিহাসের যাত্রা পথ থেকে টেনে সরিয়ে নিচ্ছে এক অদৃশ্য বুলডোজার। আর সেই দৃশ্য তাকিয়ে দেখছে সেই সব পাখিরা যারা বাসা বাঁধতো তার শাখায়, সেইসব পথিকেরা যারা শ্রান্তি দূর করতো মর্মরিত পল্লব-কুঞ্জের শ্যামল ছায়ায়, সেই সব রাখালেরা যারা আঁড় বাঁশীতে ‘সেই মোহন বটের’ মূল কাঁপাতো এবং ওরাও দেখছে, ওরা-সেই সব বিষ পিঁপড়েরা যারা তরতর করে তার কাণ্ড বেয়ে উঠে যেতো তার হৃদয়ের আশ্রয়গ্রন্থীসমূহে। বিয়োগবিধুর এক থমথমে পরিপার্শ্বে তিনি ফিরে চলেছেন। যেনো এক গম্ভীর রাগিণী বাজাচ্ছেন তার সানাই-এ বিসমিল্লাহ খান। নোনা অশ্রু ভাঙতে চাইছে হাজার হাজার ক্রিকেট দর্শকের চোখের দেয়াল। বড় হার্দ্য, বড় আর্দ্র সেই দৃশ্য।”
সাহিত্য মানুষকে গভীর আনন্দ দেয় ও জীবন সম্পর্কে সচেতন করে। ক্রীড়াসাহিত্য সাধারণত খেলাধুলার প্রতি ভালোবাসা বৃদ্ধি করে, ক্রীড়াবিদদের জীবনের পেছনের ঘটনাবলী তুলে ধরে ও পাঠকদের অনুভবে পৌঁছে দেয় খেলার রোমাঞ্চ। সাহিত্যে থাকে শব্দের ছবি, কথার সুর আর ভাবনার গভীরতা। ক্রীড়াসাহিত্যের ক্ষেত্রেও একই ধারা অনুসরণ করা হলেও ভাষা তুলনামূলক সহজ, গতিশীল ও উত্তেজনাপূর্ণ হয়, যাতে পাঠক বিষয়ের সঙ্গে সহজেই একাত্ম অনুভব করতে পারেন।
বিশ্বকাপ ফুটবলের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ক্রীড়াসাহিত্য। ফুটবলের মাঠের আবেগ, খেলোয়াড়দের জীবনসংগ্রাম ও জীবনদর্শনের বিষয়গুলো চমৎকারভাবে উঠে আসে। বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে মানুষের আনন্দ-বেদনা, দ্বন্দ্ব-সংঘাত, রাজনীতিকে উপজীব্য করে রচিত হয়েছে বিশ্বমানের অনেক সাহিত্য।
কবি সানাউল হক খান ‘ছন্দে ছন্দে খেলার আনন্দে’ গ্রন্থে বিশ্বকাপ ফুটবল নিয়ে “ইটালিয়া-’৯০: কয়েকছত্র” শিরোনামে লেখেন,
এক
হাঁটু ব্যথা, পায়ে ব্যথা, কোমরে কি যন্ত্রণা?
হোমিও’র বেলেডোনা খেয়েছে কি ম্যারাডোনা?
পানিপট্টি, আইওডেক্স, হলদি ও বাটা চুন
বিলেতির গায়ের জ্বর : উরে ব্বাবা, ক্যামেরুন!
আইলো রে আফ্রিকা, শ্বেতাঙ্গ সাবধান
রাফ-টাফ, নিপুণতা-সবদিকে বেগবান!
ফুটবল ফুটবল কালো দল দ্যায় ঠ্যালা
ভোর হলো, দোর খোলো নেলসন ম্যান্ডেলা
এশিয়ার মাটি ফুঁড়ে সে মানুষ আসবে?
যাকে দেখে হ্যাভালাঞ্জ খুব ভালোবাসবে?
দুই
শিফো-মিলা-ম্যাকানাকি, ভালদেরামারা
হ্যাজি চষে সারামাঠ : দিল্ লিয়া হামারা
মার্ মার্ কাট্ কাট্ জব্বর খেলেছে
তৃতীয় সে বিশ্বের পাখা যেন মেলেছে।
এক সময় শেষ হয়ে যায় মাঠের খেলা। স্টেডিয়ামের আলো নিভে যায়। দর্শকেরা ফিরে যান নিজেদের জীবনে। আনন্দ-বেদনার মুহূর্তগুলো একসময় স্মৃতির কুয়াশায় মিলিয়ে যায়। আর ঠিক তখনই জন্ম নেয় ক্রীড়াসাহিত্য।
হারিয়ে যাওয়া মুহূর্তগুলো নতুন জীবন পায়। অল্প সময়ের সেই দক্ষতা চিরদিনের সৌন্দর্য হয়ে থাকে। মাঠের লড়াই শেষ হয়ে গেলেও শব্দের ভুবনে খেলা চলতেই থাকে। আর সেখানেই ক্রীড়াসাহিত্য হয়ে উঠে চিরন্তন।
দুলাল মাহমুদ : ক্রীড়ালেখক ও গবেষক

