বাংলাদেশসহ পুরো বিশ্ব যখন ফিফা বিশ্বকাপে নিজের সমর্থিত দলের দৃঢ় অবস্থান নিয়ে চায়ের কাপে ঝড় তুলছে ঠিক সেই সময় বাংলাদেশের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের রেকর্ড ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেট সবার মাঝে আলোচনার প্রধান কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে।
‘গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির পথে যাত্রা’ এই প্রতিপাদ্যকে কেন্দ্র করে প্রণীত এই বাজেটে ৬.৫ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং মুদ্রাস্ফীতি ৭.৫ শতাংশে নামানোসহ সুরক্ষা কর্মসূচির জন্য রেকর্ড পরিমাণ ১,৪৪,৩৩৮ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করেছে সরকার, যা আগের বছরের তুলনায় ১৪.৪% বেশি।
এই বরাদ্দ মোট বাজেটের প্রায় ১৫.৩৯% এবং দেশের জিডিপির ২.১১%। কার্যকারিতা বৃদ্ধি এবং অপচয় কমাতে সুরক্ষা কর্মসূচির মোট সংখ্যা ৯৫ থেকে ৯০- এ নামানো হলেও বিভিন্ন কর্মসূচিতে উপকারভোগী বাড়ানোর সাথে সাথে বাড়ানো হয়েছে ভাতার পরিমাণ।
৯০টি কর্মসূচির মধ্যে ৪৫টি সম্পূর্ণরূপে দরিদ্রকেন্দ্রিক হিসেবে শ্রেণীবদ্ধ করা হয়েছে, যেগুলোর জন্য ৫৫,০০০ কোটি টাকার কিছু বেশি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে বয়স্কদের জন্য বিশেষ সুবিধা, ফ্যামিলি কার্ড এবং কৃষক কার্ড সবচেয়ে আলোচিত হচ্ছে জনসাধারণের নিকট।
সাধারণ বয়স্ক ভাতা ৭০০ টাকা মাসিক করা এর পাশাপাশি ৯০ বছরের বেশি বয়সী বয়স্ক, বিধবা ও প্রতিবন্ধী সুবিধাভোগীদের জন্য মাসিক ১,০০০ টাকার বিশেষ ভাতার ব্যবস্থা প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী নাগরিকদের সরকারি মালিকানাধীন গণপরিবহন, বিশেষত ট্রেনে ভ্রমণের ক্ষেত্রে ভাড়া থেকে সম্পূর্ণ অব্যাহতি এবং মেট্রোরেলে ভ্রমণের ক্ষেত্রে ভাড়ায় ২৫ শতাংশ ছাড় দেওয়ার প্রস্তাব নতুনদিক উন্মোচন করেছে।
...প্রস্তাবিত বাজেটে নতুন আটটি কর্মসূচিসহ সামাজিক সুরক্ষার মূলমন্ত্র হলো প্রবীণ, নারীপ্রধান পরিবার এবং প্রান্তিক কৃষকদের সরাসরি নগদ সহায়তা ও সরকারি সেবার আওতায় আনা।
মোট অর্থের ৩০ শতাংশ এককালীন গ্র্যাচুইটি হিসেবে প্রদানের সুযোগ দিয়ে সর্বজনীন পেনশন প্রকল্পকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলার উদ্যোগ নেবে বলে সরকার আশ্বাস দিয়েছে।
নতুন অন্তর্ভুক্তি হিসেবে নারীপ্রধান, দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ প্রায় ৪১ লাখ পরিবারকে পরিবারপ্রতি নিয়মিত নগদ সহায়তা দেওয়ার লক্ষ্যে ফ্যামিলি কার্ড অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা প্রস্তাবিত হয়েছে। এছাড়া প্রাথমিকভাবে ৪২.৫ লাখ কৃষক ও কৃষিসংশ্লিষ্ট উৎপাদককে বছরে একবার ২,৫০০ টাকা নগদ সহায়তাসহ কৃষি ভর্তুকি, সরকারি কৃষিসেবা, প্রশিক্ষণ এবং অন্যান্য সুবিধা সহজে পৌঁছে দেওয়ার প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কৃষক কার্ড প্রস্তাবিত হয়।
আরও পড়ুন
২,৫৫,৬৬৬ জন ধর্মীয় কর্মকর্তাকে মাসিক উপবৃত্তি প্রদানের জন্য ১,১০০ নয় কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। ইমাম, পুরোহিত ও মন্দির প্রধানরা পাবেন ৫,০০০ টাকা, মুয়াজ্জিনরা ৩,০০০ টাকা এবং প্রাতিষ্ঠানিক পরিচারকরা ২,০০০ টাকা। জুলাই অভ্যুত্থান কল্যাণ সহায়তার লক্ষে চিকিৎসা সহায়তা ও মাসিক সম্মানী বাবদ ৪৪৮ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) সামাজিক সুরক্ষার ন্যূনতম স্তর সংক্রান্ত সুপারিশ, ২০১২ (নং ২০২) (আইএলও, ২০১২) এই মর্মে নিশ্চয়তা প্রদান করে যে, সামাজিক সুরক্ষা একটি মানবাধিকার। তাই সামাজিক নিরাপত্তা খাত সম্প্রসারণের দরকার রয়েছে। বর্তমানে প্রস্তাবিত বাজেটে নতুন আটটি কর্মসূচিসহ সামাজিক সুরক্ষার মূলমন্ত্র হলো প্রবীণ, নারীপ্রধান পরিবার এবং প্রান্তিক কৃষকদের সরাসরি নগদ সহায়তা ও সরকারি সেবার আওতায় আনা।
বাংলাদেশকে একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষে সরকারের এই উদ্যোগকে অবশ্যই স্বাগত জানাই। তবে সামাজিক সুরক্ষার জন্য একটি সুসংহত ও পদ্ধতিগত কৌশল ছাড়া প্রস্তাবিত লক্ষ্যগুলো অর্জন করা কঠিন। কর্মসূচির যোগ্যতা মূল্যায়নের জন্য ব্যবহৃত মানদণ্ডটি দারিদ্র্য এবং ঝুঁকির ওপর ভিত্তি করে নির্বাচন করা হলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ত্রুটিপূর্ণ হয়, যার ফলে উচ্চ মাত্রায় বর্জনজনিত ত্রুটি (যোগ্য ব্যক্তিরা অন্তর্ভুক্ত না হওয়া) এবং অন্তর্ভুক্তিজনিত ত্রুটি (অযোগ্য ব্যক্তিরা সুবিধা পাওয়া) ঘটে।
...সুরক্ষার সীমা এমন হবে যেন এটি জরুরি অবস্থায়ও পরিবারগুলো স্থিতিশীল রাখে। যাতে করে তারা আরও গভীর ও স্থায়ী দুর্দশার মধ্যে তলিয়ে না যায়।
গবেষণায় দেখা গেছে যে, সুবিধাভোগী নির্বাচনের সময়ই ত্রুটি, জালিয়াতি এবং দুর্নীতির সর্বোচ্চ সম্ভাবনা থাকে। এই অন্তর্ভুক্তি ও বর্জন সংক্রান্ত ত্রুটি, জালিয়াতি এবং দুর্নীতির মোকাবিলা করা একটি কঠিন কাজ, কারণ অনিয়মের অন্তর্নিহিত কারণগুলো উদ্ঘাটন করার জন্য তথ্যের অভাবের সাথে মন্ত্রণালয়গুলোর অভ্যন্তরীণ কার্যাবলী পরিচালনার সক্ষমতার ঘাটতি রয়েছে।
লক্ষ্য অর্জন নিশ্চিত করতে হলে সামাজিক সুরক্ষার উদ্যোগগুলোর অসম বণ্টনগুলো পুনর্বণ্টন করতেই হবে। স্থানীয় রাজনীতিবিদদের দ্বারা পরিচালিত কাগজ-ভিত্তিক নির্বাচন ব্যবস্থা থেকে সম্পূর্ণরূপে সরে এর পরিবর্তে একটি অনলাইন, তথ্য-চালিত ব্যবস্থা চালু করে, বস্তুনিষ্ঠ যোগ্যতা মূল্যায়নের মাধ্যমে সুবিধাভোগীদের মূল্যায়ন করতে হবে।
যদিও সরকার ‘সিঙ্গেল রেজিস্ট্রি সিস্টেম’ এবং ‘ডাইনামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রি’ জোরদার করেছে বলে আশ্বাস দিয়েছে। তবে সমন্বিত ডাটাবেস ও কাঠামোর মধ্যে সামাজিক সুরক্ষার এ উদ্যোগ কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ করতে না পারলে তা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে।
টাকার অঙ্কের চাদরে সুরক্ষা তৈরি করার পাশাপাশি কার্যকরী কর্মসূচির চাদরে সুরক্ষা তৈরি করতে হবে। প্রশাসনিক ব্যয় কমাতে এবং দক্ষতা বাড়াতে আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় করে অন্তর্ভুক্তি যোগ্য ব্যক্তিদের নিকট কর্মসূচি সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা প্রদান করতে হবে।
সুরক্ষার সীমা এমন হবে যেন এটি জরুরি অবস্থায়ও পরিবারগুলো স্থিতিশীল রাখে। যাতে করে তারা আরও গভীর ও স্থায়ী দুর্দশার মধ্যে তলিয়ে না যায়।
রুনা সাহা : সহকারী অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
