বাংলাদেশের বেসামরিক বিমান পরিবহন খাত এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর-এর তৃতীয় টার্মিনাল শুধু একটি অবকাঠামো প্রকল্প নয়; এটি দেশের অর্থনীতি, বাণিজ্য, পর্যটন এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ব্যবস্থার নতুন ভিত্তি।
এই টার্মিনালের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং কার্যক্রমে সিঙ্গাপুরের স্যাটস্, সংযুক্ত আরব আমিরাতের ডানাটা, যুক্তরাজ্যের মেনজিস, তুরস্কের সেলেবি এভিয়েশন এবং সুইজারল্যান্ডের সুইসপোর্ট প্রতিষ্ঠানের আগ্রহ প্রকাশ নিঃসন্দেহে একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। এটি একদিকে বাংলাদেশের প্রতি আন্তর্জাতিক আস্থার বহিঃপ্রকাশ, অন্যদিকে নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।
অনেকেই একে ‘মধুর সমস্যা’ বলে অভিহিত করছেন। কারণ, সাধারণত উন্নয়নশীল দেশগুলো বিদেশি বিনিয়োগ বা আন্তর্জাতিক অপারেটর আকর্ষণের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়।
অথচ বাংলাদেশের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন। এখানে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং কোম্পানিগুলো নিজেরাই আগ্রহ দেখাচ্ছে। কিন্তু বিষয়টি কেবল আনন্দের নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কৌশলগত, অর্থনৈতিক এবং জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন।
বিশ্বব্যাপী বিমান পরিবহন শিল্পে একটি বিমানবন্দরের প্রকৃত শক্তি নির্ধারিত হয় তার রানওয়ে বা টার্মিনালের আকার দিয়ে নয়, বরং অপারেশনাল দক্ষতা দিয়ে। গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সেই দক্ষতার মূল ভিত্তি।
একটি উড়োজাহাজ অবতরণের পর থেকে পুনরায় উড্ডয়ন পর্যন্ত যে সব কার্যক্রম পরিচালিত হয়—ব্যাগেজ হ্যান্ডলিং, কার্গো লোডিং-আনলোডিং, কেটারিং, ক্লিনিং, যাত্রী বোর্ডিং, বিমানের পুশব্যাক, র্যাম্প অপারেশন এবং বিভিন্ন নিরাপত্তা কার্যক্রম—সবই গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের আওতাভুক্ত।
বিশ্বের ব্যস্ত বিমানবন্দরগুলো একটি উড়োজাহাজের টার্নঅ্যারাউন্ড বা গ্রাউন্ড টাইম ৩০ থেকে ৬০ মিনিটের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়। এই সময় যত কম হবে, এয়ারলাইন্সের লাভ তত বাড়বে। ফলে দক্ষ গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্সগুলোর আস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তৃতীয় টার্মিনাল চালু হলে যাত্রী ধারণক্ষমতা কয়েকগুণ বৃদ্ধি পাবে। বর্তমানে বছরে প্রায় এক কোটির কিছু বেশি যাত্রী পরিবহন হলেও নতুন টার্মিনাল পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে সেই সংখ্যা দুই থেকে আড়াই কোটির কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে। একই সঙ্গে কার্গো পরিবহনেও উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি ঘটবে। এই বিশাল বাজারই বিদেশি অপারেটরদের আকৃষ্ট করছে।
সিঙ্গাপুরের স্যাটস্ এশিয়ার অন্যতম সফল বিমানবন্দর সেবা প্রতিষ্ঠান। তারা বিশ্বের বিভিন্ন বিমানবন্দরে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ও কার্গো সেবা পরিচালনা করে। তাদের আগ্রহের অর্থ হলো, আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে বাংলাদেশের বাজার এখন লাভজনক ও সম্ভাবনাময়।
একইভাবে সংযুক্ত আরব আমিরাত ভিত্তিক ডানাটা (Dnata)-র আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। কারণ মধ্যপ্রাচ্যের এভিয়েশন খাত বর্তমানে বিশ্বের দ্রুততম বর্ধনশীল খাতগুলোর একটি। দুবাই ও আবুধাবির মতো হাব বিমানবন্দর পরিচালনার অভিজ্ঞতা নিয়ে তারা বাংলাদেশে সুযোগ খুঁজছে।
যুক্তরাজ্যের মেনজিস, তুরস্কের সেলেবি এভিয়েশন ও সুইজারল্যান্ডের সুইসপোর্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর আগ্রহও একটি স্পষ্ট বার্তা দেয়—বাংলাদেশ আর শুধু শ্রম রপ্তানিকারক দেশ নয়; এটি এখন একটি উদীয়মান আঞ্চলিক এভিয়েশন বাজার।
বিদেশি অংশগ্রহণের সবচেয়ে বড় সুবিধা হবে প্রযুক্তি ও দক্ষতার স্থানান্তর। আধুনিক গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং এখন অনেকাংশে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তিনির্ভর। ব্যাগেজ ট্র্যাকিং, কার্গো ম্যানেজমেন্ট, ডিজিটাল র্যাম্প কন্ট্রোল এবং স্মার্ট অপারেশন সিস্টেমের ব্যবহার যাত্রীসেবাকে দ্রুত ও নির্ভুল করে।
বিদেশি প্রতিষ্ঠান এলে আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ নিশ্চিত হবে, নতুন প্রযুক্তি আসবে, অপারেশনাল দক্ষতা বাড়বে, বিমানবন্দরের সেবার মান উন্নত হবে, আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্সের আস্থা বৃদ্ধি পাবে, কার্গো ব্যবসায় নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্সকে বাংলাদেশে আরও বেশি ফ্লাইট পরিচালনায় উৎসাহিত করবে।
তবে বিষয়টির অন্য দিকও রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স দেশের বিমানবন্দরগুলো গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সেবা প্রদান করে আসছে। বিদেশি প্রতিষ্ঠান এলে তাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতার বাস্তবতা তৈরি হবে।
প্রশ্ন হলো, দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে কি পর্যাপ্ত সক্ষমতা উন্নয়নের সুযোগ দেওয়া হয়েছে? যদি বিদেশি প্রতিষ্ঠান সরাসরি পুরো কার্যক্রমের নিয়ন্ত্রণ পায়, তাহলে দেশীয় দক্ষ জনবল ও প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা লাভবান হবে?
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জাতীয় নিরাপত্তা। বিমানবন্দরের গ্রাউন্ড অপারেশন একটি সংবেদনশীল খাত। এখানে যাত্রী তথ্য, কার্গো নিরাপত্তা এবং বিমান পরিচালনার নানা গোপনীয় তথ্য জড়িত থাকে। তাই বিদেশি অংশীদার নির্বাচন করতে হলে শুধু আর্থিক প্রস্তাব নয়, নিরাপত্তা সক্ষমতাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে কার্যকর মডেল হতে পারে যৌথ উদ্যোগ। এতে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তি, দক্ষতা ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা যেমন কাজে লাগবে, তেমনি দেশীয় প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণও নিশ্চিত হবে।
বিশ্বের অনেক দেশে এ ধরনের মডেল সফলভাবে পরিচালিত হচ্ছে। এতে স্থানীয় কর্মসংস্থান রক্ষা পায়, দক্ষতা বৃদ্ধি পায় এবং দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত হয়।
তৃতীয় টার্মিনালকে ঘিরে যে আন্তর্জাতিক আগ্রহ তৈরি হয়েছে, তা আসলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার প্রতিফলন। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, কর্ণফুলী টানেল, রূপপুর পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, গভীর সমুদ্রবন্দর এবং অন্যান্য মেগা প্রকল্পের মতোই এটি দেশের আধুনিকায়নের প্রতীক।
এক সময় আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্সগুলো বাংলাদেশকে শুধু যাত্রী পরিবহনের উৎস হিসেবে দেখত। এখন তারা বাংলাদেশকে একটি সম্ভাব্য আঞ্চলিক সংযোগ কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করছে। এই পরিবর্তনই সবচেয়ে বড় অর্জন।
তৃতীয় টার্মিনালের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের আগ্রহ নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের জন্য গর্বের বিষয়। এটি প্রমাণ করে যে দেশের এভিয়েশন খাত এখন বৈশ্বিক মানচিত্রে গুরুত্ব পাচ্ছে। তবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে আবেগ নয়, প্রয়োজন দূরদর্শিতা।
বিদেশি বিনিয়োগ, আধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষ জনবল, জাতীয় নিরাপত্তা এবং দেশীয় প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ-সবকিছুর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করেই এগোতে হবে। কারণ তৃতীয় টার্মিনালের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং কেবল একটি ব্যবসায়িক চুক্তির বিষয় নয়; এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ এভিয়েশন কৌশলের ভিত্তি।
আজ বিশ্বের নামকরা প্রতিষ্ঠানগুলো যখন ঢাকার আকাশপথের সম্ভাবনায় বিনিয়োগ করতে চায়, তখন সেটি নিছক একটি ‘মধুর সমস্যা’ নয়; বরং এটি বাংলাদেশের জন্য একটি বিরল সুযোগ-যা সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে দেশ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এভিয়েশন হাবে পরিণত হতে পারে।
মো. কামরুল ইসলাম : ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, ঢাকা পোস্ট
