তোমাসির হোয়াটসঅ্যাপ অন আছে দেখলাম। তাকে লিখলাম, মেসির জন্মদিনটা এবার কীভাবে উদযাপন করবে বলে ভেবেছো?
মিনিট দুয়েক সাড়াশব্দ নেই। তারপর হোয়াটসঅ্যাপ ইনবক্সে বুড়বুড়ি কাটতে লাগলো ডটগুলো। তোমাসি লিখছে, জবাব দিচ্ছে।
‘এটা আসলে অস্ট্রিয়া ম্যাচের ওপর নির্ভর করছে। ম্যাচটা কেমন যায়, সেটা আগে দেখি।’
অবাক হতে হলো। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে জিততে না পারলে মেসির জন্মদিনটা অনাড়ম্বরই যাবে আর্জেন্টিনায়! তার মানে বীরভোগ্যা বসুন্ধরা! তুমি যতক্ষণ সফল, ততক্ষণ তোমার প্রশংসা ও স্তুতি, ব্যর্থ হলেই অনাদৃত। উনচল্লিশের প্রান্তে দাঁড়িয়ে যে ফুটবলার বিশ্বকাপের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা মিরোস্লাভ ক্লোসার সঙ্গে ১৬ গোল নিয়ে ভাগাভাগি করছে সিংহাসন, তোমরা তারই জন্মদিনে কী করবে, ভাবছো?
তোমাসিকে এটা লিখলামও। ২১ জুনের গভীর রাত। তোমাসি যে জবাব দিলো তাতে বিষণ্নতা, ‘জানো তো লিওর (মেসি) বাবা রোগশয্যায়। ভীষণ অসুস্থ। গোটা আর্জেন্টিনারই এ নিয়ে মন খারাপ।’
তোমাসিকে প্রথম দেখি ২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপে। বুয়েনোস আইরেসের কোনো একটি রেডিওতে কাজ করা এই সাংবাদিকের সঙ্গে খুব বেশি ঘনিষ্ঠতা তখন হয়নি। যা হলো পরেরবার কাতার বিশ্বকাপে। ২০২৬ উত্তর আমেরিকা বিশ্বকাপে আমার মতো তারও যাওয়া হয়নি। আছে বুয়েনোস আইরেসেই।
২৩ জুন শারীরিক শক্তিনির্ভর অস্ট্রিয়ার কঠিন চ্যালেঞ্জ উতরে জোড়া গোলে আর্জেন্টিনাকে জেতালেন মেসি। ক্লোসাকে ছাপিয়ে বিশ্বকাপে গোলের চূড়ায় উঠলেন। হোয়াটসঅ্যাপে উত্তর এসে গেল তোমাসির, ‘এবার লিওর জন্মদিনটা সাড়ম্বরেই উদযাপিত হবে। বাবা অসুস্থ বলে সে যদিও চায় না পরিবার এটা নিয়ে মেতে উঠুক। কিন্তু আর্জেন্টিনাবাসী তা নিয়ে আর ভাবছে না। তা ছাড়া হোর্হে (মেসির বাবা, মেসি সিনিয়র) এখন অনেকটাই ভালো।’
অস্ট্রিয়া জুজু কেটে গেছে। সুতরাং মেসির ৩৯তম জন্মদিনের উৎসব চলবে। হোর্হে এখনো হাসপাতাল থেকে ছাড়া না পাওয়ায় সবার মন একটু খারাপ। জন্মদিনের আনুষ্ঠানিকতায় তাতে বিষণ্নতা ভর করার কারণ নেই।
জন্মদিনের ৪৮ ঘণ্টা আগের ম্যাচটিতে জোড়া গোল করে যিনি বিশ্বকাপের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার সিংহাসনে বসেন সেটি ফুটবলের পৃথিবীর সবচেয়ে বিখ্যাত জন্মদিন। এই জন্মদিনের সুবাস ছড়িয়ে পড়ুক পারানা নদীর ধারের রোজারিও শহর থেকে দানিউব পাড়ের ভিয়েনায়। ছড়িয়ে পড়ুক ভূমধ্যসাগরের আলজিয়ার্স উপসাগর তীরবর্তী আলজেরিয়ার রাজধানীতে।
মেসি এরকমই। দলের দুঃসময়ে নিজের জন্মদিনের উদযাপন তার কাছে অনাকাঙ্ক্ষিত। চিরকালের অন্তর্মুখী চরিত্রের এই ফুটবলার সুসময়ে ঘটা করে জন্মদিন উদযাপন হোক, তাও চান না।
আলজেরিয়ার বিপক্ষে নিজের ষষ্ঠ বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেই হ্যাট্রিক করে মেসি যখন টপকালেন গার্ড মুলারকে, পেরোলেন রোনালদো নাজারিওকে, ছুঁয়ে ফেললেন মিরোস্লাভ ক্লোসাকে, তখনই একটি আটত্রিশ পেরোনো নাতিদীর্ঘ শরীর শুধু আলজেরিয়ায় কেন সমাগত জন্মদিনের বার্তা পৌঁছে দিয়েছে পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তে।
মানে সবাই মেনে নিয়েছে এই গ্রহে তুমিই ফুটবলশ্রেষ্ঠ। ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো নামটি কিছু ঈর্ষাকাতর মানুষের মনের বিভ্রান্তি। যাকে তুমি ঢেকে দিয়েছো ধূসর ছায়ায়।
এই জন্মদিন ৩৯টি নীল পদ্মের সুরভি ছড়িয়ে উদযাপিত হোক জার্মানির গেলসেনকির্চেন শহরে, যেখানে মেসিকে প্রথম পেয়েছে বিশ্বকাপ। যেখান থেকে শুরু ১৮ গোলের এই অলৌকিক যাত্রা।
৩৯ লাল গোলাপে সুরভিত এই জন্মদিন উদযাপিত হোক দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গে। যেখানে তার দ্বিতীয় বিশ্বকাপ যাত্রা শুরু ২৩ বছর বয়সে। এই জন্মদিন উদযাপিত হোক ব্রাজিলের রিওতে। যেখানে শুভসূচনা হয়েছিল মেসির তৃতীয় বিশ্বকাপ যাত্রার। এই জন্মদিনটি নিশ্চয়ই বরণ ও স্মরণ করছে ২০১৮ বিশ্বকাপের মস্কোও।
মেসির জন্ম যেহেতু ২৪ জুন, আর চার বছর পর পর সাধারণত জুন মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহেই গড়ায় বিশ্বকাপ, মেসির জন্মদিন আর বিশ্বকাপ তাই জড়িয়ে পড়েছে অঙ্গাঙ্গীভাবে। ২০০৬, ২০১০, ২০১৪, ২০১৮-এর পর এই নিয়ে পঞ্চমবার বিশ্বকাপের হুলুস্থুল সময়েই জন্মদিন উদযাপন মেসির।
বিশ্বকাপে দল মনোযোগী থাকে মাঠের খেলায়। কখনো কখনো সময় হয়ে ওঠে ক্লান্তিকর, মানসিক চাপে ধ্বস্ত শরীর। কারও জন্মদিনই তখন বর্ণাঢ্য উদযাপনের উপলক্ষ নিয়ে আসে না। আর মেসি তো সবসময়ই অন্যরকম। নিজের জন্মদিন উদযাপনের চেয়ে আর্জেন্টিনার পরের ম্যাচের জয়টাই থাকে তার হৃদয় জুড়ে।
২০১৮ বিশ্বকাপে মস্কো অবলাৎসের ছোট্ট নিরিবিলি শহর ব্রোনিৎসিতে ডেরা বেঁধেছিল আর্জেন্টিনা। সেখানে জন্মদিনের আনুষ্ঠানিকতা একেবারেই অনাকাঙ্ক্ষিত ছিল মেসির কাছে। কারণ নিজেদের প্রথম ম্যাচে তার পেনাল্টি মিস হওয়ায় আর্জেন্টিনা আইসল্যান্ডের সঙ্গে অপ্রত্যাশিত ড্র করেছে।
দ্বিতীয় ম্যাচে ক্রোয়েশিয়ার কাছে ৩-০ গোলে বিধ্বস্ত হয়ে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায়ের কিনারায়। এই দুঃসময়ে এলো তার জন্মদিন। ২২-২৫ হাজার মানুষের ছোট্ট শহর ব্রোনিৎসি অবশ্য মেতে উঠলো মেসির ৩১তম জন্মদিনে।
আর্কাঞ্জেল মাইকেল গির্জার পেছনে বেলস্কয় হৃদের পাড়ে বিরাট মঞ্চ বেঁধে চলল কনসার্ট। আর হৃদের উল্টো দিকের স্পোর্টস ট্রেনিং সেন্টারে আর্জেন্টাইন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট চিকি তাপিয়া কোচ হোর্হে সাম্পাওলি ও দলের সব খেলোয়াড়কে নিয়ে মেসির জন্মদিনের কেক কাটলেন।
দুদিন পর ২৬ জুন সেন্ট পিটার্সবার্গে আর্জেন্টিনার মরণ-বাঁচন লড়াই নাইজেরিয়ার সঙ্গে। মেসি প্রথমেই দুর্দান্ত এক গোল করে এগিয়ে দিলেন আর্জেন্টিনাকে। আকাশি-সাদা শিবিরের কাঁপুনি তুলে পেনাল্টি থেকে এই গোল শোধ করে দিলো নাইজেরিয়া।
দ্বিতীয়ার্ধে মার্কোস রোহোর গোলে গ্রুপের শেষ ম্যাচে জয় নিয়েই ফিরলো আর্জেন্টিনা। উঠলো দ্বিতীয় রাউন্ডে। সেখানেই যদিও স্বপ্নের সমাধি শেষ পর্যন্ত চ্যাম্পিয়ন হওয়া এমবাপ্পেদের ফ্রান্সের হাতে।
মেসি এরকমই। দলের দুঃসময়ে নিজের জন্মদিনের উদযাপন তার কাছে অনাকাঙ্ক্ষিত। চিরকালের অন্তর্মুখী চরিত্রের এই ফুটবলার সুসময়ে ঘটা করে জন্মদিন উদযাপন হোক, তাও চান না। তারপরও এই জন্মদিন উদযাপিত হবে রোজারিওতে। বুয়েনোস আইরেসে। গোটা আর্জেন্টিনায়।
সাত সমুদ্র তেরো নদী পেরিয়ে সারা পৃথিবীতে। যেখানে ফুটবল নামের আশ্চর্য মোহময় খেলাটি আছে, সবখানে। উদযাপনের মূল কেকটা তাকে নিয়েই কাটা হবে কানসাস সিটির অরিজিন হোটেলে। আমেরিকার মিসৌরি নদীর পাড়ের যে হোটেলে এবার বেসক্যাম্প করেছে আর্জেন্টিনা।
...সাহস, আত্মত্যাগ আর প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রতীক হিসেবে শুধু আর্জেন্টিনাতেই নয়, ফুটবলের পৃথিবীতেই আনাহির মতো চির নমস্য নামটি যে মেসি। লিওনেল আন্দ্রেস মেসি কুচ্চিত্তিনি।
জন্মদিনের জাঁকালো অনুষ্ঠান মেসি চান না সত্যি কথা। এটাও সত্যি, জন্মদিনের আনুষ্ঠানিকতা তাকে ভীষণভাবেই ছুঁয়ে যায়। তাকে উদ্দীপ্ত করে নতুনভাবে। ফুরফুরে মনে হাওয়ার ডানায় ভাসতে ভাসতে নামেন মাঠে।
ওহে জর্ডান, বিশ্বকাপের নবাগত এশীয় দল, তোমরা আরেকটি মেসি-সম্মোহন দেখার প্রস্তুতি নাও। ওদিকে বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতার কুর্সিটা নিয়ে কিলিয়ান এমবাপ্পেও মেতে উঠেছেন মিউজিক্যাল চেয়ারের খেলায়।
যে দিনটিতে মেসির পূর্বসূরি ডিয়োগো ম্যারাডোনা ঈশ্বরের হাত স্পর্শিত ও শতাব্দীর সেরা গোলে কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডকে হারিয়েছিলেন ১৯৮৬ বিশ্বকাপে, সেই দিনটিতেই অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে জোড়া গোলে মেসি বিশ্বকাপ গোলের সর্বোচ্চ চূড়ায় বসার কয়েক ঘণ্টা পর এমবাপ্পেও করেছেন জোড়া গোল।
২৭ বছর বয়সী স্ট্রাইকার এখন ক্লোসাকে ছুঁয়ে মেসির দুই গোল পেছনে। প্রতিদ্বন্দ্বিতা নিয়ে হাঁকডাক করেন না এই আর্জেন্টাইন বিস্ময় প্রতিভা। কিন্তু ভেতরে ভেতরে নিরুচ্চারে যে সেটি জমিয়ে রাখেন, ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোকে কেন্দ্র করে দেড় যুগে তারই তো সাক্ষী বিশ্ব ফুটবল। এই বিশ্বকাপে এমবাপ্পে এসে পড়েছেন তার সামনে।
তোমাসি বুয়েনোস আইরেস থেকে মেসেজ পাঠালো, ‘ভেবেছিলাম, জর্ডান ম্যাচে লিও বেশি মিনিট পাবে না। কিন্তু এমবাপ্পে পরিস্থিতি বদলে দিলো।’ তার মানে এই বিশ্বকাপে মেসিকে পেয়ে বসেছে গোলতৃষ্ণায়।
মেসির এই জন্মদিনে আর্জেন্টিনার রঙিন হয়ে ওঠা উচিত সিবো ফুলের লালিমায়। স্থানীয়ভাবে ফুলটির আরেক নাম মোরগ-ঝুটি। লাল আগুনের রং। পথের ধারে, নদীর পাড়ে ৪-৫ মিটার লম্বা গাছে ফুটে থাকে থোকায় থোকায়। এটি আর্জেন্টিনার জাতীয় ফুল।
পাশের দেশ উরুগুয়েও একে দিয়েছে জাতীয় ফুলের মর্যাদা। কিন্তু হায়, মেসির জন্ম মাসেই যে ফুলটি ফোটে না। অক্টোবরে আসে কুঁড়ি, পুরোপুরি ফোটে নভেম্বরে, থাকে এপ্রিল পর্যন্ত। কিন্তু মেসির জন্য অকালেই সে ফোটে না কেন? হোক না অকালবোধন। যে খেলোয়াড় তার ১৮ বিশ্বকাপ গোলের ১২টিই করেন পঁয়ত্রিশ বছর বয়স পেরিয়ে, তার জন্যে অকালেই জন্মদিনের বাসর সাজাক সিবো।
কারণ এই ফুল আর্জেন্টিনার জাতীয় ফুলের মর্যাদা পেয়েছে পঞ্চদশ শতকে ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে আনাহি নামের দেশপ্রেমিক দুঃসাহসী নারীর আত্মত্যাগের বিনিময়ে।
সাহস, আত্মত্যাগ আর প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রতীক হিসেবে শুধু আর্জেন্টিনাতেই নয়, ফুটবলের পৃথিবীতেই আনাহির মতো চির নমস্য নামটি যে মেসি। লিওনেল আন্দ্রেস মেসি কুচ্চিত্তিনি।
পবিত্র কুন্ডু : ক্রীড়া সম্পাদক, এটিএন নিউজ

