২৬ জুন আন্তর্জাতিক মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচারবিরোধী দিবস। এই দিনে যা সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে তা হলো, নিয়মমাফিক কিছু সভা-সেমিনার, মানববন্ধন বা র্যালি, পোস্টার লাগানো এবং কিছু কড়া বক্তব্য। প্রশ্ন হলো, মাদককে কি সত্যিই নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে একটি স্থায়ী, গভীর ও সুদূরপ্রসারী সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে নাকি পুলিশি অভিযানের বিষয় হিসেবেই দেখে যাচ্ছি?
যদি দ্বিতীয়টি সত্য হয়, তবে আমাদের স্বীকার করতেই হবে, মাদকের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের বর্তমান লড়াই অসম্পূর্ণ, খণ্ডিত এবং বহু ক্ষেত্রে প্রতিক্রিয়াশীল। কারণ মাদক শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে জনস্বাস্থ্য ও মানসিক স্বাস্থ্য, সীমান্ত নিরাপত্তা, সংগঠিত অপরাধ, তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ এবং রাষ্ট্রীয় জবাবদিহিতার বিষয়।
এ বছর জাতিসংঘের বার্তায় সিনথেটিক ড্রাগের বিস্তার এবং অনলাইন পাচার নেটওয়ার্ক বৃদ্ধির বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে যা আমাদের জন্য বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ আমাদের দেশে মাদক সমস্যার সবচেয়ে ভয়ংকর মুখগুলোর একটি হলো ইয়াবা, যা মূলত মেথঅ্যামফেটামিনভিত্তিক উত্তেজক পদার্থ, বহু ক্ষেত্রে ক্যাফেইন বা অন্যান্য উপাদানের সঙ্গে মিশিয়ে ট্যাবলেট আকারে বাজারজাত হয়।
একসময় এটি সীমান্তবর্তী এলাকার সমস্যা বলে মনে করা হলেও এখন তা আর বলা যায় না বা বলার সুযোগ নেই। ইয়াবা বহু আগেই কক্সবাজার-টেকনাফের ভূগোল পেরিয়ে রাজধানী, জেলা শহর, শিক্ষাঙ্গন, শ্রমবাজার এমনকি নিম্নআয়ের মহল্লায় পৌঁছে গেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ক্রিস্টাল মেথ বা আইস।
চিকিৎসকের লিখিত প্রেসক্রিপশন ছাড়া ক্রয়-বিক্রয়, নিষিদ্ধ ড্রাগের অপব্যবহার, সেডেটিভ, গাঁজা, বিভিন্ন নতুন সিনথেটিক পদার্থ এবং অনলাইন নির্ভর বিক্রয়চক্র। ফলে দেশে মাদক সমস্যা এখন আর নির্দিষ্ট মাদককে ঘিরে নয়; বরং এটি নানা ধরনের মাদক, পরিবর্তিত সরবরাহপথ এবং ক্রমবর্ধমান চাহিদা নিয়ে গড়ে ওঠা এক জটিল ও দ্রুত বদলে যাওয়া বাজারের সমস্যা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।
বর্তমান বাস্তবতায় সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো, মাদকের সরবরাহ শৃঙ্খলের চরিত্র আমূল পাল্টে যাওয়া। অথচ রাষ্ট্রীয় প্রতিক্রিয়া সেই অনুপাতে বদলাচ্ছে না। আজকের মাদক কারবারিরা কেবল সীমান্ত দিয়েই চালান পাঠায় না; তারা অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, এনক্রিপ্টেড যোগাযোগ মাধ্যম, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস, কুরিয়ার নেটওয়ার্ক, ভুয়া পরিচয়পত্র এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ব্যবহার করছে।
অর্থাৎ, মাদক যেমন এখন কানা গলির ব্যবসা, তেমনি এটি ডিজিটাল অবকাঠামো ব্যবহারকারী সংগঠিত অপরাধও। ফলে কেবল রাস্তার ডিলার ধরে, মাঝেমধ্যে কিছু চালান জব্দ করে, আর প্রেস ব্রিফিংয়ে কঠোর ভাষণ দিয়ে এই যুদ্ধে জেতা যাবে না। পাচারের অর্থায়ন, সরবরাহচক্র, অনলাইন অর্ডার, সীমান্তপথ, কুরিয়ার রুট এবং প্রভাবশালী মদদ দাতাদের না ধরতে পারলে দৃশ্যমান অভিযান থাকবে, কিন্তু বাস্তব পরিবর্তন হবে না।
কিশোর ও তরুণদের একটি অংশ আজ এমন এক সামাজিক বাস্তবতার মধ্যে বড় হচ্ছে, যেখানে প্রবল প্রতিযোগিতা, তীব্র মানসিক চাপ, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা, পারিবারিক ও ব্যক্তিগত সম্পর্কের টানাপোড়েন, একাকীত্ব, হতাশা প্রতিনিয়ত বাড়ছে।
বাংলাদেশের জন্য মাদক প্রশ্নে সীমান্ত একটি নির্ণায়ক বাস্তবতা। বিশেষত কক্সবাজার-টেকনাফ ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই ইয়াবা পাচারের ঝুঁকি আলোচিত। সীমান্তের দুর্বলতা, সাগরপথ, পাহাড়ি ও দুর্গম রুট, স্থানীয় দালালচক্র, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক ভঙ্গুর পরিস্থিতি-সব মিলিয়ে এ অঞ্চলে পাচারকারীরা সহজেই নেটওয়ার্ক গড়ে তোলে। কিন্তু সীমান্তকে শুধু ‘পিল আটকানোর জায়গা’ হিসেবে দেখলে হবে না; এটি আসলে সামগ্রিক ব্যর্থতা।
প্রশ্ন হলো, বড় চালানের পেছনের আর্থিক প্রবাহ কোথায় যাচ্ছে? কারা সেই পাইকার, কারা অর্থদাতা, কারা রাজনৈতিক-প্রশাসনিক ছায়া দেয়? যদি এসব প্রশ্নের উত্তর না থাকে, অথবা থাকলেও তার বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া না হয়, তাহলে মাদকবিরোধী লড়াইয়ের বড় অংশই প্রতীকী যুদ্ধই থেকে যাবে যা মাদক কারবারীদেরকে আরও বেশি সক্রিয় হতে পরোক্ষভাবে সহায়তা করবে।
তবে সীমান্তই পুরো গল্পের মূল প্রেক্ষাপট বা চিত্রনাট্য নয়। কারণ একটা বিষয় মাথায় রাখা খুবই জরুরি যে চাহিদা তৈরি না হলে বাজারও বড় হয় না। আর এই চাহিদার কেন্দ্রেই আছে দেশের তরুণরা। কিশোর ও তরুণদের একটি অংশ আজ এমন এক সামাজিক বাস্তবতার মধ্যে বড় হচ্ছে, যেখানে প্রবল প্রতিযোগিতা, তীব্র মানসিক চাপ, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা, পারিবারিক ও ব্যক্তিগত সম্পর্কের টানাপোড়েন, একাকীত্ব, হতাশা প্রতিনিয়ত বাড়ছে।
আরও পড়ুন
এছাড়া বন্ধুদের প্রভাব, নামসর্বস্ব ‘কুল’ সাজার চেষ্টা-এসব মিলিয়ে তরুণদের মধ্যে মাদকের প্রতি কৌতূহল ও ঝুঁকি বাড়ে। পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি প্রায়শই বাস্তব ও যুক্তিসঙ্গত মননশীলতার চর্চার জায়গা দখল করে নিচ্ছে। কেউ কেউ শুরু করে ‘মজা’ হিসেবে, কেউ ‘স্ট্রেস কমাতে’, কেউ ‘রাত জাগার জন্য’, কেউবা বিষণ্নতা ও অস্থিরতা থেকে পালাতে। কিন্তু এই শুরুই অধিকাংশের ক্ষেত্রে আসক্তির দিকে নিয়ে যায়।
এক্ষেত্রে একটি বিষয় না বললেই নয় যে, বাংলাদেশের বাস্তবতায় কৈশোর ও তরুণ বয়সে তামাক ও নিকোটিন-নির্ভরতা বিশেষ করে ধূমপানে আসক্তি পরবর্তী মাদক ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রাথমিক প্রবেশদ্বার। নিকোটিনে আসক্ত মস্তিষ্ক খুব দ্রুত অন্য যেকোনো রাসায়নিক পদার্থের প্রতি অভ্যস্ত হয়ে পড়ে।
তাই যখন নিকোটিনের প্রভাব কমতে থাকে বা শারীরিক সহনশীলতা তৈরি হয়, তখন ব্যবহারকারী সহজেই গাঁজা, ইয়াবা বা অন্যান্য সিনথেটিক মাদকের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েন। এই বাস্তবতায় ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) আইন ২০২৬ থেকে অধ্যাদেশে উল্লেখিত ই-সিগারেট নিষিদ্ধের বিধান বাদ পড়ে যাওয়ায় দেশে এই পণ্যের অবাধ ক্রয়-বিক্রয়ের পথ আরও উন্মুক্ত হয়েছে।
যা জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর সতর্কসংকেত। কারণ ই-সিগারেটকে অনেক সময় ‘নিরাপদ’, ‘আধুনিক’ বা ‘কম ক্ষতিকর’ বিকল্প হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও বাস্তবে এটি কিশোর-তরুণদের নিকোটিনে প্রাথমিক আসক্তির নতুন দরজা খুলে দেয়। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, ভেপ ডিভাইস বা ই-সিগারেটের মাধ্যমে শুধু নিকোটিন নয়, গাঁজাসহ অন্যান্য নেশাজাত পদার্থও গ্রহণের সুযোগ তৈরি হতে পারে যার অহরহ প্রমাণ পাওয়া গেছে।
যা ভবিষ্যতের মাদকবাজারকে আরও বিস্তৃত ও জটিল করে তুলবে। ফলে একদিকে যদি রাষ্ট্র ইয়াবা ও সিনথেটিক ড্রাগের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা বলে, অন্যদিকে ই-সিগারেটের মতো নিকোটিন-আসক্তির নতুন প্রবেশপথকে কার্যত উন্মুক্ত রাখে, তবে তা হবে মাদকবিরোধী নীতির এক স্পষ্ট স্ববিরোধিতা।
এখানেই মানসিক স্বাস্থ্য উন্নয়নের প্রশ্নটি আলোচনা এবং প্রয়োজনীয়তার মূল কেন্দ্র হয়ে ওঠে। আমাদের তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এখনো অত্যন্ত সীমিত, বিশেষত জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে। স্কুল-কলেজে কাউন্সিলিং সংস্কৃতি প্রায় নেই বললেই চলে। পরিবারে মানসিক চাপ, বিষণ্নতা, উদ্বেগ, আচরণগত পরিবর্তন বা আসক্তির ঝুঁকি নিয়ে খোলামেলা কথা বলার পরিবেশও দুর্বল। ফলে বহু তরুণ নীরবে ভেঙে পড়ে, কিন্তু সহায়তা পায় না।
এই শূন্যতাকে মাদকচক্র ব্যবহার করে। যে রাষ্ট্র তরুণদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, পরামর্শ, নিরাপদ বিনোদন, ক্রীড়া, সাংস্কৃতিক পরিসর এবং কর্মমুখী আশা তৈরি করতে পারে না, সেই রাষ্ট্র পরে কেবল আইন দিয়ে মাদক ঠেকাতে গেলে দেরি হয়ে যায়। কারণ মাদকবিরোধী লড়াইয়ের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র পুলিশ নয়, প্রতিরোধমূলক সামাজিক অবকাঠামো।
করণীয় কী?
শুধুমাত্র মাদকাসক্তকে অপরাধী হিসেবে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। কারণ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তি চিকিৎসা, কাউন্সিলিং, পারিবারিক সহায়তা ও সামাজিক পুনর্বাসনের প্রয়োজনীয়তায় থাকা বিপন্ন মানুষ। আইন প্রয়োগ অবশ্যই করতে হবে, কিন্তু তা হতে হবে পাচারকারী, উৎপাদক, অর্থদাতা, নেটওয়ার্ক পরিচালনাকারী এবং দুর্নীতিগ্রস্ত পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে।
অপরপক্ষে ব্যবহারকারী ও আসক্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যকেন্দ্রিক, মানবিক ও পুনর্বাসনমুখী পথকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। না হয় আমরা ভুক্তভোগীকে শাস্তি দিচ্ছি, অথচ বাজারকে ঠিকই অক্ষত রাখছি। বর্তমান প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিয়ে এখনই প্রতিরোধ, চিকিৎসা, জবাবদিহিমূলক আইন প্রয়োগ এবং পুনর্বাসন এই চার স্তম্ভভিত্তিক জাতীয় কৌশল গ্রহণ করা জরুরি। এই কৌশলকে কার্যকর করতে সরকারকে অন্তত নিম্নোক্ত পদক্ষেপগুলো অবিলম্বে নিতে হবে-
প্রথমত, ইয়াবা ও সিনথেটিক ড্রাগ মোকাবিলায় বিশেষ জাতীয় টাস্কফোর্স গঠন করতে হবে, যেখানে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, পুলিশ, বিজিবি, কোস্টগার্ড, কাস্টমস, আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট, সাইবার ইউনিট এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরা একসঙ্গে কাজ করবে। টাস্কফোর্সের কাজ শুধু চালান জব্দ নয়; বরং পাচারের রুট, অর্থায়ন, অনলাইন নেটওয়ার্ক, কুরিয়ার ব্যবহার এবং বড় কারবারিদের সম্পদচক্র শনাক্ত করা।
দ্বিতীয়ত, টেকনাফ-কক্সবাজারসহ দেশের সব ঝুঁকিপূর্ণ সীমান্ত এলাকায় প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি বাড়াতে হবে। ড্রোন, স্যাটেলাইট-সমর্থিত নজরদারি, উন্নত স্ক্যানিং, ঝুঁকিভিত্তিক গোয়েন্দা তথ্য এবং সাগরপথে সমন্বিত টহল ছাড়া এই নেটওয়ার্ক ঠেকানো কঠিন। সীমান্তে কেবল ছোট বাহক আটক করলেই হবে না; তাদের পেছনের চেইনকে ভাঙতে হবে।
তৃতীয়ত, অনলাইন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মাদক ও সব ধরনের তামাকজাত দ্রব্য বেচাকেনা ঠেকাতে বিশেষ সাইবার নজরদারি সেল গড়ে তুলতে হবে। যাতে করে সামাজিক মাধ্যম, গেমিং চ্যাট, কুরিয়ার বুকিং ও মোবাইলে আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে যে নতুন ডিজিটাল মাদকবাজার তৈরি হয়েছে, তা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়। তার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ডিজিটাল ফরেনসিক, ডেটা অ্যানালিটিক্স ও আর্থিক ট্র্যাকিং সক্ষমতায় বিনিয়োগ করতে হবে।
...পুনর্বাসন-পরবর্তী সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করতে হবে। চিকিৎসা নিয়ে ফেরা একজন মানুষ যদি কাজ না পান, পরিবারে গ্রহণযোগ্যতা না পান, সামাজিকভাবে অপমানের মুখে পড়েন, তাহলে তিনি সহজেই আবার পুরোনো চক্রে ফিরে যেতে পারেন। সুতরাং এদের মূল ধারার সাথে সংযুক্ত করার জন্য সরকারের দায়িত্বশীল উইংগুলোর মাধ্যমে দক্ষতা উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি কর্মসংস্থানের বন্দোবস্ত করা জরুরি।
চতুর্থত, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক প্রমাণভিত্তিক প্রতিরোধ কর্মসূচি বাধ্যতামূলক করতে হবে। ভয় দেখানো বা নৈতিক কড়া ভাষার ভাষণ নয়; বরং বয়স উপযোগী তথ্য, জীবনদক্ষতা, মানসিক চাপ ব্যবস্থাপনা, অনলাইন ঝুঁকি সম্পর্কে শিক্ষা এবং সহজ কাউন্সিলিংয়ের ব্যবস্থা থাকতে হবে। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় ও বড় কলেজে অন্তত একজন প্রশিক্ষিত কাউন্সিলর নিয়োগের বিষয়টি এখন বিলাসিতা নয়, প্রয়োজন।
পঞ্চম, চিকিৎসা ও পুনর্বাসন অবকাঠামো বিস্তৃত ও মানসম্মত করতে হবে। শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক কয়েকটি সেবাকেন্দ্র দিয়ে হবে না। উল্লেখ্য, দেশে বর্তমানে মাত্র ৩টি সরকারি মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র রয়েছে। প্রতিটি বিভাগে এবং পর্যায়ক্রমে জেলায় জেলায় স্বীকৃত, তদারকিসম্পন্ন, বিজ্ঞানভিত্তিক ও পুনর্বাসন সেবা গড়ে তুলতে হবে। সেখানে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, সাইকোলজিস্ট, সমাজকর্মী, পারিবারিক কাউন্সিলিংয়ের ব্যবস্থা থাকতে হবে।
ষষ্ঠ, মাদকবিরোধী ব্যবস্থায় দুর্নীতির বিরুদ্ধে দৃশ্যমান জিরো টলারেন্স দেখাতে হবে। পাচারচক্রের সঙ্গে জড়িত প্রভাবশালী ব্যক্তি, অর্থদাতা, প্রশাসনিক মদদদাতা বা রাজনৈতিক সমর্থন দেওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে ছোট বাহকদের ধরে লাভ নেই। মনে রাখতে হবে যে, মাদকবিরোধী অভিযান বিশ্বাসযোগ্য হয় তখনই, যখন বড় রাঘব বোয়ালরাও জালে ধরা পড়ে।
সপ্তম, পুনর্বাসন-পরবর্তী সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করতে হবে। চিকিৎসা নিয়ে ফেরা একজন মানুষ যদি কাজ না পান, পরিবারে গ্রহণযোগ্যতা না পান, সামাজিকভাবে অপমানের মুখে পড়েন, তাহলে তিনি সহজেই আবার পুরোনো চক্রে ফিরে যেতে পারেন। সুতরাং এদের মূল ধারার সাথে সংযুক্ত করার জন্য সরকারের দায়িত্বশীল উইংগুলোর মাধ্যমে দক্ষতা উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি কর্মসংস্থানের বন্দোবস্ত করা জরুরি। কারণ, পরিবারভিত্তিক সহায়তা এবং কমিউনিটি রিইন্টিগ্রেশন ছাড়া পুনর্বাসন অসম্পূর্ণ।
এই মুহূর্তে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি যে মাদকবিরোধী সাফল্যকে কেবল গ্রেপ্তার ও জব্দের সংখ্যা দিয়ে মাপা বন্ধ করতে হবে। সাফল্যের সূচক হতে হবে, তরুণদের মধ্যে নতুন আসক্তির হার কমল কিনা, চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ বাড়ল কিনা, অনলাইন বিক্রয়চক্র হ্রাসের হার, সীমান্তরুট কতটা নিয়ন্ত্রণে এলো এবং বড় অর্থদাতা ও নেটওয়ার্ক-পরিচালকদের বিরুদ্ধে কতটা কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হলো।
সংখ্যার ফুলঝুরি দিয়ে জনমত সাময়িকভাবে প্রভাবিত করা যায়, কিন্তু জনস্বাস্থ্য সংকট সমাধান করা যায় না। সুতরাং এই দিনে রাষ্ট্রের অঙ্গীকার হওয়া উচিত, মাদকবিরোধী নীতি হবে প্রমাণভিত্তিক, তরুণবান্ধব, স্বাস্থ্যকেন্দ্রিক, সীমান্তসচেতন এবং দুর্নীতিবিরোধী।
কারণ মাদক যখন একজন তরুণকে গ্রাস করে, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় শুধু একটি জীবন নয়; ক্ষতিগ্রস্ত হয় একটি পরিবার, প্রজন্ম, এবং শেষ পর্যন্ত দেশের ভবিষ্যৎ। সেই ভবিষ্যৎ রক্ষায় এখন আর কেবল দিবস পালন যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গির মৌলিক পরিবর্তন।
মিঠুন বৈদ্য : উন্নয়নকর্মী ও গবেষক
