বাংলাদেশ পৃথিবীর মানচিত্রে একটি ছোট ভূখণ্ড হলেও এর জন্মের ইতিহাস অসাধারণ গৌরব, ত্যাগ এবং আত্মমর্যাদার প্রতীক। দীর্ঘ ঔপনিবেশিক শাসন, রাজনৈতিক বৈষম্য, অর্থনৈতিক শোষণ এবং সাংস্কৃতিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে বাঙালি জাতির দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। প্রায় ত্রিশ লাখ শহীদের আত্মত্যাগ, লক্ষাধিক মা-বোনের সম্ভ্রমহানি এবং অসংখ্য মানুষের সীমাহীন কষ্টের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে এই স্বাধীনতা। তাই বাংলাদেশ শুধু একটি রাষ্ট্রের নাম নয়; এটি বিশ্বব্যাপী পরাধীন জাতিগুলোর কাছে স্বাধীনতার এক অনন্য প্রতীক, আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার অর্জনের এক উজ্জ্বল উদাহরণ এবং মুক্তিকামী মানুষের অনুপ্রেরণার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
স্বাধীনতার এত বছরেও বাংলাদেশের জনগণের অনেক স্বপ্ন অপূর্ণ রয়ে গেছে। রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জিত হলেও অর্থনৈতিক মুক্তি, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং সমৃদ্ধির যে স্বপ্ন নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল, তা এখনো সম্পূর্ণ বাস্তবায়িত হয়নি। দেশের একটি বড় জনগোষ্ঠী এখনো দারিদ্র্য, বেকারত্ব এবং বৈষম্যের শিকার। উন্নত স্বাস্থ্যসেবা আজও দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের কাছে একটি অধরা বিষয়। শিক্ষার মান ও সুযোগের ক্ষেত্রেও শহর ও গ্রামের মধ্যে বিরাট বৈষম্য বিদ্যমান। রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও কৌশলগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি।
এই অবস্থার পেছনে বিভিন্ন কারণ রয়েছে। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ বহু রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামরিক শাসন, দুর্নীতি এবং নীতিগত অসংগতির মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়েছে। রাষ্ট্রের সম্পদ ও সম্ভাবনাকে যথাযথভাবে কাজে লাগানোর পরিবর্তে অনেক সময় ব্যক্তি ও গোষ্ঠীগত স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। একটি অসাধু ধনী শ্রেণির উত্থান এবং অমার্জিত ও সংঘাতমুখী রাজনৈতিক সংস্কৃতি দেশের উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করেছে। জনগণের কল্যাণের পরিবর্তে ক্ষমতার রাজনীতি এবং দলীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ফলে রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা অনেক সময় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলে দেশের সাধারণ মানুষ প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক ও সামাজিক মুক্তি থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
তবে বাংলাদেশের সম্ভাবনা অত্যন্ত উজ্জ্বল। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জনসংখ্যার একটি অংশ তরুণ এবং কর্মক্ষম। কৃষি, পোশাক শিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি, সামুদ্রিক সম্পদ এবং ভৌগোলিক অবস্থান বাংলাদেশের জন্য বিশেষ সুযোগ সৃষ্টি করেছে। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থিত হওয়ায় বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও যোগাযোগের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। কিন্তু এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে প্রয়োজন দক্ষ মানবসম্পদ, সুশাসন, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনা।
একটি দেশের উন্নয়ন কেবল তার অভ্যন্তরীণ সম্পদের ওপর নির্ভর করে না; আন্তর্জাতিক সহযোগিতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে বিশ্বের অনেক উন্নয়নশীল দেশ বিদেশি বিনিয়োগ, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং কৌশলগত অংশীদারিত্বের মাধ্যমে দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়ন অর্জন করেছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এমন উন্নয়ন সহযোগী রাষ্ট্র প্রয়োজন, যারা দেশের সার্বভৌমত্বকে সম্মান করবে, অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অযাচিত হস্তক্ষেপ করবে না এবং পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতা গড়ে তুলবে।
এই প্রেক্ষাপটে চীন বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন সহযোগী রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। কয়েক দশকে চীন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি, দারিদ্র্য বিমোচন এবং শিল্পায়নের ক্ষেত্রে চীনের সাফল্য সমগ্র বিশ্বের জন্য একটি অনুকরণীয় উদাহরণ। কয়েক কোটি মানুষকে দারিদ্র্য থেকে মুক্ত করে চীন যে উন্নয়নের মডেল প্রতিষ্ঠা করেছে, তা উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ ও চীনের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের এবং বন্ধুত্বপূর্ণ। অবকাঠামো উন্নয়ন, সড়ক ও সেতু নির্মাণ, বিদ্যুৎ উৎপাদন, বন্দর উন্নয়ন এবং শিল্প খাতে চীনের সহযোগিতা ইতিমধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। চীনের প্রযুক্তিগত দক্ষতা, আর্থিক সক্ষমতা এবং বৃহৎ শিল্পভিত্তি বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিকল্পনাকে নতুন গতি দিতে পারে। বিশেষ করে যোগাযোগ ব্যবস্থা, রেলপথ, সমুদ্রবন্দর, জ্বালানি, তথ্যপ্রযুক্তি এবং প্রতিরক্ষা খাতে দুই দেশের সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা, যেখানে চীনকে অন্যতম প্রধান উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। পাঁচ বছর, দশ বছর এবং বিশ বছরের উন্নয়ন পরিকল্পনার মাধ্যমে শিল্পায়ন, প্রযুক্তি স্থানান্তর, গবেষণা সহযোগিতা এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য যৌথ কর্মসূচি গ্রহণ করা যেতে পারে। বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠীকে প্রযুক্তিগতভাবে দক্ষ করে তুলতে চীনের বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন মানেই অন্য রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি নয়। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম মূলনীতি হলো ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’। তাই ভারত, পাকিস্তান, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গেও ভারসাম্যপূর্ণ ও পারস্পরিক আস্থার সম্পর্ক বজায় রাখা প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বহুমাত্রিক কূটনীতি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
ভারত বাংলাদেশের নিকটতম প্রতিবেশী এবং দুই দেশের মধ্যে গভীর ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের রপ্তানি বাজার, বিনিয়োগ এবং শিক্ষা ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। জাপান বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়ন ও প্রযুক্তিগত সহায়তায় দীর্ঘদিন ধরে ভূমিকা পালন করছে। পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হতে পারে। তাই বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজন এমন একটি ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি, যেখানে জাতীয় স্বার্থ এবং সার্বভৌমত্ব সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাবে।
বর্তমান বিশ্ব দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। প্রযুক্তিগত বিপ্লব, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন এবং ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। এই পরিবর্তিত বিশ্বে বাংলাদেশের উন্নয়ন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে শক্তিশালী আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব গড়ে তোলা অপরিহার্য। চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাংলাদেশের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে প্রযুক্তি স্থানান্তর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং ডিজিটাল অবকাঠামো উন্নয়নে দুই দেশের সহযোগিতা নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করতে পারে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা কেবল একটি রাজনৈতিক ঘটনা নয়; এটি ছিল একটি ন্যায়ভিত্তিক, বৈষম্যহীন এবং সমৃদ্ধ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন দূরদর্শী নেতৃত্ব, সুশাসন, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন, শিক্ষিত ও দক্ষ জনগোষ্ঠী এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার কার্যকর ব্যবহার। দেশের উন্নয়ন ও নিরাপত্তার স্বার্থে এমন সব রাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে, যারা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে সম্মান করবে এবং পারস্পরিক কল্যাণের ভিত্তিতে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেবে।
স্বাধীনতার অর্ধশতক পেরিয়ে বাংলাদেশ আজ একটি নতুন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। সামনে রয়েছে বিপুল সম্ভাবনা, আবার রয়েছে নানা চ্যালেঞ্জ। সঠিক পরিকল্পনা, জাতীয় ঐক্য এবং বিচক্ষণ কূটনৈতিক সম্পর্কের মাধ্যমে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার একটি সমৃদ্ধ, আধুনিক এবং মর্যাদাপূর্ণ রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারে। সেই যাত্রায় চীন একটি গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন সহযোগী ও কৌশলগত অংশীদার হিসেবে ভূমিকা পালন করতে পারে। তবে বাংলাদেশের চূড়ান্ত লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি রাষ্ট্র গঠন করা, যেখানে স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ—অর্থনৈতিক মুক্তি, সামাজিক ন্যায়বিচার, মানবিক মর্যাদা এবং জাতীয় সমৃদ্ধি—প্রত্যেক নাগরিকের জীবনে বাস্তব রূপ লাভ করবে। তাহলেই ত্রিশ লাখ শহীদের আত্মত্যাগের প্রকৃত মর্যাদা রক্ষা পাবে এবং বাংলাদেশ বিশ্ববাসীর সামনে স্বাধীনতা ও উন্নয়নের এক অনন্য মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।
কাজী এনায়েত উল্লাহ : মহাসচিব, অল ইউরোপিয়ান বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন (আয়েবা), প্যারিস, ফ্রান্স
