‘মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান’ প্রখ্যাত উক্তিটি বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের। তিনি আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছেন, একটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো তার মানুষ। আর মানুষকে দক্ষ, মানবিক ও সৃজনশীল সম্পদে পরিণত করার প্রধান পথ হলো শিক্ষা।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে সেই শিক্ষাকেই ঘিরে নতুন করে আশা দেখছি আমরা। এবারে শিক্ষা খাতে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে সরকার। আবার আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে বরাদ্দ জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নতির সিদ্ধান্তও হাতে নিয়েছে সরকার। নিঃসন্দেহে এটি একটি বড় ঘোষণা। প্রস্তাবিত বাজেটে এত বড় অঙ্ক আদৌও কি আমাদের শিক্ষার বড় সংকটগুলো দূর করতে পারবে? উত্তরটা পেতে হলে আমাদের আরও গভীরে প্রবেশ করতে হবে।
অর্থনীতির শক্তি, প্রযুক্তির উৎকর্ষ, শিল্পের বিকাশ কিংবা রাষ্ট্রের বৈশ্বিক অবস্থান সবকিছুর মূলে রয়েছে শিক্ষা। তাই জাতীয় বাজেটে শিক্ষা খাতের বরাদ্দ শুধু একটি আর্থিক সিদ্ধান্ত না বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি রাষ্ট্রের অঙ্গীকারও বটে। প্রথমেই স্বীকার করতে হবে, বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা খাতে তুলনামূলক কম ব্যয় করে আসছে।
দুই দশক ধরে জাতীয় আয়ের ২ শতাংশেরও কম শিক্ষা খাতে বরাদ্দ ছিল। ইউনেস্কো যেখানে জিডিপির ৪ থেকে ৬ শতাংশ শিক্ষায় ব্যয়ের সুপারিশ করে, সেখানে বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে ছিল এই খাতে।
বিশ্বের দিকে তাকালে দেখা যায়, শিক্ষা খাতের বিনিয়োগকে উন্নয়নের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করছে অধিকাংশ দেশ। সৌদি আরব শিক্ষায় জিডিপির ৭ দশমিক ৮১ শতাংশ ব্যয় করে। ভুটান ব্যয় করে প্রায় ৭ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্রে এ হার ৬ দশমিক ০৫ শতাংশ, কানাডায় ৫ দশমিক ১৭ শতাংশ। ভারত ব্যয় করে ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশ। এমনকি আফ্রিকার নামিবিয়াও শিক্ষায় ব্যয় করছে জিডিপির ৯ দশমিক ৬৪ শতাংশ।
এই পরিসংখ্যান নিঃসন্দেহে আমাদের নতুন করে ভাবায়। কিন্তু একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, কেবল আন্তর্জাতিক তুলনা দিয়ে বাংলাদেশের বাস্তবতা ব্যাখ্যা করা যায় না। দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া বা ভারতের অর্থনৈতিক কাঠামো বাংলাদেশের তুলনায় ভিন্ন। তাদের শিল্পভিত্তি অনেক শক্তিশালী। কর আহরণের সক্ষমতা বেশি। আবার প্রযুক্তি ও জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি শক্তিশালী। ফলে তারা শিক্ষা ও গবেষণায় বড় বিনিয়োগ তারা করতে পারে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ এখনো শ্রমঘন শিল্পের দেশ। প্রবাসী আয় এবং তৈরি পোশাক রপ্তানির ওপর অনেকটা নির্ভর করছে দেশের অর্থনীতি। এখানে স্বাস্থ্য, অবকাঠামো, সামাজিক নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থানের মতো মৌলিক খাতে বড় ব্যয় করে হিমশিম খেতে হয় সরকারকে।
শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর দাবি অবশ্যই যৌক্তিক, কিন্তু তা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রেখে। তবে অবকাঠামো উন্নয়নের যুক্তি কখনোই শিক্ষা খাতে কম বিনিয়োগের অজুহাতের কারণ হতে পারে না। কারণ বিশ্বব্যাংকের হিসাব বলছে, শিক্ষায় একজন মানুষের আয় গড়ে ৯ শতাংশ পর্যন্ত বাড়াতে পারে। অর্থাৎ শিক্ষা ব্যয় আসলে ব্যয় নয়, এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ। কিন্তু বিনিয়োগের ফল পেতে হলে সেই অর্থ কোথায় এবং কীভাবে ব্যয় হচ্ছে, সেটিও খতিয়ে দেখতে হবে।
শিক্ষা খাতে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়। কিন্তু সেই ব্যয়ের কার্যকারিতা মূল্যায়নের জন্য শক্তিশালী ও স্বাধীন নিরীক্ষা কাঠামো এখনো গড়ে ওঠেনি। কোথাও অব্যবহৃত ভবন, কোথাও প্রয়োজনহীন প্রকল্প, কোথাও নিয়োগে অনিয়ম—এসব অভিযোগ নতুন নয়।
নতুন প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে ইতিমধ্যে একটি প্রশ্ন সামনে এসেছে। তা হলো সরকার শিক্ষা খাতে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকার বরাদ্দের কথা বললেও শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট দুই মন্ত্রণালয় ও বিভাগের হিসাব যোগ করলে পাওয়া যায় ১ লাখ ২২ হাজার ৪৯৫ কোটি টাকা। প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকার ব্যয়ের খাত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি।
অর্থ মন্ত্রণালয় বলছে, অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডও এতে যুক্ত রয়েছে। কিন্তু জাতীয় বাজেটের মতো গুরুত্বপূর্ণ নথিতে এমন অস্পষ্টতা উদ্বেগের জন্ম দেয়। শিক্ষা খাতের সবচেয়ে বড় সংকট বরাদ্দের পরিমাণ নয়, বরং বরাদ্দের কার্যকর ব্যবহার নিয়ে। শুধু বরাদ্দ নিয়ে হইচই না করে এর প্রয়োগের দিকে নজর দেওয়া উচিত।
বাংলাদেশে শিক্ষা ব্যবস্থার ভেতরে এক ধরনের কাঠামোগত বৈষম্য এখনো বিদ্যমান। রাজধানীর একটি স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থীর পেছনে রাষ্ট্র যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে, মফস্বলের একটি সরকারি কলেজের শিক্ষার্থীর পেছনে তার সামান্য অংশও ব্যয় হয় না। এখানে রয়েছে প্রকৃত বিভাজন।
আবার জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে লাখো শিক্ষার্থী পড়াশোনা করলেও তাদের অবকাঠামো, গবেষণা সুযোগ, প্রযুক্তিগত সহায়তা নিয়ে বিস্তর আলাপের জায়গা আছে। আবার শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের সংখ্যার অনুপাত নিয়েও বিতর্ক আছে। শহর ও গ্রামের বিদ্যালয়ের মধ্যেও একই বৈষম্য দৃশ্যমান।
পাহাড়ি অঞ্চল, চরাঞ্চল, উপকূলীয় এলাকা এবং সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর শিশুরা এখনো সমান শিক্ষা সুযোগ থেকে বঞ্চিত। এই বৈষম্য দূর না করে শুধু বরাদ্দ বাড়ালে উন্নয়ন হবে সীমিত। বরং বড় প্রতিষ্ঠান আরও বড় হবে, আর পিছিয়ে পড়া প্রতিষ্ঠান আরও পিছিয়ে থাকবে। বিশ্বায়নের হাওয়া শুধু কথিত নামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পেছনে ছুটবে আর বাকিরা হাততালি দেবে। এজন্য প্রয়োজন সমশিক্ষা বণ্টন ব্যবস্থা।
আরও পড়ুন
এবারের বাজেটে কিছু সময়োপযোগী উদ্যোগ রয়েছে। ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’, ডিজিটাল লাইব্রেরি, শিক্ষার্থীভিত্তিক এডু-আইডি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিকস ও কোডিং শিক্ষা, ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে কারিগরি শিক্ষার পরিকল্পনা, তৃতীয় ভাষা শিক্ষা, ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া সংযোগ, ইন্টার্নশিপ ও অ্যাপ্রেন্টিসশিপের মতো সুযোগ।
এসব উদ্যোগ ভবিষ্যৎ শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। বিশেষ করে দক্ষতাভিত্তিক অর্থনীতি গঠনের জন্য কারিগরি শিক্ষার সম্প্রসারণ অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। বাংলাদেশে যদিও সাধারণ শিক্ষার তুলনায় কারিগরি শিক্ষার হার কম। অথচ বৈশ্বিক শ্রমবাজারে দক্ষ জনশক্তির চাহিদা দ্রুত বাড়ছে, কারিগরি শিক্ষারও গুরুত্ব বাড়ছে।
এই খাতকে এখনো পিছিয়ে পড়া খাত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। শুধু তত্ত্বীয় ধরনা দিয়ে পরীক্ষা পাস করা যায়, চাকরির বাজারে নিজেকে প্রস্তুত করতে প্রয়োজন কর্মমুখী শিক্ষা। বর্তমান বজার ব্যবস্থার সাথে শিক্ষাকে সংযুক্ত করতে হবে। তাহলে শিক্ষার পরিপূর্ণতা আসবে।
সম্প্রতি শিক্ষা অধিকার সংসদের একটি জরিপে অংশ নেওয়া ৫৩ শতাংশের বেশি তরুণ মনে করেন, অবকাঠামোর চেয়ে বেশি প্রয়োজন মানসম্মত শিক্ষক নিয়োগ এবং শিক্ষকদের সম্মানজনক বেতন। বাস্তবতাও তাই বলে। আজও বহু নামী-দামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দক্ষ শিক্ষকের সংকট রয়েছে।
আবার নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগও রয়েছে। শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের সুযোগ সীমিত রয়েছে। অনেক শিক্ষক পেশাগত মর্যাদা ও আর্থিক নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন এটা যেমন সত্য। আবার কিছু শিক্ষক গবেষণার চর্চা বাদ দিয়ে অর্থ উপার্জনকে বড় করে দেখেন। এমন পরিস্থিতিতে কেবল ট্যাব বা মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম দিয়ে শিক্ষার মান উন্নয়ন সম্ভব নয়।
তবে এটাও মাথায় রাখতে হবে প্রযুক্তি কখনো শিক্ষকের বিকল্প হতে পারে না। স্মার্ট ক্লাসরুম ব্যবস্থা চালু করলেই মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত হয় না। এর জন্য দরকার মানবিক, পেশাদারি ও দক্ষ শিক্ষাবান্ধব শিক্ষক। শিক্ষার প্রাণ শিক্ষক। শিক্ষককে বাদ দিয়ে শিক্ষা খাতের সংস্কার কল্পনা করা যায় না। শিক্ষকবান্ধব সংস্কৃতির চর্চা করতে হবে। শিক্ষকদের জন্য উপযুক্ত বেতন কাঠামো ও সচ্ছল পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জবাবদিহিতা। শিক্ষা খাতে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়। কিন্তু সেই ব্যয়ের কার্যকারিতা মূল্যায়নের জন্য শক্তিশালী ও স্বাধীন নিরীক্ষা কাঠামো এখনো গড়ে ওঠেনি। কোথাও অব্যবহৃত ভবন, কোথাও প্রয়োজনহীন প্রকল্প, কোথাও নিয়োগে অনিয়ম—এসব অভিযোগ নতুন নয়।
আবার এসব অনিয়ম ও দুর্নীতির দৃশ্যমান বিচার চোখ পড়ে না। ফলে সমাজে বিচার হীনতার সংস্কৃতি বাড়ছে। সরকারি অর্থের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হলে প্রতিটি প্রকল্পের ফলাফল মূল্যায়ন, ডিজিটাল নজরদারি, স্বাধীন অডিট ব্যবস্থা চালু করতে হবে। সামাজিক জবাবদিহিতাও নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে গবেষণা ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কেবল সনদ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান নয়, জ্ঞান উৎপাদনের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। গবেষণাভিত্তিক অর্থনীতি ছাড়া চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে টিকে থাকা সম্ভব নয়।
উন্নত ভবন, আধুনিক প্রযুক্তি কিংবা বড় বাজেট সবই অর্থহীন হয়ে যাবে, যদি শিক্ষার্থী প্রকৃত শিক্ষা না পায়। শিক্ষার প্রকৃত উন্নয়ন শুরু হয় শ্রেণিকক্ষে। বাজেট সেই যাত্রার জ্বালানি।
শিক্ষা খাতের ভবিষ্যৎ তাই শুধু বাজেটের অঙ্কে নির্ধারিত হবে না। নির্ধারিত হবে সেই অর্থের সুষম বণ্টন, দক্ষ ব্যবহার, শিক্ষক উন্নয়ন, গবেষণা বিনিয়োগ এবং জবাবদিহিতার ওপর। সরকার যে আগামী পাঁচ বছরে শিক্ষা খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, সেটি অবশ্যই আশাব্যঞ্জক। কিন্তু লক্ষ্য অর্জনের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই অর্থ দিয়ে কেমন শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে তার একটি পরিপূর্ণ রূপরেখা।
তাই বাংলাদেশের সামনে এখন এক ঐতিহাসিক সুযোগ রয়েছে। জনমিতিক সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে দক্ষ, সৃজনশীল ও বিশ্বমানের মানবসম্পদ তৈরি করা। এজন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, রাজনৈতিক অঙ্গীকার এবং সুশাসন। শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানো দরকার কিন্তু তার চেয়েও বেশি দরকার শিক্ষার প্রতি রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা বাড়ানো।
কারণ উন্নত ভবন, আধুনিক প্রযুক্তি কিংবা বড় বাজেট সবই অর্থহীন হয়ে যাবে, যদি শিক্ষার্থী প্রকৃত শিক্ষা না পায়। শিক্ষার প্রকৃত উন্নয়ন শুরু হয় শ্রেণিকক্ষে। বাজেট সেই যাত্রার জ্বালানি। গন্তব্যে পৌঁছাতে প্রয়োজন সঠিক দিকনির্দেশনা, দক্ষ পরিচালনা এবং অটল রাজনৈতিক সদিচ্ছা।
প্রশান্ত কুমার শীল : শিক্ষক ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক
[email protected]
