সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে ‘বিয়ে’ হলো সবচেয়ে আদিম সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি। বিয়ে মানে একটি নতুন জীবন ও পথচলার সূচনা। আর এর সাথেই জড়িয়ে থাকে কত স্বপ্ন, আবেগ আর প্রত্যাশার প্রাচীর। তবে বাস্তবতা হলো, বিয়ে কেবল একটি আবেগের বিষয় নয়, বিবাহিত জীবনের সাথে নবদম্পতিদের পারস্পরিক বোঝাপড়া, নতুন পরিবেশ-পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেদের খাপ খাওয়ানো, পারিবারিক ও সামাজিক দায়িত্ব এবং অর্থনৈতিক পরিকল্পনার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোও জড়িত। কিন্তু আমাদের প্রচলিত সামাজিক ব্যবস্থায় বাস্তব এই বিষয়গুলো নিয়ে নবদম্পতিদের আগাম প্রস্তুতির সুযোগ খুবই সীমিত।
যার ফলে অধিকাংশ নবদম্পতিকেই কোনো প্রস্তুতি ছাড়া এবং ‘কিছু ভুল’ বা অসম্পূর্ণ ধারণার মধ্য দিয়ে সংসার শুরু করতে হয়। যা অনেকক্ষেত্রেই পরবর্তীতে তাদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে নানা জটিলতার সৃষ্টি করে। তাই ‘বিয়ে’ বা পরিবার গঠনের এই সামাজিক প্রক্রিয়া শুরুর আগে নবদম্পতিদের বিবাহিত জীবন-সম্পর্কিত জ্ঞানের পাশাপাশি যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য-বিষয়ক তথ্য প্রদান করাও অত্যন্ত জরুরি।
আমাদের সমাজে দাম্পত্য যৌন-জীবন, পরিবার পরিকল্পনা এবং গর্ভধারণ নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করার সুযোগ বা পরিবেশ এখনো সেভাবে গড়ে ওঠেনি। ব্যক্তিগত সংকোচের কারণে এসব বিষয় নিয়ে কথা বলতে না পারার ফলে অনেকক্ষেত্রেই নবদম্পতিদের কাছে সঠিক জ্ঞান ও নির্ভরযোগ্য তথ্যের ঘাটতি থেকে যায়। যার ফলে অনেক নারীদের জীবনেই অনিচ্ছাকৃত গর্ভধারণের মতো ঘটনা ঘটে, যা পরবর্তীতে তাদের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়।
যদিও বাংলাদেশে পরিবার পরিকল্পনা, মাতৃস্বাস্থ্য এবং শিশুস্বাস্থ্যের উন্নয়নে কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে, কিন্তু নবদম্পতিদের যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য এবং অধিকার সম্পর্কিত জ্ঞান, প্রস্তুতি এবং সহায়তা কার্যক্রম তুলনামূলকভাবে এখনো বেশ সীমিত।
সাম্প্রতিক সময়ে আইসিডিডিআর,বি’র অ্যাডসার্চ নামের একটি প্রকল্পের গবেষণা এ বিষয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ করে দিয়েছে। গবেষণাটিতে বাংলাদেশের গ্রামীণ জনপদ এবং শহরের বস্তি এলাকা, উভয় প্রেক্ষাপটে নব-দম্পতিদের বিয়ে-পরবর্তী জীবনের অভিজ্ঞতা, নতুন জীবনে মানিয়ে চলা, দাম্পত্য জীবনের চাহিদা, সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা, এসব নানা বিষয় বোঝার চেষ্টা করা হয়েছে।
এতে চাঁদপুরের মতলব, কক্সবাজার জেলার চকরিয়া ও ঢাকার মিরপুর ও কড়াইল বস্তিতে বাস করেন এমন ১৩৩২ জন নবদম্পতির জীবনের গল্পের একটি অভিন্ন চিত্র ফুটে উঠেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, গ্রামের ৪৩% এবং শহরের বস্তি এলাকার ৬৫% কিশোরীদের ১৮ বছর বয়সের আগেই বিয়ে হয়ে গেছে। উদ্বেগের বিষয় হলো, এদের মধ্যে গ্রামের ৮৫% এবং শহরের ৫৩% বাল্যবিয়েই পরিবারের সিদ্ধান্তে ঘটেছে। অল্প বয়সে ঘটে যাওয়া এসব বিয়ে পরবর্তীতে নব-দম্পতিদের ব্যক্তিগত জীবনে এবং প্রজনন স্বাস্থ্যের ওপর বিশেষ নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
গবেষণার তথ্যমতে, বিয়ের পর অধিকাংশ নারীদের শিক্ষাজীবনের ওপরও নেমে এসেছে বাধা। গ্রাম ও শহরের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ নববিবাহিত নারী অনেক চেষ্টার পরেও তাদের লেখাপড়া আর চালিয়ে যেতে পারেননি এবং শেষ পর্যন্ত ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন। কারণ হিসেবে জানা গেছে, কেবল অর্থনৈতিক দৈন্যতাই নয়, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিও এর পেছনে বিরাট ভূমিকা পালন করেছে। অনেক নারীদের স্বামী এবং শ্বশুরবাড়ির লোকজন মনে করেন, স্ত্রী বেশি শিক্ষিত হলে তা স্বামীর ‘মর্যাদা’ ক্ষুণ্ন করতে পারে এবং সেজন্যই তাদের আর লেখাপড়া করার সুযোগ দেওয়া হয়নি।
গবেষণা থেকে আরও জানা গেছে যে, গ্রামে এবং শহরের বস্তি এলাকায় বিয়ের পরপরই সন্তান ধারণ করা একটি প্রচলিত ‘সামাজিক রীতির’ অংশ এবং অধিকাংশ দম্পতির ওপরই সন্তান নেওয়ার জন্য পারিবারিক ও সামাজিক চাপ ছিল। যদিও অনেকেরই ইচ্ছা ছিল, কিছুদিন নিজেদের মতো সময় কাটিয়ে পারস্পরিক সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করবার, কিন্তু অন্যান্যদের প্রত্যাশা পূরণ করার জন্য দ্রুততম সময়ের মধ্যে সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ফলে দাম্পত্য জীবনের যে আবেগী ঘনিষ্ঠতা বা আকর্ষণ ধীরে ধীরে তাদের মধ্যে গড়ে ওঠার কথা ছিল, তা অনেকের ক্ষেত্রেই অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
গবেষণায় অংশগ্রহণকারী নারীদের মধ্যে গ্রামের ৫৪% ও শহরের বস্তি এলাকার ৩৬% নারী বিয়ের প্রথম বছরের মধ্যেই গর্ভধারণ করেছেন, যদিও শহরের নারীদের মাত্র ১৭% এসময় সন্তান নেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। পারিবারিক ও সামাজিক চাপের পাশাপাশি জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি বিষয়ক জ্ঞান এবং এর সেবা সংক্রান্ত তথ্যের অভাবও নারীদের অনিচ্ছাকৃত গর্ভধারণ এর পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
নিজেদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে সময়ের আগেই সন্তান নেওয়ার এই বিষয়টি অনেক ক্ষেত্রে স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক সম্পর্কের ওপরও বিরূপ প্রভাব ফেলেছে, বিশেষত গর্ভাবস্থায় শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন, নতুন দায়িত্ব, সব মিলিয়ে অনেক নারীকে জটিল পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে।
গবেষণাটিতে ‘এনরিচ ম্যারিটাল স্যাটিসফ্যাকশন স্কেল (ENRICH Marital Satisfaction scale)’-এর মাধ্যমে স্বামী-স্ত্রী দু’জনের মাঝে বিবাহিত জীবনের সন্তুষ্টির মাত্রা পরিমাপ করা হয়েছে। তথ্য অনুযায়ী, বিয়ের শুরুতে স্বামীদের সন্তুষ্টির মাত্রা স্ত্রীদের তুলনায় প্রায় ১.৬ গুণ বেশি ছিল, কিন্তু সময়ের সাথে সাথে উভয়ের সন্তুষ্টিই কমতে থাকে এবং বিয়ের দেড় থেকে দুই বছরের মাথায় তা সর্বনিম্ন পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছায়। বিয়ের প্রথম দিকে স্বামীদের বেশি সন্তুষ্টির কারণ হিসেবে কাজ করে তাদের তথাকথিত ‘পুরুষত্ব’ ও ‘পূর্ণতা’র বোধ।
অন্যদিকে স্ত্রীদের সন্তুষ্টির মাত্রা শুরু থেকেই কম হওয়ার পেছনে মূলত যে বিষয়গুলো কাজ করে, সেগুলো হলো, নিজের পরিচিত মানুষজন ও পরিবার ছেড়ে দূরে চলে যাওয়া, নতুন পরিবারের সদস্য ও পরিবর্তিত নিয়ম কানুনের সাথে নিজেকে মানিয়ে নেওয়া, এবং অনেকের ক্ষেত্রে পড়াশোনা ও কাজের সুযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়া। এই গবেষণা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে, কেবলমাত্র আইন করেই বাল্য বিয়ে বন্ধ করা কিংবা অল্প বয়সে গর্ভধারণ রোধ করা সম্ভব নয়।
প্রশ্ন হলো, এর থেকে উত্তরণের পথ কী? সমৃদ্ধ আগামী গড়তে হলে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধের পাশাপাশি নবদম্পতিদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নয়নের প্রতি আমাদের সচেতনতা বাড়াতে হবে। বিয়ের আগে ‘প্রিম্যারিটাল কাউন্সিলিং’ বা বিয়ে-সংক্রান্ত শিক্ষামূলক কর্মসূচির মাধ্যমে ভবিষ্যৎ দম্পতিদের মধ্যে যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যবিষয়ক, জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ও এর সেবা-সম্পর্কিত, এবং অনিচ্ছাকৃত গর্ভধারণ রোধে কার্যকর পদক্ষেপসমূহ নিয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য প্রদান ও জ্ঞান নিশ্চিত করতে হবে।
কিশোরী মেয়েদের অভিভাবকদের সচেতনতা বাড়ানো ও মানসিকতার পরিবর্তন আনা অত্যন্ত জরুরি। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, অধিকাংশ মেয়েদের বয়স ১৮ বছর হবার আগেই তাদের বিয়ে দিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত বাবা-মা কিংবা অভিভাবকরাই নিয়েছেন। পাশাপাশি যেসব নারীরা বিয়ের পরেও তাদের লেখাপড়া চালিয়ে যেতে চান, তাদের শিক্ষার সুযোগ ও অধিকার যেন বজায় থাকে, সে বিষয়ে স্বামী, শ্বশুরবাড়ির সদস্য, এমনকি বাবা-মায়েরও ভাবনা-চিন্তার পরিবর্তন আনা সমান গুরুত্বপূর্ণ। ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় সব পর্যায় থেকেই এই পরিবর্তনের সূচনা হওয়া আবশ্যক এবং সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা ও দায়িত্বশীলতাই কেবলমাত্র নব-দম্পতিদের জীবনে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।
ড. ফৌজিয়া আখতার হুদা, সায়েন্টিস্ট, আইসিডিডিআর,বি
এ. এস. এম রিয়াদ আরিফ, সিনিয়র কনট্যান্ট ডেভেলপার, আইসিডিডিআর,বি
