বিজ্ঞাপন

বিশ্ব ওআরএস দিবস

ডা. দিলীপ মহলানবিশ যেভাবে ডায়রিয়ায় মৃত্যুমিছিল থামিয়েছিলেন

ডা. দিলীপ মহলানবিশ যেভাবে ডায়রিয়ায় মৃত্যুমিছিল থামিয়েছিলেন

একাত্তরের মে মাস। চারদিকে যুদ্ধের দামামা, রক্ত আর কান্নার রোল। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাত থেকে বাঁচতে লাখ লাখ মানুষ তখন ভিটেমাটি ছেড়ে ভারতের শরণার্থী শিবিরগুলোয় আশ্রয় নিচ্ছেন। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের বনগাঁর শরণার্থী শিবিরগুলোয় তখন অন্য এক অদৃশ্য শত্রু হানা দিয়েছে, কলেরা।

চারিদিকে শুধু মরণাপন্ন মানুষের আর্তনাদ। স্যালাইন দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত কাঁচামাল নেই, সুঁই নেই, এমনকি নেই বিছানাও। মেঝেতে শুয়েই একের পর এক মানুষ মারা যাচ্ছেন। কলেরার কারণে শরীর থেকে পানি ও লবণ বেরিয়ে মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছে তাজা প্রাণ।

মৃত্যুর এই মিছিল দেখে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলেন এক বাঙালি চিকিৎসক, ডা. দিলীপ মহলানবিশ। তিনি জানতেন, প্রচলিত পদ্ধতিতে শিরায় স্যালাইন (IV) দিয়ে এত মানুষের প্রাণ বাঁচানো অসম্ভব। তখন তিনি এক দুঃসাহসিক সিদ্ধান্ত নিলেন।

ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষাধীন একটি সহজ সূত্রকে মাঠে নামিয়ে দিলেন। সূত্রটি কী? এক লিটার পরিষ্কার পানিতে সামান্য লবণ আর গ্লুকোজের মিশ্রণ। মুখে খাওয়ার এই সাধারণ পানিই যে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে অন্যতম বড় বিপ্লব ঘটাতে যাচ্ছে, তা হয়তো তখন কেউ ভাবেনি।

ডা. দিলীপ মহলানবিশ এবং তার দল শরণার্থীদের ওআরএস বা ওরাল রিহাইড্রেশন সল্ট (Oral Rehydration Salts) খাওয়াতে শুরু করলেন। ফলাফল মিলল হাতেনাতে। যেখানে কলেরায় মৃত্যুর হার ছিল ৩০ শতাংশের ওপরে, ওআরএস ব্যবহারের পর তা নেমে এলো মাত্র ৩ শতাংশে! অথচ এই যুগান্তকারী আবিষ্কারের পথটা কিন্তু সহজ ছিল না।

ষাটের দশকে ঢাকার ‘SEATO কলোরা রিসার্চ ল্যাবরেটরি’ (বর্তমান আইসিডিডিআর,বি) এবং কলকাতার জনস হপকিন্স সেন্টারে ওআরএস নিয়ে গবেষণা শুরু হয়। ডা. ডেভিড নালিন ও ডা. রিচার্ড ক্যাশসহ একদল বিজ্ঞানী প্রমাণ করেছিলেন যে, গ্লুকোজের উপস্থিতিতে অন্ত্র দ্রুত পানি ও লবণ শোষণ করতে পারে। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞান মহল তখন শিরায় স্যালাইন দেওয়ার সনাতন পদ্ধতিতে অভ্যস্ত ছিল। ১৯৭১ সালের সেই শরণার্থী শিবিরের মানবিক বিপর্যয়ই ওআরএস-কে গবেষণাগারের দেয়াল ভেঙে বাস্তব পৃথিবীর সবচেয়ে বড় জীবনরক্ষাকারী হাতিয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে।

বিখ্যাত চিকিৎসা সাময়িকী ‘দ্য ল্যানসেট’ একে বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা অগ্রগতি হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। ডায়রিয়া বা কলেরায় মানুষ আসলে রোগে মারা যায় না, বরং মারা যায় পানিশূন্যতায়। শরীর থেকে পানি ও খনিজ লবণ বেরিয়ে গেলে হৃদযন্ত্র ও কিডনি বিকল হয়ে পড়ে।

ওআরএস-এর জাদু লুকিয়ে আছে আসলে এর সুনির্দিষ্ট অনুপাতে। গ্লুকোজ এবং সোডিয়ামের (লবণ) এই মেলবন্ধন শরীরের অন্ত্রকে বাধ্য করে দ্রুত পানি শোষণ করে নিতে। ওআরএস কোনো দামি ওষুধ নয়, এটি মূলত একটি রিহাইড্রেশন থেরাপি। এটি যেমন সস্তা, তেমনি তৈরি করা সহজ। কোনো সুই-সিরিঞ্জের প্রয়োজন নেই, কোনো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের দরকার নেই; শুধু অভিভাবকের একটু সচেতনতাই একজন শিশুর প্রাণ বাঁচানোর জন্য যথেষ্ট।

একাত্তরের সেই সাফল্যের পর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) নড়েচড়ে বসে। ১৯৭৮ সালে তারা বিশ্বব্যাপী ডায়রিয়া রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি শুরু করে এবং ওআরএস-কে এর মূল হাতিয়ার বানায়। কিন্তু প্যাকেটজাত ওআরএস বিশ্বের প্রত্যন্ত অঞ্চলে, আফ্রিকার অবহেলিত গ্রামে কিংবা লাতিন আমেরিকার বস্তিতে পৌঁছে দেওয়া সহজ ছিল না।

বাংলাদেশে ওআরএস ব্যবহার যেন এক নীরব বিপ্লবের গল্প। ওআরএস-এর বৈশ্বিক জয়যাত্রার গল্পটা যতটা রোমাঞ্চকর, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এর বাস্তবায়ন ঠিক ততটাই গৌরবের।

কারণ, তখনো রাস্তাঘাট উন্নত ছিল না, ছিল না ওআরএস তৈরির কারখানা। এই সময় ওআরএস-এর বার্তা ছড়িয়ে দিতে বিশ্বজুড়ে শুরু হয় ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা। বিভিন্ন দেশের সরকার, এনজিও এবং ইউনিসেফ মিলে মায়েদের শেখাতে শুরু করে কীভাবে ঘরে বসেই ‘এক চিমটি লবণ আর এক মুঠো গুড়’ দিয়ে জীবনরক্ষাকারী এই পানীয় তৈরি করা যায়।

আশির দশকে এটি আন্তর্জাতিকভাবে শিশু মৃত্যুর হার কমানোর সবচেয়ে সস্তা ও কার্যকর উপায় হিসেবে স্বীকৃতি পায়। এভাবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তৈরি করা একেকটি ওআরএস প্যাকেট কোটি কোটি শিশুর কাছে হয়ে ওঠে জীবন বাঁচানোর ‘ম্যাজিক পাউডার’।

বাংলাদেশে ওআরএস ব্যবহার যেন এক নীরব বিপ্লবের গল্প। ওআরএস-এর বৈশ্বিক জয়যাত্রার গল্পটা যতটা রোমাঞ্চকর, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এর বাস্তবায়ন ঠিক ততটাই গৌরবের।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে প্রতি বছর হাজার হাজার শিশু ডায়রিয়ায় মারা যেত। ঘরে ঘরে ওআরএস পৌঁছে দেওয়া তখন সময়ের দাবি। এই চ্যালেঞ্জটি হাতে নেয় ‘ব্র্যাক (BRAC)’। ১৯৮০ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত ব্র্যাকের নারী কর্মীরা টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি ঘরে ঘরে যান।

তারা মায়েদের হাতে-কলমে শেখান ‘নুন-গুড়ের স্যালাইন’ বানানোর নিয়ম। কোনো মাপজোখের যন্ত্র ছাড়াই এক লিটার পানি, এক চিমটি লবণ আর এক মুঠো গুড়। মায়েরা যেন নিয়মটি ভুলে না যান, সেজন্য তৈরি করা হয়েছিল সহজ ছড়া।

পাশাপাশি আইসিডিডিআর,বি-র গবেষণা এবং সরকারি উদ্যোগে ‘ওরস্যালাইন’ বা ওআরএস-এর বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয়। এসএমসি (SMC) ঘরে ঘরে ওরস্যালাইন এন (Oraline-N) পৌঁছে দিতে এক বিশাল বিপণন নেটওয়ার্ক গড়ে তোলে।

হাটে-বাজারে, মুদি দোকানে চায়ের পাতার মতো ওআরএস-এর প্যাকেট ঝুলতে শুরু করে। আজ বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের একজন সাধারণ মা-ও জানেন, শিশুর পাতলা পায়খানা হলে সবার আগে ওরস্যালাইন খাওয়াতে হবে। এর ফলে বাংলাদেশে ডায়রিয়াজনিত শিশু মৃত্যুর হার প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। ওআরএস-এর এই সফল মডেল আজ সারাবিশ্বের জন্য এক অনন্য উদাহরণ।

প্রতিবছর ২৯ জুন বিশ্বব্যাপী পালিত হয় ‘ওআরএস দিবস’। ওআরএস-এর এই অভাবনীয় অবদানকে স্মরণ করতে এবং ডায়রিয়াজনিত পানিশূন্যতা প্রতিরোধে জনসচেতনতা বাড়াতে এই দিনটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ২০২৬ সালের বিশ্ব ওআরএস দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, ‘সহজ সমাধান, সুরক্ষিত প্রাণ: ডায়রিয়া মুক্ত হোক প্রতিটি প্রাণ’।

এই প্রতিপাদ্যের মূল উদ্দেশ্য হলো, অতি সাধারণ এবং সাশ্রয়ী এই ব্যবস্থার সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তের মানুষকে, বিশেষ করে অবহেলিত শিশুদের ডায়রিয়ার অকাল মৃত্যু থেকে রক্ষা করা।

বর্তমান সময়ে ওআরএস-এর গুরুত্ব আরও বৃদ্ধি পেয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি, আকস্মিক বন্যা এবং তীব্র তাপদাহের ফলে বিশ্বজুড়ে বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ায় ডায়রিয়া ও পানিশূন্যতার প্রকোপ আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। জলবায়ু সংকটের এই সময়ে ওআরএস-এর মতো সাশ্রয়ী ও সহজলভ্য রিহাইড্রেশন থেরাপিই আমাদের সবচেয়ে বড় ভরসা।

ওআরএস ব্যবহারে সর্বোচ্চ সুফল পেতে এবং যেকোনো ঝুঁকি এড়াতে কিছু জরুরি নিয়ম ও তথ্য জেনে রাখা আবশ্যক:

সঠিক পরিমাপ: বাজার থেকে কেনা ওআরএস-এর এক প্যাকেট পাউডার নির্দেশিত সঠিক পরিমাণ (সাধারণত আধা লিটার বা ৫০০ মিলি) পরিষ্কার খাওয়ার পানিতে সম্পূর্ণ মিশিয়ে নিতে হবে। কম বা বেশি পানি দিলে লবণের ঘনত্ব পরিবর্তন হয়ে যেতে পারে, যা শিশুর জন্য বিপজ্জনক।

কখনই ফুটন্ত পানিতে নয়: ওআরএস পাউডার মেশানোর জন্য ঘরের স্বাভাবিক তাপমাত্রার পানি ব্যবহার করতে হবে। গরম বা ফুটন্ত পানিতে ওআরএস গোলানো যাবে না, কারণ এতে এর রাসায়নিক কার্যকারিতা নষ্ট হয়ে যায়।

বর্তমান সময়ে ওআরএস-এর গুরুত্ব আরও বৃদ্ধি পেয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি, আকস্মিক বন্যা এবং তীব্র তাপদাহের ফলে বিশ্বজুড়ে বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ায় ডায়রিয়া ও পানিশূন্যতার প্রকোপ আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে।

সংরক্ষণের সময়সীমা: একবার ওআরএস গোলানোর পর সেই পানি সর্বোচ্চ ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত ব্যবহার করা যাবে। ২৪ ঘণ্টা পার হয়ে গেলে অবশিষ্ট স্যালাইন ফেলে দিয়ে নতুন করে স্যালাইন তৈরি করতে হবে।

দুধ বা জুসের সাথে মেশানো নিষেধ: ওআরএস পাউডার কেবল বিশুদ্ধ পানিতেই গোলানো উচিত। এটিকে দুধ, স্যুপ বা কোনো ফলের রসের সাথে মেশানো যাবে না।

বুকের দুধ চালু রাখা: শিশু ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হলেও ওআরএস খাওয়ানোর পাশাপাশি মায়ের বুকের দুধ এবং অন্যান্য স্বাভাবিক খাবার নিয়মিত খাইয়ে যেতে হবে।

জিঙ্ক ট্যাবলেটের ভূমিকা: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিকা অনুযায়ী, শিশুদের ডায়রিয়া হলে ওআরএস-এর পাশাপাশি ১০-১৪ দিন চিকিৎসকের পরামর্শে জিঙ্ক ট্যাবলেট বা সিরাপ খাওয়ালে ডায়রিয়ার সময় ও তীব্রতা দ্রুত কমে আসে।

আজকের দিনে ওআরএস আমাদের কাছে খুবই সাধারণ একটা জিনিস। ঘরের পাশের দোকানে মাত্র কয়েক টাকায় এটি কিনতে পাওয়া যায়। কিন্তু এই সামান্য প্যাকেটের পেছনে লুকিয়ে আছে লাখো মানুষের জীবন বাঁচানোর ইতিহাস, বাঙালি চিকিৎসকের মেধা আর কোটি মায়ের সচেতনতার গল্প।

ওআরএস শুধু একটি স্যালাইনের নাম নয় বরং এটি মানুষের বাঁচতে চাওয়ার অদম্য ইচ্ছা আর বিজ্ঞানের সহজতম বিজয়ের এক জীবন্ত প্রতীক। বিশ্ব ওআরএস দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক সঠিক নিয়মে ওআরএস ব্যবহারের বার্তা দেশের প্রতিটি ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়া।

ডা. কাকলী হালদার : সহকারী অধ্যাপক, মাইক্রোবায়োলজি বিভাগ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ