একজন শিল্পী শুধুই কী ছবি আঁকেন? বা একজন শিক্ষক শুধুই কী পড়াতে জানেন? না, কখনো কখনো তিনি একটি জাতির স্মৃতি, স্বপ্ন ও চেতনারও রূপকার হন। আমি বলছি সর্বজন শ্রদ্ধেয় মুস্তাফা মনোয়ারের কথা, যিনি ছিলেন তেমনই একজন চিত্রকর, পুতুলনাট্যের নবজাগরণের অগ্রদূত, টেলিভিশন নির্মাতা, সাংস্কৃতিক সংগঠক এবং মুক্তিযুদ্ধের সাংস্কৃতিক যোদ্ধা; যার হাতে ক্যানভাস যেমন কথা বলেছে, তেমনই প্রাণ পেয়েছে কাঠের পুতুলও।
আর সেই পুতুল কখনো শিশুদের আনন্দ দিয়েছে, প্রতিবাদের ভাষা হয়েছে, আবার একটি জাতির আত্মপরিচয়কে বিশ্বদরবারে পৌঁছে দিয়েছে। যে মনুষ্য রত্নটি ১৯৩৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর অবিভক্ত বাংলার যশোর জেলার (বর্তমান মাগুরা) নাকোল গ্রামে জন্মে ছিলেন।
পিতা ছিলেন বাংলা সাহিত্যের বিশিষ্ট কবি গোলাম মোস্তফা। সাহিত্য ও সংস্কৃতির আবহে বড় হলেও জীবনের শুরুটা ছিল অতো সহজ ছিল না। মাত্র পাঁচ বছর বয়সেই মাকে হারান। শৈশবের সেই শূন্যতা তার শিল্পীসত্তাকে আরও সংবেদনশীল করে তোলে। পরবর্তীকালে তার ছবিতে, পুতুলে এবং নির্মাণশৈলীতে যে মানবিক কোমলতা দেখা যায়, তার শিকড় খুঁজে পাওয়া যায় এই ব্যক্তিগত জীবনানুভূতিতেই।

কোনো কোনো মানুষ তার জীবনকর্ম দিয়েই একটি জাতির সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ হয়ে ওঠেন। তাদের প্রস্থান কেবল ব্যক্তির মৃত্যু নয়; একটি সময়, একটি দর্শন এবং একটি সৃজনধারার অবসানের বেদনাও বয়ে আনে। মুস্তাফা মনোয়ার ছিলেন তেমনই এক বিরল ব্যক্তিত্ব। তার প্রয়াণে বাংলাদেশ হারাল অসাধারণ শিল্পী, সংস্কৃতি-সংগঠক, শিক্ষক এবং পাপেট শিল্পের পথিকৃৎকে। আর আমরা হারালাম এমন এক আলোকবর্তিকাকে, যিনি শিল্পকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়াকেই জীবনের প্রধান ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন।
আমাদের সমাজ যখন ক্রমশ যান্ত্রিকতা, ভোগবাদ ও প্রযুক্তিনির্ভর জীবনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন মুস্তাফা মনোয়ারের শিল্পভাবনা বারবার মনে করিয়ে দেয় মানুষের সবচেয়ে নির্মল পরিচয় লুকিয়ে থাকে তার কল্পনা, অনুভূতি এবং শৈশবের বিস্ময়বোধে। তার শিল্পে তাই শিশুমন কখনো অবহেলিত হয়নি; বরং সেখানেই তিনি আবিষ্কার করেছেন মানবিকতার সবচেয়ে উজ্জ্বল আলো।
ব্যক্তিগত ভাবে নব্বইয়ের দশকে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার সুযোগ আমার হয়েছিলো। বিশেষ করে পুতুল নাটকে। সে সময় বাংলাদেশজুড়ে শিশু-কিশোরদের সৃজনশীল বিকাশ, লোকসংস্কৃতির চর্চা এবং পাপেট নাটকের প্রসারে তিনি নিরলসভাবে কাজ করছিলেন।
কর্মশালা, প্রদর্শনী, সাংস্কৃতিক আয়োজন ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে তার পাশে থেকে দেখেছি তিনি কখনো শিল্পকে কেবল মঞ্চের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি; বরং মানুষের কাছে, বিশেষ করে শিশু ও তরুণদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার বিষয়টিকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতেন। প্রতিটি আয়োজনের পরিকল্পনা থেকে বাস্তবায়ন পর্যন্ত তিনি নিজে নিবিড়ভাবে যুক্ত থাকতেন। তার কর্মনিষ্ঠা, সময়ানুবর্তিতা, শৃঙ্খলাবোধ এবং সহকর্মীদের প্রতি আন্তরিকতা আমাদের মতো তরুণ সাংস্কৃতিক কর্মীদের জন্য ছিল এক অনন্য শিক্ষা।
আমি তখন তরুণ সাংস্কৃতিক কর্মী। তার সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে উপলব্ধি করেছি, বড় শিল্পীর পরিচয় তার খ্যাতিতে নয়, বিনয়ে। নতুনদের মতামত তিনি মন দিয়ে শুনতেন, ভুল হলে ধৈর্যের সঙ্গে সংশোধন করতেন এবং সবসময় উৎসাহ দিতেন। তার কাছে শিল্পচর্চা ছিল মানুষ গড়ারও একটি প্রক্রিয়া। তাই তার সান্নিধ্যে আমরা শুধু সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে শিখিনি; শিখেছি দায়িত্ববোধ, সৌন্দর্যবোধ এবং মানুষের প্রতি গভীর মমত্ববোধ।

আমি মুস্তাফা মনোয়ারকে শুধু একজন খ্যাতিমান শিল্পী ও শিক্ষক হিসেবে দেখি না; তাকে দেখি এক আলোকপ্রদীপ হিসেবে, যিনি শিল্পকে মানুষের জীবনের সঙ্গে যুক্ত করার বিরল সাধনা করেছেন। আমার কাছে তিনি ছিলেন একাধারে শিক্ষক, পথপ্রদর্শক এবং নন্দনচেতনার নির্মাতা।
তার সঙ্গে কাটানো প্রতিটি মুহূর্ত আমাকে শিখিয়েছে, শিল্পের প্রকৃত শক্তি ক্যানভাসে বা মঞ্চে নয় মানুষের মননে। তিনি বিশ্বাস করতেন, একজন শিল্পীর দায়িত্ব শুধু সুন্দর সৃষ্টি করা নয়; মানুষের ভেতরে সৌন্দর্যবোধ, সহমর্মিতা এবং মানবিক চেতনা জাগিয়ে তোলা। এই বিশ্বাসই তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে। আসলে তাকে যত কাছ থেকে দেখেছি, ততই উপলব্ধি করেছি তার অসাধারণ বিনয়। এত বড় মাপের একজন শিল্পী হয়েও তিনি কখনো দূরত্ব তৈরি করতেন না।
নতুন প্রজন্মের কথা মন দিয়ে শুনতেন, প্রশ্নকে স্বাগত জানাতেন এবং ভুলকে তিরস্কারের নয়, শেখার সুযোগ হিসেবে দেখতেন। তার এই মানবিক আচরণ আমাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। তিনি শিখিয়েছেন, প্রকৃত শিল্পী হওয়ার আগে প্রকৃত মানুষ হওয়া জরুরি।
আমার কাছে তিনি ছিলেন চলমান সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান। তার মধ্যে আমি একই সঙ্গে একজন চিত্রশিল্পী, পাপেটশিল্পের নবজাগরণ-পুরুষ, দক্ষ সংগঠক, দূরদৃষ্টিসম্পন্ন সাংস্কৃতিক নীতিনির্ধারক এবং শিশুদের অকৃত্রিম বন্ধু, এইসব সত্তার অনন্য সমন্বয় দেখেছি। তিনি সংস্কৃতিকে কখনো বিলাসিতা মনে করেননি; তিনি দেখেছেন জাতির আত্মপরিচয়, মানবিক শিক্ষা এবং সামাজিক পরিবর্তনের অন্যতম শক্তি হিসেবে।
আজ তার অনুপস্থিতিতে আরও স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করি, তিনি কেবল শিল্পকর্ম রেখে যাননি; রেখে গেছেন অসামান্য দৃষ্টিভঙ্গি। সেই দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের শেখায় যে সমাজ তার শিশুদের কল্পনাশক্তিকে লালন করে, শিল্পকে মর্যাদা দেয় এবং সংস্কৃতিকে জীবনের অংশ করে তোলে, সেই সমাজই সত্যিকার অর্থে সভ্য হয়ে ওঠে। তাই আমার কাছে মুস্তাফা মনোয়ার কোনো অতীতের কিংবদন্তি নন; তিনি বর্তমানেরও পথপ্রদর্শক এবং ভবিষ্যতের জন্য এক অনিঃশেষ প্রেরণার উৎস।
আমাদের সমাজ যখন ক্রমশ যান্ত্রিকতা, ভোগবাদ ও প্রযুক্তিনির্ভর জীবনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন মুস্তাফা মনোয়ারের শিল্পভাবনা বারবার মনে করিয়ে দেয় মানুষের সবচেয়ে নির্মল পরিচয় লুকিয়ে থাকে তার কল্পনা, অনুভূতি এবং শৈশবের বিস্ময়বোধে।
একটু ইতিহাসের দিকে দেখা যায়, দেশভাগের অভিঘাতে তার শিক্ষাজীবনও নানা বাঁক নিয়েছে। কলকাতায় পড়াশোনা শুরু হলেও পরে পরিবার পূর্ববাংলায় চলে আসেন। নারায়ণগঞ্জ গভর্নমেন্ট স্কুলে পড়ার সময়ই তিনি প্রত্যক্ষ করেন ভাষা আন্দোলনের উত্তাল সময়। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারির ছাত্রহত্যার সংবাদ তার কিশোর মনকে গভীরভাবে নাড়া দেয়।
সহপাঠীদের নিয়ে তিনি প্রতিবাদী পোস্টার ও দেয়ালচিত্র আঁকেন। সেই শিল্পই হয়ে ওঠে তার প্রথম রাজনৈতিক ভাষা। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী তাকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠায়। কিন্তু কারাবাস তার শিল্পীসত্তাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি; বরং শিল্প ও প্রতিরোধ তার জীবনে তখন থেকেই অবিচ্ছেদ্য হয়ে ওঠে পরবর্তীকালে বাবার ইচ্ছায় হিসাব বিজ্ঞান নিয়ে পড়লেও তার মন টানত রং-তুলি আর রেখার জগতে।

তাই তিনি ভর্তি হন কলকাতার গভর্নমেন্ট কলেজ অব আর্টস অ্যান্ড ক্র্যাফটসে। সেখান থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। ছাত্রাবস্থাতেই তার জলরঙের কাজ শিল্পমহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। প্রকৃতি, মানুষ এবং বাংলার লোকজ ঐতিহ্যকে তিনি আধুনিক শিল্পভাষায় প্রকাশ করার যে দক্ষতা অর্জন করেছিলেন, সেটিই তাকে পরবর্তীকালে স্বতন্ত্র পরিচয় এনে দেয়। দেশে ফিরে তিনি চারুকলা মহাবিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন। কিন্তু তার শিল্পভাবনা কেবল শ্রেণিকক্ষ বা প্রদর্শনীতে আটকে থাকেনি।
বাংলাদেশ টেলিভিশনের সূচনালগ্নেও যোগ দিয়ে তিনি বুঝিয়ে দেন, টেলিভিশনও একটি শিল্পমাধ্যম। অনুষ্ঠান নির্মাণ, দৃশ্য পরিকল্পনা, আলোকসজ্জা ও নান্দনিক উপস্থাপনায় তিনি নতুন মাত্রা যোগ করেন। শিশুদের জন্য ‘নতুন কুঁড়ি’র মতো অনুষ্ঠান কিংবা রবীন্দ্রনাথের নাটকের টেলিভিশন রূপায়ণ সব ক্ষেত্রেই ছিল তার সৃজনশীল দৃষ্টিভঙ্গির ছাপ। প্রশাসক হিসেবেও তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশন, শিল্পকলা একাডেমি ও অন্যান্য সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করে শিল্পচর্চার পরিসর বিস্তৃত করেন।
তবে তাকে আলাদা করে চেনায় তার পুতুলনাট্য। বাংলার লোকজ পুতুলনাচকে তিনি নতুন শিল্পভাষা দিয়েছেন। তার কাছে পুতুল কেবল বিনোদনের উপকরণ নয়; এটি ছিল শিক্ষা, কল্পনা, সংস্কৃতি ও সামাজিক সচেতনতার এক শক্তিশালী মাধ্যম। লোকজ ঐতিহ্যকে আধুনিক নাট্যরীতি, সংগীত, আলো ও দৃশ্য-নির্মাণের সঙ্গে মিলিয়ে তিনি এমন এক পাপেট থিয়েটারের ধারা গড়ে তোলেন, যা দেশ-বিদেশে প্রশংসিত হয়।
শিশুদের শিক্ষাকে আনন্দময় করে তুলতে তিনি শিক্ষামূলক পাপেট নির্মাণ করেন। তার সৃষ্টি চরিত্রগুলো শুধু শিশুদের মন জয় করেনি, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও প্রশংসা কুড়িয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মেলনে তিনি বাংলাদেশের পুতুলনাট্যকে তুলে ধরেছেন গবেষক ও শিল্পী দুই পরিচয়েই।
আন্তর্জাতিক পাপেট সংস্থা ইউনিমার সম্মানসূচক সদস্যপদ তার কাজের বৈশ্বিক স্বীকৃতিরই প্রমাণ। গ্রামবাংলার পুতুলনাচ থেকে অনুপ্রেরণা পেয়ে, মুস্তাফা মনোয়ার বাংলাদেশে আদ্যপুতুল শিল্পের পথপ্রদর্শক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেন। তার নির্মিত ‘পারুল’, ‘বাউল’, ‘বাঘা’, ‘মেনি’ ও আজব দেশে-সারির তথ্যভিত্তিক সিরিজ ‘মনের কথা’-তে শিশুসাহিত্য ও শিক্ষামূলক বার্তা দিয়ে জনপ্রিয়তা পান।
১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধকালে তিনি টেলিফোন ও আশ্রয়কেন্দ্রগুলোয় পাপেট নাট্য পরিবেশন করেছিলেন, ‘আগাছা’, ‘রাক্ষস’, ‘একজন সাহসী চাষী’-এর মতো নাটক দিয়ে দেশি-বিদেশি প্রচার পেয়েছেন। বাংলাদেশ টেলিভিশনে ‘রক্তকরবী’, ‘দ্য টেমিং অফ দ্য শ্রু’-তে সাহিত্যে অ্যানিমেশনের কাজ করার পাশাপাশি এর প্রায় সব শাখায়ই তিনি নিজস্ব স্বাক্ষর রেখেছেন। ১৯৮৫-এর সার্ক-সন্ধ্যা, ২য় ও ৬ষ্ঠ সাফ গেমস-এর ভিজ্যুয়াল মিশুক (মাসকট)-সহ নানা বড় রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান তিনি পরিকল্পনা ও পরিচালনা করেন।
এর মধ্যে ‘মনের কথা’ পুতুলনাট্যটি সে সময়ে অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং কালজয়ী পাপেট শো হিসেবে উল্লেখ্য। নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশ টেলিভিশনে এটি নিয়মিত প্রচারিত হতো। মূলত শিশু-কিশোরদের উপযোগী করে তৈরি এই অনুষ্ঠানটি তৎকালীন সময়ে সব বয়সী দর্শকের হৃদয়ে এক বিশেষ জায়গা করে নিয়েছিল।

‘মনের কথা’ অনুষ্ঠানের প্রধান আকর্ষণ ছিল ‘পারুল’ নামের একটি চমৎকার পুতুল চরিত্র। ফ্রক পরা, বড় বড় চোখ আর মিষ্টি চেহারার পারুল ছিল এক প্রাণবন্ত গ্রামীণ কিশোরী। তার সহজ-সরল বাচনভঙ্গি, কৌতূহল এবং বুদ্ধিমত্তা দর্শকদের মুগ্ধ করত। পারুলের মাধ্যমে সমাজের নানা দিক ফুটিয়ে তোলা হতো। পারুল ও তার চারপাশের চরিত্রগুলোর মাধ্যমে শিশুদের সততা, বড়দের সম্মান করা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং নিয়মানুবর্তিতা শেখানো হতো।
পরিবেশ ও সমাজ সচেতনতা, গাছ লাগানো, পরিবেশ রক্ষা এবং কুসংস্কার দূরীকরণের মতো বিষয়গুলো খুব সহজ ভাষায় গল্পের ছলে তুলে ধরা হতো। অনুষ্ঠানটির অন্যতম শক্তিশালী আরেকটি দিক ছিল এর গান ও আবহ সংগীত। বিশেষ করে পারুলের কণ্ঠে গাওয়া ‘আজকে মোদের বড়ই আনন্দের দিন...’ গানটি তৎকালীন সময়ে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়েছিল এবং আজও অনেকের মনে স্মৃতিকাতরতা তৈরি করে।
‘মনের কথা’ অনুষ্ঠানের প্রধান আকর্ষণ ছিল ‘পারুল’ নামের একটি চমৎকার পুতুল চরিত্র। ফ্রক পরা, বড় বড় চোখ আর মিষ্টি চেহারার পারুল ছিল এক প্রাণবন্ত গ্রামীণ কিশোরী। তার সহজ-সরল বাচনভঙ্গি, কৌতূহল এবং বুদ্ধিমত্তা দর্শকদের মুগ্ধ করত। পারুলের মাধ্যমে সমাজের নানা দিক ফুটিয়ে তোলা হতো।
সংগীতের মাধ্যমে পাপেটগুলোর নড়াচড়া ও অভিব্যক্তিকে জীবন্ত করে তোলা হতো। বলার অপেক্ষা রাখে না যে গ্রামীণ আবহ, সহজ বাংলা ভাষা এবং দেশীয় সংস্কৃতির মিশ্রণে তৈরি এই শো-টি শিশুদের নিজস্ব শিকড়ের সাথে পরিচিত করতে বড় ভূমিকা রেখেছিল।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধেও তার ভূমিকা ছিল অনন্য। তিনি অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেননি, কিন্তু সংস্কৃতিকে অস্ত্র বানিয়েছিলেন। প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে যুক্ত হয়ে নাটক, গান ও পুতুলনাট্যের মাধ্যমে বিশ্বের নানা প্রান্তে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে জনমত গঠনে কাজ করেছেন।
তার কাছে শিল্প ছিল মানবমুক্তির ভাষা; স্বাধীনতার সংগ্রামও ছিল সেই শিল্পচিন্তারই একটি স্বাভাবিক সম্প্রসারণ। মুস্তাফা মনোয়ারের শিল্পদর্শনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল লোকজ ঐতিহ্যকে আধুনিকতার সঙ্গে যুক্ত করা। তিনি বিশ্বাস করতেন, আধুনিকতা মানে শিকড় ভুলে যাওয়া নয়; বরং শিকড় থেকেই নতুন ভাষা তৈরি করা। তাই তার ছবিতে যেমন গ্রামীণ বাংলার রং, মানুষ ও প্রকৃতির অনুষঙ্গ ফিরে ফিরে এসেছে, তেমনি তার পুতুলেও জীবন্ত হয়েছে বাংলার লোকসংস্কৃতি। এই কারণেই তার শিল্প কখনো সময়ের বাইরে যায়নি; বরং প্রতিটি সময়েই নতুন অর্থে পাঠযোগ্য হয়ে উঠেছে।
দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি অসংখ্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সম্মান লাভ করেছেন। শিল্পকলায় বিশেষ অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার তাকে একুশে পদকে ভূষিত করে। কিন্তু পুরস্কারের চেয়ে বড় ছিল মানুষের ভালোবাসা। কয়েক প্রজন্মের শিল্পী, অভিনয়শিল্পী, টেলিভিশন নির্মাতা ও পুতুলশিল্পী তাকে শিক্ষক, পথপ্রদর্শক এবং অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে দেখেছেন।
আজ মুস্তাফা মনোয়ারকে স্মরণ করলে কেবল একজন শিল্পীর কথাই মনে পড়ে না। মনে পড়ে এমন একজন মানুষের কথা, যিনি শিল্পকে মানুষের জীবনের সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন। তিনি দেখিয়েছেন, একটি পুতুলও ইতিহাস বলতে পারে, একটি ছবি প্রতিবাদ করতে পারে, একটি টেলিভিশন অনুষ্ঠানও একটি জাতির সাংস্কৃতিক রুচি গড়ে তুলতে পারে।
তার চলে যাওয়াটা একটি বা দুটি যুগের অবসান নয়, এই শূন্যতা অসীম। আমরা জানি শিল্পীর মৃত্যু হয় না। তিনি বেঁচে থাকেন তার সৃষ্টিতে, ভাবনায় এবং গড়ে দেওয়া সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারে। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যখন বাংলার শিল্প-সংস্কৃতির ইতিহাস লিখবে, তখন মুস্তাফা মনোয়ারের নাম উচ্চারিত হবে এমন এক স্রষ্টা হিসেবে, যিনি তুলির আঁচড়, ক্যামেরার ফ্রেম এবং পুতুলের সুতোয় বাঙালির আত্মপরিচয়কে এক নতুন নন্দনতত্ত্বে রূপ দিয়েছিলেন।
নুরুল ইসলাম বাবুল : শিক্ষক ও গবেষক
