ফুটবলে ডুবে আছে বিশ্ব। ডুবে আছি আমরাও। দিনেরবেলা কাজের গতি খানিকটা শ্লথ, রাতে উদ্দাম হয়ে ওঠা সময়। স্নায়ুর সহ্য ক্ষমতাকে চিবিয়ে খাওয়া ম্যাচ আছড়ে পড়ছে টেলিভিশনের পর্দায়; রাত্রি তখন উৎসব অনেকের কাছে।
একটা সময় ছিল যখন বিটিভিতে বিশ্বকাপ ফুটবলের নির্দিষ্ট কিছু ম্যাচ দেখান হতো। তখন অল্প কিছু মানুষ রাত জেগে ম্যাচ দেখত। চায়ের রেস্তোরাঁ, সন্ধ্যাবেলা ছোট ছোট আড্ডায়, স্টেডিয়াম পাড়ায় ঝোড়ো সংলাপ বিনিময় আর তর্ক ছলকে পড়তো।
তখন বাড়ির ছাদে উড়তো না বিশ্বকাপে লড়তে আসা বিভিন্ন দেশের বিশাল সাইজের পতাকা। প্রিয় দলের জার্সি পড়ে মিছিল হতো না, কোন খেলোয়াড় বেশি পারদর্শী তা বিতর্কের ঝড় উঠত না। দল অথবা খেলোয়াড়কে সমর্থন করা নিয়ে সংঘাতে জড়িয়ে পড়তো না প্রচুর মানুষ।
প্রযুক্তি আমাদের জীবনধারাকে বদলে দিয়েছে। অন্তর্জালের সুনিপুণ এবং অনন্ত বিস্তার বিশ্ব ফুটবলের এই বর্ণাঢ্য আসরকে আমাদের আরও কাছে এনে দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ছড়িয়ে থাকা জাল, প্রতি মুহূর্তে খবরের শিরোনাম গোটা পৃথিবীকে ব্যক্তির হাতের মুঠোয় তুলে দিতে চাইছে। তুলে দিয়েছেও।
গৃহে, কফির দোকানে, ক্লাবে আর রাস্তায় বৃহৎ পর্দায় ফুটবল প্রেমিকরা একটার পর একটা ম্যাচ অবলোকন করে চলেছেন। তাদের উত্তেজনার পারদ আকাশচুম্বী হচ্ছে। কিন্তু কোথায় যেন খেলা দেখা অথবা সমর্থনের সেই সরলতা আর সৌন্দর্য হারিয়ে ফেলেছি। সেই অনুভূতির জায়গা দখল করেছে এক ধরনের হিংস্রতা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাঁত-নখ বের করা মন্তব্যের সূত্র ধরে ঘটছে সংঘাত, প্রিয় দলের বিজয় উদযাপন নিয়ে দুপক্ষের সংঘর্ষে খুন হয়েছেন তরুণ খোদ রাজধানীতে। অন্য একটি জেলায় ম্যাচ দেখার সময় তর্কের জেরে হত্যা করা হয়েছে একজনকে। এরকম ঘটনা আরও আছে পত্রিকার পৃষ্ঠায়।
ফুটবল খেলাকে কেন্দ্র করে এই সংঘাত নতুন কোনো ঘটনা নয়। পৃথিবীর অনেক দেশে এই ফুটবল খেলায় সমর্থকদের সংঘাত হরহামেশাই ঘটে থাকে। ইউরোপে ক্লাব ফুটবলের কোনো ম্যাচ সমর্থকদের জড়িয়ে ফেলে দাঙ্গায়। ফুটবল খেলা নিয়ে টেনশন, উত্তেজনার শেষ নেই।
একটা সমাজকে, সমাজের মানুষের বদলে যাওয়া মানসিকতাকে হয়তো ফুটবল খেলায় সমর্থনের ভাষা দিয়ে পুরোটা ব্যাখ্যা করা যায় না। একজন খেলোয়াড় বা একটা পুরো দলকে প্রত্যাখ্যানের ফর্মুলায় ফেলে বিচার করা যায় না। কিন্তু আমরা কোথায় চলেছি তার ধারণা পাওয়া যায়।
এসব খবর পড়তে পড়তে এ বছর মনে হচ্ছে, বিশ্বকাপ ফুটবলকে কেন্দ্র করে আমাদের সমাজে সমর্থকদের মানসিকতা, আচরণে বিস্তর পরিবর্তন ঘটে গেছে। প্রতিপক্ষের সমর্থককে আক্রমণের ভাষায় পরিবর্তন এসেছে, তারকাসম খেলোয়াড়দের নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রল বেড়েছে।
পৃথিবীর অন্য প্রান্তের একটি দেশ অথবা সে দেশের একজন কুশলী খেলোয়াড়কে আক্রমণ করা হচ্ছে কদর্য ভাষায়। তাদের বয়স নিয়ে সমালোচনা চলছে, ব্যক্তিগত জীবনের নানা কিছু সামনে নিয়ে এসে ব্যবচ্ছেদ করা হচ্ছে। কোনো তারকাখচিত খেলোয়াড় কেন অবসরে যাচ্ছে না তা নিয়েও এখনকার সমর্থকদের মাথাব্যথার অন্ত নেই।
অথচ একদা বড় কোনো খেলোয়াড় অবসরে চলে গেলে আমরা ব্যথিত হতাম। তার কুশলী খেলা আর দেখতে পাওয়া যাবে না ভেবে মন বিষাদে ভরে উঠত। এখন বিপরীত চিত্রই এখন চোখে পড়ে।
একটি সমাজের মানুষের ভাষা, আচরণ এবং প্রতিক্রিয়ার প্রকাশ একটু একটু করে বদলে যাওয়ার পেছনে রাজনীতি আর সামাজিক অস্থিরতার সুদূরপ্রসারী ভূমিকা আছে। যে সমাজের ভেতরে এখন বেঁচে আছি সেখানে রাজনৈতিক অস্থিরতা সীমাহীন।
আরও পড়ুন
দুই বছর ধরে রাজনীতির লক্ষ্যহীন শক্তিশালী ঢেউ আমাদের জীবন এবং মনের ওপর আছড়ে পড়ছে। তার আগে রাজনীতির কাঠামোকে ক্রমাগত ঠেলে দেওয়া হয়েছে দুবৃত্তায়নের খাদের দিকে। খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে আমরা নিজেদের অজান্তেই।
পাঠকের মনে প্রশ্ন উত্থাপিত হতে পারে, রাজনীতির সঙ্গে বিশ্বকাপ ফুটবলের সম্পর্ক কোথায়? উত্তরে বলা যায়, এই পৃথিবীতে এখন কিছুই রাজনীতির বাইরে নয়; কখনো ছিল না। সেই রাজনীতির কূটপ্রবাহ একটু একটু করে সমাজের গভীরে ছড়িয়েছে হতাশাকে।
দুর্নীতির দুর্গকে শক্তিশালী করেছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে চাহিদার চরিত্রহীন বিস্তার আমাদের সামাজিক জীবনকে দুর্বল করে দিয়েছে। এ ধরনের প্রক্রিয়া যদি একটি সমাজের ভেতরে ধারাবাহিকভাবে বয়ে চলে তাহলে সেখানে অস্থিরতার চাষাবাদ প্রবলভাবে হয়। আর সেই নিঃশব্দ অস্থিরতা বদলে দেয় মানুষের মুখের ভাষা, হিংস্র হয়ে ওঠে মানুষের আচরণ। আমাদের সমাজেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি।
এই সময়ে মুখের ভাষাকে প্রতিস্থাপন করার একটি প্রচেষ্টা সক্রিয় রয়েছে সমাজে। ভাষাকে কদর্যভাবে উপস্থাপন করে আক্রমণ করা হচ্ছে প্রতিপক্ষকে। যদি বলি এই প্রবণতা ধাক্কা দিয়েছে ফুটবল খেলার সমর্থকদের তা বোধ হয় খুব বেশি ভুল বলা হবে না।
বলা হয়ে থাকে, বিশ্ব ফুটবলের এই আসর পৃথিবীতে অসংখ্য বিভেদকে কিছুদিনের জন্য হলেও এক সুতায় সেলাই করে ফেলে। কিন্তু একটু গভীরভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, বাংলাদেশ নামক দক্ষিণ এশিয়ার ছোট্ট একটি দেশের মানুষ সেই খেলায় সমর্থনকে কেন্দ্র করে হিংসা-যুদ্ধে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গেছে। যত দিন গড়াচ্ছে এই যুদ্ধ তার দাঁত ও নখ বের করে একে-অপরকে আক্রমণ করছে।
কেউ হয়তো এই প্রবণতাকে আমাদের রুচির বিপর্যয় বলে আখ্যা দিতে পারেন। কেউ বলতে পারেন, সংস্কৃতি চেতনা থেকে ক্রমশ পিছিয়ে যাওয়ার কারণে খেলায় দল সমর্থন করা নিয়ে হিংস্রতা ছড়িয়ে পড়ছে। একটি সমাজে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে বঞ্চিত করে যখন এক ধরনের শূন্যতার বোধ তৈরি করা হয় তখন সেই শূন্যের ভেতরে হিংস্রতা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে।
ফুটবল খেলা সমাজে ঘটে চলা একটি বড় প্রেক্ষাপটের ছোট অংশ। এক মাসের বেশি সময় পর এই ফুটবলের বিশ্ব আসরের আলো নিভে যাবে। তখন উগ্রতা ছড়ানো সমর্থকদের কারুরই মনে থাকবে না তাদের নিজেদের অস্বাভাবিক আচরণের কথা।
তারা হয়তো আবার মেতে উঠবে অন্য কোনো একটি বিষয় নিয়ে। তা হতে পারে রাজনৈতিক, হতে পারে সামাজিক। সেখানেও দুটি গোষ্ঠী মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ভয়ংকর বচসায় লিপ্ত হবে, একে-অপরকে কদর্য ভাষায় আক্রমণ করবে। শারীরিক আক্রমণ চালিয়ে হত্যা করবে। তাদের ভুলে যাওয়া স্মৃতির প্রান্তরে খুব অবহেলায় পড়ে থাকবে কয়েকটি মৃত্যুর ঘটনা। হয়তো হাসপাতালের বেডে পড়ে থাকবে প্রহারে আহত ভিন্ন দলের কিছু ফুটবল সমর্থক।
ফুটবলের এই বিশাল আসর আর কিছুদিন পরেই ফুরিয়ে যাবে। কিন্তু সেই আসরকে কেন্দ্র করে যে ক্ষতচিহ্নগুলো তৈরি হলো সেগুলো কি সেরে যাবে? না, সেগুলো অন্য ক্ষতে পরিণত হবে। সে ক্ষত হয়তো আরও গভীর হবে।
একটা সমাজকে, সমাজের মানুষের বদলে যাওয়া মানসিকতাকে হয়তো ফুটবল খেলায় সমর্থনের ভাষা দিয়ে পুরোটা ব্যাখ্যা করা যায় না। একজন খেলোয়াড় বা একটা পুরো দলকে প্রত্যাখ্যানের ফর্মুলায় ফেলে বিচার করা যায় না। কিন্তু আমরা কোথায় চলেছি তার ধারণা পাওয়া যায়।
এই খণ্ডচিত্র অনেক সময় বড় পরিবর্তনের আভাস বহন করে। এই সূক্ষ্ম গবেষণা সমাজবিজ্ঞানীদের বিষয়। যারা সমাজ নিয়ে, প্রবণতা নিয়ে মাথা ঘামান তাদের চিন্তা ছোট ছোট সূত্রগুলো এক জায়গায় করে একটা বড় চিত্র আবিষ্কার করে।
আমরা সমাজের সাধারণ মানুষ। একটা সমাজ স্বাভাবিক পথে চলুক, মানুষের ভাষা থেকে শুরু করে প্রতিক্রিয়ার প্রকাশ হিংস্র হয়ে না উঠুক তা-ই আমাদের কাম্য। ফুটবল খেলার সৌন্দর্য আমাদের অস্থির ভাবনাকে দখল করে নিক, তাই আমরাদের চাওয়া।
ফুটবলের এই বিশাল আসর আর কিছুদিন পরেই ফুরিয়ে যাবে। কিন্তু সেই আসরকে কেন্দ্র করে যে ক্ষতচিহ্নগুলো তৈরি হলো সেগুলো কি সেরে যাবে? না, সেগুলো অন্য ক্ষতে পরিণত হবে। সে ক্ষত হয়তো আরও গভীর হবে।
ভাবার সময় এসেছে, নিজেদের প্রশ্ন করার সময় এসেছে আমরা কোন পথে চলেছি, কোন পথে ভেসে যাচ্ছি?
জানি, অনেকেই আমার এই মন্তব্যের সঙ্গে সহমত পোষণ করবেন না; করার কথাও নয়।
ইরাজ আহমেদ : কবি

