বাংলাদেশের উন্নয়ন খাতের একটি পুরোনো অভ্যাস আছে প্রকল্প শেষ হলেই আমরা একটা প্রতিবেদন প্রকাশ করি, কয়েকটি সাফল্যের গল্প লিখি, একটা ভিডিও বানাই, কিছু সংবাদ প্রকাশ করি। এরপর ধরে নিই, কাজ শেষ।
সত্যিই কি শেষ?
আমরা কি কখনো ভেবে দেখি, মানুষ আমাদের প্রকল্পের নাম জানে, নাকি উদ্দেশ্য বোঝে? তারা কি কার্যক্রমে অংশ নেয়, নাকি কেবল সুবিধাভোগী হিসেবে থেকে যায়? আরও বড় প্রশ্ন তারা কি আমাদের বিশ্বাস করে?
উন্নয়ন যোগাযোগের সবচেয়ে বড় সংকট এখানেই। আমরা অনেক সময় তথ্য পৌঁছে দিতে ব্যস্ত, কিন্তু আস্থা গড়ে তুলতে ব্যর্থ। অবশ্যই উন্নয়ন খাতে আচরণগত পরিবর্তন যোগাযোগ (BCC/SBCC), COMBI এবং অন্যান্য মানবকেন্দ্রিক যোগাযোগ পদ্ধতি বহু বছর ধরেই আস্থা তৈরি, অংশগ্রহণ বৃদ্ধি এবং আচরণগত পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। কিন্তু উন্নয়ন যোগাযোগের বৃহত্তর পরিসরে এখনো অনেক সময় প্রকল্পের ফলাফল তুলে ধরার ওপর বেশি জোর দেওয়া হয়, মানুষের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সংলাপ ও আস্থা তৈরির চর্চা তুলনামূলকভাবে কম দেখা যায়। আজকের বাংলাদেশে এই বাস্তবতা আরও স্পষ্ট।
একজন কৃষককে আপনি শতবার বলতে পারেন, রাসায়নিক সারের পরিবর্তে জৈব সার ব্যবহার করুন। কিন্তু তিনি সিদ্ধান্ত নেবেন তখনই, যখন পাশের গ্রামের আরেকজন কৃষকের সফলতা নিজের চোখে দেখবেন।
একজন নারী উদ্যোক্তাকে ডিজিটাল আর্থিক সেবার সুবিধা বোঝানো যায়। কিন্তু তিনি তা গ্রহণ করবেন তখনই, যখন বিশ্বাস করবেন এটি তার ঝুঁকি কমাবে, আয় বাড়াবে এবং তাকে সম্মান দেবে। অর্থাৎ, উন্নয়নে তথ্যের চেয়ে বিশ্বাসের মূল্য বেশি।
এখানেই উন্নয়ন যোগাযোগের ভবিষ্যৎ বদলে যাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন কয়েক সেকেন্ডে প্রতিবেদন লিখে দিতে পারে, ভিডিও বানিয়ে দিতে পারে, এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টও তৈরি করে দিতে পারে। খুব শিগগিরই হয়তো প্রকল্পের বার্ষিক প্রতিবেদনও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাই তৈরি করবে।
প্রশ্ন হলো, যোগাযোগ পেশাজীবীর প্রয়োজন কোথায়? কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে উন্নয়ন যোগাযোগ পেশাজীবীর ভূমিকা কীভাবে বদলাবে? উত্তরটি প্রযুক্তিতে নয়, মানুষের মধ্যে। আরও স্পষ্টভাবে বললে উত্তরটি প্রযুক্তি বনাম মানুষ এমন দ্বন্দ্বে নয়। বরং প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে মানুষের সঙ্গে আরও অর্থবহ সম্পর্ক তৈরি করার সক্ষমতায়।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তথ্য বিশ্লেষণ, কনটেন্ট তৈরি কিংবা অনুবাদে গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক হতে পারে। কিন্তু মানুষের অভিজ্ঞতা, স্থানীয় সংস্কৃতি, সামাজিক আস্থা এবং সম্পর্কের সূক্ষ্ম বাস্তবতা এখনো মানবিক যোগাযোগের ওপরই নির্ভরশীল।
কারণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কখনো বুঝবে না কেন চরাঞ্চলের একজন কৃষক নতুন প্রযুক্তি গ্রহণে দ্বিধায় থাকেন। কেন রোহিঙ্গা শিবিরে একটা গুজব কয়েক ঘণ্টার মধ্যে হাজার মানুষের আচরণ বদলে দিতে পারে। কিংবা কেন জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি সম্পর্কে জানার পরও একজন উপকূলীয় কৃষক একই ফসল চাষ করতে বাধ্য হন।
এসবের উত্তর ডেটায় নয়; মানুষের অভিজ্ঞতা, সংস্কৃতি, সম্পর্ক ও আস্থায়। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় আমরা দেখেছি, উন্নয়ন প্রকল্পের সফলতা কেবল অর্থায়নের ওপর নির্ভর করে না। নির্ভর করে, মানুষ প্রকল্পটি নিজের মনে করছে কি না।
এই জায়গায় যোগাযোগ আর ‘সহায়ক বিভাগ’ নয়; এটি এখন প্রকল্প বাস্তবায়নের অন্যতম চালিকাশক্তি। আরও বড় চ্যালেঞ্জ সামনে এসেছে, ভুল তথ্য এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিভ্রান্তিকর তথ্য। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই যুগে একটি ভুল তথ্য মুহূর্তেই মানুষের আচরণ, জনস্বাস্থ্য, কৃষি কিংবা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই ভবিষ্যতের উন্নয়ন যোগাযোগ কেবল গল্প বলার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; তথ্যের সত্যতা যাচাই, জনআস্থা রক্ষা এবং বিভ্রান্তি প্রতিরোধেও নেতৃত্ব দিতে হবে যোগাযোগ পেশাজীবীদের।
আমি মনে করি, আগামী দিনের উন্নয়ন যোগাযোগ পেশাজীবীর কাজ হবে শুধু তথ্য পৌঁছে দেওয়া নয়, মানুষের সঙ্গে আস্থার সম্পর্ক গড়ে তোলা। শুধু কনটেন্ট নয়, অর্থবহ সংলাপ। প্রচারণা নয়, সক্রিয় অংশগ্রহণ। বার্তা নয়, পারস্পরিক বিশ্বাস।
আমি আরও মনে করি, আগামী দিনের উন্নয়ন যোগাযোগের মূল শক্তি হবে মানুষকে শোনার সক্ষমতা। তাই প্রয়োজন কম একমুখী বার্তা, বেশি দ্বিমুখী সংলাপ। কম আনুষ্ঠানিক প্রচারণা, বেশি জনসম্পৃক্ততা। আর সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন আস্থা।
কারণ আগামী দিনের উন্নয়ন যোগাযোগের সাফল্য নির্ভর করবে কত বেশি কনটেন্ট তৈরি হলো, তার ওপর নয়; বরং কত বেশি আস্থা, সংলাপ ও অংশগ্রহণ সৃষ্টি করা গেল, তার ওপর।
বাংলাদেশে টিকাদান কর্মসূচি, পরিবার পরিকল্পনা, পুষ্টি কিংবা কৃষি সম্প্রসারণ এসব ক্ষেত্রের সাফল্যের পেছনে কেবল প্রযুক্তি বা অবকাঠামো নয়, মানুষের সঙ্গে ধারাবাহিক যোগাযোগ, আস্থা তৈরি এবং আচরণগত পরিবর্তনভিত্তিক উদ্যোগের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
বাংলাদেশ এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছে, যখন খাদ্যব্যবস্থা, জলবায়ু পরিবর্তন, কর্মসংস্থান, নগরায়ণ এবং ডিজিটাল রূপান্তর, সবকিছু একই সঙ্গে পরিবর্তিত হচ্ছে। এই পরিবর্তনের মধ্যে যোগাযোগের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হবে মানুষ, নীতি এবং বাস্তবতার মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করা।
আমাদের যোগাযোগচর্চা এখনো অনেক ক্ষেত্রেই সংবাদ লেখা, প্রেস রিলিজ, ইভেন্ট ব্যবস্থাপনা কিংবা গণমাধ্যম সম্পর্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। অথচ আগামী দিনের উন্নয়ন যোগাযোগ পেশাজীবীকে একই সঙ্গে আচরণগত পরিবর্তন, নীতি-সংলাপ, তথ্য বিশ্লেষণ, ডিজিটাল প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কমিউনিটি এনগেজমেন্ট এবং সংকটকালীন যোগাযোগ সম্পর্কে সমান দক্ষ হতে হবে।
অন্যভাবে বললে, ভবিষ্যতের কমিউনিকেশন ম্যানেজার শুধু গল্পকার হবেন না, সংলাপের সঞ্চালক এবং প্রমাণভিত্তিক তথ্যের অভিভাবক ও আস্থার স্থপতি হবেন।
কারণ উন্নয়নের ইতিহাসে শেষ পর্যন্ত মানুষ কোনো প্রকল্পের নাম মনে রাখে না। মনে রাখে কাদের ওপর তারা বিশ্বাস করতে পেরেছিল।
আব্দুল্লাহ সেরু : উন্নয়ন যোগাযোগকর্মী
