বাংলাদেশের দ্রুত নগরায়ণ, শিল্পায়ন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধারাবাহিক অগ্রযাত্রা এদেশের পরিবেশগত ভারসাম্যে নানাবিধ চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। এসব চ্যালেঞ্জের মধ্যে শব্দদূষণ একটি অত্যন্ত ক্ষতিকর সমস্যা, যা প্রতিনিয়ত নগর ও গ্রামীণ উভয় অঞ্চলের মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত করেই চলেছে।
সাধারণত আমরা পরিবেশ দূষণ বলতে বায়ু, পানি বা মাটির দূষণ বুঝি, কিন্তু শব্দদূষণকে অনেকেই এখনো ততটা গুরুত্ব দিয়ে দেখে না। অথচ শব্দদূষণ একটি ‘নীরব ঘাতক’ হিসেবে পরিচিত, কারণ এর ক্ষতিকর প্রভাব চোখে দেখা যায় না, তবে দীর্ঘমেয়াদে এটি মানবস্বাস্থ্য, মানসিক স্থিতিশীলতা এবং সামাজিক জীবনযাত্রার ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-এর তথ্যমতে, মানুষের জন্য সহনীয় শব্দমাত্রা ৬৫ ডেসিবেল। এর থেকে বেশি মাত্রার শব্দের মাঝে থাকলে কানের ক্ষতি করতে পারে এবং মানসিক চাপ সৃষ্টি করে। অথচ বাংলাদেশে, বিশেষ করে ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহীসহ প্রধান শহরগুলোতে শব্দমাত্রা ৮৫ থেকে ১২০ ডেসিবেল পর্যন্ত পৌঁছে যায়, যা স্বাস্থ্য ঝুঁকির জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক।
পরিবেশ অধিদপ্তর কর্তৃক নির্ধারিত মানমাত্রা হলো, আবাসিক এলাকায় দিনে ৫৫ ডেসিবেল এবং রাতে ৪৫ ডেসিবেল, বাণিজ্যিক এলাকায় দিনে ৭০ ডেসিবেল, রাতে ৬০ ডেসিবেল এবং সংবেদনশীল এলাকায় দিনে ৫০ ডেসিবেল ও রাতে ৪০ ডেসিবেল সীমা, কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, এই মানদণ্ডগুলো প্রায়শই মানা হয় না।
বাংলাদেশে শব্দদূষণের উৎস নানাবিধ। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় উৎস হলো যানবাহন ও হর্নের অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার। নগর জীবনে যানজট একটি নিয়মিত ঘটনা এবং যানজটের সময় বাস, ট্রাক, মিনিবাস, মোটরসাইকেল ইত্যাদি যানবাহনের চালকেরা অপ্রয়োজনীয়ভাবে হর্ন বাজাতে থাকে। এটি শুধু শ্রবণশক্তির ক্ষতি করে না, পাশাপাশি মানসিক বিরক্তি এবং অস্থিরতা সৃষ্টি করে।
অনেক চালক অত্যধিক শব্দযুক্ত প্রেশার হর্ন ব্যবহার করেন, যা আইনত নিষিদ্ধ হলেও প্রায়শই ব্যবহৃত হয়। তাছাড়া পুরোনো ও ত্রুটিপূর্ণ যানবাহনের ইঞ্জিনের শব্দ, ব্রেকের শব্দ ইত্যাদিও শব্দ মাত্রা বাড়িয়ে দেয়।
দ্বিতীয়ত, নির্মাণকাজ শব্দদূষণের অন্যতম প্রধান কারণ। শহরের উন্নয়নমূলক প্রকল্প, যেমন উঁচু ভবন নির্মাণ, রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি, ড্রিলিং, সেতু ও ফ্লাইওভার নির্মাণ ইত্যাদি প্রকল্পের ভারী যন্ত্রপাতির আওয়াজ আশেপাশের বাসিন্দাদের শান্তি নষ্ট করে। অনেক সময় এই কাজ রাতের বেলাতেও চালানো হয়, যার ফলে মানুষের ঘুম ও বিশ্রাম ব্যাহত হয়। উন্নয়নের জন্য এসব কাজ জরুরি হলেও শব্দ নিয়ন্ত্রণে পর্যাপ্ত উদ্যোগ না থাকায় সমস্যাটি প্রকট আকার ধারণ করে।
তৃতীয়ত, সামাজিক অনুষ্ঠান ও ধর্মীয় কার্যক্রমে লাউডস্পিকারের অতিরিক্ত ব্যবহারও একটি গুরুতর সমস্যা। বিয়ে, রাজনৈতিক সমাবেশ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ঈদ, পূজা, ওয়াজ মাহফিল বা অন্যান্য ধর্মীয় অনুষঙ্গের সময় লাউডস্পিকার ব্যবহার করা হয়, যা অনেক ক্ষেত্রে শব্দের মানদণ্ডের বাইরে চলে যায়। গ্রামের এলাকাতেও মাইকিংয়ের মাধ্যমে প্রচারণা চালানো হয়, যা স্থানীয় বাসিন্দাদের বিরক্তির কারণ হয়। বিশেষ করে রাতের বেলায় বা পরীক্ষা চলাকালীন সময়ে এই ধরনের শব্দ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে বিঘ্নিত করে।
চতুর্থত, শিল্পকারখানা, ছোট ওয়ার্কশপ, গ্যারেজ এবং লোহার কারখানার শব্দও একটি বড় সমস্যা। এসব স্থানে ব্যবহৃত ভারী মেশিনের শব্দ আশেপাশের এলাকায় শব্দমাত্রা অনেক বাড়িয়ে দেয়। বিমানবন্দর ও রেললাইন সংলগ্ন এলাকায় বসবাসকারীদের জন্য বিমানের উড্ডয়ন ও ট্রেনের শব্দ অতিরিক্ত বিরক্তির কারণ।
এই শব্দদূষণের ফলে মানুষের স্বাস্থ্যগত বহুবিধ নেতিবাচক প্রভাব দেখা দেয়।
প্রথমত, শ্রবণশক্তির হ্রাস ঘটে। দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চমাত্রার শব্দের মধ্যে অবস্থান করলে কানের শ্রবণক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা স্থায়ী বধিরতার কারণ হতে পারে।
দ্বিতীয়ত, মানসিক স্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অবিরাম শব্দ মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রকে উত্তেজিত করে, যার ফলে উদ্বেগ, বিরক্তি, ক্লান্তি এবং মানসিক চাপ বৃদ্ধি পায়।
তৃতীয়ত, শব্দদূষণ হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়। এক গবেষণায় দেখা গেছে, শব্দদূষণ হৃদস্পন্দন বাড়ায় এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে বাধা সৃষ্টি করে।
চতুর্থত, শব্দদূষণ ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায়। বিশেষ করে রাতে লাউডস্পিকার বা যানবাহনের শব্দ মানুষের ঘুমকে বিঘ্নিত করে, যার ফলে কর্মক্ষমতা হ্রাস পায় এবং দৈনন্দিন জীবনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। শিশুদের ক্ষেত্রে মনোযোগের ঘাটতি, শিক্ষার মান কমে যাওয়া এবং বয়স্কদের মানসিক অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।
আরও পড়ুন
বাংলাদেশে পরিচালিত বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে যে, ঢাকার গুলিস্তান, ফার্মগেট, মিরপুর, উত্তরা, গাবতলী, নিউ মার্কেটসহ প্রধান সড়কগুলোয় গড় শব্দমাত্রা ৯০ থেকে ১১৫ ডেসিবেল পর্যন্ত থাকে। চট্টগ্রাম, খুলনা, সিলেটের বাজার এলাকা ও প্রধান সড়কগুলোতেও শব্দমাত্রা ৮০ থেকে ১০০ ডেসিবেলের মধ্যে থাকে। আদালত, হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি সংবেদনশীল এলাকায়ও শব্দ নিয়ন্ত্রণ কার্যকরভাবে হয় না।
২০১৭ সালে বিশ্বের সবচেয়ে শব্দদূষিত শহরের তালিকায় ঢাকার অবস্থান শীর্ষে ছিল, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্র (ক্যাপস) এর (এপ্রিল ২০২১–মার্চ ২০২২) সমীক্ষা অনুযায়ী, ঢাকা শহরের ‘সাইলেন্ট জোনে’ শব্দ অনুমোদিত সীমা অতিক্রম করেছে ৯৬.৭ শতাংশ সময়, আবাসিক এলাকায় ৯১.২ শতাংশ, মিশ্র এলাকায় ৮৩.২ শতাংশ, বাণিজ্যিক এলাকায় ৬১ শতাংশ এবং শিল্প এলাকায় ১৮.২ শতাংশ সময়।
মোট পর্যবেক্ষিত স্থানের ৮২ শতাংশ সময় শব্দমাত্রা ধারাবাহিকভাবে ৬০ ডেসিবেল ছাড়িয়ে গিয়েছিল। এছাড়া, ক্যাপস-এর অন্য একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে, ধানমন্ডির ১৭টি হাসপাতালের সামনে গড় শব্দমাত্রা ছিল ৮১.৭ ডেসিবেল, যেখানে ‘সাইলেন্ট’ জোনের জন্য নির্ধারিত সর্বোচ্চ ছিল ৫০ ডেসিবেল।
ঢাকা বিমানবন্দরের আশেপাশে ‘সাইলেন্ট জোন’ ঘোষণা করেও শব্দমাত্রা প্রায় ০.৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছিল। শহরের প্রধান মোড় সংযোগস্থলগুলোতেও শব্দ ছিল অনুমোদিত সীমার ১.৩ থেকে ২ গুণ বেশি মাত্রার শব্দ পরিলক্ষিত হয়েছে নিউ মার্কেট মোড়, নয়াপল্টন মোড়, প্রেস ক্লাব মোড়, মোহাম্মদপুর বাস স্ট্যান্ড মোড়, শিয়া মসজিদ মোড় ও মাসকট প্লাজা মোড়গুলোতে।
২০১৭ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত সাত বছরে নববর্ষ উদযাপনের কারণে ৩১ ডিসেম্বর রাত ১১টা থেকে ১টা (১ জানুয়ারি) পর্যন্ত গড়ে ৯০ শতাংশ সময় শব্দের মাত্রা ৭০ ডেসিবল অতিক্রম করেছে, যা মানবস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।
এই সমস্যার সমাধানে সরকার কিছু আইনি উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। ২০০৬ সালে প্রণীত Noise Pollution (Control) Rules এবং ১৯৯৫ সালের পরিবেশ সংরক্ষণ আইন শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে আইনি কাঠামো তৈরি করেছে। এসব আইনে আবাসিক, শিল্প, বাণিজ্যিক এবং মিশ্র এলাকার জন্য ভিন্ন শব্দমাত্রার মান নির্ধারণ করা হয়েছে। মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে মাঝে মাঝে অভিযান পরিচালিত হয় এবং জরিমানা করা হয়। তবে আইন বাস্তবায়নে রয়েছে নানা প্রতিবন্ধকতা, যেমন জনবল ঘাটতি, পর্যাপ্ত সরঞ্জামের অভাব এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব।
শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে কিছু কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি।
প্রথমত, আইনের সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। সংবেদনশীল এলাকায় (যেমন হাসপাতাল, আদালত, স্কুল) বিশেষ নজরদারি চালানো উচিত এবং সেখানে ‘সাইলেন্স জোন’ ঘোষণা করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, যানবাহনের মান উন্নয়ন করা দরকার। পুরোনো ও ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন অপসারণ, হর্নের মান নির্ধারণ এবং গণপরিবহন ব্যবস্থা উন্নত করতে হবে।
তৃতীয়ত, জনসচেতনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে শব্দদূষণের ক্ষতিকর দিকগুলো প্রচার করতে হবে। ধর্মীয় নেতা, জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক এবং সাংস্কৃতিক কর্মীদের সম্পৃক্ত করা যেতে পারে।
চতুর্থত, প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে শব্দ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। সাইলেন্স জোন চিহ্নিত করে সেখানে শব্দমাত্রা মনিটর করা, পরিমাপক যন্ত্র বসানো এবং তথ্য প্রকাশ করা যেতে পারে।
সর্বশেষ, ব্যক্তিগত পর্যায়ে উদ্যোগ জরুরি। অপ্রয়োজনীয় হর্ন বাজানো থেকে বিরত থাকা, সামাজিক অনুষ্ঠান বা ধর্মীয় কর্মকাণ্ডে লাউডস্পিকারের ব্যবহার সীমিত করা এবং শব্দদূষণ সম্পর্কিত অভিযোগ জানানোর সংস্কৃতি তৈরি করতে হবে।
বাংলাদেশে শব্দদূষণ এখন অত্যন্ত গুরুতর পরিবেশগত এবং জনস্বাস্থ্য সমস্যায় রূপ নিয়েছে। নগরায়ণ, যানবাহনের বৃদ্ধি, শিল্প ও নির্মাণ কার্যক্রমের প্রসার এই সমস্যাকে বহুগুণে বাড়িয়ে তুলছে। শব্দদূষণের কারণে শুধু মানুষের মানসিক চাপ ও শ্রবণশক্তি হ্রাসই নয়, হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ঘুমের ব্যাঘাত এবং শিশুদের মেধা ও শেখার ক্ষমতার ওপরও বিরূপ প্রভাব পড়ছে।
এটি শুধু একটি পরিবেশগত সমস্যা নয়, বরং একটি সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং নীতি নির্ধারণ সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে আইন আছে কিন্তু প্রয়োগ নেই; ধারণা আছে কিন্তু সচেতনতা নেই। তাই সরকার, স্থানীয় প্রশাসন, পরিবেশবাদী সংগঠন, গণমাধ্যম এবং সাধারণ জনগণের সমন্বিত প্রচেষ্টা ছাড়া এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। এখনই যদি কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া যায়, তবে শব্দদূষণ কমিয়ে একটি নির্মল, স্বাস্থ্যকর এবং বাসযোগ্য পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব হবে।
অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার : ডিন, বিজ্ঞান অনুষদ; অধ্যাপক, পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগ, স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ; যুগ্ম সম্পাদক, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) এবং চেয়ারম্যান, বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্র (ক্যাপস)
