বিজ্ঞাপন

বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস

জনসংখ্যাকে জনশক্তিতে রূপান্তরই হোক বড় অঙ্গীকার

জনসংখ্যাকে জনশক্তিতে রূপান্তরই হোক বড় অঙ্গীকার

প্রতি বছর ১১ জুলাই বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস আমাদের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপন করে, জনসংখ্যা কি উন্নয়নের পথে চাপ, নাকি এটি হতে পারে একটি দেশের সবচেয়ে বড় শক্তি? কয়েক দশক আগেও এই প্রশ্নের একমাত্র সমাধান হিসেবে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণকেই সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হতো। কিন্তু বৈশ্বিক অর্থনীতির পরিবর্তিত বাস্তবতা আজ স্পষ্ট করে দিয়েছে, একটি দেশের উন্নয়ন নির্ভর করে জনসংখ্যার আকারের ওপর নয়; বরং সেই জনগোষ্ঠীর দক্ষতা, স্বাস্থ্য, উদ্ভাবনী ক্ষমতা ও উৎপাদনশীলতার ওপর।

যে রাষ্ট্র তার জনসংখ্যাকে বিনিয়োগ হিসাবে দেখে, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও দক্ষতা উন্নয়নে ধারাবাহিকভাবে বিনিয়োগ করে, তারাই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির শীর্ষে পৌঁছায়। বিপরীতে যে রাষ্ট্র জনসংখ্যাকে কেবল ভোক্তা হিসেবে বিবেচনা করে, তার জন্য জনসংখ্যাই একসময় অর্থনৈতিক ও সামাজিক চাপে পরিণত হয়।

জনসংখ্যাকে বোঝা নয় বরং জনশক্তিতে রূপান্তরিত করার এক ঐতিহাসিক সুযোগ সৃষ্টি হবে বাংলাদেশের সামনে। দেশের জনসংখ্যার একটি বড় অংশ বয়সে কর্মক্ষম রয়েছে। অর্থনীতির ভাষায় এটি ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ বা জনমিতিক সুবিধা বলা হয়।

এই সুবিধা স্থায়ী হওয়ার পূর্বশর্ত হলো তরুণ জনগোষ্ঠীকে আরও দক্ষ, সুস্থ ও উৎপাদনশীল মানবসম্পদে রূপান্তর করা। একে সঠিক বাস্তবায়ন সম্ভব হলে আগামী কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশ উচ্চ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধারা বজায় রাখতে সক্ষম হবে। কিন্তু এই সুযোগ কাজে লাগাতে ব্যর্থ হলে একই জনগোষ্ঠী ভবিষ্যতে রাষ্ট্রের ওপর বোঝায় পরিণত হবে এবং সামগ্রিক উন্নয়নের গতি মন্থর হয়ে পড়বে।

জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সি.ডি.পি.)’র তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশ ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর তারিখের মধ্যে জাতিসংঘের স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি)’র তালিকা থেকে উত্তীর্ণ হয়ে উন্নয়নশীল দেশে রূপান্তরিত হবে। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য অবকাঠামো উন্নয়ন যেমন অপরিহার্য, তেমনি তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ একটি দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা।

কারণ সেতু, মহাসড়ক, সমুদ্রবন্দর কিংবা অর্থনৈতিক অঞ্চল নিজেরা কোনো মূল্য সৃষ্টি করে না; এগুলো মূল্য সৃষ্টি করে তখনই, যখন দক্ষ জনগণ এগুলো উৎপাদন, উদ্ভাবন ও কর্মসংস্থানের মাধ্যমে কাজে লাগাতে পারে। ফলে উন্নয়নের পরবর্তী ধাপে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ হওয়া উচিত জনগণের ওপর।

মানবসম্পদ উন্নয়নের প্রথম ভিত্তি শিক্ষা। তবে বর্তমান সময়ে শিক্ষা বলতে কেবল ডিগ্রি বা সনদ অর্জনকে বোঝালে চলবে না। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন, রোবটিক্স, ডিজিটাল প্রযুক্তি এবং চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে শ্রমবাজারের চাহিদা দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকেও সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা সম্প্রসারণ, গবেষণা ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, শিল্পখাতের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ পাঠ্যক্রম এবং প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতা অর্জনের সুযোগ সৃষ্টি এখন সময়ের দাবি।

অন্যথায় একদিকে শিক্ষিত বেকারত্ব বাড়বে, অন্যদিকে দক্ষ জনবলের অভাবে শিল্প ও উৎপাদন খাত পিছিয়ে পড়বে। তবে শিক্ষা ও দক্ষতার পাশাপাশি জনশক্তি গঠনের অন্যতম প্রধান পূর্বশর্ত হলো সুস্বাস্থ্য। একজন অসুস্থ, অপুষ্ট বা দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি কখনোই তার পূর্ণ কর্মক্ষমতা অর্জন করতে পারেন না। তাই স্বাস্থ্যকে কেবল চিকিৎসার সমার্থক হিসেবে দেখার প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সংজ্ঞা অনুযায়ী, স্বাস্থ্য কেবল রোগের অনুপস্থিতি নয়; এটি শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক সুস্থতার একটি পূর্ণাঙ্গ অবস্থা। অর্থাৎ স্বাস্থ্যসেবা মানেই হাসপাতাল নির্মাণ বা ওষুধ সরবরাহ নয়; বরং এমন একটি সামাজিক ও নীতিগত পরিবেশ নিশ্চিত করা, যেখানে মানুষ অসুস্থ হওয়ার আগেই সুস্থ থাকতে পারে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোয়, বাংলাদেশ হৃদরোগ, ডায়াবেটিস এবং ক্যান্সারের মতো অ-সংক্রামক রোগের দ্রুত বৃদ্ধি লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যা স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করছে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশে মোট মৃত্যুর ৬৭ শতাংশের কারণ অসংক্রামক রোগ এবং ৩০ থেকে ৭০ বছর বয়সের মধ্যে প্রায় প্রতি পাঁচজনের একজন এই অসংক্রামক রোগের কারণে অকাল মৃত্যুর ঝুঁকিতে রয়েছে।

দেশের প্রায় ১২.৮৮ মিলিয়ন মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত, যা মোট জনসংখ্যার ৮ শতাংশ এবং দেশের মোট মৃত্যুর ৩ শতাংশের জন্যও দায়ী এই রোগ। শিশুদের মধ্যে অপুষ্টি একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।

ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রতি তিনজন শিশুর মধ্যে দুইজন শিশুই খাদ্য দারিদ্র্যের শিকার। এছাড়া বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভের তথ্য অনুযায়ী ৫ বছরের নিচে প্রায় ২৫ শতাংশ শিশুর দীর্ঘমেয়াদি অপুষ্টির কারণে শারীরিক বৃদ্ধি কমে গেছে।

বিশ্ব ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের জনগণের ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যব্যয়ের শতকরা হার অধিকাংশ দেশের তুলনায় অনেক বেশি। এই সীমাবদ্ধতা চিকিৎসা-কেন্দ্রিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করছে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশে চিকিৎসা ব্যয়ের প্রায় ৭৪ শতাংশই বহন করতে হয় রোগীকে যা বিশ্বের মধ্যে সর্বোচ্চ। রোগভেদে এই ব্যয়ের হার আরও বেশি হয়।

মানবসম্পদ উন্নয়ন কৌশলকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে চলে আসে-তা হলো নারীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ এবং ক্ষমতায়ন। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক নারী। কিন্তু এই বিপুল জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ এখনো তাদের পূর্ণ অর্থনৈতিক সক্ষমতা নিয়ে শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ করতে পারছেন না।

বর্তমানে বাংলাদেশে মাথাপিছু স্বাস্থ্য ব্যয় ৫ হাজার টাকারও অধিক যা এশিয়ার মধ্যে অন্যতম। ২০১০ সাল থেকে এখন পর্যন্ত স্বাস্থ্যখাতে বাংলাদেশ সরকারের বরাদ্দ প্রায় ৭ গুণ বৃদ্ধি পেলেও রোগীর ব্যক্তিগত ব্যয় তো কমেইনি বরং সংশ্লিষ্ট সব ক্ষেত্রে এই খরচ অনেকাংশেই বেড়েছে। সুতরাং বিদ্যমান চিকিৎসাকেন্দ্রিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় বরাদ্দ বাড়িয়ে রোগীর খরচ যে কমানো যাবে না তাও একাধিক গবেষণায় প্রমাণিত।

বিশেষ করে বিগত এক দশকে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ প্রায় চার গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং একই সময়ে মোট জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের অংশও মোটামুটি ৫ শতাংশের আশপাশে অবস্থান করেছে। কিন্তু এই ক্রমবর্ধমান বরাদ্দ সত্ত্বেও ব্যক্তিগত চিকিৎসা ব্যয়, অসংক্রামক রোগের বিস্তার এবং স্বাস্থ্যসেবার ওপর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেনি।

অর্থাৎ সমস্যা কেবল বরাদ্দের পরিমাণে নয় বরং সেই বরাদ্দের ব্যবহার ও অগ্রাধিকারে। যদি ক্রমাগত বাড়তে থাকা স্বাস্থ্য বাজেটের একটি অংশ রোগ প্রতিরোধ, স্বাস্থ্য উন্নয়ন এবং স্বাস্থ্যসচেতনতা বৃদ্ধিতে বিনিয়োগ করা যায়, তাহলে একই অর্থ দিয়ে আরও টেকসই স্বাস্থ্যগত ফলাফল অর্জন করা সম্ভব হবে।

এখানেই স্বাস্থ্য বাজেট পুনর্বিন্যাসের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিদ্যমান বাজেটের একটি অংশ যদি প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যব্যবস্থা, পুষ্টি, তামাক নিয়ন্ত্রণ, অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ, স্বাস্থ্য শিক্ষা, শারীরিক কার্যক্রম এবং মানসিক স্বাস্থ্য উন্নয়নে বিনিয়োগ করা হয়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে চিকিৎসা ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে।

একই সঙ্গে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর উৎপাদনশীলতা বাড়বে, কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়া কমবে এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যব্যবস্থায় বিনিয়োগের অর্থনৈতিক রিটার্ন চিকিৎসাভিত্তিক ব্যয়ের তুলনায় বহুগুণ বেশি।

১০ বছরে গড় স্বাস্থ্য বাজেট বৃদ্ধির হার ১১.৩৪২২ শতাংশ। এই বৃদ্ধির ধারাটি বিবেচনায় নিয়ে অর্থবছর ২০২৬-২৭ থেকে ২০৩৫-৩৬ পর্যন্ত সম্ভাব্য স্বাস্থ্য বাজেটের মাত্র ৫ শতাংশ রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা উন্নয়নে বিনিয়োগ করলে সম্ভাব্য ব্যয় হ্রাসের যে ভবিষ্যৎ চিত্র দেখা যাচ্ছে তা দারুণ আশাব্যঞ্জক।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং বিশ্ব ব্যাংকের তথ্য বলছে, উল্লেখিত বিষয়গুলো নিশ্চিতের লক্ষ্যে বিনিয়োগ করা প্রতি ১ ডলার সার্বিকভাবে ১৬ ডলার ব্যয় সাশ্রয় করতে পারে যা সরাসরি স্বাস্থ্য ব্যয় কমাতে সাহায্য করে। এমতাবস্থায় মোট স্বাস্থ্য বাজেটের মাত্র ৫ শতাংশ রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা উন্নয়নে বিনিয়োগ করলে সম্ভাব্য ব্যয় হ্রাসের যে ভবিষ্যৎ চিত্র দেখা যেতে পারে তা দারুণ আশাব্যঞ্জক যা পরোক্ষভাবে সরকারের রাজস্ব খাতে যুক্ত হওয়ারও সুযোগ তৈরি হয়।

আগামী ১০ বছর এই ধারা অব্যাহত রাখলে এই সম্ভাব্য বরাদ্দের ইতিবাচক চিত্রটি হবে নিম্নরূপ—

এই চিত্র প্রমাণ করে যে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা উন্নয়নে স্বাস্থ্য বাজেটের মাত্র ৫ শতাংশ বরাদ্দের ফলে মাত্র ১০ বছরে স্বাস্থ্য ব্যয় হ্রাসের পরিমাণ প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার কাছাকাছি পৌঁছে যাবে যা মোট স্বাস্থ্য বাজেটের প্রায় সমান। ফলে সরকারের ওপর এই খাতে বছর বছর বরাদ্দ বৃদ্ধির চাপ কমে যাবে।

এই মানবসম্পদ উন্নয়ন কৌশলকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে চলে আসে-তা হলো নারীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ এবং ক্ষমতায়ন। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক নারী। কিন্তু এই বিপুল জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ এখনো তাদের পূর্ণ অর্থনৈতিক সক্ষমতা নিয়ে শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ করতে পারছেন না।

তিন দশকে তৈরি পোশাক শিল্প, ক্ষুদ্রঋণ, কৃষি, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং শিক্ষা খাতে নারীদের অবদান বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রাকে ত্বরান্বিত করেছে। এই অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, নারীদের জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি করা গেলে তারা কেবল নিজেদের জীবনমান উন্নত করেন না; পরিবার, সমাজ এবং জাতীয় অর্থনীতিরও অন্যতম চালিকাশক্তিতে পরিণত হন।

তাই নারী শ্রমশক্তির অংশগ্রহণ বাড়াতে নিরাপদ কর্মপরিবেশ, সমমজুরি, মাতৃত্বকালীন সুবিধা, কর্মক্ষেত্রে শিশুযত্ন কেন্দ্র, প্রযুক্তিভিত্তিক দক্ষতা উন্নয়ন এবং নারী উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ অর্থায়নের সুযোগ আরও সম্প্রসারণ করতে হবে।

উল্লেখ্য, প্রতি বছর লাখ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে কিন্তু তাদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ দক্ষতার ঘাটতি কিংবা উপযুক্ত কর্মসংস্থানের অভাবে হতাশার মুখোমুখি হচ্ছেন। এই বাস্তবতা শুধু ব্যক্তিগত নয়; এটি জাতীয় অর্থনৈতিক ক্ষতি। কারণ কর্মক্ষম একজন তরুণের বেকার থাকা মানে সম্ভাব্য উৎপাদন, সম্ভাব্য আয় এবং সম্ভাব্য কর-রাজস্ব সবকিছুরই অপচয়।

...জনসংখ্যা যদি শিক্ষিত, সুস্থ, দক্ষ, প্রযুক্তিসম্পন্ন, উদ্ভাবনী এবং কর্মক্ষম মানবসম্পদে রূপান্তর করা যায়, তাহলে উন্নত বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়ন শুধু সম্ভবই নয়, তা অনিবার্য। অতএব, সময় এসেছে উন্নয়নের অগ্রাধিকার পুনর্নির্ধারণের।

তাই কর্মসংস্থানকে কেবল চাকরি সৃষ্টির বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না; বরং উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান তৈরির বিষয় হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, কৃষিভিত্তিক শিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা, সবুজ জ্বালানি, পর্যটন, সৃজনশীল অর্থনীতি এবং ডিজিটাল উদ্যোক্তা তৈরির মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র সম্প্রসারণ করতে হবে।

একই সঙ্গে স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম শক্তিশালী করা, উদ্ভাবনী উদ্যোগে সহজ ঋণ ও কর-প্রণোদনা প্রদান এবং তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য ঝুঁকি বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি করা জরুরি।

বাংলাদেশের অর্থনীতির আরেকটি শক্তিশালী ভিত্তি রেমিট্যান্স। দীর্ঘদিন ধরেই প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাঠানো বৈদেশিক মুদ্রা দেশের অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কর্মী এখনো স্বল্পদক্ষ বা অদক্ষ হিসেবে বিদেশে যান যার প্রভাব পড়ে তাদের বেতন কাঠামোতেও।

বাংলাদেশ যদি আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন কারিগরি প্রশিক্ষণ, ভাষা শিক্ষা এবং দক্ষতা সনদায়নের ওপর জোর দেয়, তাহলে একই সংখ্যক কর্মী বিদেশে গিয়েও বহুগুণ বেশি আয় করতে পারবেন। এর ফলে শুধু রেমিট্যান্সই বাড়বে না; বৈশ্বিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশের অবস্থানও আরও শক্তিশালী হবে। অর্থাৎ বৈদেশিক কর্মসংস্থানকেও মানবসম্পদ উন্নয়ন নীতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখতে হবে।

জনসংখ্যাকে জনশক্তিতে রূপান্তর করতে হলে নীতিগত পর্যায়েও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। বর্তমানে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শ্রম, শিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক পরিকল্পনা অনেক ক্ষেত্রেই আলাদা আলাদা কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত হয়। অথচ মানবসম্পদ উন্নয়ন একটি সমন্বিত বিষয়। তাই শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দক্ষতা উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থানকে একই জাতীয় কৌশলের আওতায় আনতে হবে।

শিল্পখাতের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শিক্ষাক্রম নিয়মিত হালনাগাদ করা, জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন নীতির কার্যকর বাস্তবায়ন, গবেষণা ও উদ্ভাবনে সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, স্থানীয় সরকারকে মানবসম্পদ উন্নয়নে সম্পৃক্ত করা এবং দক্ষতা উন্নয়নে বেসরকারি খাতকে আরও বেশি অংশীদার করার বিকল্প নেই।

বিশ্ব জনসংখ্যা দিবসে তাই আমাদের অঙ্গীকার হওয়া উচিত শুধু জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার নিয়ে আলোচনা নয়; বরং কীভাবে এই বিপুল জনগোষ্ঠীকে জাতীয় উন্নয়নের সবচেয়ে বড় শক্তিতে পরিণত করা যায়, সেই প্রশ্নকে জাতীয় নীতির কেন্দ্রে নিয়ে আসা। কারণ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ গ্যাস, কয়লা কিংবা কোনো প্রাকৃতিক খনিজ নয়; বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার জনসংখ্যা।

এই জনসংখ্যা যদি শিক্ষিত, সুস্থ, দক্ষ, প্রযুক্তিসম্পন্ন, উদ্ভাবনী এবং কর্মক্ষম মানবসম্পদে রূপান্তর করা যায়, তাহলে উন্নত বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়ন শুধু সম্ভবই নয়, তা অনিবার্য। অতএব, সময় এসেছে উন্নয়নের অগ্রাধিকার পুনর্নির্ধারণের।

অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি মানুষ গড়ার বিনিয়োগকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। স্বাস্থ্য বাজেটকে ধীরে ধীরে চিকিৎসাকেন্দ্রিকতা থেকে স্বাস্থ্য উন্নয়নমুখী করতে হবে; শিক্ষাকে সনদ নির্ভরতা থেকে দক্ষতানির্ভর করতে হবে; কর্মসংস্থানকে চাকরিনির্ভর ধারণা থেকে উৎপাদনশীল কর্মসৃষ্টির ধারণায় উন্নীত করতে হবে; আর নারীর ক্ষমতায়ন ও যুবসমাজের উদ্ভাবনী শক্তিকে জাতীয় উন্নয়নের মূলধারায় নিয়ে আসতে হবে।

তাহলেই জনসংখ্যা আর পরিসংখ্যানের একটি সংখ্যা হয়ে থাকবে না; সেটিই হবে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক শক্তি, সবচেয়ে বড় প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা এবং উন্নত, সমৃদ্ধ ও আত্মনির্ভর বাংলাদেশের সবচেয়ে দৃঢ় ভিত্তি।

মিঠুন বৈদ্য : উন্নয়নকর্মী ও গবেষক