বিজ্ঞাপন

অতিবৃষ্টি, পাহাড়ধস ও বন্যা : প্রতিবছরের ট্র্যাজেডি, সমাধান কোথায়?

অতিবৃষ্টি, পাহাড়ধস ও বন্যা : প্রতিবছরের ট্র্যাজেডি, সমাধান কোথায়?

অতিবৃষ্টি, ভূমিধস, জীবনহানি, পত্রিকায় শিরোনাম, সরকারের বিবৃতি, টেলিভিশনের খবর এসব কিছু বাংলাদেশে নতুন কোনো ঘটনা নয়। প্রায় প্রতি বছর একই চিত্র দেশবাসীর সামনে আসে এবং কিছুটা সহানুভূতি ও দুঃখবোধ প্রকাশ করার পর বিষয়টি চাপা পড়ে যায়।

কখনো হয়তোবা কিছু সহায়তা কিংবা সাহায্যের হাত বাড়িয়ে কর্মসূচি পালন করাও হয়। শোক পালন করা হয় অথবা আর্থিক সাহায্য দিয়ে ছবিসহ ফলাওভাবে প্রচার করা হয়।

যদি প্রশ্ন করা হয় এসবই কি সাময়িক নয়? উত্তরে পাল্টা প্রশ্ন আসে তা ছাড়া আর কি করার আছে? এসব কথা যদি লে-ম্যানদের থেকে আসত তবুও কিছুটা সান্ত্বনা দেওয়া যেত। যাতনাটা দ্বিগুণ হয় যখন দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গ এসব কথা ছুঁড়ে দেয়।

যাই হোক, অতিবৃষ্টি যেহেতু ভৌগোলিক কারণে বাংলাদেশে প্রতিবছরের চিত্র, তার সাথে যোগ হয় পাহাড় ধস এবং জীবনহানি। পাহাড় ধস আলোচনা করতেই আসে অপরিকল্পিতভাবে পাহাড় কাটা এবং জীবনহানির কথা বলতেই আসে পরিকল্পনাবিহীন ও অবৈধভাবে বসতি স্থাপন। এসব কথা আংশিক সত্য হলেও প্রকৃত চিত্র ভিন্নরূপ।

ভূ-তাত্ত্বিকভাবে পাহাড়গুলো অনেক পুরোনো দিনের এবং বর্ষার সময় পাহাড়ের মাটির স্তরে পানি প্রবেশ করে মাটিগুলো আরও দুর্বল করে ফেলে অর্থাৎ মাটির কাঠিন্যতা দুর্বল হয়ে পড়ে এবং সহজে ভেঙে পড়ার উপযোগী হয়।

এর সাথে পাহাড়ের পাদদেশের মাটি সরিয়ে ফেললে ভাঙন প্রক্রিয়া আরও সহজতর ও তরান্বিত হয়। এ অবস্থার অবসানের জন্য পাহাড়ের পাদদেশের মাটি সংরক্ষণ ও পাদদেশে গাইড ওয়াল/কংক্রিট স্থাপন করলে ভাঙন প্রক্রিয়া কিছুটা হলেও রোধ করা সম্ভব হবে।

তবে তার আগে যেটা দরকার সেটা হলো সংশ্লিষ্ট এবং দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের সদিচ্ছা ও নিরন্তর প্রচেষ্টা। এ বিষয়ে জনসচেতনতা এবং জনসম্পৃক্ততা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রমোশনাল এক্টিভিটিজ জরুরি। শুধু সরকারের ওপর দায় না চাপিয়ে প্রত্যেকের অবস্থান থেকে সম্ভাব্য সব পদক্ষেপ গ্রহণ করলে এই ঝুঁকি কমিয়ে আনা সম্ভব।

অন্যদিকে জীবনহানি রোধে পাহাড়ের ঢালে, চুড়ায় কিংবা পাদদেশের বসতি স্থাপনে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা আবশ্যক। পাহাড়ি অঞ্চলে ঝুঁকিপূর্ণ স্থান থেকে সরকারি উদ্যোগে বসবাসকারীদের অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার কর্মসূচি গ্রহণ করা জরুরি।

এক্ষেত্রে পাহাড় ইজারাদারদের চিহ্নিত করে সরকারি উদ্যোগে ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার। পাহাড়ি ঢালে বসবাসকারীদের সাথে আলাপ করে জানা গেছে, তাদের কেউ কেউ ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের থেকে আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে সেখানে বসতি স্থাপন এবং কৃষি কাজের অনুমতি পেয়েছেন। এসব মাসলম্যানদের চিহ্নিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ ও অবৈধ স্থাপনা সরিয়ে ফেললে জীবনহানি কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।

সৌন্দর্যের রানীখ্যাত পাহাড়ি জেলাগুলোর মাটিচাপা কর্মসূচি যেন একটা মরণ ফাঁদে পরিণত হয়েছে। একটু অসচেতন হলেই আটকে যাচ্ছে এই ফাঁদে শত শত জীবন। পঙ্গু হচ্ছে হাজারও মানুষ।

গৃহহীন ও অসহায় হয়ে পড়ছে শত শত পরিবার। সবকিছুকেই নিয়তির নির্মম পরিহাস বলে মেনে নিয়ে আবারও শুরু করছে পাহাড়ের ঢালে বসবাস, চলছে পাহাড় কাটা, গাছ কাটা কিংবা পাহাড়ে কৃষিকাজ।

শুধু বসবাস নয়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানও গড়ে তোলা হচ্ছে এসব ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায়। ফলে শিশুমৃত্যুর হারও বেড়ে যাচ্ছে।

এবারের পাহাড় ধসের সাথে যুক্ত হয়েছে বিপুল পরিমাণ পানির ঢল। অববাহিকা অঞ্চলে ভারী বৃষ্টিপাতের ফলে পানি প্রবাহ বেড়ে বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে এবং নতুন নতুন জায়গা প্লাবিত হচ্ছে। এছাড়াও পানির উচ্চতা ও স্রোতের তীব্রতা বৃদ্ধি পাওয়ায় একদিকে যেমন জনদুর্ভোগ বাড়ছে তেমনি জীবনহানিও ঘটছে।

ইউএনএইচসিআর-এর মতে ইতিমধ্যে ৯৫টির বেশি ভূমিধসের ঘটনা ঘটেছে এবং ভারী বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে দক্ষিণ পূর্ব অঞ্চলের আরও কিছু এলাকা ভূমিধ্বসের শিকার হতে পারে মর্মে আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে। এর ফলে আরও কিছু মানুষ গৃহহীন হতে পারে। ঘটতে পারে আরও জীবনহানি।

এ সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে জরুরি ভিত্তিরে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারীদের অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া এবং স্থানীয়ভাবে উদ্যোগ গ্রহণ করে বিষয়টির স্থায়ী সমাধান করা একান্তভাবে জরুরি।

ড. মো. সিরাজুল ইসলাম : অধ্যাপক, ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়