বিজ্ঞাপন

বারুদের দুনিয়ায় এক সজারুর ভাইরাল ভিডিও

বারুদের দুনিয়ায় এক সজারুর ভাইরাল ভিডিও

চারদিকে যখন বারুদ আর অস্ত্রের উল্লম্ফন, প্রাণ-প্রকৃতি তখন চুরমার। ঝলসানো বাস্তুতন্ত্র আর ফুটন্ত জলবায়ু। এর ভেতরেই এক সজারুর ভিডিও আমাদের সামনে বহু অমীমাংসিত প্রশ্ন হাজির করেছে। ন্যায়বিচার না পাওয়া বহু পরিবেশ জিজ্ঞাসা সামনে এনেছে।

সম্প্রতি এই সজারুর ভিডিও ভাইরাল হয়েছে সামাজিক মাধ্যমে। একটা বাচ্চা মেয়ে ধানক্ষেতের আইল দিয়ে কোলে বিড়াল বা গন্ধগোকুল নিয়ে হাঁটছে। মেয়েটির পেছন পেছন হাঁটছে এক সজারু। বলা ভালো দৌড়াচ্ছে। মেয়েটি থামলে সজারুটিও থামছে। ভিডিওটি বাংলাদেশের না শ্রীলঙ্কার এ নিয়ে একটা তর্ক শুরু হয়েছিল।

ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠান রিউমার স্ক্যানার জানায়, ২ জুন ২০২৬ শ্রীলঙ্কার নাগরিক প্রভাত সিলভা ভিডিওটি ফেসবুকে প্রকাশ করেন। সেখানে সিনহালা ভাষায় তিনি লিখেন, ছোট ভাই তার বোনের সাথে ধানক্ষেতে যাচ্ছে।

এই ভাইরাল ভিডিও আমাদের কী বার্তা দেয়? এটি শ্রীলঙ্কার না বাংলাদেশের এই প্রমাণ কী খুব জরুরি? এই ভিডিওর মাধ্যমে এক ছোট্ট মেয়ের সাথে বন্যপ্রাণীর সখ্যতা এবং বন্যপ্রাণীর প্রতি এক শিশুর দায়িত্বশীলতা আমাদের সামনে হাজির হয়। আমরা দেখতে পাই ক্ষতবিক্ষত বন আর বন্যপ্রাণীর লাশের স্তূপে এক ছোট সজারু আর গন্ধগোকুল বুক আগলে দাঁড়িয়ে আছে এক শিশু।

বড়দের পৃথিবীতে যুদ্ধ, বাণিজ্য, কার্বন নিঃসরণ আর পরিবেশ ধ্বংস। বড়রাই এই দুনিয়াকে লণ্ডভণ্ড করে ফেলছে। একের পর এক হাতি হত্যা হচ্ছে বাংলাদেশে। কারা করছে?

বনের হাতিকে নৃশংসভাবে বন্দি করে ক্রীতদাস বানানো হচ্ছে। একের পর এক খেলার মাঠ বা উদ্যান কারা লোপাট করছে? বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন থেকে শুরু করে দেশের টিকে থাকা রাতারগুল জলাবন কাউকে রেহাই দেয়নি কারা? কারা পাখি মেরে পাখির লাশের হোটেল খুলেছে?

এসব অন্যায় পরিবেশ ও বন্যপ্রাণী হত্যা শিশুরা করেনি। সব করেছে লোভী, মুনাফাখোর, লুটেরা ও অস্থির বড় মানুষেরা। ছোটদের দুনিয়ায় বড়রাই পরিবেশ ধ্বংসকারী এবং বন্যপ্রাণী হত্যাকারী। ভাইরাল ভিডিওটি বন্যপ্রাণীর প্রতি আমাদের দায় ও দায়িত্বশীলতার কথা স্মরণ করিয়ে দেয় এক শিশুর দুর্বিনীত দায়িত্ববোধের ভেতর দিয়ে।

ভাইরাল ভিডিওটি বন্যপ্রাণীর প্রতি আমাদের দায় ও দায়িত্বশীলতার কথা স্মরণ করিয়ে দেয় এক শিশুর দুর্বিনীত দায়িত্ববোধের ভেতর দিয়ে।

দেশজুড়ে আমরা দেখি মানুষ পিটিয়ে মেরেছে গন্ধগোকুল বা মেছোবিড়াল। বরেন্দ্র অঞ্চলে পিটিয়ে পিটিয়ে শঙ্খচূড় সাপের বংশ বিনাশ করা হয়েছে। দেশে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইন আছে। সেই আইনে বন্যপ্রাণী শিকার ও হত্যা দণ্ডনীয় অপরাধ। কিন্তু যখন একটা বিশাল বাঘাইড় বা শাপলাপাতা মাছ ধরা পড়ে, মানুষ বাজারে হুমড়ি খেয়ে পড়ে।

গণমাধ্যমও সেই নিষিদ্ধ মাছ কত টাকা দিয়ে বিক্রি হলো তা প্রচার করে। একটা সড়ক বা অবকাঠামো বানাতে গিয়ে দুম করে এক প্রবীণ বটগাছ হত্যা করা হয়। কিংবা ঝড়ের দিনে শামুকখোল পাখি মেরে রান্না হয় চলনবিলে। গ্যাস জরিপ বা খননের নামে পুড়িয়ে দেওয়া হয় লাউয়াছড়া বন।

দেশের প্রধান বন সংরক্ষকের বাসাভর্তি টাকা পাওয়া যায়। বন কর্মকর্তার বাড়িতে বাঘের বাচ্চা উদ্ধার হয়। এসব ঘটনা শিশুদের মনে কী রেখাপাত করে? নতুন প্রজন্ম এসব থেকে কী বার্তা পায়? অরণ্য, নদী, পাখি, বন্যপ্রাণী কিংবা পাহাড়ের প্রতি কীভাবে তারা সংবেদনশীল হবে? ভাইরাল ভিডিওটি এমন বহু অমীমাংসিত প্রশ্নকে আমাদের সামনে ছুঁড়ে দেয়। 

সজারু সনের কথা মনে আছে?

আমরা হয়তো সাম্প্রতিক ভাইরাল ভিডিওটি দেখে শ্রীলঙ্কা-বাংলাদেশ তর্কে মেতেছি। কিন্তু দেশে বন্যপ্রাণীর প্রতি দায় ও ভালোবাসার বহু দৃষ্টান্ত রয়েছে। করোনা মহামারির সময় বাংলাদেশের এক সজারু ছানার কথা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল।

খাগড়াছড়ির পানছড়ির লোগাং ইউনিয়নের মঙ্গল সাঁওতালপাড়ার বর্গাচাষি সমাই সাঁওতাল ও তার স্ত্রী জবা সাঁওতালের পরিবারে বড় হচ্ছিল এক সজারু ছানা। তাদের সন্তান বর্ষর সাথে সজারুটির খুব ভাব হয়েছিল। খড়ের বিছানা বানিয়ে দিলেও সজারুটি তাদের খাটের তলাতেই ঘুমাত। সজারুটির নাম তারা রেখেছিলেন ‘সন’।

একদিন কাজ থেকে ফেরার পথে পাহাড়ি ছড়ার খাঁদে সজারু ছানাটিকে পেয়ে তারা বাড়িতে এনে সেবা-শুশ্রূষা করে ভালো করেন। বর্ষ নিজে না খেয়ে সজারুটিকে চিপস খাওয়ায় আর সজারুটি সারাদিন তার পেছন পেছন হাঁটে। সন বেশি পছন্দ করেছিল পাহাড়ি বাঁশ কোড়ল, ভাত ও দুধ।

সজারু পাগলার কথা মনে আছে?

মানুষের সাথে সজারুর মিতালির আরেকটি ঘটনাও বাংলাদেশেই। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরের বছর ঘটনাটি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল। টাঙ্গাইলের ঘাটাইলের সন্ধানপুর ইউনিয়নের কুশারিয়া গ্রামের অটোরিকশা চালক লিটন মিয়ার বাড়িতে বড় হয়েছে এক সজারু। তিনিও এক রাতে ঘাটাইল-সাগরদীঘি সড়কে সজারু ছানাটি কুড়িয়ে পান এবং বাড়িতে এনে বড় করেন।

লিটন মিয়া সজারুটির নাম রেখেছিলেন ‘পাগলা’। নাম ধরে ডাকলেই গর্ত থেকে সজারুটি বের হয়ে আসে এবং খাবার খায়। কলা, আলু, ফুলকপি, বাঁধাকপি, পাউরুটি, ভাত, দুধ, বিস্কুট কিনে তাকে খাওয়ান পরিবারের সবাই।

শ্বেতা, বর্ষ কিংবা লিটন মিয়াদের টুটু, সন কিংবা পাগলা

সজারুর ভিডিওটি যখন ভাইরাল হয় তখন আমি ছিলাম মালয়েশিয়ার পেনাংয়ে। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ থেকে প্রতিনিধিরা এসেছিলেন এগ্রোইকোলজি বিষয়ক এক কর্মশালায়। শ্রীলঙ্কা থেকে আমাদের বন্ধু ‘লংকা অর্গানিক অ্যাগ্রিকাল মুভমেন্টের’ থিলাক কিরুস্বামী এবং ভিকালপানি নামের এক নারী সংগঠনের চাতুরিকা সেওয়া’র সাথে কর্মশালার ফাঁকে এই ভিডিওটি নিয়ে আলাপ হয়।

তারা জানান এটি শ্রীলঙ্কার। সিনহালা ভাষায় সজারুকে বলে ইট্টেওয়া এবং তামিল ভাষায় বলে মুল্লাম পান্দ্রি। গন্ধগোকুলকে সিনহালা ভাষায় বলে কালাওয়াদ্দা বা উগুডাওয়া এবং তামিল ভাষায় বলে মারান্নাই।

আমাদের চারপাশ জুড়ে যখন বন ও বন্যপ্রাণী লুটতরাজ ও খুনখারাবি হয়ে যাচ্ছে আমরা তখন স্বার্থপর নির্বোধের মতো লুকিয়ে আছি। অথচ এই বন ও বন্যপ্রাণী ছাড়া মানুষের সমাজ বাঁচবে না। এদের অবদান ছাড়া এই গ্রহ টিকবে না। এসব জেনেও আমরা সোচ্চার ও দায়িত্বশীল নই।

তখনো বিবিসি সিনহালার প্রতিবেদনটি আমার দেখা হয়নি। সেই প্রতিবেদন থেকে জানতে পারি বাচ্চা মেয়েটির নাম শ্বেতা। মায়ের নাম সুরাম্যা নিরোশামি এবং বাবার নাম প্রভাত ডি সিলভা। তারা শ্রীলঙ্কার পোলোনারুয়ার বাসিন্দা। তারা সজারুটির নাম রেখেছেন টুটু। শ্বেতার মা জানিয়েছেন, তাদের মেয়ে জীবজন্তুর ভাষা বুঝতে পারে। বর্ষর পরিবার জানিয়েছিল, তারা সজারুটি নিজের পরিবারের সদস্য মনে করেন। লিটন মিয়া জানান, মানুষ বেঈমানি করে কিন্তু বন্যপ্রাণী করে না।

যুদ্ধ, জলবায়ু ও পরিবেশ-বিধ্বস্ত এই দুনিয়ায় আমাদের শ্বেতা, বর্ষ আর লিটন মিয়াদের খুব দরকার। বন্যপ্রাণী আইনে বন্যপ্রাণী নিজেদের বাড়িতে পোষা বা রাখা আইনত নয়। কিন্তু এসব সজারু প্রতিটির জীবনেই খুব নির্মম ঘটনা ঘটেছিল। তারা কেউ এদের শিকার করেননি বা জোর করে বুনো পরিবেশ থেকে ছিনিয়ে আনেননি।

সজারু ছানাগুলো আহত, মুমূর্ষু ছিল। তাদের পরিবারের এই আহত প্রাণীর প্রতি মায়া ও দায়িত্ববোধ জেগেছিল। আর এটাই জরুরি। আমাদের চারপাশ জুড়ে যখন বন ও বন্যপ্রাণী লুটতরাজ ও খুনখারাবি হয়ে যাচ্ছে আমরা তখন স্বার্থপর  নির্বোধের মতো লুকিয়ে আছি। অথচ এই বন ও বন্যপ্রাণী ছাড়া মানুষের সমাজ বাঁচবে না। এদের অবদান ছাড়া এই গ্রহ টিকবে না। এসব জেনেও আমরা সোচ্চার ও দায়িত্বশীল নই।

আমরা বন্যপ্রাণীকে আমাদের পরিবারের টুটু, সন কিংবা পাগলা হিসেবে ভাবতে শিখিনি। আর তাই আমাদের কাছে প্রাণীদের বন্দিশালা চিড়িয়াখানা বা কাঁটাবনে প্রাণী বিক্রির বাজার বৈধ হয়ে যায়।

শ্বেতার ভাইরাল ভিডিওটির ভিডিও ভাইরাল হয়েছে, কিন্তু এর পরিবেশ-বার্তাকে ভাইরাল করবে কে? প্রাণ-প্রকৃতির সুরক্ষায় নিজেদের দায় ও দায়িত্বের জায়গায় আমরা কী এক একজন শ্বেতা, বর্ষ বা লিটন মিয়া হয়ে ওঠতে পারি?

পাভেল পার্থ : প্রতিবেশ ও প্রাণবৈচিত্র্য বিষয়ক গবেষক ও লেখক
[email protected]