বিজ্ঞাপন

বৃষ্টি হলেই অচল ঢাকা, জলাবদ্ধতা নিরসনে কোটি টাকা ব্যয়ের সুফল কি মিলছে?

বৃষ্টি হলেই অচল ঢাকা, জলাবদ্ধতা নিরসনে কোটি টাকা ব্যয়ের সুফল কি মিলছে?

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো বর্ষা বন্দনার সুযোগ কোথায়! বর্ষাকাল এ নগরে আশীর্বাদ নয়; আসে অভিশাপ হয়ে! আকাশে কালো মেঘ দেখলেই পড়ে কপালে চিন্তার ভাঁজ। আজ আবার কোন সড়কে পানি জমবে, কোন রাস্তায় যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকতে হয়, কে জানে।

কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতে ঢাকার কোনো কোনো জায়গায় হাঁটু সমান, কোথাও কোমর সমান পানি জমে। মাঝ রাস্তায় যানবাহন বিকল কিংবা যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। লাটে ওঠে দোকানিদের বেচাকেনা, কর্মজীবী মানুষ সময়মতো কর্মস্থলে পৌঁছাতে পারেন না। শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি বাড়ে, জরুরি সেবাও ব্যাহত হয়। প্রশ্ন হলো, এত বছরের পরিকল্পনা আর শত শত কোটি টাকা ব্যয়ের পরও কেন এই পরিস্থিতির পরিবর্তন হচ্ছে না?

ঢাকায় জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য নতুন কোনো উদ্যোগের অভাব ছিল না। অবিভক্ত সিটি কর্পোরেশনের সময় থেকে শুরু করে দুই সিটি কর্পোরেশন গঠনের পরও একের পর এক প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। খাল পুনরুদ্ধার, ড্রেন সংস্কার, নতুন ড্রেন নির্মাণ, পাম্প স্থাপন, কুইক রেসপন্স টিম গঠন সবই হয়েছে।

ঢাকা শহরে জলাবদ্ধতা নিরসনের নামে প্রতিবছর ২০০ থেকে ৩০০ কোটি টাকা খরচ করে দুই সিটি কর্পোরেশন। কিন্তু নাজুক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এই খরচ খুব একটা কাজে আসে না। ফলে বৃষ্টি হলেই জলাবদ্ধতা হয়। কখনোই দায় নেয় না সিটি কর্পোরেশন।

আমরা দেখতে পাই জলাবদ্ধতা হলে এক সংস্থা অন্য সংস্থার ওপর দায় চাপায়। কিন্তু যে সংস্থাই দায়ী হোক, সিটি কর্পোরেশন সঠিক পন্থায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করলে, হাতের কাছে সবার আবর্জনা ফেলার জায়গা দিলে এবং জনগণকে সচেতন করতে পারলে এই সমস্যা অনেকটাই কমে আসত।

দেশের অন্য সব সিটি কর্পোরেশন এলাকায় জলাবদ্ধতা নিরসনের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্পোরেশন কর্তৃপক্ষের। শুধু ঢাকায় এ দায়িত্ব সিটি কর্পোরেশনর পাশাপাশি ঢাকা ওয়াসা, পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ ছয়টি সংস্থা পালন করে। তবু জলাবদ্ধতা সমস্যার সমাধান হয়নি।

বিশ্বের অনেক শহর আমাদের চেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত সামলেও কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থার মাধ্যমে মানুষের দুর্ভোগ কমিয়ে এনেছে। সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ আমাদেরও রয়েছে।

ফলে মতিঝিল, আরামবাগ, স্বামীবাগ, মালিবাগ, শান্তিনগর, খিলগাঁও, যাত্রাবাড়ী, ধানমন্ডি, মিরপুর, মোহাম্মদপুর, নিউমার্কেট, উত্তরা, বনানী, কিংবা শুক্রাবাদের মতো এলাকাগুলো এখনো মাঝারি বৃষ্টিতেই পানির নিচে চলে যায়।

১১ জুলাই ২০২৬ রাত থেকে ১২ জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত টানা বৃষ্টি আবারও দেখিয়ে দিয়েছে, রাজধানীর জলাবদ্ধতার সমস্যা এখনো আগের জায়গাতেই রয়ে গেছে। এত অর্থ ব্যয়ের পরও যদি মানুষের দুর্ভোগ না কমে, তাহলে প্রকল্পের সাফল্য কোথায়?

জলাবদ্ধতার জন্য শুধু অতিবৃষ্টিকে দায়ী করলে ভুল হবে। নগর পরিকল্পনার দুর্বলতা, খাল দখল, অপরিকল্পিত নির্মাণ, অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতি দীর্ঘদিন ধরেই সমস্যাকে জটিল করেছে।

অনেক এলাকায় ড্রেন আছে, কিন্তু সেগুলো ময়লা-আবর্জনায় ভরে থাকে। কোথাও খালের সঙ্গে ড্রেনের সংযোগ ঠিকমতো নেই। কোথাও আবার উন্নয়নকাজের কারণে পানি চলাচলের পথ বন্ধ হয়ে যায়। ফলে বৃষ্টির পানি দ্রুত নামার সুযোগ পায় না।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো সমন্বয়ের। একই শহরে একাধিক সংস্থা বিভিন্ন সময় উন্নয়নকাজ করে। এক সংস্থা রাস্তা খোঁড়ে, আরেক সংস্থা ড্রেন নির্মাণ করে, অন্য কেউ পাইপলাইন বসায়। কিন্তু কাজের মধ্যে প্রয়োজনীয় সমন্বয় না থাকায় অনেক সময় একটি কাজ অন্যটির কার্যকারিতা নষ্ট করে দেয়। এতে জনগণের অর্থ ব্যয় হয়, কিন্তু প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যায় না।

আরও একটি বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। আমরা সাধারণত নতুন প্রকল্প ঘোষণাকে সাফল্য হিসেবে দেখি। কিন্তু প্রকল্প শেষ হওয়ার পর তার কার্যকারিতা কতটা, ব্যয়ের সঙ্গে ফলের মিল আছে কি না, কোথায় ত্রুটি ছিল-এসব নিয়ে খুব কম আলোচনা হয়। জবাবদিহির এই ঘাটতি থাকলে একই ধরনের সমস্যা বারবার ফিরে আসবে।

ঢাকার মতো একটি ঘনবসতিপূর্ণ শহরে জলাবদ্ধতা পুরোপুরি দূর করা হয়তো সহজ নয়। কিন্তু মাঝারি বৃষ্টিতেই শহর অচল হয়ে পড়া কোনোভাবেই স্বাভাবিক হতে পারে না। বিশ্বের অনেক শহর আমাদের চেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত সামলেও কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থার মাধ্যমে মানুষের দুর্ভোগ কমিয়ে এনেছে। সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ আমাদেরও রয়েছে।

এখন নতুন করে শুধু বরাদ্দ বাড়ানোর কথা বললে হবে না। আগে দেখতে হবে, এতদিনে যে অর্থ ব্যয় হয়েছে, তার কতটা সঠিকভাবে কাজে লেগেছে। কোন প্রকল্প সফল হয়েছে, কোনটি হয়নি, কোথায় পরিকল্পনার ভুল ছিল, কোথায় অবহেলা ছিল-এসবের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন জরুরি।

বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার খাল খননের দিকে জোর দিচ্ছে। এটা ভালো দিক। জলাবদ্ধতা কমাতে হলে খাল ও জলাধার দখলমুক্ত রাখা, ড্রেন নিয়মিত পরিষ্কার করা, সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে কঠোর জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

জলাবদ্ধতা নিরসনের নামে বছরের পর বছর প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে, কোটি কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে। কিন্তু সামান্য বর্ষণেই যদি নগর ডুবে যায়, তবে সেই ব্যয়ের সুফল জনগণ কোথায় পেল?

জলাবদ্ধতা নিরসনের নামে এর আগে দুর্নীতির অভিযোগও উঠেছিল। দুর্নীতি দমন কমিশনও ঢাকা ও চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনের নামে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছিল বছর তিনেক আগে তার তদন্তে নেমেছিল। কিন্তু এসব তদন্তের অগ্রগতির বিষয়ে জানা যায়নি।

রাজধানীর মানুষ প্রতি বছর একই দুর্ভোগের পুনরাবৃত্তি দেখতে চায় না। তারা জানতে চায়, শত শত কোটি টাকা ব্যয়ের বাস্তব ফল কোথায়। জনগণের করের টাকায় নেওয়া প্রকল্প যদি ফলাফল শূন্য হয় তাহলে নগর কর্তৃপক্ষের কোনো আশ্বাসেই মানুষ বিশ্বাস করবে না।

জলাবদ্ধতা নিরসনের নামে বছরের পর বছর প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে, কোটি কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে। কিন্তু সামান্য বর্ষণেই যদি নগর ডুবে যায়, তবে সেই ব্যয়ের সুফল জনগণ কোথায় পেল? নতুন প্রকল্প হাতে নেওয়ার আগে আগের প্রকল্পগুলোর কার্যকারিতা, জবাবদিহি ও ব্যর্থতার কারণ খুঁজে বের করায় এখন সবচেয়ে জরুরি।

এ সংকট শুধু ঢাকার নয়; দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামের অবস্থাও অনেক ক্ষেত্রে আরও নাজুক। নগরকে বাসযোগ্য রাখতে হলে পরিকল্পনা, সমন্বয় ও জবাবদিহিকে প্রাধান্য দেওয়ার বিকল্প নেই।

আদিত্য আরাফাত : অ্যাসাইনমেন্ট এডিটর, ডিবিসি নিউজ
[email protected]