বিশ্বকাপের ডামাডোলে আর বিশ্বজুড়ে যুদ্ধের দামামার ভেতর সংবাদপত্র আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে খবরটায় ক’দিন চোখ এড়ানো দায়, সেটা কটা ‘মৃত্যু’-এর সংবাদ, যদিও ‘হত্যাকাণ্ড’ বললেই বোধহয় যথার্থ হতো। একটা দুটা নয়, প্রায় গোটা তিরিশেক কিংবা আরও বেশি প্রাণ গেছে গত ক’দিনে, যার মধ্যে আছে দশ মাসের শিশু থেকে বার বছরের কিশোরী, তরুণ থেকে বয়োবৃদ্ধ।
পত্রিকা খুললেই যে দেশে নানান উপায়ে মানুষ মরার খবর, সেখানে এ ধরনের মৃত্যুকে ‘ভদ্রপল্লি’তে ‘ভাইরাল’ হতে নানা বিশেষণে বিশেষায়িত হওয়া লাগে ইদানীং, এবারকার বিশেষণ ‘পাহাড়ধসে মৃত্যু’। এর সাথে অতিবৃষ্টিতে তলিয়ে যাওয়া শহরে ডুবে মরা, স্রোতে ভেসে যাওয়া এসবও যোগ করে নেওয়া যায়।
এটুক শুনেই যাদের শোনার আগ্রহে ভাটা পড়ল, দোষ তাদের নয়, বহু বছর ধরে বর্ষা এলেই চট্টগ্রামে পাহাড়ধসে দু-দশটা মানুষ মরার খবর, শহরতলীর তলিয়ে যাওয়ার খবর, জলাবদ্ধতা আর স্রোতে দু-চার জনের সলিল সমাধির খবর শুনে শুনে তৈরি হওয়া আশ্চর্য অভ্যস্ততা!
ছোট্ট দীর্ঘশ্বাস ফেলে কিংবা তাও না ফেলে দ্রুত খেলার কিংবা অর্থনীতির পাতায় পালিয়ে যাওয়ার তাড়া, বড়জোর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ‘#Pray for Chattogram’ হ্যাশট্যাগ লিখে আপাত দায়মুক্তির ফাঁদ! সাত নাকি তেরোজন, শিশু না বয়োবৃদ্ধ, এই পরিসংখ্যানের নেপথ্যে, মানুষ মরার খতিয়ানের আড়ালে, আমাদের চোখের সামনেই যে ‘পাহাড়ি’ শহরটা যে প্রায় মরেই গেল, তার খবরওবা রাখে কে!
স্থাপত্য আর ‘আরবান ডিজাইন’- এ পড়াশোনা কিংবা পেশাগত চর্চার সুবাদে, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতে গিয়ে, সর্বোপরি চট্টগ্রামে বেড়ে ওঠার পরিচয়ের পরিপ্রেক্ষিতে যখনই এসব দেখি, আর পাঁচটা প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা ‘নিয়তি’ বলে মেনে নেওয়া যায় না কিছুতেই। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় চট্টগ্রামের আবহাওয়া, ভূপ্রকৃতি এবং নগরায়ণের যে ধারা, তা বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট বোঝা যায় এসব নিছক কোনো প্রাকৃতিক দুর্ঘটনা নয়, বরং কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড, দায় আর দায়িত্ব এড়ানোর সুযোগ যেখানে একেবারেই নেই।
পাহাড়ধস যে চট্টলাবাসীর বার্ষিক ট্র্যাজেডিতে পরিণত হয়েছে, সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত সাংবাদিক পাভেল পার্থর অভিমত লেখা থেকে তার কিছু নমুনা জানা যাক। নিকট ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা ২০০৭ সালের ১১ জুন; লেবুবাগান, কুসুমবাগ আর বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় পাহাড় ধসে ১৩০টারও বেশি তাজা প্রাণ মাটিতে মিশে গিয়েছিল। ঠিক তার পরের বছরই মেরিন ড্রাইভের কাজ করতে গিয়ে সেনাসদস্যসহ ১৪ জন মানুষ মাটি চাপা পড়েন।
২০০৯ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত প্রতি বছরই গড়ে ৩ জন, ১৭ জন, এমনকি কোনো কোনো বছর ৫০ জন করে মানুষ এই নীরব হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। আর সর্বশেষ ২০১৭ সালের জুনে রাঙামাটি আর চট্টগ্রামে যে প্রলয়ংকরী ধস নামল, তা মুহূর্তের মধ্যে কেড়ে নিলো প্রায় ১৩৭ জন মানুষের জীবন। সংখ্যাতত্ত্বের বড় ফাঁকি, তাতে লেখা থাকে না, এক একটা মৃত্যুতে কতগুলো পরিবারের নিঃশব্দ মৃত্যু হয়।
চট্টগ্রামের পাহাড়ের ভূতাত্ত্বিক চরিত্র ও ভারসাম্যহীনতা
এদেশের নগর বিষয়ক নীতিমালার সবচেয়ে বড় ভুল সম্ভবত সমগ্র বাংলাদেশের মাটিকে একই চরিত্রের মনে করা। অথচ ঢাকা বা সমতলের তুলনায় চট্টগ্রামের পার্বত্য ভূতত্ত্ব আদতে ভিন্ন; মূলত নরম বেলেমাটি, পলি এবং কাদা মাটির অবিন্যস্ত স্তরে গঠিত, যার ভেতরের পারস্পরিক বাঁধন বা ‘কোহেশন’ প্রাকৃতিকভাবেই অত্যন্ত দুর্বল।
প্রকৃতি এই পাহাড়গুলো রক্ষা করার জন্য ‘অ্যাঙ্গেল অব রিপোজ’ নামক একটি নিজস্ব মেকানিজম দিয়েছিল, যার কারণে মাটি সাধারণত ৩০ থেকে ৪০ ডিগ্রি কোণে নিজেকে স্থির রাখতে পারে এবং ঘন গাছপালার শিকড় মাটির গভীরে গিয়ে একটি ‘অদৃশ্য রিটেইনিং ওয়াল’ তৈরি করে। কিন্তু মানুষ যখন আবাসন প্রকল্প বা রাস্তা বানানোর জন্য কিংবা মাটি বেচবার লোভে পাহাড়ের পাদদেশ কেটে প্রায় খাড়া করে ফেলে, তখন এই প্রাকৃতিক ভারসাম্য যায় নষ্ট হয়ে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের স্যাটেলাইট তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৬ থেকে ২০০৮ সালের মধ্যে পাহাড়ি এলাকার প্রায় ৬০ শতাংশ পাহাড় কাটা পড়েছিল। পরবর্তী দেড় দশকে বায়েজিদ-ফৌজদারহাট লিংক রোড নির্মাণ এবং জালালাবাদ ও আকবরশাহ এলাকার বেপরোয়া আগ্রাসনের কারণে আরও ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পাহাড় চরিত্র হারিয়েছে।
বড় মুশকিলটা আসে বর্ষাকালে, একটানা ভারী বৃষ্টিপাতে গাছপালাহীন বেলেমাটি স্পঞ্জের মতো পানি শোষণ করে ওজন বাড়িয়ে ফেলে এবং ‘অভ্যন্তরীণ কৃন্তন শক্তি’ শূন্যের কোঠায় নেমে বিশাল মাটির চাঁই নিজের ভারেই হুড়মুড় করে ধসে পড়ে। তাছাড়াও পাহাড় আর গাছ কাটার মচ্ছবে, খাল ভরাট করে বাড়ি গড়ার ফাঁদে, মাঝারি বৃষ্টিতেই গোটা নগরের পানি প্রবাহের চ্যানেলগুলো হয়ে যায় অপ্রতুল, ফলস্বরূপ পরের দিন পত্রিকার প্রথম পাতায় গলাপানিতে নাজেহাল মানুষের চেনা ছবি, বর্ষা ফুরোলে ভুলে থাকা, আবার পরের বছর একই চক্রের অপেক্ষা!
ঔপনিবেশিক নগর-দর্শন, দখলের রাজনীতি আর পাহাড় কাটার খতিয়ান
আমাদের নগরগুলোর বিকাশ আর ভবিষ্যৎ, সামগ্রিক নগর দর্শন ঔপনিবেশিক চশমার বলয় থেকে রেহাই পায়নি কখনোই। পাহাড় আর বর্ষা যে এলাকার জল জমি জনপদের মূল নিয়ামক, সেখানে পাহাড়কে কেটে সমতল বানিয়ে, আর ‘পানি’র মতো আশীর্বাদকে আপদ ভেবে জোর করে ঠেকানোর বন্দোবস্ত যে কত বড় অবিমৃশ্যতা চট্টগ্রাম নগরীর এই বিপর্যয়ে সেটা টের পাওয়া যায়।
প্রি-ঔপনিবেশিক আমল থেকে পাহাড়ের পাদদেশের প্রাকৃতিক জলধারা বা ‘ছড়া’ (যেমন চাক্তাই ও মির্জা ছড়া) এবং কৃত্রিম দীঘিগুলো (যেমন আসকার দীঘি ও লালদীঘি) বৃষ্টির পানি ধরে রাখার ‘ডিটেনশন পন্ড’ হিসেবে ব্যবহার করা হতো, যা পাহাড়ের জলীয় চাপ কমাত। কিন্তু সমতলের মানুষ পাহাড়ে শহর গড়তে গিয়ে, পাহাড়কে সমতলের মতন ব্যবহার করতে গিয়েই বিপর্যয়ের শুরু।
কোম্পানির শাসনের শুরুর দিক থেকেই বাণিজ্যিক ব্যবহার, রাস্তা আর রেললাইনের জন্য নির্বিচারে পাহাড়ের ঢাল কাটা হয়, আর চূড়া কেটে তৈরি করা হয় বিশালাকার ‘কলোনিয়াল বাংলো’। একই সাথে ভিন্ন এলাকার প্রকৌশলীরা প্রাকৃতিক ছড়াগুলোর জলতাত্ত্বিক গুরুত্ব না বুঝে সেগুলো ইটের দেয়াল দিয়ে বেঁধে ‘আর্টিফিশিয়াল ড্রেন’-এ রূপান্তর করেন, ঘটা করে শুরু হয় নদী আর পানি শাসন, যা প্রকৃতির স্বাভাবিক জলশোষণ ক্ষমতাকে চিরতরে ধ্বংস করে দেয়।
বিপত্তিটা বাধে যখন ঔপনিবেশিক আমল পেরিয়েও, এই ঘোর বর্ষার দেশে, পাহাড় টিলার নগরীতে ‘উন্নয়ন’-এর মডেলটাকে বিউপনিবেশায়ন করার তাগিদটা খুব একটা হালে পানি পায় না। বরং রিয়েল এস্টেট আগ্রাসন, লোভ আর জবর দখলের বলি হয় নগরীর প্রাকৃতিক ড্রেনেজ চ্যানেলগুলো। বৃষ্টির পানির স্বাভাবিক চক্রে নিয়ত বিপত্তি, পাহাড়ের ভেতরে অবরুদ্ধ হয়ে মারাত্মক ‘হাইড্রোস্ট্যাটিক প্রেশার’ বা জলীয় চাপ বেড়ে জলাবদ্ধতা, পাহাড়ধস, নিয়ম করে মৃত্যুর শিরোনাম।
আরও পড়ুন
নেপথ্যে আছে কুৎসিত রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক সমীকরণ ও সুসংগঠিত সিন্ডিকেট। পাহাড়ের চূড়া কেটে উচ্চবিত্তের জন্য বিলাসবহুল প্লট বা ক্যাফে-রিসোর্ট আর কাটা পাহাড়ের বিপজ্জনক খাড়া পাদদেশে বাঁশ, কাঠ আর পলিথিনের সস্তা বস্তি। নদীভাঙন বা গ্রামীণ দারিদ্র্যের শিকার যে মানুষগুলো শহরে সস্তা শ্রম দিতে আসে, চরম অর্থনৈতিক অসহায়ত্বের কারণে এই ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের পাদদেশই তাদের একমাত্র সাশ্রয়ী ঠিকানা হয়ে দাঁড়ায়। মানবসৃষ্ট লোভের নির্বিচার বলি হয়ে মৃত্যু কূপে ঠেলে দেওয়া হয় খেটে খাওয়া অসহায় মানুষগুলো।
যদিও রাষ্ট্রীয়ভাবে পাহাড় কাটার কোনো সুনির্দিষ্ট সরকারি শুমারি বা ডাটাবেজ নেই, তবুও স্যাটেলাইট ইমেজারি এবং নান পরিবেশবাদী সংগঠন, যেমনটা ‘বেলা’-র আইনি লড়াইয়ের নথিপত্র বিশ্লেষণ করলে ৫০ বছরের একটি ভয়াবহ বৈজ্ঞানিক খতিয়ান ফুটে ওঠে।
নানা খতিয়ানে উঠে আসে, স্বাধীনতার পর থেকে এ শতকের প্রথম দশক না পেরুতেই চট্টগ্রামে বায়েজিদ, খুলশী, পাঁচলাইশ, কাতালগঞ্জ ও পলিটেকনিক এলাকাসহ প্রায় শতাধিক পাহাড় সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে মানচিত্র থেকে বিলীন হয়ে গেছে, এর পরের হিসেব তো বলাই বাহুল্য।
এছাড়া চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের স্যাটেলাইট তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৬ থেকে ২০০৮ সালের মধ্যে পাহাড়ি এলাকার প্রায় ৬০ শতাংশ পাহাড় কাটা পড়েছিল। পরবর্তী দেড় দশকে বায়েজিদ-ফৌজদারহাট লিংক রোড নির্মাণ এবং জালালাবাদ ও আকবরশাহ এলাকার বেপরোয়া আগ্রাসনের কারণে আরও ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পাহাড় চরিত্র হারিয়েছে। অর্থাৎ, ৫০ বছরে চট্টগ্রামের মূল পাহাড়গুলোর প্রায় ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশ কোনো না কোনোভাবে ধ্বংসের শিকার হয়েছে, যা এই অঞ্চলের পরিবেশকে এক চরম বিপর্যয়ের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
‘আর্দ্র নগরায়ণ’, জল-জন-পাহাড়বান্ধব শহর
উপকূলীয় ও পাহাড়ি শহর হিসেবে চট্টগ্রামের জন্য সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক তত্ত্ব সম্ভবত ‘ওয়েট আরবানিসম’, বাংলায় বলা যায়, ‘আর্দ্র নগরায়ণ’। প্রথাগত নগর পরিকল্পনা যেখানে পানিকে আপদ ভেবে কেবল তাড়ানো বা আটকিয়ে শহর শুকনো রাখার কথা বলে, ‘ওয়েট আরবানিসম’ সেখানে পানিকে শত্রু না ভেবে তার স্বাভাবিক প্রবাহকে মেনে নিয়ে সহাবস্থানের নকশা করার তাগিদ দেয়।
চট্টগ্রামের মতো টিলা আর পাহাড়বহুল নগরীর নগর পরিকল্পনা হয়ে আসছে ‘টপ ডাউন’ পদ্ধতিতে, পাখির চোখে দেখা ‘আরবান প্ল্যানিং’ এ, নগরীর নিজস্বতাকে অস্বীকার করে। অথচ এ শহর গড়া উচিত ছিল ‘সেকশন’, ‘ঢাল’, ‘কন্ট্যুর’ (পাহাড়ের সমোন্নতি রেখা) ধরে, নানা তলে, জল আর পাহাড় রেখে।
‘সিআরবি’তে যেমন পাশাপাশি দু-রাস্তা দু-সমতলে, জামালখান থেকে রহমতগঞ্জ যেতে যেমন সিঁড়ি আর ঢালে নামা লাগে, গণি বেকারির পাশ থেকে চন্দনপুরার দিকে যেমন নেমে গেছে অনেকটা ঢাল, শহরটার নিজস্বতা হতে পারত সেটাই। পুরোনো কিছু স্থাপনা যেমন জামালখান এলাকাস্থ সেন্ট মেরিস স্কুলের পুরোনো ভবনের মতো আগেকার কিছু নির্মাণে পাহাড়কে বুঝে, ঢালের সাথে মিলিয়ে কাজ দেখা যেত।
পাহাড়ি এলাকায় থাকার কথা অনেকগুলো গ্রাউন্ড ফ্লোর বা নিচতলা, বিভিন্ন উচ্চতায়, যেমনটা দেখা যায় এডিনবরা বা নানা পুরোনো পাহাড়ি নগরীতে, হালের নির্মাণগুলোর কতগুলোয় এমন দেখা যায়। পাহাড়ইবা কতটা চোখে পড়ে ইদানীং শহরটায় হাঁটতে গেলে?
মানুষ গণনার মতো পাহাড়ের শুমারি যেমন প্রয়োজন, তার চেয়ে বেশি প্রয়োজন টিকে থাকা গুটিকয়েক পাহাড়কে ‘ন্যাচারাল হেরিটেজ’ হিসেবে ঘোষণা করা। হেরিটেজ তালিকাভুক্ত পুরোনো স্থাপনার আশপাশে নতুন স্থাপত্য নকশায় যেমন কড়া বিধিনিষেধ থাকে, নগর-টিলা-এর ক্ষেত্রেও তেমন কঠোর নিয়ম করা উচিত।
পাহাড় ধস রোধ এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে একটি নিরাপদ নগরী গড়ে তুলতে সিডিএ এবং সিটি কর্পোরেশনের মহাপরিকল্পনায় প্রকৌশল আর জল-পাহাড়ের প্রতি দরদের সমন্বয় ঘটানো জরুরি। এর প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে পাহাড়গুলো জিআইএস ম্যাপিংয়ের আওতায় এনে ‘ইকো-সেনসিটিভ ডিজিটাল জোনিং’ করা যায়, যেখানে সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ‘রেড জোনে’ সব ধরনের নির্মাণকাজ চিরতরে নিষিদ্ধ ও কঠোর আইনি নজরদারিতে থাকবে।
আইনের প্রয়োগে সর্ষের মধ্যেই থাকা ভূত তাড়াতেই হবে। একই সাথে, নগরীকে জলবায়ু সহনশীল করতে ‘ওয়েট আরবানিসম ও স্পঞ্জ সিটি’ ধারণার প্রয়োগ দরকার। পাহাড়ের পানি নিষ্কাশনের সমস্ত প্রাকৃতিক ছড়া ও নালা দখলমুক্ত করার পাশাপাশি পাহাড়ের পাদদেশে ‘ডিটেনশন পন্ড’ বা জলাধার তৈরি করতে হবে, যা অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি সাময়িকভাবে ধরে রেখে ভেতরকার জলীয় চাপ কমিয়ে দেবে কিছুটা হলেও।
বিপর্যয় থেকে শিক্ষা নিয়ে নীতি ও দর্শনে বড় পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া সময় ইতিমধ্যে গত, যার মাশুল দিচ্ছে অনেকগুলো প্রাণ, একটা গোটা শহর। নীতি, মননে, প্রয়োগের ঠিক দিকে ফেরার সময় এখন না হলে আর কবে?
পাহাড় রক্ষায় ঢালাওভাবে কংক্রিটের খাড়া রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণের মানসিকতা বাদ দিতে হবে, কারণ এটি অনেক সময় পানির চাপ আটকে উল্টো বিপর্যয় বাড়ায়। এর পরিবর্তে পরিবেশবান্ধব ‘বায়ো-ইঞ্জিনিয়ারিং’ পদ্ধতির প্রয়োগ, কাটা পাহাড়ের ঢালে ‘বিন্না ঘাস’ বা এ ধরনের প্রাকৃতিক পদ্ধতির প্রয়োগ, যার শিকড় মাটির গভীরে গিয়ে প্রাকৃতিকভাবে ‘রিইনফোর্সড’ করে ধরে রাখতে পারে। প্রায়োগিক আর নীতি নির্ধারণী ক্ষেত্রে প্রকৌশলী, আরবান ডিজাইনার, পরিকল্পনাবিদ, স্থপতি, ভূতত্ত্ববিদ, ল্যান্ডস্কেপ স্থপতিসহ প্রাসঙ্গিক বিশেষজ্ঞদের নিয়োগ হওয়াটা জরুরি। জরুরি তাদের কাজ করতে দেওয়া ও মতামতকে কাজে লাগানোটাও।
সর্বোপরি, এই মহাপরিকল্পনার সফল বাস্তবায়নে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে সামাজিক আবাসন নিশ্চিত করা প্রয়োজন। পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী ছিন্নমূল মানুষগুলো শুধু লাঠি উঁচিয়ে তাড়িয়ে দিলে তারা জীবিকার তাগিদে অন্য পাহাড়ে গিয়ে আবার বস্তি তুলবে, যার সুযোগ নেবে ভূমিদস্যুরা। যেহেতু এই শ্রমজীবী মানুষগুলো শহরের অর্থনীতি সচল রাখছে, তাই সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে (পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ মডেল), অংশীজনের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণে (অন্তর্ভুক্তিমূলক ও অংশগ্রহণমূলক) শহরের নিরাপদ কোনো সমতল খাস জমিতে আবাসন ব্যবস্থা করতে হবে। টেকসই প্রযুক্তি এবং এই মানবিক পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার সমন্বয় ঘটানো গেলেই কেবল পাহাড়ের ওপর থেকে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসের চাপ চিরতরে দূর করা সম্ভব হবে।
আমরা যদি মনে করি পাহাড় কেটে, নদী ও জলাশয় ভরাট করে শুধু কিছু কংক্রিটের বাকসো দাঁড় করিয়ে দিলেই একটা শহর ‘আধুনিক’ বা ‘স্মার্ট’ হয়ে ওঠে, তবে আমরা এক মারাত্মক বোকার স্বর্গে বাস করছি। ভূমিদস্যুতায়, দখলের রাজনীতিতে, প্রশাসনের নাকের ডগায় পাহাড় কেটে, দখল টেকাতে ছিন্নমূল দুস্থ মানুষগুলোর ঘাড়ে আরোহী হয়ে, মৃত্যু উপত্যকায় তাদের সমাধিস্থ করার অপেক্ষা আর কতদিন?
‘নদী শাসন’-এর মতো গোড়ায় গলদওয়ালা শব্দের ব্যবহার প্রকৃতির প্রতি আমাদের বিরূপতাকে তুলে ধরে, ‘পাহাড় শাসন’ শব্দটা প্রচলিত নয়, কিন্তু প্রচলিত বন্দোবস্ত অনেকটাই তাই। প্রাণ প্রকৃতিকে না বুঝে ‘শাসন’-এর মতো আত্মঘাতী নীতি বদলে, পাহাড় ও পানির সাথে সহাবস্থানের নীতি দরকার প্রতিক্ষেত্রে।
বিপর্যয় থেকে শিক্ষা নিয়ে নীতি ও দর্শনে বড় পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া সময় ইতিমধ্যে গত, যার মাশুল দিচ্ছে অনেকগুলো প্রাণ, একটা গোটা শহর। নীতি, মননে, প্রয়োগের ঠিক দিকে ফেরার সময় এখন না হলে আর কবে?
এস এম রুম্মান মাশরুর চৌধুরী : সহকারী অধ্যাপক, স্থাপত্য বিভাগ, ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক, ঢাকা
