বাংলাদেশ একটি অসাম্প্রদায়িক চেতনা, বহু সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং ধর্মীয় সহাবস্থানের দেশ। হাজার বছরের ইতিহাসে এই ভূখণ্ডে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টানসহ বিভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতির মানুষের মিলিত বসবাস একটি অনন্য সামাজিক পরিবেশ সৃষ্টি করেছে।
এ দেশের উৎসবগুলো কেবল নির্দিষ্ট কোনো ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং বহুক্ষেত্রেই তা সর্বজনীন আনন্দ- উৎসবে পরিণত হয়। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের তেমনই একটি উৎসব ভগবান জগন্নাথ দেবের রথযাত্রা।
রথযাত্রা হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় উৎসব। ভগবান জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার রথ টেনে নিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে এই উৎসব উদযাপন করা হয়। ধর্মীয় তাৎপর্যের পাশাপাশি এটি সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং মানবিক মূল্যবোধেরও প্রতীক।
বাংলাদেশের রথযাত্রা বহু শতাব্দী ধরে পালিত হয়ে আসছে এবং এই উৎসবে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
রথযাত্রা পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন ধর্মীয় উৎসব। এর উৎপত্তি ভারতীয় উপমহাদেশে। বিশেষকরে ওড়িশার পুরী জগন্নাথ মন্দিরকে কেন্দ্র করে রথযাত্রার আন্তর্জাতিক পরিচিতি গড়ে উঠেছে। রথযাত্রা দুটি সংস্কৃত শব্দের সমন্বয়ে গঠিত।
‘রথ’ শব্দের আভিধানিক অর্থ অক্ষ, যুদ্ধযান বা যেকোনো ধরনের যানবাহন অথবা ঘোড়ায় টানা হালকা যাত্রীবাহী গাড়ি। আর ‘যাত্রা’ শব্দের অর্থ হলো কোথাও গমন করা। ইতিহাসবিদদের মতে, বহু শতাব্দী ধরে এই উৎসব পালিত হয়ে আসছে।
হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, বছরে একবার ভগবান জগন্নাথ, তাঁর বড় ভাই বলরাম এবং বোন সুভদ্রাকে নিয়ে মন্দির থেকে বেরিয়ে মাসির বাড়ি অর্থাৎ ইন্দ্রদ্যুম্নের পত্নী গুণ্ডিচার বাড়ি যান। এই যাত্রাই রথযাত্রা হিসেবে পরিচিত।
আবার কয়েকদিন পর তারা পুনরায় মূল মন্দিরে ফিরে আসেন, যাকে উল্টোরথ বলা হয়। রথযাত্রার অর্ধনির্মিত মূর্তির বিষয়ে ব্রহ্মাণ্ডপুরাণে উক্ত আছে, কৃষ্ণ তাঁর ভক্ত রাজা ইন্দ্রদ্যুম্নের সম্মুখে আবির্ভূত হয়ে পুরীর সমুদ্রতটে ভেসে আসা একটি কাষ্ঠখণ্ড দিয়ে তাঁর মূর্তি নির্মাণের আদেশ দেন।
বাংলাদেশের ইতিহাস সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ইতিহাস। এ দেশের মানুষ যুগ যুগ ধরে একে অপরের উৎসবে অংশগ্রহণ করেছে, বিপদে পাশে দাঁড়িয়েছে, ধর্মীয় স্বাধীনতাকে সম্মান করেছে, মানবতাকে সর্বোচ্চ মূল্য দিয়েছে।
মূর্তি নির্মাণের জন্য রাজা একজন উপযুক্ত কাষ্ঠশিল্পীর খোঁজ করতে থাকেন। তখন এক রহস্যময় বৃদ্ধ কাষ্ঠশিল্পী মূর্তি নির্মাণ করে দিতে রাজি হন এবং শর্ত দেন যতদিন না মূর্তি নির্মাণ সম্পন্ন হবে, মন্দিরের দরজা কেউ খুলবে না।
প্রতিদিন ওই কাষ্ঠশিল্পী মন্দিরের ভেতর মূর্তি নির্মাণ করতেন আর রাজা-রানী মন্দিরের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতেন আর নির্মাণকাজের শব্দ শুনতে পেতেন। ৬/৭ দিন অতিবাহিত হওয়ার পর একদিন তারা মন্দিরের বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন, কিন্তু ভেতরের কোনো শব্দ না পেয়ে কৌতূহলবশত রানী মন্দিরের দরজা খুলে ফেলেন।
দেখেন মূর্তি তখনো অসম্পূর্ণ এবং কাষ্ঠশিল্পী অন্তর্ধিত। এই রহস্যময় কাষ্ঠশিল্পী ছিলেন দেবশিল্পী বিশ্বকর্মা। মূর্তির হস্তপদ নির্মিত হয়নি দেখে রাজারানী নিজেদের কৃতকর্মের জন্য অনুশোচনা করতে লাগলেন।
এমন সময় নারদ তাঁদের সম্মুখে আবির্ভূত হয়ে রাজারানীকে সান্ত্বনা দিয়ে ওই অর্ধনির্মিত মূর্তিকেই পরমেশ্বরের স্বীকৃতিস্বরূপ অসম্পূর্ণরূপেই পূজা শুরু করতে বললেন। তখন থেকেই আষাঢ় মাসের শুক্লদ্বিতীয়ায় এই রথযাত্রার প্রচলন।
ভারতের ওড়িশা, ঝাড়খণ্ড, পশ্চিমবঙ্গ এবং বাংলাদেশে এই উৎসব বিশেষ উৎসাহ উদ্দীপনায় পালিত হয়। বর্তমানে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে রথযাত্রা পালিত হয় যেমন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া প্রভৃতি।
বাংলাদেশে বহু প্রাচীনকাল থেকেই রথযাত্রার প্রচলন রয়েছে। বিশেষ করে ঢাকার শাঁখারিবাজার, লক্ষ্মীবাজার, চট্টগ্রাম, খুলনা, যশোর, রাজশাহী, কুমিল্লা, দিনাজপুর, ময়মনসিংহ প্রভৃতি অঞ্চলে এই রথযাত্রা পালন করা হয়।
তবে সর্বাধিক প্রসিদ্ধ রথযাত্রা হচ্ছে স্বামীবাগ ইসকন মন্দির থেকে ঢাকেশ্বরী মন্দির পর্যন্ত রথযাত্রা এবং ধামরাইয়ের রথযাত্রা। ঢাকা জেলার ধামরাই উপজেলায় অবস্থিত হিন্দু দেবতা যশমাধব দেবের (বিষ্ণুরূপ) প্রতি উৎসর্গকৃত মন্দির এটি। প্রতি বছর রথযাত্রার দিন একটি সুবিশাল ছয়তলা রথে যশমাধব দেব, কানাই বলাই ও আদ্যাদেবের প্রতিমা সমন্বয়ে শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়। রথটি হিন্দু দেবদেবীর নানা ছবিতে সজ্জিত থাকে।
আরও পড়ুন
৪০০ বছরের ঐহিত্যবাহী এই রথযাত্রাটি বাংলাদেশ ভূখণ্ডের সর্বাধিক প্রাচীন ও সর্ববৃহৎ রথযাত্রা। সারাদেশ থেকে পুণ্যার্থীরা এই রথযাত্রায় অংশগ্রহণ করেন। রথযাত্রা উপলক্ষে নানা আয়োজন করা হয়। রথের মেলা, যাত্রাপালা, নাগরদোলা থেকে শুরু করে নানারকম আয়োজন থাকে। আর এই আয়োজনেই শামিল হয় নানা ধর্মবর্ণের মানুষ। আর তখনই এটি রূপ নেয় সর্বজনীন উৎসবে।
পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশ উভয় স্থানেই রথযাত্রার একটি অন্যতম অনুষঙ্গ হচ্ছে লটকন। রথযাত্রা এবং উল্টোরথের দিন লটকন কেনার প্রচলন রয়েছে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে।
রথযাত্রা কেবল একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়; এটি ভক্তি, সমতা এবং মানবকল্যাণের প্রতীক। হিন্দু শাস্ত্র অনুযায়ী, ভগবান সব মানুষের জন্য সমান। রথের রশিটানা পুণ্যের কাজ হিসেবে বিবেচিত। ধারণা করা হয় ঈশ্বর নিজেই ভক্তদের কাছে আসেন এবং অহংকার ত্যাগ করে মানবসেবার শিক্ষা প্রদান করেন।
সন শ্রেণি, পেশার মানুষ একই রশিতে রথ টানেন। এই দৃশ্য সামাজিক সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের ধারণাকে শক্তিশালী করে। সামাজিক যোগাযোগ বৃদ্ধি পায়, প্রতিবেশীদের মধ্যে সৌহার্দ্য গড়ে ওঠে, নতুন প্রজন্ম ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হয়, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য সংরক্ষিত হয়, সমাজে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ বৃদ্ধি পায়।
বাংলাদেশের ইতিহাস সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ইতিহাস। এ দেশের মানুষ যুগ যুগ ধরে একে অপরের উৎসবে অংশগ্রহণ করেছে, বিপদে পাশে দাঁড়িয়েছে, ধর্মীয় স্বাধীনতাকে সম্মান করেছে, মানবতাকে সর্বোচ্চ মূল্য দিয়েছে।
বাংলাদেশে রথযাত্রা এমন একটি উৎসব যেখানে কেবল হিন্দু ধর্মাবলম্বীরাই নয়, মুসলিম, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টানসহ বিভিন্ন ধর্মের মানুষও শামিল হয়। অনেক এলাকায় দেখা যায় মুসলিম ব্যবসায়ীরা শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণকারী পুণ্যার্থীদের মধ্যে শরবত বিতরণ করেন, স্থানীয় যুবকরা নিরাপত্তায় সহযোগিতা করেন, এভাবে প্রশাসন সর্বধর্মের মানুষের সহযোগিতায় এই বিশাল আয়োজনকে সফল করেন।
রথযাত্রা মানুষকে শেখায় অন্যের ধর্মকে সম্মান করতে, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান গড়ে তুলতে, ভিন্ন সংস্কৃতিকে গ্রহণ করতে, পারস্পরিক শ্রদ্ধা বজায় রাখতে। কারণ ধর্মীয় সহিষ্ণুতা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অন্যতম ভিত্তি।
রথযাত্রা কেবল একটি ধর্মীয় উৎসব নয়; এটি মানবতা, ঐক্য, সহমর্মিতা ও সম্প্রীতির প্রতীক। বাংলাদেশের মতো বহুধর্মীয় সমাজে এই উৎসব পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহযোগিতা ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের মূল্যবোধকে আরও সুদৃঢ় করে।
রথযাত্রা উপলক্ষে যে মেলা বসে সেখানে সর্বধর্মের লোকের সমাগম ঘটে। লোকসংগীত, কীর্তন, মাটির খেলনা, বিভিন্ন লোকজ শিল্প প্রদর্শিত হয়। এখানে যেসব ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী দোকানে বিভিন্ন জিনিসের পসরা বসায় তারা কিন্তু সবাই হিন্দু ধর্মাবলম্বী নয় বরং অন্য ধর্মাবলম্বীই বেশি। এভাবেই গড়ে ওঠে সাম্য ও সহমর্মিতার এক অনন্য পরিবেশ এবং এই উৎসব হয়ে ওঠে একটি সর্বজনীন উৎসব।
রথযাত্রা কেবল একটি ধর্মীয় উৎসব নয়; এটি মানবতা, ঐক্য, সহমর্মিতা ও সম্প্রীতির প্রতীক। বাংলাদেশের মতো বহুধর্মীয় সমাজে এই উৎসব পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহযোগিতা ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের মূল্যবোধকে আরও সুদৃঢ় করে।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, এ দেশের মানুষ যুগে যুগে ভিন্ন ধর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতির মধ্যেও মিলেমিশে বাস করেছে। রথযাত্রা সেই ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
কোনো দেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি একদিনে গড়ে ওঠে না; এটি দীর্ঘদিনের পারস্পরিক আস্থা, সহনশীলতা এবং মানবিক আচরণের ফল। তাই ধর্মীয় উৎসবকে বিভেদের নয়, বরং মিলনের উপলক্ষ হিসেবে দেখতে হবে।
রথযাত্রা আমাদের শেখায় মানুষের পরিচয় তার মানবিকতায়, বিদ্বেষে নয়; ভালোবাসায়, বৈরিতায় নয়; সহযোগিতায়, সংঘাতে নয়। রথযাত্রাসহ সব ধর্মীয় উৎসব শান্তি, সৌহার্দ্য ও জাতীয় ঐক্যের শক্তিশালী ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে এই আশাবাদ ব্যক্ত করছি।
একটি সমৃদ্ধ, মানবিক ও সম্প্রীতিময় বাংলাদেশ গঠনের জন্য এ মূল্যবোধকে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র-সব পর্যায়ে লালন করা আমাদের পবিত্র দায়িত্ব।
ড. সঞ্চিতা গুহ : অধ্যাপক, সংস্কৃত বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
