বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশে ভ্যাপিংয়ের নীরব ছোবল ও তরুণ প্রজন্মের মানসিক স্বাস্থ্য

বাংলাদেশে ভ্যাপিংয়ের নীরব ছোবল ও তরুণ প্রজন্মের মানসিক স্বাস্থ্য

বাংলাদেশে ই-সিগারেট বা ভ্যাপিংয়ের বিস্তার এখন আর কেবল একটি জীবনধারাগত প্রবণতা নয়; এটি ধীরে ধীরে একটি জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিচ্ছে। প্রতিবেশী দেশ ভারত যেখানে জনস্বাস্থ্য বিবেচনায় ভ্যাপিং সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করেছে, সেখানে বাংলাদেশে বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের তরুণদের মধ্যে এর ব্যবহার উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে।

সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের সাতটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রতি ছয়জনের একজন বর্তমানে ভ্যাপ ব্যবহার করছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ আবার ‘ডুয়াল ইউজার’ যারা একইসঙ্গে সিগারেট ও ভ্যাপিং করেন। এই প্রবণতা শুধু নিকোটিন নির্ভরতা বাড়াচ্ছে না, বরং আসক্তিকে আরও জটিল করে তুলছে।

গবেষণার ফলাফল আরও উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে যখন মানসিক স্বাস্থ্যের সঙ্গে এর সম্পর্ক সামনে আসে। ভ্যাপিং ও ধূমপান উভয়ই ব্যবহারকারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে সাইকোলজিক্যাল ডিস্ট্রেস ও বিষণ্নতার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। একইভাবে শুধুমাত্র ভ্যাপ ব্যবহারকারীদের মধ্যেও উদ্বেগ ও বিষণ্নতার হার সাধারণের তুলনায় অনেক বেশি পাওয়া গেছে। এই তথ্য স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দেয় যে, ভ্যাপিংকে ‘নিরাপদ বিকল্প’ হিসেবে দেখার ধারণাটি বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

ভ্যাপিং এবং মানসিক স্বাস্থ্য

বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটি ক্রস-সেকশনাল জরিপ শীর্ষক এই গবেষণাটি দেশের সাতটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ১,৬১৫ জন ১৮-২৫ বছর বয়সী স্নাতক শিক্ষার্থীর ওপর পরিচালিত হয়। এর মধ্যে পাঁচটি সরকারি এবং দুটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অন্তর্ভুক্ত ছিল।

প্রতি ছয়জনের একজন ভ্যাপ ব্যবহারকারী

গবেষণার ফলাফলে দেখা যায়, ১৫.৪ শতাংশ শিক্ষার্থী নিয়মিত ভ্যাপিং করেন। এর মধ্যে ৬.২ শতাংশ শুধুমাত্র ভ্যাপ ব্যবহার করেন, আর ৯ শতাংশ শিক্ষার্থী ভ্যাপ ও প্রচলিত সিগারেট উভয়ই ব্যবহার করেন। উদ্বেগজনকভাবে, ভ্যাপ ব্যবহারকারীদের মধ্যে ৫৮ শতাংশ উচ্চমাত্রার নিকোটিনযুক্ত ই-লিকুইড ব্যবহার করেন, যা আসক্তির ঝুঁকি বহুগুণ বাড়ায়।

ভ্যাপিং শুরু করার প্রধান কারণ হিসেবে ৩৭.৫ শতাংশ শিক্ষার্থী কৌতূহলকে দায়ী করেছেন। ২৬.২ শতাংশ জানিয়েছেন বন্ধুদের প্রভাব, আর ১৮.৫ শতাংশ সামাজিক ট্রেন্ড ও লাইফস্টাইল অনুসরণের কারণে শুরু করেছেন। প্রায় ২৫ শতাংশ শিক্ষার্থী ভুলভাবে মনে করেন যে ভ্যাপিং প্রচলিত সিগারেটের তুলনায় কম ক্ষতিকর।

ফ্লেভার ও সামাজিক প্রভাবেই আকর্ষণ

ম্যাঙ্গো, স্ট্রবেরি, আপেলসহ বিভিন্ন আকর্ষণীয় ফ্লেভার, রঙিন ডিজাইন এবং অতিরিক্ত ধোঁয়া তৈরির সুযোগ তরুণদের ভ্যাপিংয়ের প্রতি আকৃষ্ট করছে। এসব উপাদান অনেক শিক্ষার্থীকে কৌতূহল ও সামাজিক প্রভাবে ভ্যাপিং শুরু করতে উদ্বুদ্ধ করছে, যা পরবর্তীতে নিকোটিন নির্ভরতার দিকে নিয়ে যেতে পারে।

ভ্যাপিং ও মানসিক স্বাস্থ্যের শক্তিশালী সম্পর্ক

গবেষণায় দেখা গেছে, ভ্যাপিং এবং মানসিক স্বাস্থ্যের মধ্যে একটি উদ্বেগজনক সম্পর্ক বিদ্যমান। যারা ভ্যাপিং ও ধূমপান উভয়ই করেন, তাদের মধ্যে মানসিক চাপ বা সাইকোলজিক্যাল ডিস্ট্রেসের হার ৮০.৫ শতাংশ এবং বিষণ্নতার হার ৬৩.৮ শতাংশ। শুধুমাত্র ভ্যাপ ব্যবহারকারীদের মধ্যেও বিষণ্নতা ৬০.৮ শতাংশ এবং তীব্র উদ্বেগ ৫৬. ৯ শতাংশ পাওয়া গেছে।

নিকোটিনের স্নায়বিক প্রভাব

বিশেষজ্ঞদের মতে, নিকোটিন কিশোর ও তরুণদের মস্তিষ্কের বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এটি ডোপামিন ও সেরোটোনিনের মতো নিউরোট্রান্সমিটারকে প্রভাবিত করে, যা আবেগ ও মানসিক স্থিতিশীলতা নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে উদ্বেগ, বিষণ্নতা, মনোযোগের ঘাটতি এবং আসক্তির ঝুঁকি বেড়ে যায়।

অতিরিক্ত স্বাস্থ্যঝুঁকি

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, ভ্যাপিংয়ের সঙ্গে মাদক ও অ্যালকোহল ব্যবহারের সম্পর্ক রয়েছে। পাশাপাশি শারীরিকভাবে দীর্ঘস্থায়ী কাশি, মাথা ঘোরা, বুক ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, ক্ষুধামন্দা, ওজন হ্রাস এবং মাথাব্যথার মতো উপসর্গও রিপোর্ট করা হয়েছে।

মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও প্রতিরোধমূলক উদ্যোগের প্রয়োজন

এই প্রেক্ষাপটে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের কাছে সহজে ও গোপনীয়ভাবে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা বা মোবাইল হেলথ (mHealth) উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। অ্যাপভিত্তিক কাউন্সিলিং, এসএমএস রিমাইন্ডার এবং ডিজিটাল আচরণগত সহায়তা কার্যক্রম শিক্ষার্থীদের নিকোটিন নির্ভরতা কমাতে এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণে উৎসাহিত করতে পারে। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে বিদ্যমান মানসিক স্বাস্থ্য কাউন্সিলিং সেবা আরও শক্তিশালী করা জরুরি।

গবেষকরা আশা প্রকাশ করেছেন, এই গবেষণার ফলাফল বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং নীতিনির্ধারকদের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে সহায়তা করবে, যাতে তরুণদের মধ্যে ভ্যাপিং, মাদক ব্যবহার এবং মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি মোকাবিলা করা যায়।

বাংলাদেশে নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন

‘ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০০৫’ আরও শক্তিশালী করার উদ্দেশ্যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার 'ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০২৫' অনুমোদন করে। অধ্যাদেশে ই-সিগারেট, ভ্যাপ, হিটেড টোব্যাকো এবং সব ধরনের ইমার্জিং তামাক পণ্য সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়। যা পরবর্তীতে মহান সংসদে ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) আইন ২০২৬-এ রূপান্তরিত হয়। যেখান থেকে ই-সিগারেট, ভ্যাপ, হিটেড টোব্যাকো এবং সব ধরনের বিকাশমান নিকোটিন পণ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়। পাশাপাশি এই পণ্যকে কর আরোপের মাধ্যমে দেশের বাজারে বিক্রয়-ক্রয়ে বৈধতা দেওয়ার ফলে এই পণ্য সহজলভ্য হবে এবং তরুণদের মধ্যে বিস্তার লাভ করবে। 

জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার স্বার্থে গবেষক ও বিশেষজ্ঞরা বহুদিন যাবৎ বাংলাদেশে ভ্যাপ ও ই-সিগারেটের আমদানি, বিপণন ও বাজারজাতকরণ সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করার আহ্বান জানিয়ে আসছেন। কিন্তু আইনে পণ্যটির বৈধতা তামাক নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ অগ্রগতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করার পাশাপাশি একটি নতুন ও দ্রুতবর্ধনশীল জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হবে। আকর্ষণীয় ফ্লেভার, আধুনিক ডিজাইন এবং সামাজিক প্রভাব তরুণদের কাছে এর প্রকৃত ঝুঁকি আড়াল করছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি কার্যকর প্রতিক্রিয়ার জন্য ই-সিগারেটসহ সব নিকোটিন পণ্যের কঠোর নিয়ন্ত্রণ, বিশ্ববিদ্যালয় ও স্কুল পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ এবং সামাজিক মাধ্যমভিত্তিক প্রচারণা নিয়ন্ত্রণ জরুরি। নিকোটিন আসক্তি বা মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সমস্যায় পড়লে দেরি না করে নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রের চিকিৎসক বা কাউন্সিলরের সাথে কথা বলুন। এই পণ্য আপাতদৃষ্টিতে নিরীহ বাষ্প মনে হলেও, তা দীর্ঘমেয়াদে যে একটি প্রজন্মের মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপর গভীর প্রভাব ফেলবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

ডা. ফারাহ সাবরিনা : জনস্বাস্থ্য গবেষক