World Cup Football Field

বিজ্ঞাপন

ফুটবলের সমাজতত্ত্ব : সর্ব খর্বতারে দহে তব ক্রোধদাহ

ফুটবলের সমাজতত্ত্ব : সর্ব খর্বতারে দহে তব ক্রোধদাহ

বিশ তারিখ রাত একটায় এবারের বিশ্বকাপ ফাইনালে মুখোমুখি হবে স্পেন ও আর্জেন্টিনা। এই দুই দলেরই অতীতে বিশ্বকাপ জয়ের রেকর্ড রয়েছে।

ম্যানচেস্টার সিটি ক্লাবের ফুটবলার তথা মিড ফিল্ডার রড্রিই এবারের স্প্যানিশ ফুটবল দলের অধিনায়ক। ১৯৯৬ সালে জন্ম এবং টায় টায় ত্রিশ বছরের রড্রির উচ্চতা ছয় ফুট তিন ইঞ্চি এবং স্প্যানিশ ফুটবল দল দু’বার বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনালিস্ট হতে পেরেছে ২০১০ এ, যে বার তারা বিশ্বকাপ জিতেছিল এবং এবার ২০২৬ এও তারা ফাইনালিস্ট।

এ পর্যন্ত ফিফা আয়োজিত বিশ্বকাপে ২৩ বারের ভেতর ১৭ বার তারা অংশ নিতে পেরেছে। বিশ্বকাপে সব মিলিয়ে ছয় বার কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠা স্পেন ১৯৫০ সালে চার সেমি ফাইনালিস্ট দলেরও একটি হয়েছিল।

স্পেনের বিপরীতে আছে আর্জেন্টিনা, বিশ্বজুড়ে ব্রাজিলের পরই যে দলের নাম সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়! ১৯৭৮, ১৯৮৬ ও ২০২২-সহ মোট তিনবার বিশ্বকাপ জিতেছে এই দলটি। ফাইনালিস্ট হয়েছে মোট ছয়বার। এই দলের নেতৃত্বে আছেন লিওনেল মেসি, জীবনের সব প্রতিবন্ধকতা উতরে আজ যিনি ভুবনজয়ী ফুটবল তারকা।

১৯৮৭ সালে জন্ম নেওয়া এবং উনচল্লিশ বছরের এই তারকা ফুটবলারের বয়স যখন মাত্র ১২, তখন তাকে দেখে ‘নিওয়লস ওল্ড বয়েজ’ ক্লাবের কোচ আড্রিয়ান কয়রার যা মনে হয়েছিল তা বহু পরে তিনি সংবাদ মাধ্যমকে জানান, ‘প্রথমে এই বালককে দেখে আপনার মনে হবে যে এই বাচ্চাটি ফুটবল খেলার উপযুক্ত নয়। সে বামন, সে বড় বেশি ভঙ্গুর গোছের, বড্ড বেঁটে। কিন্তু খুব দ্রুতই আপনি বুঝতে পারবেন যে সে জন্মেছে আর সবার থেকে আলাদা হয়ে, সে সত্যিই বিশেষ কিছু।’

২০১৮ সালে মেসি অবশ্য বিশ্বকাপ জেতেননি। জিতলেন গতবারের বিশ্বকাপে। এবারও কী তার হাতেই উঠবে বিশ্বকাপ? এ প্রশ্ন কোটি ফুটবল দর্শকের। তবে, রূঢ় সত্য হলো এবার আর্জেন্টিনা-মিশর ম্যাচে রেফারির একাধিক সিদ্ধান্ত সুস্পষ্টভাবেই বিতর্কিত হয়েছে।

মিশরের একটি গোলকে বাতিল করাসহ নানা ভাবেই আর্জেন্টিনাকে সাহায্য করা হয়। এ সত্ত্বেও, দুটো গোলে পিছিয়ে গিয়ে আবার খেলায় সমতা ফেরানোর অদম্য মনোভাবের জন্য আর্জেন্টিনার লড়াকু স্পিরিটও প্রশংসার দাবিদার। তবে রেফারির সুস্পষ্ট পক্ষপাতও তাই বলে এড়ানো যায় না।

জীবনে, কর্মক্ষেত্রে বা খেলার মাঠেও আপনার সব পরিশ্রম ও প্রতিভা তখনই ফলপ্রসূ হয় যখন আপনি ‘এস্টাব্লিশমেন্ট’এর প্রিয়পাত্র। গ্রিক পুরাণ নিয়ে নির্মিত এক সিনেমার একটি দৃশ্যে যেমন দেখা যায় যে, দেবতারা দাবা খেলছেন যেখানে ট্রোজানরা হেরে বসেই আছে, হেক্টর হেরেই আছেন আর গ্রিকরাও জয়ী হয়েই আছে, একিলিসও জয়ী হয়েই আছেন।

ভারতীয় পুরাণেও দ্রোণাচার্যের পক্ষপাতিত্বে একলব্য বা কুরুপক্ষের ভীষ্ম-দ্রোণ-শল্যসহ সবার পক্ষপাতিত্বের শিকার কর্ণ কখনোই জয়ী হতে পারেন না। একলব্য বা কর্ণ যেমন সমাজের সুবিধাবঞ্চিত অংশের সদস্য ছিলেন, ফিফার বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের সাথে নরওয়ের খেলায় পুনরায় পক্ষপাতদুষ্ট রেফারিংয়ের শিকার! 

স্বয়ং আর্লিং হাল্যান্ডকে ঠাট্টা করে বলতে হয়েছে যে বড় দলগুলো কিছু বাড়তি সুবিধা পায়ই, যেমন ক্লাবের খেলায় তিনি বড় ক্লাবের খেলোয়াড় বলে তার দলও অন্য দলগুলোর বিপক্ষে বাড়তি সুবিধা পায়। তা কে বলছেন এই কথা? আর্লিং হাল্যান্ড যার ছ’ফুট পাঁচ ইঞ্চি উচ্চতার দীর্ঘ দেহের সাথে তুষারশুভ্র রং ও সোনালী চুল নরওয়েজীয়দের ‘ভাইকিং আবেগে’ এতটাই উন্মত্ত করেছিল যে এআই দিয়ে নির্মিত নানা ভিডিও হাল্যান্ডকে কখনো দেখা যাচ্ছে ভাইকিং, পৌরাণিক দেবতা থরের হাতুড়ি হাতে প্রতিপক্ষকে চূর্ণ করছেন, তাকে নিয়ে লেখা গানে ‘ভালহাল্লা’ বা ভাইকিং পুরাণের পাতালপুরীতে তার যাওয়ার কথা বলা হচ্ছে।
‘ভালহাল্লা’ অর্থ নরওয়েজীয় তথা ভাইকিংদের সম্মান বা বিজয় রক্ষায় যে বীররা প্রয়োজনে জীবনের বিনিময়ে বা পাতালপুরীতে গিয়েও দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেন, সেই পাতালপুরী। এহেন ‘হোয়াইট সুপ্রিমিসি’র আইকন এবং ফুটবলে প্রথম কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠা নবশক্তির দেশ নরওয়ের অধিনায়ক হাল্যান্ড পর্যন্ত বিপন্ন বোধ করছেন পক্ষপাতদুষ্ট রেফারিংয়ের চাপে ও তাপে!

আসলে ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবলে কারা কোয়ার্টার, সেমি ও ফাইনালে যাবেন এ নিয়ে রীতিমতো জুয়ার আসর বসে, যাতে লাখ লাখ ডলারের বিনিয়োগ থাকে। আছে স্পন্সরদের ব্যবসা। ফলে ১৯৯০-এর বিশ্বকাপে ক্যামেরুন নামে আফ্রিকার দলটির সাথে আর্জেন্টিনার ম্যাচে রেফারি কোন স্তরের অন্যায় করেছিল, সেই স্মৃতি এখনো ভুলবার নয়।

তবে, এতকিছুর পরও লক্ষণীয় যেটা যে ১৯৭০-এর দশক থেকে ল্যাটিন ফুটবলের যে জয়জয়কার শুরু হয়েছিল বা ইউরোপের ভয়ানক গতির ও দৈহিক শক্তি নির্ভর ফুটবলের বদলে মিশ্র বর্ণের ল্যাটিনেরা তাদের তুলনামূলক দুর্বলতর দৈহিক কাঠামোর উপযোগী যে ছোট ছোট পাসের, নান্দনিক কৌশল সম্বলিত ফুটবল খেলা শুরু করেন, তা ইদানীং আগের মতো জোরালো জায়গায় নেই।

অবশ্য ব্রাজিলও পাঁচবার বিশ্বকাপ বা আর্জেন্টিনাও তিনবার বিশ্বকাপ জিতেছে। আর্জেন্টিনা চতুর্থবারের মতো জিততেই পারে, তবে আগে যেমন পেরু, ইকুয়েডর, বলিভিয়া বা চিলির মতো দেশগুলো বিশ্বকাপে দুর্দান্ত খেলতো, ইউরোপীয় পাওয়ার ফুটবল বা টোটাল ফুটবলের ঝোড়ো গতির কাছে তা যেন কিছুটা হলেও দুর্বল হয়ে পড়ছে। কেন? কারণ শেষ পর্যন্ত দারিদ্র্য ও পুষ্টির কম বা বেশিই আপনার পেশি শক্তি বা দৈহিক সক্ষমতাকে নির্ধারণ করে।

এবার আসুন দেখি বিশ্বকাপের সেরা দীর্ঘকায় খেলোয়াড় করা? গোলকিপাররা দেখা যাচ্ছে কেন জানি লম্বা খেলোয়াড়দের ভিড়ে এগিয়ে। অস্ট্রিয়ার গোলকিপার ফ্লোরিয়ান উইগেলে এবারের বিশ্বকাপের দীর্ঘতম খেলোয়াড়। তিনি ছাড়িয়ে গেছেন গত বিশ্বকাপে ডাচ গোলকিপার আন্দ্রিস নোপার্টের (৬ ফুট ৭.৯ ইঞ্চি) উচ্চতাকেও। তার উচ্চতা ৬ ফুট ৯ ইঞ্চি।

এরপর আছেন কলম্বিয়ার (ল্যাটিন হলেও পূর্ণ শ্বেতকায়) আলভারো মন্টেরো (৬ ফুট ৭ ইঞ্চি), বসনিয়া হার্জেগোভিনার ডিফেন্ডার স্টেফান রাডেলজিচ (৬ ফুট ৭ ইঞ্চি), অস্ট্রিয়ার ফরোয়ার্ড সাশা কারাদজিচ (৬ ফুট ৭ ইঞ্চি) এবং বেলজিয়ামের গোলকিপার মাইক পেন্ডার্স (৬ ফুট ৭ ইঞ্চি)।

এবারের বিশ্বকাপে গোলকিপারদের গড় উচ্চতা ৬ ফুট ২.৭ ইঞ্চি, এরপরেই আছে গড়ে ৬ ফুট ০.৪ ইঞ্চি উচ্চতার ডিফেন্ডার, গড়ে ৫ ফুট ১১.৪ ইঞ্চির ফরোয়ার্ড এবং গড়ে ৫ ফুট ১০.৮ ইঞ্চির মিড ফিল্ডাররা। এবারের বিশ্বকাপে দীর্ঘতম খেলোয়াড়দের দলের ভেতর অন্যতম নরওয়ের হাল্যান্ড হলেন ৬ ফুট ৫ ইঞ্চি।

এসব পড়তে পড়তে দক্ষিণ এশিয়ার বাংলাদেশের আমি অন্তর্জালে নরওয়ের নারী ও পুরুষ এবং উপমহাদেশের ভারত-বাংলাদেশ-পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের নারী-পুরুষের গড় উচ্চতা অন্তর্জালে খুঁজলাম। নরওয়েজীয় নারী-পুরুষের গড় উচ্চতা হচ্ছে যথাক্রমে ৫ ফুট ১০ ও ৫ ফুট ৫।

পাশাপাশি বাংলাদেশে এটা হলো ৫ ফুট ৫ ও ৪ ফুট। ভারতে এটা হচ্ছে ৫ ফুট ৫ ও ৫ ফুট ৩ (এখানে উত্তর প্রদেশের সাথে বাংলা, কেরালা বা অরুণাচলের ধরা যাক পার্থক্য আছে), পাকিস্তানে ৫ ফুট ৭ ও ৫ ফুট ২.৫ আর আফগানিস্তানে ৫ ফুট ৬ ও ৫ ফুট ১। অবশ্য ভারতে পাঞ্জাব ও উত্তর প্রদেশে উচ্চতা পাক-আফগানদের মতো। আমি নেপাল বা মালদ্বীপ পর্যন্ত আর খুঁজলাম না। শ্রীলঙ্কায় ৫ ফুট ৩ ও ৫ ফুট।

অবশ্য রবীন্দ্রনাথ ‘খর্বতা’ বলতে মনের খর্বতাকেই বুঝিয়েছেন। কিন্তু দৈহিক খর্বতাও একটি জরুরি বিষয়। এমনকি ইউরোপেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বা তার অব্যবহিত পর জন্ম নেওয়া মানুষ গড় উচ্চতায় খর্ব হয়েছেন; যুদ্ধের রেশনের ওপর শৈশবে বড় হওয়ার কারণে। কেন আমরা বা দক্ষিণ এশিয়ার মানুষেরা কখনো ফুটবল খেলতে বিশ্বকাপে যেতে পারি না?

রোজা ল্যুক্সেমবার্গের ‘দ্য এ্যাকুমুলেশন অফ ক্যাপিটাল’—এ পশ্চিমা দেশগুলো কীভাবে আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার তুলা ক্ষেত বা কোকো বাগান থেকে শুরু করে এশিয়ার বিপুল সম্পদ লুণ্ঠন করেছে তার সবিস্তার বিবরণ আছে যা এত ছোট পরিসরে উদ্ধৃত করাও কঠিন।

আপনার বা আমার খর্বতার ব্যাখ্যা মিলবে উপনিবেশের লুণ্ঠনে, যুদ্ধ-দাঙ্গা-মন্বন্তর-দারিদ্র্যে। আমরা তাই বিশ্বকাপে যেতে পারি না। শুধু অন্যের খেলা দেখে উল্লাস করি, ব্যথিত হই, নিজেদের ভেতর মারামারি করি। অক্ষমের উত্তেজনাই সার!

অদিতি ফাল্গুনী : কবি, কথাসাহিত্যিক ও অনুবাদক