বিজ্ঞাপন

ঝরে পড়া শিক্ষার্থী কেন বাড়ছে?

ঝরে পড়া শিক্ষার্থী কেন বাড়ছে?

বাংলাদেশে প্রতিবছর শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ে। নতুন বই ছাপা হয়, নতুন শ্রেণিকক্ষ নির্মিত হয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়ে, শিক্ষাবাজেট নিয়ে আলোচনা হয়। কিন্তু এই দৃশ্যমান অগ্রগতির আড়ালে আরেকটি বাংলাদেশ নীরবে তৈরি হচ্ছে-যেখানে প্রতিবছর লাখ লাখ শিশু ও কিশোর শিক্ষার পথ থেকে অদৃশ্য হয়ে যায়। তারা পরীক্ষার ফলাফলে নেই, ভর্তি-পরিসংখ্যানে নেই, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বপ্নে নেই। তারা আছে ইটভাটায়, কারখানায়, ক্ষেতে, গ্যারেজে, অভিবাসনের ঝুঁকিপূর্ণ পথে কিংবা খুব অল্প বয়সে বিয়ের সংসারে।

০২ জুলাই ২০২৬ উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি ও সমমান) পরীক্ষা শুরু হয়েছে। সেই পরীক্ষায় প্রায় সাত লাখ নিবন্ধিত পরীক্ষার্থী অনুপস্থিত থাকার ঘটনা নতুন করে সেই অদৃশ্য বাংলাদেশের দিকে তাকাতে বাধ্য করেছে। এই সাত লাখ হলো একাদশ শ্রেণিতে নিবন্ধিত কিন্তু এইচএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণ না করা এবং ফরম পূরণ করেও পরীক্ষায় অনুপস্থিত থাকা শিক্ষার্থীদের সম্মিলিত বাস্তবতা।

সংখ্যাটি কেবল একটি পরীক্ষার পরিসংখ্যান নয়, এটা বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের ক্ষয়, সামাজিক বৈষম্য, অর্থনৈতিক চাপ এবং নীতিগত দুর্বলতার এক নির্মম প্রতিচ্ছবি। যে দেশে একটি পরীক্ষায় এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী পরীক্ষার হলে পৌঁছাতে পারে না, সেখানে সমস্যাটি কেবল ব্যক্তিগত ব্যর্থতার নয়- রাষ্ট্র, সমাজ ও শিক্ষা ব্যবস্থার সম্মিলিত সংকট।

২০২৪ সালে এসএসসি ও সমমানে পাস করেছিল প্রায় ১৬.৭২ লাখ শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে প্রায় ১.৮০ লাখ শিক্ষার্থী একাদশ শ্রেণিতেই ভর্তি হয়নি। যারা ভর্তি হয়েছিল, তাদের মধ্যে আরও প্রায় ৫.৪৪ লাখ শিক্ষার্থী নিয়মিত এইচএসসি পরীক্ষার ফরমই পূরণ করেনি।

পরীক্ষার প্রথম দিন আবার ২৪,৭৮৪ জন ফরম পূরণ করেও পরীক্ষায় অনুপস্থিত ছিল। অর্থাৎ, এসএসসি পাস করা একটি ব্যাচ থেকে ৭.২৪ লাখেরও বেশি শিক্ষার্থী নিয়মিত এইচএসসি পরীক্ষার ধারাবাহিকতা থেকে হারিয়ে গেছে।

২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার তথ্য বলছে, নিয়মিত নিবন্ধিত শিক্ষার্থীদের প্রায় ৩৬ শতাংশই পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেনি। নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে একাদশ শ্রেণিতে নিয়মিত নিবন্ধিত ছিল ১১ লাখ ৮৬ হাজার ৪৬১ শিক্ষার্থী। কিন্তু পরীক্ষার ফরম পূরণ করেছে মাত্র ৭ লাখ ৯৪ হাজার ৪৭৭ জন। অর্থাৎ ৩ লাখ ৯১ হাজার ৯৮৪ জন বা ৩৩.০৪ শতাংশ শিক্ষার্থী পরীক্ষার ফরমই পূরণ করেনি।

পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষায়। মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে ৪৪.০৭ শতাংশ এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে ৫৪.৫৮ শতাংশ নিয়মিত শিক্ষার্থী ফরম পূরণ করেনি। এরপরও যারা ফরম পূরণ করেছে, তাদের মধ্যেও পরীক্ষার প্রথম দিন অনুপস্থিত ছিল ২৪ হাজার ৭৮৪ জন। অর্থাৎ, একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হওয়া বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী উচ্চমাধ্যমিকের চূড়ান্ত পরীক্ষায় পৌঁছানোর আগেই শিক্ষা-ধারা থেকে ছিটকে পড়েছে।

এটা শুধু একটি পরীক্ষার পরিসংখ্যান নয়, এটা বাংলাদেশের মানবসম্পদ উন্নয়নের ভবিষ্যৎ নিয়ে এক কঠিন সতর্কবার্তা।

এই সাত লাখ সংখ্যাটি আরও বড় একটি বাস্তবতার প্রতীক। বাংলাদেশে শিক্ষার্থীরা একদিনে হারিয়ে যায় না। তারা ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়।

প্রথমে অনিয়মিত উপস্থিতি, তারপর শ্রেণিকক্ষে আগ্রহ কমে যাওয়া, এরপর আর্থিক সংকটে পড়াশোনার পাশাপাশি কাজ শুরু করা, কোনো মেয়ের ক্ষেত্রে অল্প বয়সে বিয়ে, কারও ক্ষেত্রে পরিবারের সঙ্গে অন্যত্র চলে যাওয়া, কারও ক্ষেত্রে পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়ে আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলা-এভাবেই একজন শিক্ষার্থী শিক্ষা-পরিসংখ্যান থেকে মুছে যায়। শেষ পর্যন্ত যখন বোর্ড পরীক্ষার দিন আসে, তখন সেই অনুপস্থিতি কেবল শেষ দৃশ্য, হারিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়াটি শুরু হয়েছিল বহু আগে।

বাংলাদেশে প্রাথমিক স্তরে ভর্তি হার অনেক বছর ধরেই প্রশংসনীয়। কিন্তু শিক্ষা ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ভর্তি নয়, শিক্ষার্থীকে বিদ্যালয়ে ধরে রাখা। আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং এর বিভিন্ন গবেষণায় বহুবার দেখানো হয়েছে, বাংলাদেশের অন্যতম বড় সমস্যা হলো শিক্ষার্থীর ঝরে পড়া এবং শিক্ষাজীবনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে না পারা। বিশেষ করে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরে এই সংকট আরও প্রকট।

ঝরে পড়া মানেই কেবল বিদ্যালয় ছেড়ে দেওয়া নয়। এর অর্থ, একজন শিশুর সম্ভাবনার মৃত্যু। কারণ, শিক্ষা থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া মানে শুধু একটি সনদ হারানো নয়, এর সঙ্গে হারিয়ে যায় উন্নত কর্মসংস্থানের সুযোগ, স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতা, নাগরিক অংশগ্রহণের সক্ষমতা এবং প্রজন্মান্তরে দারিদ্র্য ভাঙার সম্ভাবনা। যে শিশু আজ বিদ্যালয় ছাড়ছে, তার সন্তানও ভবিষ্যতে একই ঝুঁকির মধ্যে পড়বে-এটাই দারিদ্র্য ও বৈষম্যের পুনরুৎপাদনের সবচেয়ে শক্তিশালী চক্রগুলোর একটি।

অর্থনৈতিক সংকট এই বাস্তবতাকে আরও কঠিন করে তুলেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় উচ্চ মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা এবং পরিবারের আয় কমে যাওয়ায় বহু পরিবারে শিক্ষা খরচকে আর অগ্রাধিকার দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। সরকারি বিদ্যালয়ে টিউশন ফি কম হলেও বই, কোচিং, পরীক্ষার ফি, যাতায়াত, পোশাক, ডিজিটাল ডিভাইস এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয় অনেক পরিবারের জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। দরিদ্র পরিবার তখন কঠিন সিদ্ধান্ত নেয়-শিশু পড়বে, নাকি কাজ করবে?

গ্রামের অনেক কিশোর নির্মাণশ্রমিক, কৃষিশ্রমিক বা ওয়ার্কশপে সহকারী হিসেবে কাজ শুরু করে। শহরে তারা রেস্তোরাঁ, দোকান, গ্যারেজ, কারখানা কিংবা অনানুষ্ঠানিক শ্রমবাজারে ঢুকে পড়ে। মেয়েদের ক্ষেত্রে চিত্রটি আরও জটিল। মাধ্যমিকের পর অনেক পরিবার নিরাপত্তা, সামাজিক চাপ কিংবা অর্থনৈতিক কারণে বিয়েকেই ভবিষ্যতের একমাত্র পথ মনে করে। ফলে একটি মেয়ের স্কুলব্যাগের জায়গা দখল করে সংসারের দায়িত্ব।

শিক্ষার ভেতরের সমস্যাগুলোও উপেক্ষা করা যাবে না। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার বড় অংশ এখনো পরীক্ষাকেন্দ্রিক। শ্রেণিকক্ষের আনন্দ, অনুসন্ধান, সৃজনশীলতা কিংবা বাস্তব জীবনের দক্ষতার চেয়ে নম্বর এবং সনদকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। ফলে দুর্বল শিক্ষার্থী খুব দ্রুত নিজেকে অযোগ্য ভাবতে শুরু করে। অনেকেই একবার অকৃতকার্য হওয়ার পর আর বিদ্যালয়ে ফিরতে চায় না। কেউ কেউ মনে করে, এই ব্যবস্থায় তার জন্য কোনো জায়গাই নেই।

এখানে আরও একটি নীরব বৈষম্য কাজ করে। শহরের তুলনায় গ্রামের শিক্ষার্থী, দরিদ্র পরিবারের সন্তান, প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী, চরাঞ্চল, হাওর, পাহাড় কিংবা উপকূলের শিক্ষার্থীরা একই সুযোগ পায় না। একই পাঠ্যবই সবার হাতে গেলেও সবার সামনে সমান সম্ভাবনা খোলা থাকে না। ফলে শিক্ষা ব্যবস্থার ভেতরেই অসমতা জমতে থাকে, আর সেই অসমতার শেষ পরিণতি হয় ঝরে পড়া।

এই কারণেই সাত লাখ অনুপস্থিত পরীক্ষার্থীকে কেবল একটি বোর্ড পরীক্ষার পরিসংখ্যান হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটা আদতে বহু বছর ধরে জমে থাকা হাজারো ছোট ছোট ব্যর্থতার সমষ্টি। প্রতিটি অনুপস্থিত শিক্ষার্থীর পেছনে আছে একটি পরিবার, একটি গল্প, একটি ভাঙা স্বপ্ন এবং একটি অপূর্ণ সম্ভাবনা। রাষ্ট্র যখন কেবল কতজন পাস করল, কতজন জিপিএ-৫ পেল-এই হিসাব নিয়ে ব্যস্ত থাকে, তখন আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন চাপা পড়ে যায়-যারা পরীক্ষার হলেই পৌঁছাতে পারল না, তাদের কী হলো?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে কেবল শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান যথেষ্ট নয়। দরকার অর্থনীতি, সমাজ, শ্রমবাজার, শিশুসুরক্ষা, নারী অধিকার এবং স্থানীয় বাস্তবতাকে একসঙ্গে বিবেচনায় নেওয়া। কারণ, একজন শিক্ষার্থীর বিদ্যালয় ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত খুব কম ক্ষেত্রেই শুধুমাত্র শিক্ষার সমস্যা, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেটা সমাজের সামগ্রিক সংকটের বহিঃপ্রকাশ।

বাংলাদেশে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার বিষয়টি কোনো নতুন ঘটনা নয়। নতুন হলো এর মাত্রা এবং এর প্রতি আমাদের অসাড়তা। বছরের পর বছর বিভিন্ন সরকারি ও আন্তর্জাতিক গবেষণায় সতর্কবার্তা এসেছে, কিন্তু সমস্যাটিকে আমরা প্রায়ই পরীক্ষার ফলাফল কিংবা ভর্তি-পরিসংখ্যানের আড়ালে ঢেকে রেখেছি। ফলে শিক্ষা ব্যবস্থার প্রকৃত স্বাস্থ্য সম্পর্কে একটি বিভ্রম তৈরি হয়েছে।

ঝরে পড়া মানেই কেবল বিদ্যালয় ছেড়ে দেওয়া নয়। এর অর্থ, একজন শিশুর সম্ভাবনার মৃত্যু। কারণ, শিক্ষা থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া মানে শুধু একটি সনদ হারানো নয়, এর সঙ্গে হারিয়ে যায় উন্নত কর্মসংস্থানের সুযোগ, স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতা, নাগরিক অংশগ্রহণের সক্ষমতা এবং প্রজন্মান্তরে দারিদ্র্য ভাঙার সম্ভাবনা।

শিক্ষার অগ্রগতি পরিমাপের ক্ষেত্রে আমরা সাধারণত ভর্তি হার, পাসের হার কিংবা জিপিএ-৫-এর সংখ্যা নিয়ে আলোচনা করি। কিন্তু একজন শিক্ষার্থী প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার পর উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত পৌঁছাতে পারল কিনা-এই প্রশ্নটি তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত। অথচ একটি দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নের প্রকৃত সূচক এখানেই লুকিয়ে থাকে।

গবেষণা বলছে, দরিদ্র পরিবারের শিশুরা ধনী পরিবারের শিশুদের তুলনায় অনেক বেশি ঝরে পড়ে। শহরের তুলনায় গ্রাম, সমতলের তুলনায় চর, হাওর, পাহাড় ও উপকূলীয় এলাকার শিক্ষার্থীরা তুলনামূলকভাবে বেশি ঝুঁকিতে থাকে। প্রতিবন্ধী শিশুরা এখনো বিদ্যালয়ে টিকে থাকার ক্ষেত্রে নানা কাঠামোগত বাধার মুখোমুখি হয়। অর্থাৎ, শিক্ষা ব্যবস্থার সংকট সবার জন্য সমান নয়, এটা বৈষম্যের ওপর দাঁড়িয়ে আছে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, শিক্ষার্থী ঝরে পড়া ও শিশুশ্রমের মধ্যে একটি প্রত্যক্ষ সম্পর্ক আছে। পরিবার যখন আয়ের সংকটে পড়ে, তখন প্রথমেই ক্ষতিগ্রস্ত হয় শিশুর শিক্ষা। একজন কিশোর যদি দিনে কয়েকশ টাকা উপার্জন করতে পারে, তাহলে অনেক দরিদ্র পরিবারের কাছে সেটাই হয়ে ওঠে বাস্তবতার কঠিন সমাধান। দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষার চেয়ে তাৎক্ষণিক আয় তখন বেশি জরুরি হয়ে দাঁড়ায়।

বাংলাদেশের শ্রমবাজারের একটি বড় অংশ অনানুষ্ঠানিক। এখানে শিশু বা কিশোরদের কাজের হিসাবও সব সময় দৃশ্যমান নয়। তারা ছোট দোকানে, গ্যারেজে, ইটভাটায়, কৃষিকাজে, পরিবহন খাতে কিংবা গৃহকর্মে যুক্ত হয়। অনেকেই কোনো সরকারি পরিসংখ্যানে ধরা পড়ে না। কিন্তু তারা সবাই একসময় কোনো না কোনো বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিল। অর্থাৎ, শিশুশ্রম কেবল শ্রমবাজারের সমস্যা নয়, এটা শিক্ষা ব্যবস্থারও ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি।

মেয়েদের ক্ষেত্রে চিত্রটি আরও জটিল। বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে আইন থাকলেও বাস্তবে অর্থনৈতিক চাপ, সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা এবং প্রচলিত সামাজিক মানসিকতার কারণে বহু কিশোরীর শিক্ষাজীবন অকালেই থেমে যায়। অনেক পরিবার এখনো মনে করে, মেয়ের উচ্চশিক্ষার চেয়ে বিয়ে দেওয়া বেশি নিরাপদ। ফলে নবম বা দশম শ্রেণিতে পৌঁছেই অনেক মেয়ের শিক্ষা শেষ হয়ে যায়। এই প্রবণতা শুধু একজন কিশোরীর অধিকারই কেড়ে নেয় না, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও অর্থনৈতিক অবস্থার ওপরও দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

আবার শুধু দারিদ্র্যই নয়, শিক্ষার মানও অনেক শিক্ষার্থীকে বিদ্যালয়বিমুখ করে তোলে। একজন শিশু যদি বছরের পর বছর বিদ্যালয়ে গিয়েও ঠিকমতো পড়তে, লিখতে কিংবা গণিতের মৌলিক দক্ষতা অর্জন করতে না পারে, তাহলে তার কাছে বিদ্যালয় ধীরে ধীরে অর্থহীন হয়ে ওঠে। তখন পরীক্ষা তার কাছে ভয়ের প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়। সে মনে করে, এই ব্যবস্থায় তার সফল হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

কোভিড-১৯ মহামারির অভিঘাতও এখনো পুরোপুরি কাটেনি। দীর্ঘ সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় বহু শিক্ষার্থী আর বিদ্যালয়ে ফিরে আসেনি। কেউ কাজে যোগ দিয়েছে, কেউ বিয়ে করেছে, কেউ পরিবারসহ স্থানান্তরিত হয়েছে, কেউ আবার পড়াশোনার ধারাবাহিকতাই হারিয়ে ফেলেছে। মহামারির সেই ক্ষত আজও শিক্ষা ব্যবস্থায় দৃশ্যমান।

আরও একটি বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে হবে। আমরা কি ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের খুঁজে বের করার কোনো কার্যকর জাতীয় ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পেরেছি? একজন শিক্ষার্থী যদি হঠাৎ বিদ্যালয়ে যাওয়া বন্ধ করে দেয়, তাহলে কে তার খোঁজ নেয়? বিদ্যালয়, স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, সমাজকল্যাণ বিভাগ, নাকি অন্য কেউ? বাস্তবে দেখা যায়, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শিক্ষার্থীর অনুপস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে যায়। পরে সে আর কখনো বিদ্যালয়ে ফিরে আসে না।

অনেক উন্নয়নশীল দেশে বিদ্যালয়ভিত্তিক আগাম সতর্কতা (Early Warning System) চালু হয়েছে। শিক্ষার্থীর উপস্থিতি কমে গেলে, পরীক্ষার ফল খারাপ হলে বা আচরণে পরিবর্তন দেখা দিলে দ্রুত পরিবার ও স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। উদ্দেশ্য একটাই-শিক্ষার্থীকে ঝরে পড়ার আগেই সহায়তা করা। বাংলাদেশেও এ ধরনের তথ্যভিত্তিক ব্যবস্থা এখন সময়ের দাবি।

কারণ, শিক্ষা থেকে হারিয়ে যাওয়া একজন শিক্ষার্থী শুধু একটি সংখ্যা নয়। ভবিষ্যতের একজন দক্ষ কর্মী, উদ্যোক্তা, শিক্ষক, চিকিৎসক, কৃষি উদ্ভাবক কিংবা সচেতন নাগরিক হওয়ার সম্ভাবনা হারিয়ে যায়। জাতীয় অর্থনীতিও এর মূল্য দেয়। কম শিক্ষিত শ্রমশক্তি নিয়ে উচ্চ আয়ের অর্থনীতি গড়া সম্ভব নয়। জনসংখ্যাকে জনসম্পদে রূপান্তর করতে হলে শিক্ষার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করাই সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ।

তাই সাত লাখ অনুপস্থিত পরীক্ষার্থীকে শুধুই একটি পরীক্ষার ঘটনা হিসেবে দেখলে চলবে না। এটা আমাদের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন তুলে ধরে-আমরা কি শুধু বিদ্যালয়ে ভর্তি করাতে সফল হয়েছি, নাকি শিক্ষার্থীদের শিক্ষিত করতেও সফল হয়েছি? এই প্রশ্নের সৎ উত্তর না খুঁজলে আগামী বছরও হয়তো নতুন করে আরও কয়েক লাখ শিক্ষার্থী নীরবে হারিয়ে যাবে, আর আমরা শুধু ফলাফলের দিন সংখ্যা গুনেই সন্তুষ্ট থাকব।

এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে হলে প্রথমেই আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন জরুরি। শিক্ষা নিয়ে আলোচনা মানেই শুধু পরীক্ষার ফল, জিপিএ-৫ কিংবা পাসের হার নয়। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো-কতজন শিক্ষার্থী শিক্ষার ধারায় টিকে থাকল, কতজন মাঝপথে হারিয়ে গেল এবং কেন হারিয়ে গেল। এই প্রশ্নগুলো শিক্ষা নীতির কেন্দ্রে আনতে না পারলে সমস্যার সমাধান হবে না।

প্রথম কাজ হওয়া উচিত একটি সমন্বিত জাতীয় শিক্ষার্থী ট্র্যাকিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা। একজন শিক্ষার্থী প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার পর থেকে উচ্চশিক্ষা বা কারিগরি শিক্ষায় প্রবেশ পর্যন্ত তার শিক্ষাযাত্রার তথ্য একটি একীভূত ডেটাবেজে সংরক্ষিত থাকা দরকার। কোনো শিক্ষার্থী দীর্ঘদিন বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকলে বা হঠাৎ পড়াশোনা ছেড়ে দিলে তাৎক্ষণিকভাবে বিদ্যালয়, উপজেলা শিক্ষা প্রশাসন, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান এবং সমাজসেবা বিভাগকে সতর্কবার্তা পাঠানোর ব্যবস্থা থাকতে হবে। এখনো এমন সমন্বিত ব্যবস্থা কার্যকরভাবে গড়ে ওঠেনি।

দ্বিতীয়ত, দরিদ্র পরিবারের জন্য শিক্ষা যেন সত্যিকার অর্থেই ব্যয়মুক্ত হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। শুধু বিনা মূল্যের পাঠ্যবই যথেষ্ট নয়। যাতায়াত, পরীক্ষার ফি, ইউনিফর্ম, ডিজিটাল শিক্ষাসামগ্রী এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয়ও বহু পরিবারের জন্য বড় বাধা। লক্ষ্যভিত্তিক শিক্ষা-সহায়তা, শর্তসাপেক্ষ নগদ ভাতা এবং ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারের জন্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির বিস্তার শিক্ষার্থী ধরে রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

গবেষণা বলছে, দরিদ্র পরিবারের শিশুরা ধনী পরিবারের শিশুদের তুলনায় অনেক বেশি ঝরে পড়ে। শহরের তুলনায় গ্রাম, সমতলের তুলনায় চর, হাওর, পাহাড় ও উপকূলীয় এলাকার শিক্ষার্থীরা তুলনামূলকভাবে বেশি ঝুঁকিতে থাকে। প্রতিবন্ধী শিশুরা এখনো বিদ্যালয়ে টিকে থাকার ক্ষেত্রে নানা কাঠামোগত বাধার মুখোমুখি হয়। অর্থাৎ, শিক্ষা ব্যবস্থার সংকট সবার জন্য সমান নয়, এটা বৈষম্যের ওপর দাঁড়িয়ে আছে।

তৃতীয়ত, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার পরিবেশকে আরও আকর্ষণীয় ও জীবনঘনিষ্ঠ করতে হবে। এখনো আমাদের শ্রেণিকক্ষের বড় অংশ মুখস্থনির্ভর পরীক্ষা-কেন্দ্রিক সংস্কৃতির মধ্যে আবদ্ধ। একজন শিক্ষার্থী যদি বিদ্যালয়ে নিজের প্রতিভা প্রকাশের সুযোগ না পায়, যদি ব্যর্থতার ভয়ই তার সবচেয়ে বড় অভিজ্ঞতা হয়ে ওঠে, তাহলে বিদ্যালয়ের সঙ্গে তার সম্পর্ক দুর্বল হবেই। শিক্ষা এমন হতে হবে, যেখানে সৃজনশীলতা, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা, প্রযুক্তি-জ্ঞান, খেলাধুলা, সংস্কৃতি ও মানসিক সুস্থতা সমান গুরুত্ব পায়।

চতুর্থত, বাল্যবিবাহ ও শিশুশ্রমের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি পরিবারভিত্তিক সামাজিক সহায়তা জোরদার করতে হবে। কেবল আইন করে এই সমস্যা দূর করা যায় না। একটি দরিদ্র পরিবার যদি মনে করে সন্তানের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া তার পক্ষে অসম্ভব, তাহলে আইন নয়, সহায়তাই তাকে সিদ্ধান্ত বদলাতে পারে।

পঞ্চমত, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে মূলধারার মর্যাদা দিতে হবে। আমাদের সমাজে এখনো সাধারণ শিক্ষাকেই সাফল্যের একমাত্র পথ হিসেবে দেখা হয়। ফলে যেসব শিক্ষার্থী প্রচলিত একাডেমিক ধারায় ভালো করতে পারে না, তাদের অনেকেই পড়াশোনা ছেড়ে দেয়। অথচ আধুনিক অর্থনীতিতে দক্ষতা-ভিত্তিক শিক্ষার গুরুত্ব দ্রুত বাড়ছে। শিক্ষার্থীদের আগ্রহ, সক্ষমতা ও শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বহুমুখী শিক্ষার পথ তৈরি করতে পারলে ঝরে পড়ার হারও কমবে।

একই সঙ্গে শিক্ষকদের ভূমিকাও নতুনভাবে ভাবতে হবে। একজন শিক্ষক শুধু পাঠদানকারী নন, তিনি একজন শিক্ষার্থীর সবচেয়ে কাছের পর্যবেক্ষক। কোনো শিক্ষার্থী কেন হঠাৎ অনুপস্থিত হচ্ছে, কেন তার ফল খারাপ হচ্ছে, কেন সে আগের মতো অংশগ্রহণ করছে না-এসব পরিবর্তন দ্রুত শনাক্ত করার সক্ষমতা ও সুযোগ শিক্ষকদের দিতে হবে। বিদ্যালয়কে শুধু পাঠদানের প্রতিষ্ঠান নয়, শিক্ষার্থীকে ধরে রাখার প্রতিষ্ঠান হিসেবেও গড়ে তুলতে হবে।

সবচেয়ে বড় কথা, আমাদের পরিসংখ্যানের ভাষাও বদলাতে হবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় যখন পরীক্ষার ফল প্রকাশ করবে, তখন শুধু পাসের হার নয়, আগের বছরের নিবন্ধিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে কতজন পরীক্ষায় অংশ নিতে পারল না, কতজন মাঝপথে ঝরে পড়ল এবং তাদের ফিরিয়ে আনতে কী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে-সেসব তথ্যও নিয়মিত প্রকাশ করা উচিত। এতে সমস্যাটি দৃশ্যমান হবে, জবাবদিহিও বাড়বে।

কারণ, একটি রাষ্ট্রের সাফল্য কেবল তার মেধাবীদের অর্জনে নয়-যারা পিছিয়ে পড়ে, তাদের কতটা এগিয়ে আনতে পারে, তার ওপরও নির্ভর করে। যে শিক্ষার্থী পরীক্ষার হলে পৌঁছাতে পারেনি, তার দায় শুধু তার পরিবারের নয়, রাষ্ট্রেরও। সে হারিয়ে গেলে ক্ষতি শুধু একটি পরিবারের নয়, ক্ষতি পুরো দেশের।

বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের নতুন স্বপ্ন দেখছে। উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশ, দক্ষ জনশক্তি, চতুর্থ শিল্পবিপ্লব, স্মার্ট অর্থনীতি-এসব লক্ষ্য অর্জনের কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু সেই স্বপ্ন বাস্তব হবে কীভাবে, যদি প্রতিবছর লাখ লাখ তরুণ শিক্ষার মূলধারা থেকে ছিটকে পড়ে? দক্ষ জনশক্তি কেবল প্রশিক্ষণকেন্দ্রে তৈরি হয় না, তার ভিত্তি তৈরি হয় বিদ্যালয়ে। আর সেই ভিত্তিতেই যদি ফাটল ধরে, তাহলে উন্নয়নের সুউচ্চ অট্টালিকাও একসময় দুর্বল হয়ে পড়বে।

সাত লাখ অনুপস্থিত পরীক্ষার্থী তাই কেবল একটি সংখ্যা নয়, এটা একটা সতর্কসংকেত। এই সংকেত আমাদের জানিয়ে দিচ্ছে, শিক্ষাব্যবস্থার বাইরে আরেকটি বাংলাদেশ তৈরি হচ্ছে-যেখানে স্বপ্ন অসমাপ্ত, সম্ভাবনা অপচয়িত এবং ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। আমরা যদি এখনই সেই শিশু-কিশোরদের খুঁজে না ফিরি, তাদের আবার শিক্ষার পথে ফিরিয়ে আনতে না পারি, তাহলে একদিন হয়তো বুঝতে হবে-আমরা শুধু সাত লাখ শিক্ষার্থী

দীপু মাহমুদ : কথাসাহিত্যিক ও উন্নয়নকর্মী
[email protected]