ফুটবল শুধু একটি খেলা নয়; এটি বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ভাষা। ভাষা, ধর্ম, জাতি, বর্ণ কিংবা রাজনৈতিক মতাদর্শের বিভাজন অতিক্রম করে যে কয়েকটি বিষয় সমগ্র মানবজাতিকে একই আবেগে একত্রিত করতে পারে, ফুটবল তার মধ্যে অন্যতম।
২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপ আবারও প্রমাণ করেছে যে পৃথিবী যতই বিভক্ত হোক না কেন, মানুষের মধ্যে ঐক্যের আকাঙ্ক্ষা কখনো মুছে যায় না। বিশ্ব যখন যুদ্ধ, ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং জলবায়ু সংকটের মতো বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, তখন ফুটবলের বিশ্বায়ন আমাদের সামনে এক নতুন আশার বার্তা নিয়ে এসেছে মানবতার শক্তি এখনো অপরাজেয়।
২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপ ছিল ইতিহাসের এক যুগান্তকারী অধ্যায়। প্রথমবারের মতো ৪৮টি জাতীয় দল এই আসরে অংশগ্রহণ করেছে। এর ফলে বিশ্বের আরও অনেক দেশ ফুটবলের সর্বোচ্চ মঞ্চে নিজেদের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পেয়েছে। এটি শুধু একটি ক্রীড়া সংস্কারের সিদ্ধান্ত নয়; বরং বিশ্বায়নের নতুন বাস্তবতার প্রতিফলন।
আন্তর্জাতিক ফুটবল আর কয়েকটি শক্তিশালী দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বরং আফ্রিকা, এশিয়া, লাতিন আমেরিকা, ওশেনিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর অংশগ্রহণ বিশ্ব ফুটবলকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করেছে। এর চেয়েও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, ফিফা ইতিমধ্যে ২০৩০ সালের বিশ্বকাপকে আরও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, যেখানে ৬৪টি দেশের অংশগ্রহণের ধারণা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচিত হচ্ছে।
জলবায়ু পরিবর্তন, মহামারি, খাদ্য নিরাপত্তা কিংবা মানবিক বিপর্যয়ের মতো সংকট কোনো সীমান্ত মানে না। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায়ও প্রয়োজন একই ধরনের বৈশ্বিক সংহতি, যা আমরা ফুটবলের বিশ্বমঞ্চে প্রত্যক্ষ করি।
এই পরিবর্তন ফুটবলের ক্রমবর্ধমান বিশ্বায়নকে আরও সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরে। যত বেশি দেশ বিশ্বকাপে অংশ নেবে, তত বেশি মানুষ নিজেদেরকে বৈশ্বিক এই উৎসবের অংশ হিসেবে অনুভব করবে। এটি শুধু ক্রীড়ার বিস্তার নয়; বরং বৈশ্বিক অন্তর্ভুক্তি, বহুত্ববাদ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রতীক।
বিশ্বকাপ চলাকালে একটি বিস্ময়কর দৃশ্য আমরা প্রত্যক্ষ করি। রাজনৈতিক বিরোধ, কূটনৈতিক উত্তেজনা, অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা কিংবা মতাদর্শগত সংঘাত সবকিছু যেন সাময়িকভাবে আড়ালে চলে যায়। যুদ্ধরত দেশের মানুষও একই ম্যাচ দেখে উল্লাস করে, প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রের নাগরিকরাও একই খেলোয়াড়ের অসাধারণ দক্ষতায় করতালি দেয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোটি কোটি মানুষ একই মুহূর্তে একই আবেগ ভাগাভাগি করে। ফুটবল এমন একটি বৈশ্বিক পরিসর তৈরি করে, যেখানে মানুষের পরিচয় প্রথমে একজন সমর্থক, তারপর একজন নাগরিক।
আজকের পৃথিবী কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন এক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, বৈশ্বিক বাণিজ্যযুদ্ধ, খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তাহীনতা, শরণার্থী সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন এবং প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা বিশ্বকে ক্রমশ বিভক্ত করে তুলছে।
আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। অনেক ক্ষেত্রেই জাতীয় স্বার্থ মানবিক মূল্যবোধকে ছাপিয়ে যাচ্ছে। ফলে বিশ্বব্যবস্থায় সহযোগিতার পরিবর্তে প্রতিযোগিতা, সংলাপের পরিবর্তে অবিশ্বাস এবং মানবিকতার পরিবর্তে কৌশলগত হিসাব-নিকাশ প্রাধান্য পাচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে ফুটবল আমাদের একটি মৌলিক শিক্ষা দেয় প্রতিযোগিতা থাকতে পারে, কিন্তু প্রতিদ্বন্দ্বিতা কখনো মানবিকতাকে ধ্বংস করতে পারে না। মাঠে দুই দল জয়ের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করে, কিন্তু খেলা শেষে তারা পরস্পরকে সম্মান জানায়।
বিজয়ী ও পরাজিত উভয়ই একই নিয়ম মেনে খেলে, একই রেফারির সিদ্ধান্ত মেনে নেয় এবং একই খেলাধুলার চেতনার প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও এই মূল্যবোধ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য থাকবে, স্বার্থের সংঘাত থাকবে, কিন্তু তা কখনো মানবতার চেয়ে বড় হতে পারে না।
বিশ্বকাপের সময় আমরা দেখেছি, কোটি কোটি মানুষ নিজ নিজ দেশের পতাকা ধারণ করলেও তারা একই সঙ্গে বৈশ্বিক ফুটবল পরিবারের সদস্য। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে জাতীয় পরিচয় এবং বৈশ্বিক নাগরিকত্ব একে অপরের পরিপূরক হতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তন, মহামারি, খাদ্য নিরাপত্তা কিংবা মানবিক বিপর্যয়ের মতো সংকট কোনো সীমান্ত মানে না। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায়ও প্রয়োজন একই ধরনের বৈশ্বিক সংহতি, যা আমরা ফুটবলের বিশ্বমঞ্চে প্রত্যক্ষ করি।
বিশ্বায়নের সমালোচনা যেমন রয়েছে, তেমনি এর ইতিবাচক দিকও অনস্বীকার্য। ফুটবলের বিশ্বায়ন দেখিয়েছে যে বৈচিত্র্যকে গ্রহণ করেও ঐক্য গড়ে তোলা সম্ভব। একটি বিশ্বকাপে শতাধিক ভাষার মানুষ, ভিন্ন সংস্কৃতির সমর্থক এবং নানা ধর্মবিশ্বাসের নাগরিক একই আনন্দে অংশগ্রহণ করেন। এই বহুত্ববাদই ভবিষ্যতের শান্তিপূর্ণ বিশ্বের ভিত্তি হতে পারে। কারণ প্রকৃত শান্তি তখনই প্রতিষ্ঠিত হয়, যখন মানুষ পার্থক্যকে সংঘাতের কারণ হিসেবে নয়, বরং পারস্পরিক সমৃদ্ধির উৎস হিসেবে বিবেচনা করে।
এখানে আন্তর্জাতিক সংস্থা, রাষ্ট্র এবং নাগরিক সমাজের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা রয়েছে। যদি ফুটবল কয়েক সপ্তাহের জন্য পুরো বিশ্বকে একই আবেগে যুক্ত করতে পারে, তবে বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় কেন একই ধরনের সহযোগিতা সম্ভব হবে না?
জলবায়ু পরিবর্তন রোধে, দারিদ্র্য হ্রাসে, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কিংবা যুদ্ধ বন্ধে যদি বিশ্ব একই আন্তরিকতা, একই সমন্বয় এবং একই মানবিক চেতনা নিয়ে কাজ করে, তবে বর্তমানের বহু সংকটই কার্যকরভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব।
বাংলাদেশের জন্যও এই অভিজ্ঞতা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বিশ্বকাপ এলেই বাংলাদেশের শহর, গ্রাম, বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং কর্মস্থল উৎসবমুখর হয়ে ওঠে। আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, ফ্রান্স, স্পেন কিংবা অন্যান্য দলের সমর্থকদের মধ্যে প্রাণবন্ত প্রতিযোগিতা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা আনন্দ, বন্ধুত্ব এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে।
এটি আমাদের সামাজিক সম্প্রীতির একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। এই চেতনাকে যদি আমরা শিক্ষা, সামাজিক উন্নয়ন, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং মানবিক সহমর্মিতার ক্ষেত্রে কাজে লাগাতে পারি, তবে জাতীয় ঐক্য আরও সুদৃঢ় হবে।
আজকের পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রয়োজন নতুন অস্ত্র নয়, নতুন আস্থার। নতুন প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়, নতুন সহযোগিতার। নতুন বিভাজন নয়, নতুন মানবিক সংহতির। বিশ্বকাপ আমাদের সেই সম্ভাবনার বাস্তব উদাহরণ দেখিয়েছে।
ফুটবলের বিশ্বায়ন আমাদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয় সুযোগের বিস্তারই অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের ভিত্তি। ৪৮ দলের বিশ্বকাপ যেমন নতুন দেশগুলোর জন্য সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত করেছে, তেমনি ৬৪ দলের সম্ভাব্য বিশ্বকাপ আরও বেশি দেশকে বৈশ্বিক মঞ্চে নিজেদের সামর্থ্য প্রদর্শনের সুযোগ করে দিতে পারে। আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাতেও উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত দেশগুলোর কণ্ঠস্বরকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। একটি ন্যায়ভিত্তিক ও অংশগ্রহণমূলক বিশ্বব্যবস্থা ছাড়া টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।
আজকের পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রয়োজন নতুন অস্ত্র নয়, নতুন আস্থার। নতুন প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়, নতুন সহযোগিতার। নতুন বিভাজন নয়, নতুন মানবিক সংহতির। বিশ্বকাপ আমাদের সেই সম্ভাবনার বাস্তব উদাহরণ দেখিয়েছে। যখন কোটি কোটি মানুষ একই খেলার আনন্দে একত্রিত হতে পারে, তখন একই মানবিক লক্ষ্যেও তারা একত্রিত হতে পারে। ফুটবল আমাদের শিখিয়েছে, বৈচিত্র্যের মধ্যেও ঐক্য সম্ভব; প্রতিযোগিতার মধ্যেও সম্মান সম্ভব; আর ভিন্নতার মধ্যেও সহাবস্থান সম্ভব।
অতএব, ফুটবলের বিশ্বায়নকে শুধু একটি ক্রীড়া ঘটনা হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি আমাদের সময়ের জন্য একটি নৈতিক ও রাজনৈতিক শিক্ষা। যদি বিশ্বকাপের সেই সম্মিলিত চেতনাকে আমরা যুদ্ধ বন্ধে, মানবিক সংকট মোকাবিলায়, জলবায়ু পরিবর্তন রোধে এবং বৈশ্বিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় কাজে লাগাতে পারি, তবে আরও শান্তিপূর্ণ, সহনশীল এবং মানবিক একটি বিশ্ব গড়ে তোলা সম্ভব। মানবতার এই অপরাজেয় শক্তিই হতে পারে আগামী বিশ্বের সবচেয়ে বড় বিজয় যেখানে ফুটবলের মতোই পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং একই বৈশ্বিক পরিবারের সদস্য।
ড. সুজিত কুমার দত্ত : অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও পরিচালক, হংকং রিসার্চ সেন্টার ফর এশিয়ান স্টাডিজ-বাংলাদেশ সেন্টার
[email protected]
