শেষ হলো মহাযজ্ঞ। বিশ্বকাপের। অসামান্য মঞ্চ। আলোকোজ্জ্বল। এখানেই মঞ্চস্থ হয় নব্বই মিনিটের নাটক। এরপর বাতাসের সঙ্গে ভেসে আসে দুটো করে শব্দ। জয়, পরাজয়। বিজয়ী, বিজিত। তার সঙ্গে হাসি-কান্নার হীরে-পান্না ঝরতে থাকে নীরবে। কোটি কোটি মানুষ এই নব্বই মিনিটের উত্তেজিত দর্শক। তাদের ভেতরকার ঐক্য ওই সৌন্দর্যের দ্বিধাহীন অবলোকনের আনন্দময় ঔৎসুক্যে।
যে মহত্তম লক্ষ্যকে সামনে রেখে শত শত বছর আগে ফুটবলের যাত্রা। তার ভিত্তি ছিল জাতি-ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে সর্বমানবের বিশ্বজোড়া ঐক্য-সাধনা। সেই ভিত্তিমূলের ভেতরেই আজ চলছে সেরা বিশ্ব-বৈশ্যদের সমান্তরাল, ভয়ংকর লোভনীয় বাণিজ্যিক প্রয়াস, যেখানে তারা বহু শতভাগ সফল।
তাদের সাফল্যের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নিকৃষ্টতম বাজিকরদের লোলুপ জুয়াবাজির রমরমা কারবার। আর এর ফলেই মাঠের ভেতর ঢুকেছে সেই জুয়ার ঘোলা জোয়ার। তার ফলে, মাঠে সৌন্দর্য সৃজনের বিপরীতে আগেই ভাগ্য নির্ধারিত ম্যাচের কুশলী, ছন্দময়, দক্ষ, উদ্ভাবনী প্রতিভারা পরাজয়ের গ্লানি ভুলতে নানান অসুন্দরের জন্ম দিচ্ছে বহুকাল যাবৎ।
আদিম সাম্যবাদী সমাজব্যবস্থার কথা আমরা শুনেছি। তখন মানুষের মুখগুলো ছিল অন্যসব মুখদের প্রতি নিবদ্ধ আর পরস্পরের প্রতি যত্নবান, মানুষগুলো মিলেমিশে শিকারলব্ধ খাবারদাবার ভাগ করে খেয়েছে। একসঙ্গে গান আর নাচ করেছে। অন্যের সম্পদ কুক্ষিগত করার কু-মতলব তাদের মনে উদিত হয়নি।
সমাজে বুদ্ধিমান মানুষের জন্ম হওয়ার পর থেকে সমাজ বিকাশের নানা স্তর পেরিয়ে বিংশ শতাব্দীর প্রথমদিকের অর্ধশতাব্দীর দু-দুটো বিশ্বযুদ্ধের ধাক্কা পৃথিবীর মানুষদের টালমাটাল করে দিয়েছে। আর নতুন নতুন আরও আধুনিক যন্ত্রাদি বিকাশ ও আবিষ্কারের ফলে যন্ত্রণার আরও নতুন নতুন মুখ-মাত্রা আবির্ভূত হচ্ছে।
পুরো পৃথিবীটা ভয়ংকর অস্থিরতার ভেতর পড়ে গেছে। সারা বিশ্ব জুড়ে যুদ্ধ, হত্যাযজ্ঞ, নতুন আবির্ভূত মারণাস্ত্রের ব্যবহার সব মানুষেরই বিরুদ্ধে, মনুষ্যত্বের বিরুদ্ধেই, মানবিকতার বিপক্ষে।
জাতিগত শ্রেষ্ঠত্বের পথ বেয়ে আসা প্রতিযোগিতার আবর্ত আবিল করে ফেলেছে গোটা বিশ্বকে। আজ থেকে পঁচাত্তর বছর আগেই আমাদের সব আলোর উজ্জ্বলতম উৎস রবীন্দ্রনাথ তার শেষ ভাষণে সভ্যতার সংকটের কারণ ব্যাখ্যা করেছিলেন।
সেখানেই ছিল এক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এই শ্রেষ্ঠত্ব দাবির নতুন কথা আজ শুনি এভাবে—‘আমেরিকা ফার্স্ট’। পৃথিবীতে প্রথম হওয়া, দেশের বাজার দখলে প্রথম হওয়া, খেলাধুলায় প্রথম হওয়া, ক্লাসে প্রথম হওয়া, ভোটে প্রথম হওয়া অর্থাৎ সব জায়গায় এই প্রতিযোগিতামূলক কর্মকাণ্ড চলছে। ফাঁকফোকরে দু’চারটা ব্যতিক্রম বাদে সবখানেই যে অন্যায্য জয়ের এক গা-জোয়ারি মনোভাব আর তার পক্ষে আমাদের সাফাই গাওয়ার মনোভঙ্গী, তাই আমাদের সাধারণ আমমানুষকে করে তুলছে ক্রমাগত অসহায়, উদ্দেশ-উদ্দেশ্যহীন, ঠাঁইনাড়া, বানজারানের নিয়তি বিশ্বাসী প্রতিনিধি।
অস্থির পৃথিবীর নানা প্রান্তের বেশকিছু দেশে চলছে নতুন প্রজন্মের ক্রমাগত ক্ষোভ-বিক্ষোভ। রাষ্ট্রের পেটোয়াবাহিনী হিংসা ছড়ানো অমানবিক নির্মমতায় সেইসব আন্দোলন দমনের প্রয়াস চালাচ্ছে। প্রতিবেশী দেশ ভারতে, সম্প্রতির ছাত্র-আন্দোলন দমনের সময় লাঠিচার্জ-টিয়ারগ্যাস ব্যবহারের পাশাপাশি বিক্ষোভকারী ছাত্রীদের গোপনাঙ্গে লাঠি প্রবেশ করানোর মতো নিষ্ঠুরতাও প্রদর্শন করেছে বলে কোনো কোনো প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। পুলিশকেও শিক্ষার্থীদের আক্রমণের শিকার হতে হচ্ছে।
শিক্ষার্থীরা আবার নতুন করে তাদের নির্ধারিত নেতার বিরুদ্ধেই নতুন করে আন্দোলন শুরু করেছে নেপালে। পাকিস্তান আবার নতুন করে ভাঙছে। বেলুচিস্তান স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছে। ইরান-আমেরিকা-ইসরায়েলের সংকট কাটেনি। আফ্রিকাও কোথাও কোথাও বেশ অশান্ত। ভিন্ন দেশের নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট আর তার স্ত্রীকে সেনা পাঠিয়ে তুলে নিয়ে আসার উদাহরণ তৈরি তো বহু আগেই হয়েছে। এই নতুন ধরনের শক্তিমত্তা প্রকাশের অবাক কাল আমাদের পার হতে হচ্ছে।
আরও পড়ুন
একজন সাধারণ মানুষের, যার এক সংবেদনশীল মন আছে, তার পক্ষে এই আবিল জগতের রক্ত আর নৃশংসতার বাইরে যেতে গেলে তো তার, সংকুচিত আর তার জন্য ছোট হয়ে আসা নিজস্ব জগতের ভেতরে ঢুকে জীবনানন্দের মতো ভাবতে হবে—
‘যারা অন্ধ সবচেয়ে বেশি আজ চোখে দেখে তারা’
কিংবা
“সকল লোকের মাঝে ব’সে
আমার নিজের মুদ্রাদোষে
আমি একা হতেছি আলাদা?
আমার চোখেই শুধু ধাঁধা?
আমার পথেই শুধু বাধা?”
এমন বিহ্বলতা, নিরর্থক বোধে ম্লান, হতাশ, বেদনাবিদ্ধ আর আত্মহননকামিতার অন্ধকার চৈতন্য নিয়ে একজন মানুষের পক্ষে অপরিমেয় সমাজ-বিযুক্ততা আর মনুষ্য-বিচ্ছিন্নতার নঞর্থক ভাবনা ছাড়া আর কোন বোধইবা ক্রিয়াশীল হবে?
উৎপাদন সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হলেই মানুষগুলোর এমন দশা হয়, এসব বইয়ে আছে, আমরা জানি। রাজনৈতিক জীবন যাপন করে, রাজনীতি-যুক্ত থেকেও অনেকে এই বিযুক্ততার যন্ত্রণা সহ্য করেছেন, বাংলা সাহিত্যের অন্তত দুইজন লেখককে আমরা জানি। তাদের মতো শক্ত মানসিকতার প্রতিভাও বিযুক্ত বিচ্ছিন্ন ছিলেন, হয়েছেন। তাদের অর্ধশতাব্দী-পেরোনো সময় তো আরও জটিল হয়েছে, পৃথিবী আরও নিষ্ঠুরতার পথ ধরেছে।
এই সার্বিক বিশ্বসমুদ্র মন্থনের কালবেলায় বাণিজ্য-বাসুকির রজ্জু মোচড়ের উথালপাতালে ক্রমাগত বিষ নিঃশ্বাসের তীব্রতা অসহ্য হচ্ছে সাধারণ মানুষের কাছে। দম নিতে পারছে না। অনিবার্য মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে এই নতুনতর বিশ্বব্যবস্থাকে অভিসম্পাত দিচ্ছে। মুক্তিও চাইছে দু’হাত তুলে। আর এর পথ বেয়ে নানা ধর্মের ধ্বজাধারীরা, কালনাগের মতো সূক্ষ্ম আর বর্তমানে প্রায় স্থূল শরীর নিয়ে সমাজের নানা রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়েছে।
একদিকে অর্থনৈতিক চাপ, সামাজিক অসাম্য আর সাংস্কৃতিক সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি ধর্মের সর্বগ্রাসী চাপ মানুষকে অবশ অবোধ করে তুলছে। সে উত্তেজিত সবসময়, সবকিছুতে। সেই উত্তেজনা মেটানোর একটা পথ সে খুঁজে নিয়েছে সাত সমুদ্র তের নদীর পারের ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনার সমর্থনের মাধ্যমে শুধু নয়, স্পেন বা জার্মান দলের বিজয় ব্যর্থতা তার কাছে ততটা জরুরি নয়, জরুরি প্রতিপক্ষ সমর্থকদের নিয়ে মিম বানানো, গালাগাল করা, চিৎকার আর চেঁচামেচি করা, মারপিট করা, প্রয়োজনে দল হেরে গেলে আবেগ না সামলে আত্মহত্যা করা।
ফিরি আবার সেই ফুটবলে, এই বিশ্বকাপে ছন্নছাড়া ব্রাজিলকে দেখে মন খারাপ হয়েছিল। পুরোনো ব্রাজিল সমর্থনকারী হিসেবে ওইটুকুই। ফ্রান্সকে ছন্নছাড়া, ছন্দহারা, বিপর্যস্ত ও বিধ্বস্ত দেখে খারাপ লেগেছে। আর্জেন্টিনার কথা আর না বলি! খেলোয়াড়দের যে খেলোয়াড়সুলভ স্পিরিট দেখাতে হয়, তারা দুই-দুইবার বিশ্বকাপ জিতেও সেটা দেখাতে ব্যর্থ হয়েছে।
ওই দুটো ম্যাচে দুটো আলাদা টিম হেরেছিল তাদের কাছে। তারা তো তেমন আচরণ করেনি, এবার হারে আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়, স্টাফদের যা করতে দেখেছে সারা বিশ্ব। বিস্ময়কর মানুষ আমরা।
এত দার্শনিক, বৈজ্ঞানিক, সাহিত্যের দিকপাল, চিন্তাবিদ পৃথিবীতে জন্মেছেন আর পৃথিবীকে এগিয়ে দিয়েছেন বলে জানতাম এতকাল, সে জানা তবে ভুল ছিল? আমাদের ভাষার এক অসামান্য কবি তার এক কবিতার শুরু করেছিলেন এই বলে যে—
‘কতদূর এগোলো মানুষ?’
এই প্রশ্ন রেখে কবির মতো আমিও জিজ্ঞেস করি, আসলে কতটা?
আমাদের বর্বরতাতো এভারেস্ট ছাড়িয়ে আকাশের দিকে ধাবমান। আকাশ মানে তো শূন্যতা। তবে কি আমরা তাই ছুঁতে চাইছি!
তুষার দাশ : কবি, প্রাবন্ধিক, সমালোচক
