বিজ্ঞাপন

বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস ও বাংলাদেশ পরিস্থিতি

বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস ও বাংলাদেশ পরিস্থিতি

হেপাটাইটিস-এর শাব্দিক অর্থ হলো লিভার বা যকৃতের সংক্রমণ বা প্রদাহ। যকৃত বাংলা শব্দ হলেও বাংলাদেশে ইংরেজি লিভার শব্দটি সর্বমহলে বোধগম্যতা ও গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। বরং সাধারণ মানুষ যকৃত শব্দের চেয়ে লিভারকে সহজে চিনতে ও বুঝতে পারে, অনেকটা ছায়াছবির চেয়ে সিনেমা যেমন সাধারণের নিকট বেশি সহজবোধ্য।

একধরনের ভাইরাস দ্বারা লিভার আক্রান্ত হয়। এদেরকে হেপাটাইটিস ভাইরাস বলে। এই ভাইরাসের মোট পাঁচটি ধরন রয়েছে। এরা হচ্ছে হেপাটাইটিস এ, বি, সি, ডি এবং ই ভাইরাস। প্রতিবছর হেপাটাইটিস ভাইরাসের সংক্রমণে সারা বিশ্বে বিপুল সংখ্যক মানুষ অসুস্থ হয় যাদের একটা অংশ মৃত্যুবরণ করে। 

অবস্থা এতটা শঙ্কাজনক অবস্থায় পৌঁছে গিয়েছে যে সমগ্র পৃথিবীর সব মানুষকে হেপাটাইটিসের বিরুদ্ধে সচেতন করার লক্ষ্যে বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস ঘোষণা করা হয়েছে।

প্রতিবছর ২৮ জুলাই বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস পালন করা হয়। ২০০৮ সালের ২৮ জুলাই বিশ্ব হেপাটাইটিস অ্যালায়েন্সের উদ্যোগে প্রথমবার বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস পালিত হয়। এরপর ২০১০ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আনুষ্ঠানিকভাবে ২৮ জুলাইকে বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে। 

হেপাটাইটিস বি ভাইরাসের আবিষ্কারকর্তা হলেন বিজ্ঞানী ড. বারুক স্যামুয়েল ব্লুমবার্গ। তিনি ১৯৬৩ থেকে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত বিস্তৃত গবেষণার মাধ্যমে এই ভাইরাসটি শনাক্ত করেন। ১৯৬৯ সালে ড. ব্লুমবার্গ ও মাইক্রোবায়োলজিস্ট ড. আরভিং মিলম্যান হেপাটাইটিস বি ভাইরাসের টিকা আবিষ্কার করেন।

এই যুগান্তকারী আবিষ্কারের জন্য ১৯৭৬ সালে ড. বারুক স্যামুয়েল ব্লুমবার্গ নোবেল প্রাইজ পান। ২৮ জুলাই হলো ড. ব্লুমবার্গের জন্মদিন। এই মহান বিজ্ঞানীকে সম্মান জানানোর জন্য ২৮ জুলাইকে বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস হিসেবে পালন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।

মানুষকে হেপাটাইটিস সম্পর্কে সচেতন করা, টিকাদানের মাধ্যমে হেপাটাইটিস প্রতিরোধ করা, পরীক্ষার মাধ্যমে রোগ শনাক্ত করা এবং চিকিৎসা গ্রহণের জন্য সবাইকে উদ্বুদ্ধ করার লক্ষ্যে প্রতিবছর এই দিনটি পালন করা হয়।

হেপাটাইটিসকে নীরব ঘাতক বলা হয়। কারণ এই রোগটি বছরের পর বছর কোনো ধরনের উপসর্গ বা লক্ষণ তৈরি না করে লিভারে বাস করে এবং লিভারের ক্ষতি করতে থাকে।

বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস ২০২৬-এর প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে—“Hepatitis : Let's break down” যার বাংলা অর্থ হলো, হেপাটাইটিস: আসুন বাধাগুলো ভেঙে ফেলি। দিবসটির মূল লক্ষ্য হচ্ছে—

১। সচেতনতা বৃদ্ধি: হেপাটাইটিস এ থেকে ই পর্যন্ত সবধরনের ভাইরাস সম্পর্কে মানুষ সঠিক বৈজ্ঞানিক তথ্য জানানো।

২। বাধা দূর করা: হেপাটাইটিসের পরীক্ষা ও চিকিৎসাসেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে সব ধরনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাধা অপসারণ করা।

৩। সময়মতো পরীক্ষা নিশ্চিত করা: কোনো ধরনের লক্ষণ ছাড়াই হেপাটাইটিস ভাইরাস দ্বারা লিভার আক্রান্ত হতে পারে। তাই লিভার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আগেই পরীক্ষার নিশ্চয়তা বিধান করা।

৪। টিকাদান ও চিকিৎসা: হেপাটাইটিস এ ও বি-এর বিরুদ্ধে টিকা পাওয়া যায়। এই দুটি বিশেষ করে হেপাটাইটিস বি-র টিকাদান নিশ্চিত করা। এছাড়া সবধরনের হেপাটাইটিস ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা সহজলভ্য করা।

লিভার সিরোসিস ও লিভার ক্যান্সারের অন্যতম কারণ হচ্ছে ভাইরাসজনিত হেপাটাইটিস। হেপাটাইটিসকে নীরব ঘাতক বলা হয়। কারণ এই রোগটি বছরের পর বছর কোনো ধরনের উপসর্গ বা লক্ষণ তৈরি না করে লিভারে বাস করে এবং লিভারের ক্ষতি করতে থাকে। যখন লক্ষণ প্রকাশ পায় তখন আর তেমন কিছু করার থাকে না। পাঁচ ধরনের হেপাটাইটিস ভাইরাসের আক্রমণের পথ এবং ধরণে ভিন্নতা রয়েছে। 

হেপাটাইটিস এ এবং ই ভাইরাস প্রধানত পানি ও খাদ্যের মাধ্যমে মানবশরীরে প্রবেশ করে। বাংলাদেশের খাবারের পানি প্রায়শই অনিরাপদ। ওয়াসার পাইপ লিকেজ, পয়ঃনিষ্কাশনের ড্রেনেজ লাইনের সাথে খাবার পানির মিশ্রণের কারণে হেপাটাইটিস এ ও ই-র বিস্তার ঘটে।

বর্ষা, বন্যা ও বৃষ্টির  কারণে পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব অত্যন্ত সাধারণ ঘটনা। খোলা খাবার তৈরিতে অনিরাপদ পানির ব্যবহারও অতি সাধারণ ঘটনা। সাধারণত হেপাটাইটিস এ ও ই ভাইরাসের সংক্রমণ তীব্র এবং স্বল্পমেয়াদি হয়। বিশ্রাম, সুষম খাবার, পর্যাপ্ত তরল খাবার এবং তাজা ফলমূল খাওয়ার মাধ্যমে অধিকাংশ রোগী ভালো হয়ে যায়।

তবে কখনো কখনো লিভার ফেইলিউর বা লিভারের অকার্যকারিতা হয়ে যেতে পারে। এতে রোগীর মৃত্যু পর্যন্ত ঘটতে পারে। গর্ভবতী নারীর জন্য হেপাটাইটিস ই ভাইরাসের আক্রমণ মারাত্মক হয়ে উঠতে পারে। এতে গর্ভবতী নারীর লিভার বিকল হয়ে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।

হেপাটাইটিস বি, সি এবং ডি ভাইরাসগুলো রক্ত ও দেহরসের মাধ্যমে সংক্রমিত হয়। এই ভাইরাসগুলোর সংক্রমণ দীর্ঘমেয়াদি এবং মারাত্মক। এগুলোর আক্রমণে লিভার সিরোসিস ও লিভার ক্যানসারের মতো মতো জীবনঘাতী রোগ হয়।

গবেষণায় দেখা গিয়েছে, অ্যাকিউট বা তীব্র হেপাটাইটিসের ৩৫ শতাংশ, ক্রনিক বা দীর্ঘস্থায়ী হেপাটাইটিসের ৭৫ শতাংশ, লিভার সিরোসিসের ৬০ শতাংশ এবং লিভার ক্যানসারের ৬৫-৭০ শতাংশ কেবলমাত্র হেপাটাইটিস বি ভাইরাসের সংক্রমণের জন্য হয়ে থাকে। এই জাতীয় রোগগুলো শুধু স্বাস্থ্য সমস্যাই নয়, অর্থনৈতিক সমস্যাও সৃষ্টি করে। এইসব রোগের চিকিৎসা বেশ ব্যয়বহুল। অনেক পরিবার এসব রোগের চিকিৎসা করতে গিয়ে নিঃস্ব হয়ে যায়।

বাংলাদেশের চিত্রটিও যথেষ্ট উদ্বেগজনক। বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৫ সালের বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবসে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রায় এক কোটি মানুষ হেপাটাইটিস বি ও সি-এ আক্রান্ত। এই সংখ্যা দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬ শতাংশ।

হেপাটাইটিস এ এবং ই ভাইরাস প্রধানত পানি ও খাদ্যের মাধ্যমে মানবশরীরে প্রবেশ করে। বাংলাদেশের খাবারের পানি প্রায়শই অনিরাপদ। ওয়াসার পাইপ লিকেজ, পয়ঃনিষ্কাশনের ড্রেনেজ লাইনের সাথে খাবার পানির মিশ্রণের কারণে হেপাটাইটিস এ ও ই-র বিস্তার ঘটে।

বাংলাদেশে হেপাটাইটিস বি ভাইরাস ছড়ানোর প্রধান উপায় হচ্ছে—

১। রক্তের মাধ্যমে: আক্রান্ত ব্যক্তির ব্যবহৃত সূচ, সিরিঞ্জ, অপারেশনের যন্ত্রপাতি, দাঁতের যন্ত্রপাতি, রেজার, নাপিতের দোকান বা সেলুনের রেজর বা ব্লেড, টুথব্রাশ, অনিরাপদ রক্ত সঞ্চালন দ্বারা।

২। অনিরাপদ যৌন সম্পর্ক: আক্রান্ত ব্যক্তির সাথে কনডম ছাড়া যৌনমিলন, চুম্বন ইত্যাদির মাধ্যমে।

৩। মায়ের থেকে শিশুতে: আক্রান্ত মায়ের থেকে জন্মের সময় শিশুর শরীরে সংক্রমণ ঘটার সম্ভাবনা ৯৫ শতাংশের বেশি।

৪। আক্রান্ত ব্যক্তির রক্ত বা দেহরস দ্বারা দূষিত বস্তুর সংস্পর্শে: শরীরের বাইরে রক্ত, মুখের লালা বা অন্যান্য দেহরসের মধ্যে হেপাটাইটিস বি ভাইরাস ৭ দিন পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে। তাই এসব দ্বারা দূষিত বস্তুর মাধ্যমে হেপাটাইটিস বি ছড়াতে পারে।

হেপাটাইটিস বি-র কবল থেকে মুক্ত থাকার সর্বোত্তম উপায় হচ্ছে টিকাদান। ইতিমধ্যে বাংলাদেশে শিশুদের জন্য সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচিতে হেপাটাইটিস বি-এর টিকা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। 

শিশুদের টিকা দেওয়ার ক্ষেত্রে অতীতে বাংলাদেশ প্রভূত সফলতা অর্জন করেছিল যা বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে প্রশংসিতও হয়েছিল। কিন্তু ২০২৪-২৫-এর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দায়িত্বহীন সিদ্ধান্তের কারণে সেই সাফল্যের গায়ে কালি লেগে গিয়েছে।

হেপাটাইটিস সি-এর কোনো টিকা নেই। কিন্তু মুখে খাওয়ার কার্যকর ওষুধ রয়েছে। হেপাটাইটিস সি আক্রান্ত রোগীর ৯৫ শতাংশের বেশি এখন মুখে খাওয়ার ওষুধ দ্বারা সম্পূর্ণ নিরাময় লাভ করে। ৮-১২ সপ্তাহের ডাইরেক্ট অ্যাক্টিং অ্যান্টিভাইরাল (DAA) কোর্স খাওয়ার মাধ্যমে হেপাটাইটিস সি-র সংক্রমণ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। এই ওষুধটি বাংলাদেশে অল্প দামে পাওয়া যায়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০৩০ সালের মধ্যে হেপাটাইটিস নির্মূলের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। এই লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে শিশুদের জন্য সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত হেপাটাইটিস বি টিকার সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখতে হবে। 

স্কুল কলেজসহ সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সচেতনতা বাড়ানোর কার্যক্রম, স্ক্রিনিং প্রোগ্রাম পরিচালনা করা, টিকাদানের বিশেষ ক্যাম্প পরিচালনা করা, প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হেপাটাইটিস বি পরীক্ষা ও টিকা সহজলভ্য করার ওপর বিশেষ জোর দিতে হবে।

আমাদের দেশে প্রায় এক কোটির মতো হেপাটাইটিস বি আক্রান্ত মানুষ রয়েছে। তাদের খুঁজে বের করার জন্য বিশেষ কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে। এদের পর্যবেক্ষণ এবং চিকিৎসার আওতায় আনতে হবে এবং নতুন সংক্রমণ প্রতিরোধের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। জনসাধারণকে যুক্ত করে বিজ্ঞানসম্মত পন্থায় অগ্রসর হলে ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে হেপাটাইটিস মুক্ত করা সম্ভব।

ডা. লেলিন চৌধুরী : চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ