বিজ্ঞাপন

মুস্তাফিজুর রহমান : বাংলাদেশের টেলিভিশনের স্বর্ণযুগের একজন

মুস্তাফিজুর রহমান : বাংলাদেশের টেলিভিশনের স্বর্ণযুগের একজন

‘কালা কইতর’ এনটিভি নিয়ে নিলো। হুমায়ূন আহমেদ নিজেই আমাদেরকে জানালেন। আমি আর মুস্তাফিজুর রহমান দুজনেই তার সামনে বসা। খালি গায়ে লুঙ্গি পরে আসন পেতে ফ্লোরে বসে আছেন হুমায়ূন আহমেদ। আমরাও ফ্লোরে বসলাম। আমি স্পষ্ট বুঝতে পারছি ফ্লোরে বসতে মুস্তাফিজুর রহমানের বেশ কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু তিনি সেটা বলছেন না।

হুমায়ূন আহমেদ বললেন, মুস্তাফিজ ভাই আপনি আমার পছন্দের মানুষ। আপনি একটা নাটক চেয়েছেন, এটা আমি দিতে পারব না? আমি একটা চমৎকার ধারাবাহিক নাটক তৈরি করেছি, নাম, ‘কালা কইতর’। গতকাল বাপ্পী সাহেব নিজে এসে নগদ টাকা দিয়ে ‘কালা-কইতর’ নাটকটা নিয়ে গেছেন। কটা দিন আগে জানলেও এই নাটকটা আপনাকে দিতে পারতাম। এখন আপনি যদি বলেন তাহলে আমি সেই চুক্তি ক্যান্সেল করে নাটকটা আপনাকে দিতে পারি। আপনি কী বলেন?

তখন বাংলাভিশন সবেমাত্র যাত্রা শুরু করেছে। কেউ খুব এটা চেনে না। বাংলাভিশন বললেই পাল্টা প্রশ্ন করে, এটা কি এনজিও? ওয়ার্ল্ড ভিশনের শাখা? তাই বাংলাভিশনের সিইও হিসেবে মুস্তাফিজুর রহমান বিশেষ পরিকল্পনায় হাতে নিলেন। তার একটা ছিল  হুমায়ূন আহমেদ-এর একটা ধারাবাহিক নাটক প্রচার করা। সেই উদ্দেশ্যে আমরা হাজির হয়েছি দখিন হাওয়ায়। ২০০৫ অথবা ২০০৬ সালের কথা।

আমি তখন অনেক ছোট। আমি মনে মনে ভাবছিলাম, চুক্তি ক্যান্সেল করে ‘কালা কইতর’ নাটকটা নিয়ে নিলেই ভালো হয়।

মুস্তাফিজুর রহমান কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন, না, যা আপনি অন্য একটা চ্যানেলকে দিয়ে দিয়েছেন সেটা দরকার নেই। এরপর আপনি যখন আবার নাটক তৈরি করবেন সেটা আমাদের দেবেন।

আমি খুবই অবাক হলাম। আমার সামনে বসা দুজনই প্রবাদ-প্রতিম মানুষ। দুজনই ভালো বন্ধু, দুজনের প্রতি দুজনের অগাধ সম্মান। কিন্তু তারপরও নীতির বাইরে গেলেন না কেউই। হুমায়ূন আহমেদ প্রস্তাব করলেন, মুস্তাফিজুর রহমান সেটা প্রত্যাখ্যান করলেন। এই দুজনের কেউই এখন আমাদের পাশে নেই। দুজন মানুষই আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন।

যখন মুস্তাফিজুর রহমানের মৃত্যু সংবাদটি শুনলাম তখন কষ্ট হচ্ছিল। বুকের বা দিক একটু ব্যথাও অনুভব করছিলাম। আমার টেলিভিশনের পথটা যে তারই তৈরি করা, এই মানুষটা হাতে ধরে আমাকে টেলিভিশন সম্পর্কে শিক্ষা দিয়েছেন।

...তিনি পুরো বিষয়টা আমাকে পাশে বসিয়ে বসিয়ে শেখালেন। আমি ভাবতাম তিনি শুধু আমাকেই এমন গুরুত্ব দিচ্ছেন, পরে জানলাম যাদের মধ্যে তিনি একটু আগ্রহ দেখেন তাদেরই হাত ধরে কাজ শেখান।

২০০১ সালের দিকে আমি তখন বিটিভিতে একটা সাপ্তাহিক অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করতাম। নাম ‘আমার কথা বলব আমি’। কিশোর-কিশোরীদের মুখোমুখি বসত তাদের অভিভাবকেরা, তারপর ডিবেট। প্রযোজক ছিলেন বদিউদ্দজ্জামান ভাই। বিটিভির ডিজি তখন ছিলেন মুস্তাফিজুর রহমান।

একদিন আমাকে তিনি রুমে ডাকলেন। বিটিভির ডিজি-র রুমে যাচ্ছি তাই আমার হার্টবিট একটু বাড়তে লাগল। আমাকে দেখেই বললেন, শামীম তোমার অনুষ্ঠানটা ভালো হচ্ছে, এখন থেকে এটা আধাঘণ্টার জায়গায় এক ঘণ্টা করে প্রচারিত হবে। এমন ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন মানুষ আমি খুব কমই দেখেছি।

আমাদের বাচ্চাকাল থেকেই তিনি তারকা। ‘এইসব দিনরাত্রি’, ‘সকাল সন্ধ্যা’, ‘জব্বার আলী’, ‘শঙ্খনীল কারাগার’— এই রকম অজস্র কালজয়ী প্রযোজনা তার ঝুলিতে। তখন আমি প্রথম আলোর সিনিয়র সাব এডিটর। একঘণ্টা করেই অনুষ্ঠান করতে লাগলাম।

২০০৫ সালে হঠাৎ আবার আমাকে ডেকে পাঠালেন মুস্তাফিজুর রহমান। স্বভাব সুলভ গম্ভীর ভঙ্গিতে প্রশ্ন করলেন, শামীম তুমি এখন প্রথম আলোতে কাজ করছ না? তুমি সেই চাকরিটা ছেড়ে দাও। আমরা একটা নতুন টেলিভিশন চ্যানেল করব, নাম বাংলাভিশন, তুমি সেটাতে জয়েন কর। সিনিয়র এক্সিকিউটিভ, অনুষ্ঠান বিভাগ, পারবে না?

আমি তখন প্রথম আলোতে অনেক টাকা বেতন পাই। বিয়ে করেছি মাত্র পাঁচ দিন হয়েছে। কিন্তু মুস্তাফিজুর রহমানের কথা শুনে উপর-নিচ মাথা নাড়লাম এবং পরদিন গিয়েই প্রথম আলোর চাকরি ছেড়ে দিলাম। 

আত্মীয় স্বজন বকাঝকা করতে লাগল, এত বড় পত্রিকা এটা কেউ ছাড়ে? কিন্তু আমার ভেতরে তখন বিরাট নেশা, টেলিভিশনের নেশা। মুস্তাফিজুর রহমান সেটা কীভাবে যে আঁচ করতে পারলেন, তা এখনো আমার কাছে বিস্ময়!

পরবর্তী সময়ে বাংলাভিশন শুরু হলো। প্রচুর লোক নিয়োগ দেওয়া হলো। প্রচুর নাটক, টেলিফিল্ম কেনা হলো। তিনি পুরো বিষয়টা আমাকে পাশে বসিয়ে বসিয়ে শেখালেন। আমি ভাবতাম তিনি শুধু আমাকেই এমন গুরুত্ব দিচ্ছেন, পরে জানলাম যাদের মধ্যে তিনি একটু আগ্রহ দেখেন তাদেরই হাত ধরে কাজ শেখান।

তার সঙ্গে আমার একটা প্রোডাকশনের বাণিজ্যিক সাফল্য নিয়ে যেমন কথা হতো, তেমন কথা হতো নাটকের সাহিত্যমূল্য নিয়ে। কোন নাটক সবল, কোন নাটক দুর্বল, কেন সেটা দুর্বল—সবকিছু তিনি আলোচনা করতেন বিস্তারিত।

অপি করিমের ‘আমার আমি’, শারমিন লাকীর ‘আপনার আগামী’, পারভীন সুলতানা দিতির ‘রমজানের রান্না’, ব্যস্ত ডাক্তারসহ বাংলাভিশনের বহু আলোচিত কাজ সম্ভব হতো না মুস্তাফিজুর রহমানের প্রশ্রয় না পেলে। বহু নতুন নির্মাতাকে ডেকে নিয়ে তিনি কাজ দিয়েছেন, বহু পড়ুয়াকে লেখক বানিয়েছেন, বহু হতাশকে আশার আলো দেখিয়েছেন।

...সবাই চলে যাওয়ার পর আমাকে রুমে ডাকলেন। আমি ধরেই নিয়েছিলাম তিনি এখন আমাকে কঠিন বকা দেবেন। কিন্তু তিনি কিছুই বললেন না, শুধু বললেন, একটা বিষয় মনে রেখো, সবার সামনে যখন কথা বলবে তখন একটু কৌশলে বলবে। তুমি যে কাজটা করতে চাও না সেটাও বলবে একটু নরম করে।

একটা ঘটনা বলি। সেদিন আমি সত্যি সত্যি মুস্তাফিজুর রহমানের সঙ্গে একটু বেয়াদবি করে ফেলেছিলাম। ভরা মজলিশে কিছুটা রেগে বলেছিলাম, আমি এভাবে কাজ করতে পারব না। তাতে তিনি কিছুটা হয়তো অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন।

সবাই চলে যাওয়ার পর আমাকে রুমে ডাকলেন। আমি ধরেই নিয়েছিলাম তিনি এখন আমাকে কঠিন বকা দেবেন। কিন্তু তিনি কিছুই বললেন না, শুধু বললেন, একটা বিষয় মনে রেখো, সবার সামনে যখন কথা বলবে তখন একটু কৌশলে বলবে। তুমি যে কাজটা করতে চাও না সেটাও বলবে একটু নরম করে। তুমি বলবে, আমার পক্ষে কাজটা করা কঠিন হবে। ঠিক আছে?

আমি আবারও উপর নিচে মাথা নাড়লাম, সরি বলে রুম থেকে বেরিয়ে আসতে আসতে ভাবলাম মানুষটা কত বড় মাপের। কীভাবে এতটা শান্ত হওয়া সম্ভব। তিনিই তখন বলেছিলেন, তুমি যদি ঘরের ভেতরের মানুষটা আর কিশোর-কিশোরীদের জন্য চ্যানেল সাজাতে পারো তাহলে তোমার চ্যানেল সবাই দেখবে। বাংলাভিশনের সাফল্যের মূলমন্ত্র এটাই।

বাংলাদেশ টেলিভিশনের স্বর্ণযুগের সফল, দূরদর্শী এবং কালজয়ী প্রযোজক ও নির্মাতা এই মানুষটা আমাদের মাঝে আর নেই, কিন্তু আমাদের সামনে এখনো আছে ‘এইসব দিনরাত্রি’-র জাদুকর আনিস, রফিক, নিলু, শফিক, টুনি। ‘সকাল সন্ধ্যা’র শাহেদ, শিমু, মাখনা।

‘শঙ্খনীল কারাগার’-এর রাবেয়া, খোকা, নিনু, মন্টু, রুনু ও ঝুনু। আমজাদ হোসেনের জব্বার আলী সিরিজ। এই কাজগুলোর কথা মনে হলেই লেখকের পাশাপাশি সবসময় উচ্চারিত হবে প্রযোজক হিসেবে মুস্তাফিজুর রহমানের নামও।

যতদিন তিনি বেঁচে ছিলেন কাজ করে গেছেন। বিটিভির মহাপরিচালকের পর বাংলাভিশন টেলিভিশনের সিইও। তারপর গাজী টিভির প্রধান উপদেষ্টা। বাংলাদেশের টেলিভিশনের ইতিহাস লেখা হলে যে কয়েকজন মানুষ প্রথম অধ্যায়ে থাকবেন তাদের মধ্যে মুস্তাফিজুর রহমান অন্যতম।

এখন কত যে ওটিটি, কত যে চ্যানেল, কত যে নির্মাতা সবাই কিন্তু হাঁটছেন মুস্তাফিজুর রহমানদের তৈরি করা পথ দিয়ে। আধুনিক এই মানুষটি একদিন রম্য করে বলেছিলেন, নতুনেরা আসবে, জায়গা করে নেবে, আবার চলে যাবে। এইসব নিয়েই আমাদের এইসব দিনরাত্রি!

শামীম শাহেদ : অভিনেতা, সাংবাদিক; সার্টিফাইড প্যারালিগ্যাল, লিগ্যাল ইনভেস্টিগেটর, কুইন্স, নিউইয়র্ক