কয়েক সপ্তাহের টানা ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে অনেকেরই ধারণা হয়েছে যে ডেঙ্গুর ঝুঁকি হয়তো কমে এসেছে। কারণ এ সময় তুলনামূলকভাবে মশার উপদ্রবও কিছুটা কম চোখে পড়ে। কিন্তু এই দৃশ্যমান স্বস্তি বিভ্রান্তিকর হতে পারে।
প্রকৃতপক্ষে, ভারী বৃষ্টিপাত এডিস মশার ডিম, লার্ভা ও পিউপাকে অনেক ক্ষেত্রেই ধুয়ে নিয়ে যায় অথবা সাময়িকভাবে তাদের প্রজননস্থল নষ্ট করে দেয়। ফলে বর্ষণের সময় এডিস মশার সংখ্যা কিছুটা কমে যায়। কিন্তু বৃষ্টি কমে এলে বা থেমে থেমে বৃষ্টি শুরু হলে পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়।
তখন বাড়ির ছাদ, বারান্দা, ফুলের টব, এসির ট্রে, প্লাস্টিকের ড্রাম, টায়ার, নির্মাণাধীন ভবন এবং আশপাশের অসংখ্য ছোট-বড় পাত্রে পরিষ্কার পানি জমে থাকে, যা এডিস মশার বংশবিস্তারের জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি করে।
সাধারণত বৃষ্টির কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই এসব প্রজননস্থল থেকে বিপুল সংখ্যক এডিস মশা জন্ম নিতে শুরু করে এবং ডেঙ্গু সংক্রমণের ঝুঁকি দ্রুত বেড়ে যায়। তাই বাংলাদেশে আগস্ট, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর, এই তিন মাসকে ডেঙ্গুর সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সময় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ২০২৬ সালের এই মৌসুমি ঝুঁকির সঙ্গে ডেঙ্গু ভাইরাসের সেরোটাইপ পরিবর্তনের ঘটনাও যুক্ত হয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার দাবি রাখে।
চার বছর ধরে দেশে ডেঙ্গু ভাইরাসের সবচেয়ে বেশি প্রচলিত সেরোটাইপ ছিল ডেনভ-২ (DENV-2)। কিন্তু চলতি বছর রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)-এর সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, পরীক্ষিত নমুনার ৯১.৫ শতাংশে ডেনভ-৩ (DENV-3) এবং মাত্র ৮.৫ শতাংশে ডেনভ-২ শনাক্ত হয়েছে।
অর্থাৎ বাংলাদেশে আবারও ডেনভ-৩-এর আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। যদিও তারা মাত্র ৭১ জন ডেঙ্গু রোগীর রক্ত বিশ্লেষণ করে এই তথ্যটি দিয়েছেন। নমুনা এবং নমুনা সংগ্রহের স্থান যত বেশি হবে ফলাফল তত বেশি নির্ভরযোগ্য এবং সঠিক হবে।
অনেকেই মনে করেন, একবার ডেঙ্গু হলে আর ডেঙ্গু হয় না। বাস্তবে ধারণাটি সঠিক নয়। ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটি সেরোটাইপ রয়েছে; DenV-১, DenV-২, DenV-৩ এবং DenV-৪।
একজন ব্যক্তি যদি DenV-২-এ আক্রান্ত হন, তবে তার শরীরে মূলত DenV-২-এর বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়। কিন্তু অন্য তিনটি সেরোটাইপে তিনি পরবর্তীকালে আবার আক্রান্ত হতে পারেন।
অনেকেই মনে করেন, একবার ডেঙ্গু হলে আর ডেঙ্গু হয় না। বাস্তবে ধারণাটি সঠিক নয়। ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটি সেরোটাইপ রয়েছে; DenV-১, DenV-২, DenV-৩ এবং DenV-৪।
বরং দ্বিতীয়বার ভিন্ন সেরোটাইপে সংক্রমিত হলে গুরুতর ডেঙ্গুর ঝুঁকি কিছু রোগীর ক্ষেত্রে বেড়ে যেতে পারে, যা অ্যান্টিবডি-ডিপেনডেন্ট এনহ্যান্সমেন্ট (Antibody-Dependent Enhancement বা ADE) নামে পরিচিত একটি ইমিউনোলজিক্যাল প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে এটি মনে রাখা জরুরি যে, প্রত্যেক দ্বিতীয় সংক্রমণই গুরুতর হবে এমন নয়; অনেক রোগী দ্বিতীয়বার সংক্রমিত হয়েও সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠেন।
বাংলাদেশের ডেঙ্গুর ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সেরোটাইপ পরিবর্তনের সঙ্গে বড় প্রাদুর্ভাবের একটি সম্পর্ক রয়েছে। ২০০০ সালের প্রথম বড় ডেঙ্গু প্রাদুর্ভাবের পর ২০১৩-২০১৬ সময়ে DenV-১ ও DenV-২ বেশি হয়ে ছিল।
আরও পড়ুন
এরপর ২০১৯ সালে দেশের অন্যতম বড় ডেঙ্গু প্রাদুর্ভাবের সময় DenV-৩ প্রধান সেরোটাইপে পরিণত হয়। পরে ২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত আবার DenV-২-এর আধিপত্য দেখা যায়। এখন ২০২৬ সালে পুনরায় DenV-৩-এর দ্রুত বিস্তার লক্ষ করা যাচ্ছে। এর অর্থ হলো, কয়েক বছরে যারা DenV-২-এ আক্রান্ত হয়েছিলেন, তাদের একটি অংশ এবার DenV-৩-এ আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকতে পারেন।
এই কারণেই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা DenV-৩-এর প্রত্যাবর্তনকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন। যদি জনসংখ্যার একটি বড় অংশের শরীরে আগে থেকেই DenV-২-এর অ্যান্টিবডি থাকে, তবে নতুন সেরোটাইপের সংক্রমণে কিছু রোগীর ক্ষেত্রে রোগ দ্রুত জটিল আকার ধারণ করতে পারে।
বিশেষ করে ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার (DHF) বা ডেঙ্গু শক সিনড্রোম (DSS)-এর মতো জটিলতা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা বাড়তে পারে। তবে ব্যক্তির বয়স, শারীরিক অবস্থা, ভাইরাসের বৈশিষ্ট্য এবং দ্রুত চিকিৎসা পাওয়ার ওপরও রোগের তীব্রতা নির্ভর করে। তাই সেরোটাইপ পরিবর্তনকে ঝুঁকির একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে দেখা উচিত, কিন্তু একে একমাত্র কারণ হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক হবে না।
বাংলাদেশে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর একটি বড় কারণ হলো দেরিতে হাসপাতালে আসা। অনেক রোগী জ্বর কমে যাওয়াকে সুস্থতার লক্ষণ মনে করেন। অথচ ডেঙ্গুর ক্রিটিক্যাল ফেজ সাধারণত জ্বর কমার সময়ই শুরু হতে পারে। এ সময় শরীর থেকে প্লাজমা বেরিয়ে যাওয়া, রক্তচাপ কমে যাওয়া, শক, রক্তক্ষরণ কিংবা বিভিন্ন অঙ্গের কার্যকারিতা ব্যাহত হওয়ার মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে।
তাই তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, অতিরিক্ত দুর্বলতা, শ্বাসকষ্ট, রক্তক্ষরণ, প্রস্রাব কমে যাওয়া বা অস্বাভাবিক ঘুমঘুম ভাবের মতো সতর্কতামূলক লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে। দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা গেলে অধিকাংশ গুরুতর রোগীকেও সুস্থ করা সম্ভব।
DenV-৩-এর আধিপত্যের এই সময়ে শুধু চিকিৎসা নয়, নজরদারিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত সেরোটাইপ পর্যবেক্ষণ, দ্রুত রোগ নির্ণয়, হাসপাতালে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি এবং তথ্যভিত্তিক জনস্বাস্থ্য সিদ্ধান্ত ভবিষ্যৎ প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় সহায়ক হবে। একই সঙ্গে প্রতিটি জেলায় ভেক্টর সার্ভেইলেন্স জোরদার করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় আগে থেকেই মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম পরিচালনা করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর একটি বড় কারণ হলো দেরিতে হাসপাতালে আসা। অনেক রোগী জ্বর কমে যাওয়াকে সুস্থতার লক্ষণ মনে করেন। অথচ ডেঙ্গুর ক্রিটিক্যাল ফেজ সাধারণত জ্বর কমার সময়ই শুরু হতে পারে।
সবশেষে মনে রাখতে হবে, ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র এখনো এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস। বাড়ির ছাদ, গাড়ির পার্কিং বা ভবনের বেসমেন্টে জমা পানি, বারান্দা, ফুলের টব, এসির ট্রে, প্লাস্টিকের ড্রাম, টায়ার বা যেকোনো পাত্রে তিন দিনের বেশি পানি জমতে দেওয়া যাবে না। ব্যক্তিগত সুরক্ষার পাশাপাশি পরিবার ও প্রতিবেশীকে সম্পৃক্ত করে মশার প্রজনন উৎস ধ্বংসের উদ্যোগ নিতে হবে।
DenV-এর আধিপত্য আমাদের জন্য একটি সতর্ক সংকেত। এটি আতঙ্কের নয়, বরং প্রস্তুতির সময়। সঠিক সময়ে সঠিক প্রস্তুতি গ্রহণ না করলে আগস্ট, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর ডেঙ্গুর ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
বিজ্ঞানভিত্তিক নজরদারি, দ্রুত চিকিৎসা, কার্যকর মশক নিয়ন্ত্রণ এবং জনসচেতনতার সমন্বয় ঘটাতে পারলে দ্বিতীয়বার ডেঙ্গু সংক্রমণজনিত গুরুতর অসুস্থতা ও মৃত্যুঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব। বাংলাদেশের ডেঙ্গু মোকাবিলার পরবর্তী সাফল্য নির্ভর করবে আমরা এই সতর্কবার্তাকে কত দ্রুত এবং কত কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে পারি।
অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার : কীটতত্ত্ববিদ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]
