কঠিন সময় অতিক্রান্ত করছে স্পেন সরকার। উত্তর আফ্রিকার মরক্কো সীমান্তে স্পেনের সেউতা এবং মেলিলা নামক দুটো ছিটমহল রয়েছে। এরমধ্যে মরক্কো থেকে সেউতায় একদিনের মধ্যে ঢুকে পড়েছে প্রায় ৬০ হাজার শরণার্থী, যার মধ্যে ৮ হাজার শিশু। উপকূলীয় শহর সেউতার মোট অধিবাসী যেখানে মাত্র ৮৫ হাজার, সেখানে এত বেশি সংখ্যক মানুষের অপ্রত্যাশিত উপস্থিতি নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খেতে হচ্ছে অঞ্চলটির স্থানীয় প্রশাসনকে। সাঁতরে সমুদ্র অতিক্রম করতে গিয়ে ইতিমধ্যে মারা গেছেন ৫৭ জন।
সেউতার স্থানীয় প্রশাসনের অনুরোধে বিশেষ বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে সেখানে। তারপরও পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যাচ্ছে না। স্পেনের প্রধানমন্ত্রী বিষয়টিকে দেখছেন তার দেশের ওপর হামলা হিসেবে।
একদিনের মধ্যে এত সংখ্যক মানুষের ঢল নিকট অতীতে দেখা যায়নি। ইউরোপীয় দেশগুলো এই পরিস্থিতি সামালে স্পেন সরকারকে আশ্বাস দিলেও স্পেনের সরকার অবৈধ এসব অনুপ্রবেশকারীদের ফেরত পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে। বলা হচ্ছে ১৩ হাজার অবৈধ অনুপ্রবেশকারী ইতিমধ্যে ফেরত পাঠানো হয়েছে, তবে সামগ্রিকভাবে পরিস্থিতি অনুকূলে আনা কঠিন হয়ে পড়েছে।
এখানে দুটো আইনি বিষয়ের অবতারণা প্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে; প্রথমটি হচ্ছে জুলাইয়ের শুরুতে স্পেনের সুপ্রিম কোর্ট দেশটিতে অবৈধ অনুপ্রবেশ রোধে সরকারকে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিলেও জলপথে, বিশেষ করে সমুদ্রপথে আগন্তুকদের ক্ষেত্রে এই নির্দেশনা কার্যকর হবে না বলে সিদ্ধান্ত রয়েছে।
এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে অবৈধ মানবপাচারকারী চক্র মরক্কো থেকে দলে দলে মানুষদের জড়ো করছে সেউতাতে। আর একবার সেউতায় পৌঁছাতে পারলে সেখান থেকে সুযোগ বুঝে জলপথ পাড়ি দিয়ে স্পেনের মূল ভূখণ্ডে প্রবেশ করা সময়ের ব্যাপার হবে বলে তাদের ধারণা।
তবে এখানে আইনের যে ফাঁক রয়েছে সেখানে সুপ্রিম কোর্ট মূলত অতীতের অভিজ্ঞতার আলোকে জিব্রাল্টার প্রণালী এবং ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে যারা দেশটিতে আশ্রয় নিয়েছে, মানবিক কারণে তাদের দিকটিকেই ইঙ্গিত করেছেন, প্রথমে স্থলপথ পাড়ি দিয়ে পরবর্তীতে জলপথে স্পেনে প্রবেশের ক্ষেত্রে এটি প্রযোজ্য নয় বলে অনেক বিশেষজ্ঞর অভিমত। এই বিবেচনায় এখানে মানবিক বিষয়টি অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে।
...কনভেনশন অনুযায়ী ধর্ম, বর্ণ, রাজনৈতিক পরিচয় বা জাতিগত সংঘাত হতে উদ্ভূত যেকোনো নিরাপত্তা শঙ্কা থেকে নাগরিকদের প্রতিবেশী দেশে আশ্রয়ের অধিকার দেওয়া হয় এবং পুনরায় নিজ দেশে প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে শরণার্থীদের জোর করার বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়।
দ্বিতীয় দিকটি হচ্ছে এখানে শরণার্থী এবং অবৈধ অনুপ্রবেশকারী–এই দুটো বিষয়ের মধ্যে আইনগত পার্থক্য রয়েছে। ১৯৫১ সালের শরণার্থী বিষয়ক আন্তর্জাতিক কনভেনশনটি মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকে কেন্দ্র করে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের শরণার্থী সংকট মোকাবিলার জন্য আয়োজিত হয়েছিল।
এই কনভেনশন অনুযায়ী ধর্ম, বর্ণ, রাজনৈতিক পরিচয় বা জাতিগত সংঘাত হতে উদ্ভূত যেকোনো নিরাপত্তা শঙ্কা থেকে নাগরিকদের প্রতিবেশী দেশে আশ্রয়ের অধিকার দেওয়া হয় এবং পুনরায় নিজ দেশে প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে শরণার্থীদের জোর করার বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়।
পরবর্তীতে বিষয়টি ১৯৪৮ সালের জাতিসংঘের মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্রেও বিবৃত হয়েছে। এটি হচ্ছে শরণার্থীদের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা, যা এককথায় বিশেষ করে ইউরোপীয় দেশগুলোর জন্য পালনের ক্ষেত্রে একধরনের নৈতিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
অন্যদিকে অবৈধ অনুপ্রবেশের ক্ষেত্রে এধরনের আন্তর্জাতিক বিধিবিধান নেই, বরং বিষয়টি স্ব স্ব দেশের অভিবাসন নিতিমালা অনুযায়ী পালনীয়। এক্ষেত্রে কিছু দেশ মানবিক বিষয়কে আমলে নিয়েছে, যেমন স্পেনের সর্বোচ্চ আদালতের সিদ্ধান্তটি এখানে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই অবস্থায় মরক্কোর ভূখণ্ড ব্যবহার করে সেখানকার স্প্যানিশ ছিটমহলে মানুষের ঢলকে যদি নিরাপত্তা শঙ্কা থেকে দেখার অবকাশ না থাকে তাহলে নিশ্চিতভাবেই এটিকে অবৈধ অনুপ্রবেশ হিসেবে বিবেচনার সুযোগ থাকে এবং এক্ষেত্রে আইন অনুযায়ী নিজ দেশের নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় সার্বিক ব্যবস্থা গ্রহণের অধিকার স্পেনের রয়েছে।
তারপরও কিছু কথা থেকে যায়, যার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে এই জনস্রোতের সংখ্যাটি। মাত্র ৮৫ হাজার জনসংখ্যা অধ্যুষিত সেউতায় ৬০ হাজার মানুষের এই ঢলকে নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর দায়িত্ব, এক্ষেত্রে খরচ এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক বিষয়গুলো যদি স্পেন সরকারকে মোকাবিলা করতে হয়, তাহলে এখানে একটি বিষয় সঙ্গত কারণেই আলোচিত হবে, আর সেটি হচ্ছে কীভাবে এবং কেন তারা মরক্কো দিয়ে স্পেনের ভূখণ্ডের অংশে অনুপ্রবেশ করল, এক্ষেত্রে মরক্কোর কোনো দায় রয়েছে কি না এবং ভবিষ্যতে এটিকে রোধ করা যাবে কি না ইত্যাদি।
মরক্কোর তরুণ সম্প্রদায়ের মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে দারিদ্র্য, বেকারত্ব, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন এবং নানাবিধ সামাজিক সমস্যার বিপরীতে আলো ঝলমলে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)ভুক্ত স্পেনে প্রবেশের একধরনের আকাঙ্ক্ষা পরিলক্ষিত হচ্ছে।
আমরা জানি সাম্প্রতিক সময়ে মরক্কোর সাথে স্পেনের সম্পর্ক ভাল যাচ্ছে না, বিশেষ করে ২০২১ সালে যখন সেউতা দ্বীপে মরক্কো থেকে মাত্র কয়েকদিনে ৮ হাজারের বেশি মানুষ ঢুকে পড়ে তখন থেকেই দুই দেশের মধ্যে এই কূটনৈতিক টানাপড়েন শুরু হয়। এর আগে এবং পরে বিভিন্ন সময়ে সেউতা এবং মেলিলা দিয়ে আফ্রিকার সাথে স্থলবেষ্টিত সেই সাথে জলবেষ্টিত এই দুই ভূখণ্ডে মরক্কো হয়ে মানুষের স্পেন অভিমুখে আগমন অব্যাহত ছিল।
বিষয়টি কেবল মরক্কোর এবং স্পেনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। স্পেন ইইউভুক্ত দেশ এবং ইউরোপীয় সীমান্ত নিরাপত্তা রক্ষায় অঙ্গীকারাবদ্ধ। সেনজেনভুক্ত (ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে মুক্ত চলাচল) দেশ হওয়ার কারণে মরক্কো থেকে এই বিশাল জনস্রোত ইইউ সীমান্ত নিরাপত্তাকে ঝুঁকিগ্রস্ত করেছে, যার জেরে ইইউ’র সাথে স্পেনের সেনজেন কার্যক্রম সীমিত করার বিষয়টি সামনে চলে এসেছে।
পার্শ্ববর্তী দেশ ইতালি এক্ষেত্রে স্পেনের নিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্ন করেছে এবং অবৈধ অভিবাসী নিয়ন্ত্রণে স্পেনের সরকারকে পরোক্ষভাবে দায়ী করে মুক্ত সীমান্ত এলাকা থেকে তাদের বহিষ্কারের হুমকি দিয়েছ। এটি ইউরোপের সার্বিক নিরাপত্তার জন্যও হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বর্তমান সময়ের এই জনস্রোত দমনে একদিকে ইইউ’র নিষ্ক্রিয় অবস্থান, আবার অন্যদিকে স্পেনের সুপ্রিম কোর্টের রায়কে নিয়ে বিভিন্নমুখী ব্যাখ্যা এই সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলেছে। মরক্কোর উপকূলীয় স্পেনের ছিটমহল সেউতা এবং মেলিলাকে পৃথক করেছে জিব্রাল্টার প্রণালী।
ইতালির এই অবস্থানে হতাশা ব্যক্ত করে স্পেন জানিয়েছে যে, তারা ইইউ’র কাছ থেকে সহযোগিতা আশা করে, কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য নয়। যদিও ইইউভুক্ত কয়েকটি দেশ (যুক্তরাজ্য এবং ফ্রান্স) বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে, এরপরও ফ্রান্স স্পেনের সাথে তাদের সীমান্তে তল্লাশি জোরদার করেছে।
সার্বিক বিষয়টি নিয়ে ইইউ স্পেনকে এই মর্মে দায় চাপাতে চাইছে যে, মরক্কোর সাথে স্পেনের দ্বিপাক্ষিক সমস্যার কারণে মরক্কো সরকারের পক্ষ থেকে এসব অবৈধ অভিবাসীদের দমনে সে রকম জোর তৎপরতা নেই। এর আগে ২০২২ সালে আলজেরিয়ার সরকার সমর্থিত স্বাধীনতাপন্থি পলিসারিও ফ্রন্ট’কে মরক্কোর একাংশের স্বায়ত্তশাসন প্রশ্নে স্পেন সমর্থন দিয়েছিল, যা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও অবনতিশীল করে তুলে।
বর্তমান সময়ের এই জনস্রোত দমনে একদিকে ইইউ’র নিষ্ক্রিয় অবস্থান, আবার অন্যদিকে স্পেনের সুপ্রিম কোর্টের রায়কে নিয়ে বিভিন্নমুখী ব্যাখ্যা এই সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলেছে। মরক্কোর উপকূলীয় স্পেনের ছিটমহল সেউতা এবং মেলিলাকে পৃথক করেছে জিব্রাল্টার প্রণালী।
সেই অর্থে এই প্রণালী দিয়ে স্পেনের অভ্যন্তরে সমুদ্র যাত্রা করলে অভিবাসীরা কতটা আইনি সুরক্ষা পাবে, এটাও একটা প্রশ্ন। এমনটা হলে তাদের প্রতি কতটা মানবিক আচরণ করা হবে এবং কতটা শরণার্থী হিসেবে আচরণ করা হবে, এমন প্রশ্নের উত্তরও অস্পষ্ট।
জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা (ইউএনএইচসিআর)-এর ‘গ্লোবাল ট্রেন্ডস’ বা বৈশ্বিক প্রবণতা বিষয়ক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে প্রায় ১১ কোটি ৭০ লাখ থেকে ১১ কোটি ৮০ লাখ মানুষ জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত হয়েছে; এর মধ্যে প্রায় ৪ কোটি ১৬ লাখ মানুষকে সুনির্দিষ্টভাবে ‘শরণার্থী’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে একটা বড় সংখ্যার সাথে মরক্কো থেকে আগত মানুষের ঢল একে ইউরোপের জন্য আরও জটিল করে তুলেছে।
অন্যদিকে এই সংকট মোকাবিলা করার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টা সেরকম দৃশ্যমান নয়। ১৯৫১ সালের কনভেনশনের আলোকে ইউরোপ এটিকে পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে নিয়ন্ত্রণ এবং এর সংখ্যা হ্রাসকরণে কিছু ব্যবস্থা নিলেও বিশ্বের অন্যান্য অংশে এটি এখনও প্রকৃত সমস্যা হয়ে রয়ে গিয়েছে।
বর্তমানে ফিলিস্তিন সমস্যার বাইরে বাংলাদেশের রোহিঙ্গা সংকট সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থায় রয়েছে, যা এক কথায় সমাধানের অতীত। তবে স্পেনের সাথে মরক্কোর বিরোধ দমনে ইইউ যদি সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ না করে, সেক্ষেত্রে স্পেনের পক্ষে এককভাবে এর মোকাবিলা করা বেশ কঠিন হয়ে দাঁড়াবে, যা ইইউভুক্ত দেশগুলোর পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়কে অনেকাংশে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
ড. ফরিদুল আলম : অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
