দুই বছর আগে আমার ANT101 কোর্সে জমা পড়া কয়েকটি খাতা আবার খুলে বসেছি। লেখাগুলোর বিষয় ছিল জুলাই-আগস্ট ২০২৪-এর ব্যক্তিগত স্মৃতি। এগুলো বড় কোনো রাজনৈতিক বিশ্লেষণ নয়।
শিক্ষার্থীরা লিখেছিল নিজেদের দিনগুলোর কথা—কখন ঘুম থেকে উঠেছে, কোন ক্লাসে দেরি হয়েছে, মিডটার্মের প্রস্তুতি কত দূর এগিয়েছে, ট্রাফিক জ্যামে কতক্ষণ আটকে ছিল, পরিবার কী বলেছে, আর কখন প্রথম মনে হয়েছে—দূরে কোথাও ঘটে চলা ঘটনাটি আসলে তার নিজের জীবনেও প্রবেশ করেছে।
একজন শিক্ষার্থী লিখেছিল, ১ জুলাই আন্দোলনটি কী নিয়ে, সে জানতই না। তার মনে ছিল ১১টার ক্লাসে দেরি হওয়া, বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো এবং ল্যাবের মূল্যায়নের ভয়। শুক্রবারের ছুটির দিনটি সে সাধারণত শুয়ে কাটাত। তখনো সে জানত না, কয়েক দিনের মধ্যে নিজের সমবয়সী এবং আরও কম বয়সী মানুষের মৃত্যুর সংবাদ তাকে দেখতে হবে।
আরেকজন তখন ডেঙ্গু ও টাইফয়েডে আক্রান্ত। হাসপাতাল, ক্যানুলা, জ্বর, মিস হয়ে যাওয়া ক্লাস এবং সেমিস্টার পিছিয়ে যাওয়ার দুশ্চিন্তার মধ্য দিয়ে আন্দোলনের খবর তার কাছে পৌঁছাচ্ছিল। প্রচণ্ড জ্বরের মধ্যে সে প্রশ্নপত্র ফাঁস ও বৈষম্যের সংবাদ দেখেছে। হাসপাতালে যাওয়ার পথে পরিচিত এক অন্তর্মুখী বন্ধুকে পতাকা ও প্ল্যাকার্ড হাতে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছে।
অন্য একজনের সামনে মিডটার্ম। আন্দোলনের সংবাদ দেখছে, সামাজিক মাধ্যমে অপরিচিত মানুষের সঙ্গে কথা বলছে, আবার পরীক্ষার সিলেবাস শেষ করারও চেষ্টা করছে। সে নিজেকেই প্রশ্ন করেছে, সবকিছু জেনেও এত দিন কেন প্রায় উদাসীন ছিল?
ইতিহাস সম্ভবত এভাবেই মানুষের জীবনে প্রবেশ করে। প্রথমে দূরের একটি শব্দ হিসেবে। তারপর যানজট, বন্ধ হয়ে যাওয়া ক্লাস কিংবা মোবাইলের পর্দায় ভেসে ওঠা একটি দৃশ্য হিসেবে। একসময় সেটি ঘরের ভেতরে এসে বসে এবং মানুষকে জিজ্ঞেস করে, তুমি কোথায় দাঁড়াবে?
এই লেখাগুলো ইতিহাসের চূড়ান্ত নথি নয়। কোথাও তীব্র রাগ আছে, কোথাও অসম্পূর্ণ তথ্য, কোথাও মুহূর্তের আবেগ। কিন্তু নৃবৈজ্ঞানিকভাবে এগুলোর মূল্য অন্য জায়গায়। ঘটনাগুলো মানুষ তখন কীভাবে অনুভব করেছিল, ভয় কীভাবে ক্ষোভে এবং ক্ষোভ কীভাবে অংশগ্রহণে রূপ নিয়েছিল লেখাগুলো তার জীবন্ত দলিল।
মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে শিক্ষার্থীদের ভাষা বদলে যেতে দেখা যায়। যে শিক্ষার্থী শুরুতে আন্দোলনের খবরই জানত না, ১৪ জুলাইয়ের পর সে লিখেছিল—দীর্ঘদিন পর দেশটিকে আবার নিজের হৃদয়ের মধ্যে অনুভব করেছে; এই দেশ শুধু কারও একার নয়, সবার।
...ইতিহাস সম্ভবত এভাবেই মানুষের জীবনে প্রবেশ করে। প্রথমে দূরের একটি শব্দ হিসেবে। তারপর যানজট, বন্ধ হয়ে যাওয়া ক্লাস কিংবা মোবাইলের পর্দায় ভেসে ওঠা একটি দৃশ্য হিসেবে। একসময় সেটি ঘরের ভেতরে এসে বসে এবং মানুষকে জিজ্ঞেস করে, তুমি কোথায় দাঁড়াবে?
আরেকজন ৩ আগস্ট শহীদ মিনারের সমাবেশকে দেখেছিল যেন নতুন একটি দেশ গঠনের আগে সম্মিলিত শপথের মুহূর্ত। এই রূপান্তরটিই আমাকে আশার নৃবিজ্ঞান নিয়ে ভাবায়।
আশা মানে সামনে সব ভালো হয়ে যাবে, এমন সরল বিশ্বাস নয়। বরং নিশ্চিত ভবিষ্যৎ না থাকার পরও মানুষ সেই ভবিষ্যৎ কল্পনা করে, তার জন্য সম্পর্ক গড়ে, ঝুঁকি নেয় এবং কাজ শুরু করে। আশা একা মানুষের ব্যক্তিগত আবেগ নয়; এটি একটি সামাজিক সক্ষমতা।
যে মানুষ মনে করে তার কথা কখনো শোনা হবে না, যোগ্যতার কোনো মূল্য থাকবে না, অন্যায়ের প্রতিকার পাওয়া যাবে না কিংবা কথা বললে বিপদ বাড়বে তার ভবিষ্যৎ কল্পনার পরিসর ক্রমে ছোট হয়ে আসে। সে পাঁচ বছর পরের জীবন নয়, পরের দিনটি নিরাপদে পার করার কথা ভাবে।
অন্যদিকে, মানুষ যখন বিশ্বাস করে পরিবর্তন সম্ভব, তখন পরিচিত সামাজিক সীমানাগুলোও নড়তে শুরু করে। শিক্ষার্থীদের স্মৃতিতে তার বহু ছোট চিহ্ন রয়েছে। কেউ অপরিচিত আহত মানুষকে সাহায্য করছে, কেউ খাবার ও পানি নিয়ে দাঁড়াচ্ছে, কেউ বিপদের মধ্যে অন্যকে ঘরে আশ্রয় দিচ্ছে।
একজন লিখেছিল, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধাওয়া থেকে বাঁচাতে স্থানীয় নারীরা তাকে বাড়ির ভেতর লুকিয়ে রেখেছিলেন; পরে আবার আন্দোলনে ফেরার একটি গোপন পথও দেখিয়ে দিয়েছিলেন।
৫ আগস্টের পর সেই আশা আরও দৃশ্যমান হয়েছিল। শিক্ষার্থীরা রাস্তায় যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করেছে, দেয়ালে ছবি এঁকেছে, উপাসনালয় ও পাড়া পাহারা দিয়েছে, নিজেদের মতো করে শহরের দায়িত্ব নেওয়ার চেষ্টা করেছে।
একজন শিক্ষার্থী লিখেছিল, স্বাধীনতা অর্জনের পর সেটিকে রক্ষা করাই তাদের পরবর্তী কাজ। রাস্তায় শিক্ষার্থীদের তৎপরতা দেখে তার মনে হয়েছিল, এটিই তাদের স্বপ্নের বাংলাদেশ।
দুই বছর আগে খাতাগুলোয় যে দেশটির কথা লেখা হয়েছিল, সেটি নিখুঁত কোনো রাষ্ট্রের নকশা ছিল না। সেটি ছিল ভয় কাটিয়ে ভবিষ্যৎ কল্পনা করতে শেখা একটি প্রজন্মের অসম্পূর্ণ খসড়া।
দুই বছর পর সেই খসড়াটির কাছে ফিরে আসা প্রয়োজন।
রাষ্ট্রের ক্যালেন্ডারে ৫ আগস্ট এখন ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস’ এবং সরকারি ছুটির দিন। জাতীয় সংসদের নথিতে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি জাদুঘর এবং শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের কল্যাণ-পুনর্বাসনের জন্য পৃথক আইনেরও উল্লেখ রয়েছে। অর্থাৎ জুলাইয়ের স্মৃতিকে আনুষ্ঠানিকভাবে সংরক্ষণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর একটি রাষ্ট্রীয় কাঠামো তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ একটি প্রতিযোগিতামূলক জাতীয় নির্বাচনও অতিক্রম করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্বাচন পর্যবেক্ষক মিশন নির্বাচনটিকে বিশ্বাসযোগ্য ও দক্ষতার সঙ্গে পরিচালিত বলে মূল্যায়ন করেছে এবং গণতান্ত্রিক শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার পথে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখেছে। একই মূল্যায়নে স্থানীয় রাজনৈতিক সহিংসতা, গণআক্রমণের ভয় এবং অনলাইনে ছড়ানো বিভ্রান্তিকর বয়ানের মতো উদ্বেগও চিহ্নিত হয়েছে।
এটি একই সঙ্গে অগ্রগতি ও সতর্কতার ছবি।
নির্বাচন গণতন্ত্রের অপরিহার্য ভিত্তি। রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি, আইন এবং স্মৃতির প্রতিষ্ঠানও প্রয়োজনীয়। কিন্তু সরকার বদলাতে একটি দিন লাগতে পারে; ক্ষমতার ব্যাকরণ বদলাতে অনেক বেশি সময় লাগে।
ইতিহাসের ক্যালেন্ডার এবং মানুষের আশার ক্যালেন্ডার এক গতিতে চলে না।
গণঅভ্যুত্থানের দিন মানুষ ভবিষ্যৎকে খুব কাছ থেকে দেখতে পায়। মনে হয়, পুরোনো কাঠামো সরে গেলেই ন্যায়সঙ্গত সমাজটি প্রায় সঙ্গে সঙ্গে এসে উপস্থিত হবে। কিন্তু আন্দোলনের সংহতিকে প্রতিষ্ঠান, নিয়ম, দলীয় আচরণ ও দৈনন্দিন নাগরিক মর্যাদায় রূপ দেওয়া দীর্ঘ কাজ। সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে ব্যাপক সম্মতি থাকলেও তার গতি, পদ্ধতি ও বাস্তবায়ন নিয়ে রাজনৈতিক মতপার্থক্য এখনো রয়েছে।
এই অসম্পূর্ণতার কথা বলা হতাশার চর্চা নয়। বরং আশাকে বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত রাখার উপায়। অন্ধ আশাবাদ বলে, সবকিছু ঠিক হয়ে গেছে। হতাশা বলে, কিছুই বদলায়নি। আশা সম্ভবত মাঝখানে দাঁড়িয়ে বলে, অনেক কিছু বদলেছে, কিন্তু পরিবর্তনের কাজটি এখনো শেষ হয়নি।
নৃবৈজ্ঞানিকভাবে গণতন্ত্র শুধু সংসদ, সংবিধান কিংবা নির্বাচনের মধ্যে বাস করে না। এটি থানা, শ্রেণিকক্ষ, অফিস, পরিবার, রাজনৈতিক দল এবং সামাজিক মাধ্যমের ভাষার মধ্যেও বাস করে। গণতন্ত্র সম্ভবত অন্য মানুষের উপস্থিতি সহ্য করার সামাজিক শিক্ষা।
এই দুই বছরে আমাদের তাই শুধু অর্জনের তালিকা কিংবা ব্যর্থতার হিসাব করলে চলবে না। দেখতে হবে ক্ষমতার ভাষা কতটা বদলেছে। সাধারণ মানুষ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে গেলে কেমন আচরণ পাচ্ছেন। রাজনৈতিকভাবে দুর্বল, সংখ্যায় কম কিংবা মতের দিক থেকে অজনপ্রিয় মানুষ নিরাপদ বোধ করছেন কি না।
বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন শিক্ষার্থী প্রশ্ন করতে পারছেন কি না। সংবাদমাধ্যম অস্বস্তিকর সত্য প্রকাশ করতে পারছে কি না। একজন কর্মকর্তা নাগরিককে অনুগ্রহ করছেন, নাকি তার অধিকারটি স্বীকার করছেন।
নৃবৈজ্ঞানিকভাবে গণতন্ত্র শুধু সংসদ, সংবিধান কিংবা নির্বাচনের মধ্যে বাস করে না। এটি থানা, শ্রেণিকক্ষ, অফিস, পরিবার, রাজনৈতিক দল এবং সামাজিক মাধ্যমের ভাষার মধ্যেও বাস করে। গণতন্ত্র সম্ভবত অন্য মানুষের উপস্থিতি সহ্য করার সামাজিক শিক্ষা।
এর অর্থ সব মতকে সঠিক বলে মেনে নেওয়া নয়। এর অর্থ হলো, আমার সঙ্গে একমত না হলেও অন্য মানুষটির নাগরিক মর্যাদা অক্ষুণ্ন থাকবে। তার প্রশ্নকে সঙ্গে সঙ্গে ষড়যন্ত্র বলা হবে না। সমালোচনাকে শত্রুতা এবং দ্বিমতকে বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে দেখা হবে না। একইভাবে সমালোচনাও গুজব, অপমান কিংবা প্রতিশোধের ভাষায় নেমে আসবে না।
সবাই কথা বলতে চায়; শোনার মানুষ তুলনামূলকভাবে কম। অথচ ক্ষমতার আসল পরীক্ষা সে কত জোরে কথা বলতে পারে, তা নয়, তার বিরুদ্ধে বলা ছোট কথাটুকু সে কতটা স্থিরভাবে শুনতে পারে।
দুই বছর পর তিনটি প্রশ্ন তাই আমাদের সামনে থেকে যায়। ক্ষমতার মুখ বদলেছে, কিন্তু ক্ষমতার ভাষা কতটা বদলেছে? তরুণেরা কি এখন দেশে থেকে ভবিষ্যৎ নির্মাণের একটি বিশ্বাসযোগ্য পথ দেখতে পাচ্ছে? আর আমরা কি জুলাইয়ের স্মৃতিকে একটি বার্ষিক অনুষ্ঠানে রাখব, নাকি তাকে প্রতিদিনের গণতন্ত্রে রূপ দেবো?
দুই বছর আগে শিক্ষার্থীদের খাতায় লেখা ভবিষ্যৎটি কোনো দলীয় ইশতেহার ছিল না। সেখানে রাগ ছিল, ভয় ছিল, ভুল ছিল; কিন্তু একটি দৃঢ় বিশ্বাসও ছিল, রাষ্ট্র অন্য রকম হতে পারে, ক্ষমতা সংযত হতে পারে এবং সাধারণ মানুষও ভবিষ্যতের বৈধ নির্মাতা হতে পারে।
৫ আগস্টের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উত্তরাধিকার সম্ভবত ক্ষমতার পরিবর্তনমাত্র নয়। উত্তরাধিকারটি হলো, সাধারণ মানুষ একবার বিশ্বাস করেছিল, দেশের ভবিষ্যৎ কল্পনা করার অধিকার তারও আছে।
রাষ্ট্রের ক্যালেন্ডারে দিনটি এখন প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু শিক্ষার্থীদের খাতায় লেখা দেশটি এখনো নির্মাণাধীন। আশার খাতাগুলো তাই বন্ধ হয়নি। প্রতিশ্রুতিটিও এখনো অসম্পূর্ণ। আর সম্ভবত এ কারণেই সেটিকে রক্ষা করা জরুরি।
ড. মঈন জালাল চৌধুরী : শিক্ষক ও গবেষক
