বিজ্ঞাপন

দেশপ্রেমিক রবীন্দ্রনাথ ও তার সাহিত্যকর্ম

দেশপ্রেমিক রবীন্দ্রনাথ ও তার সাহিত্যকর্ম

আমরা যখন স্বাধীন বাংলাদেশের খোলা আকাশের নিচে দাঁড়াই, কী উদাত্ত আহ্বানে আকাশ ডানা মেলে দেয় আমাদের মাথার ওপর, কণ্ঠে ধারণ করে গান—আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি...।

পৃথিবীতে নানা জাতি, নানা ভাষা, অজস্র কবি ও লেখক। কিন্তু অমরাত্মা রবীন্দ্রনাথের মতো এমন গান লিখতে পেরেছেন, যে গানের বাণী ও সুর একাত্ম হয়ে হৃদয় ও মনে তৈরি করে চির নতুন অনুভবের স্রোত! কত সাধারণ বাণী কিন্তু কত গভীর দৃশ্যময়তার মধ্যে কোটি কোটি মানুষের হৃদয় একটি সমতলে দাঁড়িয়ে গাইতে থাকে, মা, তোর বদনখানি মলিন হলে, ও মা, আমি নয়নজলে ভাসি...

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গানটি লিখেছিলেন ১৯০৫ সালে সাদাচামড়ার কলোনিবাদী ব্রিটিশ রাজ কর্তৃক বাংলা ভাগ করে বাংলা আসাম নিয়ে আলাদা প্রদেশ গঠন করে। তখন হিন্দু-মুসলমান দুই পক্ষই দুইভাবে পক্ষপাত করতে থাকলে বাংলার ভূমি পুত্র রবীন্দ্রনাথ দেশ প্রেমের উতল হাওয়ায় অবগাহন করতে লেখেন অবিনাশী গান—চিরদিন তোমার আকাশ, তোমার বাতাস, আমার প্রাণে বাজায় বাঁশি। আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি...

কত সাধারণ শব্দপুঞ্জে তিনি দেশমাতৃকার প্রতি বাঙালির আজন্মকালের অমৃত অনুভব প্রকাশ করেছেন আকুল শুভ্রতায় স্মৃতির স্রোতে ইতিহাসের মানচিত্রে, এমন অলৌকিক দেশপ্রেম মন্থন কেবলই বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের পক্ষেই।

আমরা যদি রবীন্দ্রনাথের ‘সার্থক জনম আমার’ কবিতাটি বিশ্লেষণ করি, এমন শরৎ শুভ্র সুখ প্লাবিত দেশবন্দনা কোথায় পাবো? তিনি কবিতায় লিখেছেন—

‘সার্থক জনম আমার জন্মেছি এই দেশে।

সার্থক জনম, মা গো, তোমায় ভালোবেসে।।

জানি নে তোর ধনরতন   আছে কি না রানীর মতন,

শুধু   জানি আমার অঙ্গ জুড়ায় তোমার ছায়ায় এসে।।’

মা, জন্মভুমি—যেকোনো মানুষের জন্য অমরাবতীর ঠিকানা। মাতৃভূমিকে ভালোবেসে কত ভূমিপুত্র হাসতে হাসতে জীবন দিয়েছে আর গেয়েছে এমন অনুভব সত্তায় রবীন্দ্রনাথের কবিতা, শুধু জানি আমার অঙ্গ জুড়ায় তোমার ছায়ায় এসে...

সন্তান হয়তো বুভুক্ষু, নিঃস্ব কিন্তু সেই সন্তান শত ক্রোশ দূর থেকে আসে মাতৃভূমির কোনো আম্র মুকুলের ছায়ায় দাঁড়ায়, আশ্রয় নেয়, সেই সন্তানের সব শ্রম, অনুমান, পরিমাপ বা যুক্তি নিমিষে লাভ করে পূর্ণতার অনন্য সুখ আর প্রদীপ্ত লাবণ্য!

রবীন্দ্রনাথের অনিঃশেষ গানের মোহন যাদুমন্ত্রবলে যখন শিল্পী গেয়ে ওঠেন—

‘ও আমার দেশের মাটি, তোমার 'পরে ঠেকাই মাথা।

তোমাতে বিশ্বময়ীর, তোমাতে বিশ্বমায়ের আঁচল পাতা।।

তুমি মিশেছ মোর দেহের সনে,

তুমি মিলেছ মোর প্রাণে মনে,

তোমার ওই শ্যামলবরন কোমল মূর্তি মর্মে গাঁথা।।’

মানুষ যখন দিকভ্রান্ত, পথ হারা, বেদনায় অপমানে জর্জরিত—সেই সময়ে মা যখন দুই হাত বাড়িয়ে সন্তানকে বক্ষে ধারণ করেন, সন্তানের কোনো সন্তাপ, মনোবেদনা, দুঃখ থাকতে পারে না, সবটাই মা অনিঃশেষ মমতায় শুষে নিয়ে নতুন জীবন ও আশা দান করেন।

রবীন্দ্রনাথের এই গানে বিশ্ব সন্তানের সব মর্মবেদনার ভার লাঘব করে নিবেদনের এক চূড়ান্ত জায়গায় পৌঁছে যায়, যেখানে শান্তি সুধার অবিশ্রান্ত স্রোত থাকে অবিশ্রান্ত প্রবহমান, মায়ের শ্যামল বরণ মুখের পানে তাকিয়ে! এমন মর্মচ্ছেদী গানে ও সুরে বাংলা ভাষার সব শ্রেণি পেশার মানুষ নুয়ে পড়েন সবুজ শ্যামল কোমল দূর্বাঘাসে, শিশিরের পবিত্র ভালোবাসায়, এমনই যাদুমন্ত্রের তরঙ্গ তোলের রবীন্দ্রনাথের এই গান, দেশপ্রেমের। মাতৃভূমির প্রতিটি ঘাস নদীর স্রোত নৌকার পাল অনুভব সত্তায় তীব্র দহনে জ্বলে ওঠে অন্তরস্রোতের অথৈ জলে।

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জ্ঞান, প্রজ্ঞা, সৃষ্টিশীলতা, চিন্তার বিস্তার বিশ্বচরাচরে অতুলনীয়। কবিতা, গান, প্রবন্ধ, নাটক, বিজ্ঞানসহ মানব জীবনের এমন কোনো সূত্র নেই, যেখানে তিনি কলম ধরেননি। গল্প-উপন্যাসেও রবীন্দ্রনাথ মুগ্ধকর এক বিশ্বসারথি।

‘গোরা’ উপন্যাস রবীন্দ্রনাথের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কীর্তি। বিশালায়তনের উপন্যাস গোরা। গোরা চরিত্রকে কেন্দ্র করে গোটা উপন্যাস আবর্তিত। কিন্তু কে এই গোরা? গোরা বাংলাদেশের সন্তান নয় যদিও কিন্তু জন্মেছে এই দেশে এবং আইরিশ পুত্র।

গোরা যখন পিতামাতা হারায়, তাকে দত্তক নিয়ে কৃষ্ণদয়াল ও আনন্দময়ী দম্পতি চলে আসে কলকাতায়। মজার ঘটনা গোরা’র জন্ম হয় ১৮৫৭ সালে, যখন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শাসনের বিরুদ্ধে উপমহাদেশের সিপাহীরা বিদ্রোহ করেছিল, স্বাধীনতার পক্ষে।

গোরা’র জন্ম তো অন্যকোনো সালেও হতে পারতো, দু-এক বছর সামনে পেছনে নিয়ে, কিন্তু ভারতের স্বাধীনতা পিয়াসী রবীন্দ্রনাথ সিপাহী বিদ্রোহের গোরোকে জন্ম দিয়ে দেশ প্রেমের উত্তাল তরঙ্গে নিজেকে স্থাপন করেন এবং গোরা হয়ে ওঠে শান্তি, সৃজনশীলতা, অসাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে, জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সব মানব সত্তার এক অনন্য প্রতীক।

রবীন্দ্রনাথ যখন কবিতায় লেখেন—

‘এসো হে আর্য, এসো অনার্য,

              হিন্দু মুসলমান।

       এসো এসো আজ তুমি ইংরাজ,

              এসো এসো খৃস্টান।’

তখন গোরা উপন্যাসের গোরা কেবল আইরিশ পুত্র থাকে না, হয়ে ওঠে বিশ্বপুত্রমানব। জ্বলে ওঠে দেশের প্রতি, মানুষের প্রতি দায় পালনের এক অবিশ্রান্ত যাত্রা।

যে যাত্রা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শুরু করেছিলেন জীবনের শুরুর বেলায়, সব অত্যাচারী পীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে। গোরা উপন্যাসে গোরা চরিত্রের বিচিত্র ধরনের উত্থান-পতন আছে, কিন্তু সব বাঁধা অতিক্রম করে গোরা চরিত্র যখন মায়ের পরিচয় পাওয়ার পর উচ্চারণ করে—‘তার বাপ নাই, তার মা নাই, দেশ নাই, জাতি নাই, নাম নাই, দেবতা নাই।’

সব অহংকার সংস্কার চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায়, যে মাকে এতদিন শুচিতার জন্য দূরে ঠেলে রেখেছিল, সেই মাকে কাছে টেনে নিয়ে উচ্চারণ করে—‘ মা, তুমিই আমার মা। যে মাকে খুঁজে বেড়াচ্ছিলুম তিনিই আমার ঘরের মধ্যে এসে বসে ছিলেন। তোমার জাত নেই, বিচার নেই, ঘৃণা নেই—শুধু তুমি কল্যাণের প্রতিমা। তুমি আমার ভারতবর্ষ!’

দেশ মাতৃকার চরণে এমন করে কোনো কবি কবে আত্মাহুতি দিয়েছেন বিশ্ব, মহাত্মা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আগে? তিনি বর্ণে বর্ণে চরণে চরণে দেশ মাতৃভূমির প্রতি চির নিবেদিত ছিলেন অমৃত্যু।

আমাদের মনে পড়ে যায়, ব্রিটিশরা জালিয়ানওয়ালাবাগে জেনারেল পিশাচ ডায়ারের নির্দেশে জনতার ওপর গুলি চালায় ১৯১৯ সালের ১৩ এপ্রিল। অনেক ভারতীয় হত্যার শিকার হয়। ব্রিটিশরা হত্যার ঘটনা গোপন রাখার নানা চেষ্টা করা সত্ত্বেও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন এই পাশবিক ঘটনা জানতে পারেন, তিনি প্রবলভাবে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন।

আমরা জানি না, সেই সময়ে ভারতের কোনো কবি, লেখক মানবিকতায়, দেশপ্রেমের অলৌকিক মায়ায় এমন করে নিজেকে তুলে ধরেছিলেন! একমাত্র অনন্য, অফুরন্ত রবীন্দ্রনাথই অনাথের নাথ হয়ে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের পতাকা তুলে ধরেছিলেন।

বিস্ময়কর ঘটনা হলো, পাঞ্জাবের জালিয়ানওয়ালাবাগে ব্রিটিশদের এই পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডে ভারতের রাজনীতিবিদরা অবাক নিশ্চুপ ছিলেন। মানবদরদী, দেশপ্রেমের নিরন্তর পথিক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছুটে গেলেন মহাত্মা গান্ধীর কাছে, এই নিরীহ নিরাপদ মানুষ হত্যার প্রতিবাদ করার জন্য, কিন্তু তিনি ফিরিয়ে দিলেন রবীন্দ্রনাথকে, এই বলে, প্রতিবাদের সময় এখন নয়।

অশান্ত রবীন্দ্রনাথ গেলেন স্বভাষার বিরাট রাজনৈতিক নেতা চিত্তরঞ্জন দাসের কাছে বড় আশা নিয়ে। কিন্তু সেখানেও তিনি বিফল হলেন। ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক জালিয়ানওয়ালাবাগ এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে শামিল হতে চাইলেন না কেউই। অবাক ও হতাশ রবীন্দ্রনাথ নিজের কাছে যা গচ্ছিত ছিল, সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশদের দেওয়া নাইটহুড উপাধি, তিনি ঘৃণায় অপমানে ফিরিয়ে দিলেন ব্রিটিশদের কাছে। নামের শুরুতে লিখলেন না কোনোদিন স্যার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

লেখায়, কর্মে ও জীবন যাপনে স্বদেশের ঘ্রাণ, স্বদেশের মমতা ও মায়া নিয়েই রবীন্দ্রনাথ চিরকাল পথ চলেছেন। তিনি পৃথিবীর নানাদেশে ভ্রমণ করেছেন, সাহিত্য সভায় অংশ নিয়েছেন এবং যখনই সুযোগ এসেছে তিনি উজাড় করে ভারত দেশমাতৃকার বন্দনা করেছেন আনন্দবিহারে মম চিত্তে নিতি নৃত্যে...।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিশ্বজুড়ে চিরকালের বাঙালি জাতি সত্তার অমৃত প্রতীক। সারা জীবন জুড়ে তিনি দুটি প্রসঙ্গে অনড় ছিলেন, একটি মানুষ, দ্বিতীয়টি দেশ। দেশ ও মানুষ নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন সমুদ্র বিহারের কল্যাণ পুরুষ। 

মনি হায়দার : কথাসাহিত্যিক