সাংবাদিকতা একটি সৃজনশীল ও সংবেদনশীল পেশা। এই পেশার সাথে প্রযুক্তির নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। প্রযুক্তির বিকাশের সাথে সাথে এই পেশার ধরন-ধারণ ও প্রকরণ পরিবর্তিত হয়েছে, এখনো হচ্ছে।
একবিংশ শতাব্দীতে এসে প্রথমে সিএআর (কম্পিউটার এ্যাসিসটেড রিপোর্টিং), পরে ইন্টারনেটভিত্তিক সাংবাদিকতা এবং বর্তমানে চলছে এআই বা কৃত্তিমবুদ্ধিমত্তার যুগ। সেখানে শুধু সংবাদ প্রক্রিয়াজাতকরণই নয় পুরো সংবাদপত্র প্রকাশের দায়িত্বও নিচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।
২০২৫ সালের ১৮ মার্চ ইতালিতে এল ফগলিও (Il Foglio) নামের একটি পরিপূর্ণ সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়েছিল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে। চার পাতার এই দৈনিক সংবাদপত্র সাংবাদিকতায় এআই এর ব্যবহারের এক বিশেষ মাইলফলক।
এছাড়া বর্তমান বিশ্বের প্রধানসারির সংবাদমাধ্যম ও সংবাদ সংস্থাগুলো বিভিন্ন পরিসরে এআই ব্যবহার করে আসছে। টেলিভিশনে অনেকক্ষেত্রে সংবাদ পাঠ করছে মানুষের বদলে কৃত্রিমবুদ্ধিমত্তার সংবাদ উপস্থাপক (non-human news anchor)। বাস্তবতা হলো সাংবাদিকতায় কৃত্রিমবুদ্ধিমত্তার প্রয়োগ ও প্রভাব থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখার সুযোগ নেই।
নতুন এই প্রযুক্তি সাংবাদিকতায় অনেক নতুন নতুন সুবিধা যুক্ত করছে। তবে এর পাশাপাশি নিশ্চিতভাবে তৈরি করছে কিছু গভীর সংকটও। যে সংকট কিছু কিছু ক্ষেত্রে খুবই গুরুতর। সমাজের শৃঙ্খলা ও গণতন্ত্রের জন্য মারাত্মক হুমকি। জাতিসংঘের শিক্ষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষণ বিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো গবেষণাপত্র প্রকাশ করে বিষয়ে সতর্ক করেছে।
ইউনেস্কো বলছে, এআই অবশ্যই ভুল করতে পারে। যা নাগরিককে বিভ্রান্ত করতে পারে, নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে পারে। একইসাথে কমে দিতে পারে সাংবাদিকতার বিশ্বাসযোগ্যতা। সাংবাদিকের চাকরির সুযোগ কমে যাওয়ার ভয়তো আছেই।
প্রথমেই আসা যাক সাংবাদিকতায় এআই-এর অপব্যবহারের দিকটিতে। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের এক মারাত্মক অনুষঙ্গ হলো ভুয়া সংবাদ ফটোকার্ড। খুব সম্ভবত এমন কোনো সামাজিক যোগাযোগ ব্যবহারকারী নেই, যিনি প্রতিদিন ভুয়া ফটোকার্ডের সম্মুখীন হন না।
ইউনেস্কোর সংখ্যা অনুযায়ী, চরিত্রগতভাবে যেগুলো হলো ছদ্মবেশী ভুয়া সংবাদ আধেয় বা Imposter Content। এই আধেয়গুলো এখন অতি সহজে এআই টুল ব্যবহার করে তৈরি করা যায়। যেগুলো আবার আধেয় তৈরির প্রেক্ষাপট বিবেচনায় চিপ ফেক নামে পরিচিত।
কোনো এডিটের প্রয়োজন নেই, শুধু কৃত্রিমবুদ্ধিমত্তার অ্যাপে কিছু নির্দেশনা ও ছবি দেওয়ায় যথেষ্ট। যার মাধ্যমে মুহূর্তেই তৈরি হয় ভুয়া সংবাদ আধেয়। যা পুরো তথ্য বাস্তুসংস্থানকেই দূষিত করে ফেলেছে।
বাংলাদেশকেন্ত্রিক ফেসবুক ওয়ালে আপনি প্রতিনিয়ত হাজার হাজার যেসব ভুয়া ফটোকার্ড দেখেন সেগুলোর বেশিরভাগই চিপ ফেক। যে প্রবণতাকে সহজলভ্য করেছে এআই টুল। এছাড়া ভুয়া উক্তি, আরোপিত সূত্র আবিষ্কার, মিথ্যা পরিসংখ্যান এবং তথ্য বিকৃতভাবে সংবাদ উপস্থাপনে এআই টুল যথেচ্ছা ব্যবহার করা হচ্ছে। যা থামাতে এরইমধ্যেই সোচ্চার আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থাসমূহ।
২০২৫ সালের ইউনেস্কোর বৈশ্বিক গণমাধ্যম ও তথ্য সাক্ষরতা সপ্তাহে এক ধরনের বিশেষ প্রচারণা চালানো হয়েছিল। সংস্থাটির স্লোগান ছিল-এআই ভুল করতে পারে (AI Can Make Mistakes)।
আরও পড়ুন
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নাগরিকের মধ্যে তৈরি করতে পারে মতিভ্রম। কারণ এআই টুলগুলো অনেক সময় পরিপূর্ণ ভুল আধেয় তৈরি করে থাকে। যার সাথে বাস্তবতা ও সত্যতার কোনো সম্পর্ক নেই। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, সংবাদের জন্য তথ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে এআই টুলগুলো ইন্টারনেট পরিসরে ভাসতে থাকা তথ্যের সাহায্য নেয়।
এক্ষেত্রে ভুল তথ্য, অপতথ্য ও বিদ্বেষমূলক তথ্যের ঝুঁকি প্রবল। এখানে আরেকটি বিষয় প্রণিধানযোগ্য। এআই টুল কিন্তু নির্দেশনা ছাড়া চলতে পারে না। আর এআই টুলের তথ্য প্রক্রিয়াজাতকরার সামর্থ্য মানব মস্তিষ্কের চাইতে খুবই সীমিত। তাই এখানে একজন প্রতিবেদকের মস্তিষ্কের ওপর অবিচল আস্থা রাখা জরুরি।
এই আবেদন বা প্রয়োজন এখনো ফুরিয়ে যায়নি। এছাড়া ইউনেস্কোসহ অন্যান্য গণমাধ্যম উন্নয়ন সংস্থা এখনো একমত যে, একজন প্রতিবেদকের মস্তিষ্কই হলো এখনো পর্যন্ত কার্যকর ও যথাযথ যাচাইকরণ টুল।
এবার আসা যাক, এআই যুগে সাংবাদিকের চাকরির নিশ্চয়তা ও নিরাপত্তা প্রসঙ্গে। মাত্র এক দশক আগেও বাংলাদেশের সংবাদপত্রগুলোর একটি প্রধান বিভাগ ছিল আর্ট অ্যান্ড ডিজাইন। চার-ছয় জনের দলটির কর্মীরা সংবাদপত্রের জন্য কার্টুন ও বিভিন্ন ধরনের লেখার মেকআপ ডিজাইন করেন।
সংবাদমাধ্যমের জন্য এটা একটি বৈশ্বিক চর্চা। বিশ্বের প্রায় সব প্রতিষ্ঠিত গণমাধ্যমে এই বিভাগ আছে। কিন্তু কৃত্রিমবুদ্ধিমত্তা এই চাকরিতে ভাগ বসিয়েছে এআই অ্যাপ। বাংলাদেশের বিভিন্ন গণমাধ্যম এখন চিত্রশিল্পী নিয়োগের বদলে চ্যাটজিপিটি, ইনভিডিও এআই, স্টিভ এআই এবং গুগল ইমেজ এফএক্স ব্যবহার করছেন।
এছাড়া অনুবাদ, সংবাদ সম্পাদনা, মেক আপ থেকে শুরু নানা কাজে কৃত্রিমবুদ্ধিমত্তার অ্যাপ ব্যবহার হচ্ছে। যা নিশ্চিতভাবেই সংবাদ প্রতিবেদন ও সংবাদ কর্মীদের কাজের ক্ষেত্র সংকুচিত করছে। একইসাথে গ্রাফিক্স টিমের পরিধিও কমছে টেলিভিশন ও অনলাইন সংবাদমাধ্যমগুলোতে।
জার্মানির ঐতিহ্যবাহী ট্যাবলয়েড গণমাধ্যম বিল্ড (Bild) ২০২৩ সালের জুন মাসে ২০০ জন সংবাদকর্মী ছাঁটাই করে। একইসাথে সংবাদপত্রটি ঘোষণা দেয়, সংবাদপত্রটি এক-তৃতীয়াংশ কর্মী ছাঁটাই করবে এবং তাদের কার্যাবলী মেশিনের মাধ্যমে করার উদ্যোগ নেবে। যে উদ্যোগ চলমান।
খুব সম্ভবত বাংলাদেশেও অনেক গণমাধ্যমে মানুষের কাজ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মেশিন দিয়ে করানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। হয়তো অনেকেই চাকরিও হারিয়েছেন। কিন্তু সব পরিসরে না হওয়ায় হয়তো তা দৃশ্যমান হয়নি।
বাংলাদেশেসহ বিশ্বের গণমাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। বরং এ বিষয়ে যথাযথ প্রস্তুতি প্রয়োজন। যার মাধ্যমে এই প্রযুক্তির অভিঘাত মোকাবিলা করে নতুন দিনে সুন্দর করে পথ চলা সম্ভব হয়।
আরও সহজ করে বলতে গেলে আগামী দিনে গণমাধ্যমের টেকসইভাবে টিকে থাকতে কৃত্রিমবুদ্ধিমত্তার সাথে পাশাপাশি কাজ করার দক্ষতা অর্জনের কোনো বিকল্প নেই।
১. https://www.theguardian.com/technology/2025/mar/18/italian-newspaper-says-it-has-published-worlds-first-ai-generated-edition
২. https://www.unesco.org/en/articles/ai-can-make-mistakes-why-media-literacy-matters-more-ever
৩. What future for journalism in the age of AI?, 19 Jul 2023, Al Jazeera, online, Retrieved on 06-08-2026; https://www.aljazeera.com/opinions/2023/7/19/what-future-for-journalism-in-the-age-of-ai
রাহাত মিনহাজ : সহকারী অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
