বিজ্ঞাপন

কক্সবাজারে প্যারাসেইলিংয়ে মৃত্যু, পর্যটকবান্ধব পরিবেশ আশা করা কি দোষের?

কক্সবাজারে প্যারাসেইলিংয়ে মৃত্যু, পর্যটকবান্ধব পরিবেশ আশা করা কি দোষের?

কক্সবাজারের দরিয়ানগর সৈকতে প্যারাসেইলিং করার সময় রশি ছিঁড়ে সমুদ্রে পড়ে শৌভিক রায় (৩১) নামের এক পর্যটকের মৃত্যু হয়। ঘটনাটি ১ আগস্ট ২০২৬-এর। তার আগে থেকে কক্সবাজারে প্যারাসেইলিং চলছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর সবাই প্রশ্ন তুলছে, প্রশাসন কী করছে?

প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে অবৈধভাবে ও অপর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কার্যক্রম চালানোর কারণে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে, যা পর্যটনবান্ধব পরিবেশ ও নিরাপত্তার ওপর গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। আরও প্রশ্ন উঠেছে, ওই পর্যটক এবং সেই প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতার বিষয়ে।

প্রথমত, নিহত পর্যটকের ওজন ছিল প্রায় ১১০ কেজি। এত ওজনের একজন পর্যটক এই জাতীয় খেলার জন্য উপযুক্ত কিনা, তা যাচাই না করেই শুধুমাত্র অতিরিক্ত অর্থের লোভে তাকে সুযোগ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। 

দ্বিতীয়ত, প্যারাসেইলিং পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের ওই কাজে পূর্ব অভিজ্ঞতা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত না করে চালানো যথার্থ ছিল না বলে অভিজ্ঞজনের ধারণা। ওই প্রতিষ্ঠানটি বহু বছর ধরেই কক্সবাজারের বিচে এই ধরনের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে আসছিল।

কথা হচ্ছে, এটি পরিচালনা করতে তারা প্রশাসন থেকে কোনো ধরনের অনুমতি বা লাইসেন্স প্রাপ্ত হয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করছিল কিনা। কক্সবাজারের জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে একটা কমিটি আছে-যার নাম বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটি।

পদাধিকার বলে এর সভাপতি জেলা প্রশাসক নিজে। পর্যটনের অন্যান্য স্টেক হোল্ডাররা অনেকেই এর সদস্য। এমনকি কক্সবাজারে টুরিস্ট পুলিশেরও বড় একটি ইউনিট রয়েছে। এত কিছু থাকার পরেও কেন এই দুর্ঘটনা—তা ব্যাপক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

এটি কি নিছকই একটি দুর্ঘটনা? যে পরিচালনা প্রতিষ্ঠানের খামখেয়ালিপনাও এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিনা তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। প্রশাসকের নাকে ডগার ওপর দাঁড়িয়ে যথাযথ বা উপযুক্ত লাইসেন্স ও প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার না করেই এই ধরনের কর্মকাণ্ডের এবং দুর্ঘটনার দায়ভার প্রশাসনের ওপরও বর্তায়।

এমনিতেই কক্সবাজার বিচ ডেসটিনেশন হওয়া সত্ত্বেও ওখানে ভালো মানের আবাসন এবং খাওয়া-দাওয়া ছাড়া অন্য কোনো বিনোদনমাধ্যম নেই। অথচ বিচ ট্যুরিজমে এগিয়ে থাকা অন্য দেশগুলো যেমন থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, শ্রীলঙ্কা, ভারতের গোয়া, মালদ্বীপ কিংবা অন্যান্য দেশগুলো এক্ষেত্রে অনেক এগিয়ে।

তারা তাদের বিচগুলো এবং বিচকেন্দ্রিক আনন্দ-বিনোদনের মাধ্যমগুলো এমনভাবে সাজিয়েছে—যা অন্যদের ঈর্ষার কারণ হতে বাধ্য। অথচ পৃথিবীর দীর্ঘতম অভঙ্গুর সমুদ্র সৈকতের দাবিদার কক্সবাজার কখনোই বিচ ট্যুরিজমে বিশেষ নজর দেয়নি।

উপরন্তু পর্যটন মৌসুমে অহেতুক দাম বাড়িয়ে পর্যটকদের হয়রানি নিত্য-নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর এ ব্যাপারে প্রশাসনেরও খুব বেশি নজরদারির কথা শুনিনি।

কক্সবাজার হচ্ছে পর্যটনের রাজধানী। একটা দেশ ততটাই উন্নত যতটা তার রাজধানী সুন্দর ও উন্নত। সেই বিবেচনায় পর্যটনের বিশ্ব মানচিত্রে যথেষ্ট সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও এর বাস্তবায়নের অভাবে বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কক্সবাজার।

অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন পর্যটন সংক্রান্ত বিশেষ কমিটির শেষ বৈঠকে কক্সবাজারে একটি পর্যটন মহা-পরিকল্পনা প্রণয়নের ব্যাপারে আলোচনাও সিদ্ধান্ত হয়েছে।

আমরা আশা করি, এটি অতি দ্রুত সঠিক উপায়ে বাস্তবায়ন করা অতীব জরুরি। তবে এই মহা-পরিকল্পনায় বেসরকারি অভিজ্ঞ প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্তিও বিশেষ জরুরি-যারা দেশি-বিদেশি পর্যটক পরিচালনায় অভিজ্ঞ এবং এখানে তাদের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার সংমিশ্রণ ঘটাতে পারবেন।

মূল কথা হচ্ছে, এখনই সময় সরকার কর্তৃক পর্যটন শিল্পকে বিশেষ প্রায়োরিটিতে নিয়ে আসা এবং পর্যটন মহা-পরিকল্পনার যথাযথ বাস্তবায়ন করা। আর তাহলেই প্রতিবছর বিশ্ব পর্যটন দিবস পালনের যথার্থতা এবং সার্থকতা অর্জন করতে পারবে সরকার।

তৌফিক রহমান : প্রধান নির্বাহী, জার্নি প্লাস এবং মহাসচিব, প্যাসিফিক এশিয়া ট্রাভেল অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশ চ্যাপ্টার