টমাস আলভা এডিসন সর্বকালের সেরা উদ্ভাবকদের একজন। বৈদ্যুতিক বাতি, ফনোগ্রাফ, চলচ্চিত্রসহ অনেক উদ্ভাবনের জন্য ইতিহাসখ্যাত। ছোটবেলা থেকেই কানে কম শুনতেন। পড়াশোনায়ও ভালো ছিলেন না। খারাপ রেজাল্টের জন্য স্কুল থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল।
শিক্ষকদের মতে, ছাত্র হিসেবে তিনি ছিলেন যা-তা। তবে শিক্ষকরা যা-ই মনে করুন, নিজের ওপর এডিসনের বিশ্বাস ছিল ষোল আনা। পণ করেছিলেন, উদ্ভাবক হবেন তিনি। প্রাণপাত করেছিলেন বৈদ্যুতিক বাতি উদ্ভাবনে।
বাড়ির গ্যারেজে ১০ হাজার ভিন্ন ভিন্ন পরীক্ষার পর খুঁজে পান কাঙ্ক্ষিত বস্তু, যা তিনি ফিলামেন্ট হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন বাতি জ্বালানোর জন্য। জীবদ্দশায় এক হাজারেরও বেশি পণ্যের প্যাটেন্ট করেছিলেন এডিসন।
শিক্ষকরা যার সম্বন্ধে মানসিক প্রতিবন্ধীর মতো ভয়ংকর শব্দ ব্যবহার করে, যাকে স্কুল থেকে বের করে দেয়, ভবিষ্যৎ জীবনে তার কী হওয়া উচিত? কিছুই না। অথচ শিক্ষকদের ধারণাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এডিসন হয়েছিলেন প্রাতঃস্মরণীয় ব্যক্তি। পৃথিবী যতদিন থাকব এডিসনের নাম ততদিন থাকবে। আর এডিসনের সেই শিক্ষকেরা? কালের ধুলোয় হারিয়ে যাবেন।
এভারেস্ট জয়ী এডমন্ড হিলারির কথা আমরা সবাই জানি। ১৯৫২ সালে এভারেস্ট জয়ের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছিলেন হিলারি। দমে যাননি। এভারেস্টের সামনে দাঁড়িয়ে আঙুল উঁচিয়ে বলেছিলেন, ‘এভারেস্ট, প্রথমবার আমাকে হারিয়েছ তুমি, কিন্তু পরেরবার দেখা হলে আমি তোমাকে হারাব। কারণ কী জানো? যা বড় হওয়ার তুমি হয়ে গেছো। কিন্তু আমি এখনো বড় হচ্ছি!’
এক বছর পর বন্ধু তেনজিং নোরগেকে নিয়ে ঠিকই এভারেস্ট জয় করেছিলেন হিলারি।
...ব্যর্থতা আর সফলতা নেহাতই আপেক্ষিক। সমাজ আমাদের জন্য সফলতা ব্যর্থতার কিছু ছাঁচ তৈরি করে রেখেছে, শতাব্দীর পর শতাব্দী এ ছাঁচে ফেলেই আমাদের সফলতা ব্যর্থতা মাপার চেষ্টা করা হচ্ছে।
এডিসন আর হিলারির গল্প বলতে হলো ছোট্ট এ কথাটি বলার জন্য যে, ব্যর্থতা আর সফলতা নেহাতই আপেক্ষিক। সমাজ আমাদের জন্য সফলতা ব্যর্থতার কিছু ছাঁচ তৈরি করে রেখেছে, শতাব্দীর পর শতাব্দী এ ছাঁচে ফেলেই আমাদের সফলতা ব্যর্থতা মাপার চেষ্টা করা হচ্ছে।
বেশিরভাগ মানুষ এ ছাঁচকেই মানদণ্ড ধরে নিয়ে জীবনযাপন করছে। কিন্তু একবারও কেউ প্রশ্ন করছে না, কেন এই বাঁধাধরা মানদণ্ড মানতে হবে আমাকে? আমি কি নিজের মতো করে সফলতা ব্যর্থতার মানদণ্ড ঠিক করে নিতে পারি না?
আমাদের দেশে মাধ্যমিক পরীক্ষার ফল ঘোষিত হয়েছে ১০ আগস্ট ২০২৬। ফলাফল বলছে, ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে গড় পাসের হার ৬৪.০৫ শতাংশ। ২০২৫ সালে এটা ছিলে ৬৮ দশমিক ০৪ শতাংশ। অর্থাৎ পাসের হার ৩ দশমিক ৯৯ শতাংশ কমেছে।
এমন অনেক প্রতিষ্ঠান আছে যেখানে একজন শিক্ষার্থীও পাস করেনি। দাখিলের ফলাফলে ছিল বড় বিপর্যয়, শতভাগ পাসের মাদরাসা কমেছে ৩২২টি, শূন্য পাস প্রতিষ্ঠান বেড়েছে ১৪৪টিতে।
১১টি শিক্ষা বোর্ডে এবার পাসের হার নেমে এসেছে ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশে, যা ২০০৭ সালের পর ১৯ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এক বছরের ব্যবধানে পাসের হার কমেছে ৬ দশমিক ২০ শতাংশ। একই সঙ্গে কমেছে জিপিএ-৫ পাওয়ার সংখ্যাও।
গ্রেড পয়েন্ট এভারেজ তথা জিপিএ নামের একটা জিনিসকে আজকাল সফলতার সবচেয়ে বড় মানদণ্ড বলে ধরা হচ্ছে। এবার মহার্ঘ্য সেই জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ লাখ ৬ হাজার ৯ জন পরীক্ষার্থী। তাদের ছবিতে ফেসবুক আর পত্রিকার পাতা সয়লাব।
হাত ধরাধরি করে নাচছে তারা। আনন্দে গান গাইছে। তাদের মুখের সামনে মাইক্রোফোন ধরে সফলতার কারণ জানতে চাচ্ছেন সাংবাদিকেরা। কিন্তু যারা জিপিএ-৫ নামের সেই মহার্ঘ বস্তু পায়নি? তারা কোথায়? প্রিয় বন্ধুটি যখন সফলতার আনন্দে প্রাণ খুলে হাসছে, ‘ব্যর্থতা’র তকমা পাওয়া অন্য বন্ধুটি তখন কী করছে? কেমন লাগছে তার?
জিপিএ নামের আরোপিত এক মাপকাঠিতে যারা সব শিক্ষার্থীদের চোখ বন্ধ করে বিচার করে ফেলছেন তারা কি সেই ম্লানমুখ শিক্ষার্থীর কথা একবারও ভাবছেন, ফলাফল প্রকাশের আগ পর্যন্ত যার মুখটিও ছিল হাস্যোজ্জ্বল, ‘ভালো ফলাফল’-এর আশায় উন্মুখ, অথচ ‘ভালো ফল’ নামে সমাজের চাপিয়ে দেওয়া এই বিপুল আকাঙ্ক্ষার ভার পনের-ষোল বছর বয়সী এসব তরুণ-তরুণী কীভাবে সহ্য করবে তা কি একবারও ভেবে দেখছি আমরা?
ইংরেজিতে কনভেনশানাল উইসডম বলে একটা কথা আছে। এর মানে হচ্ছে সেসব ধারণা, বিশ্বাস ও মতামত যেগুলো সাধারণভাবে সত্য বলে ধরে নেওয়া হয়। ১৯৫৮ সালে লেখা ‘দ্য অ্যাফ্লুয়েন্ট সোসাইটি’ বইয়ে কনভেনশনাল উইসডমের ধারণাটিকে জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ জন কেনেথ গলব্রেইথ। এর মাধ্যমে তিনি বুঝিয়েছিলেন, সাধারণভাবে প্রচলিত, আরামদায়ক সব ধারণা যেগুলো প্রমাণ ছাড়াই আমরা বিশ্বাস করি।
‘পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়া সফলতার মানদণ্ড’–একথাটি হচ্ছে একটা কনভেনশনাল উইসডম। ফেসবুকে আজ একটা পোস্ট খুব ঘুরতে দেখছি, সেটি এরকম, “বাচ্চারা, তোমরা যারা জিপিএ-৫ পাওনি বলে মন খারাপ করেছো, তাদের মন খারাপ করার কারণ নেই। আমি জিপিএ-৫ পেয়েছিলাম। কোনো কাজে আসেনি ওটা।”
এটাই হচ্ছে মোদ্দা কথা। জিপিএ-৫-এ কিছু যাবে আসবে না, যদি তার পেছনে পরিশ্রম আর চিন্তাশক্তি না থাকে। জ্ঞানার্জনের প্রতি ভালোবাসা না থাকে। একটা কথা খুব বলা হয়, আজকের প্রজন্ম বস্তুগত উন্নতি ছাড়া আর কিছুকে উন্নতি বলে মনে করে না। একটু ঢালাওভাবে বলা হয়ে গেল (এবং নির্দিষ্ট কোনো প্রজন্মে এটি সীমাবদ্ধও নয়), কিন্তু কথাটির মধ্যে সারবত্তা অবশ্যই আছে।
ঝাঁ চকচকে গাড়ি, বড় বাড়ি, দামি গ্যাজেট, পকেটভর্তি টাকা–এসবই হয়ে গেছে এ সমাজে উন্নতি মাপার ব্যারোমিটার। ছোট-বড় সবাই যেন এর পেছনেই দৌড়াচ্ছে। ফলে এখানে শিক্ষাগত প্রবৃদ্ধি মাপার ব্যারোমিটার যে জিপিএ-৫ হবে তাতে আর আশ্চর্য কী!
প্রাচীন গ্রিক দার্শনিকদের মতে, জীবনের প্রকৃত সফলতা হচ্ছে ইউডাইমোনিয়া (Eudaimonia)। এর অর্থ মানবিক সমৃদ্ধি, পরিপূর্ণতা ও সার্থক জীবনযাপন। তারা মনে করতেন, প্রকৃত সফলতা ঘটে মনের ভেতর। সৎ জীবনযাপন ও নিজের অন্তর্নিহিত সম্ভাবনাকে উপলব্ধি করার মাধ্যমে এটি অর্জিত হয়।
সবসময় নিজের সেরা সত্তাটি হওয়ার চেষ্টা করা, নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের প্রয়াস এবং নৈতিকতা ও যুক্তির সাথে জীবনের বাধাগুলো মোকাবিলার মাধ্যমেই মানুষ নিজেকে সফল বলে দাবি করতে পারে। এসব কথাকে পাগলের প্রলাপ বলে উড়িয়ে দিতেই পারেন, কিন্তু ঠান্ডা মাথায় একটু চিন্তা করলে এগুলোর সত্যতা অবশ্যই বুঝতে পারবেন।
আমরা কবে বুঝবো, পাস-ফেল আর জিপিএ-৫-এর মধ্যে নয়, সত্যিকারের মানুষ হওয়ার মধ্যেই আছে সফলতা।
কনভেনশনাল উইসডমের ঠুনকো সফলতার পেছনে উন্মাদের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছি আমরা। অপাপবিদ্ধ কিশোর-কিশোরীদের ঠেলে দিচ্ছি জিপিএ-৫ আর পরীক্ষায় পাস ফেল নামের আরোপিত ছাঁচে জীবনকে সাজানোর দিকে।
সমাজের এই নির্মম পেষণে দু-চারটি তরুণ প্রাণ যদি ক্ষয়েও যায়, তাতেও বিকার নেই আমাদের। আমরা কবে বুঝবো, পাস-ফেল আর জিপিএ-৫-এর মধ্যে নয়, সত্যিকারের মানুষ হওয়ার মধ্যেই আছে সফলতা। তারপরও সমাজের বানিয়ে দেওয়া সফলতার ছাঁচে জীবন সাজানোর জন্য প্রাণপাত করছি সবাই।
আমাদের জন্য ‘দু-দণ্ড শান্তি’ এনে দিতে পারে রবীন্দ্রনাথের ‘বোঝাপড়া’ নামের বিখ্যাত কবিতাটি। তার কয়েকটি পঙ্ক্তি উচ্চারণের মাধ্যমেই ইতি টানা যাক এ লেখার—
‘তোমার মাপে হয় নি সবাই
তুমিও হও নি সবার মাপে,
তুমি মর কারো ঠেলায়
কেউ বা মরে তোমার চাপে--
তবু ভেবে দেখতে গেলে
এমনি কিসের টানাটানি?
তেমন করে হাত বাড়ালে
সুখ পাওয়া যায় অনেকখানি।
আকাশ তবু সুনীল থাকে,
মধুর ঠেকে ভোরের আলো,
মরণ এলে হঠাৎ দেখি
মরার চেয়ে বাঁচাই ভালো।
যাহার লাগি চক্ষু বুজে
বহিয়ে দিলাম অশ্রুসাগর
তাহারে বাদ দিয়েও দেখি
বিশ্বভুবন মস্ত ডাগর।
মনেরে তাই কহ যে,
ভালো মন্দ যাহাই আসুক
সত্যেরে লও সহজে।’
মোস্তাক শরীফ : শিক্ষক, অনুবাদক, কথাসাহিত্যিক
