সিআরবি : প্রকৃতি-পরিবেশ, ইতিহাস-ঐতিহ্যের আধার

Professor Dr. Kabirul Bashar

১৮ জুলাই ২০২১, ০৯:১৭ এএম


সিআরবি : প্রকৃতি-পরিবেশ, ইতিহাস-ঐতিহ্যের আধার

গত কয়েক দিনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হলো চট্টগ্রামের ফুসফুস বলে খ্যাত সিআরবি এলাকা ধ্বংস করে হাসপাতাল নির্মাণ। সিআরবি এর পূর্ণরূপ হল সেন্ট্রাল রেলওয়ে বিল্ডিং। ১৮৯৯ সালে সিআরবি প্রতিষ্ঠিত হয় আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ের সদর দপ্তর হিসেবে। সেই সময়ে আসাম-বেঙ্গল রেলস্টেশনের সদর দপ্তর চট্টগ্রামের এই স্থানে প্রতিষ্ঠার মূল কারণ ছিল, এখানকার ভৌগোলিক পরিবেশ- পরিস্থিতির সাথে বন্দরের সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে বাণিজ্যিক উন্নয়ন।

সেই ধারাবাহিকতায় চট্টগ্রামে সেন্ট্রাল রেলওয়ে বিল্ডিংখ্যাত, লাল ভবনটি স্থাপিত হয়। সেসময় এখানে প্রায় ৫০ হাজার লোক কাজ করতো। কালের বিবর্তনে এখানে অফিসের সংখ্যা কমেছে তবে প্রাকৃতিকভাবে সিআরবির গুরুত্ব কখনোই কমেনি।

সিআরবি এখন তুমুল আলোচনায় কারণ এখানে ছয় একর জায়গা জুড়ে হাসপাতাল নির্মাণের জন্য বাংলাদেশ রেলওয়ের সাথে ৪ কোটি টাকার চুক্তি করেছে ইউনাইটেড হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

সাম্প্রতিক সময়ে সিআরবি এলাকায় নানা ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ এবং উন্নয়ন সাধনের কারণে এটি চট্টগ্রামবাসীর স্বস্তি, শান্তি ও বিনোদনের জায়গা হিসেবে পরিণত হয়েছে। সিআরবি বললেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে সুন্দর প্রকৃতি ও সবুজ সাতরাস্তার মাথা, সেই সঙ্গে একটি মনোরম পরিবেশ। চট্টগ্রামের বাইরে থেকে যখনই কোনো মানুষ চট্টগ্রামে আসেন তারা সিআরবি এলাকায় ঘুরতে যান।

সিআরবি এখন তুমুল আলোচনায় কারণ এখানে ছয় একর জায়গা জুড়ে হাসপাতাল নির্মাণের জন্য বাংলাদেশ রেলওয়ের সাথে ৪ কোটি টাকার চুক্তি করেছে ইউনাইটেড হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এখানে একটি ৫০০ শয্যার হাসপাতাল তৈরি করবেন তারা। হাসপাতাল নির্মাণের কথাটি যখন সাধারণ মানুষ জেনেছে তখনই প্রতিবাদে মুখর হয়েছেন পরিবেশবাদী সংগঠন, সংস্কৃতিকর্মী, সাধারণ নাগরিক এবং নগর পরিকল্পনাবিদরা। যেই ৬ একর জায়গা হাসপাতাল নির্মাণের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে সেখানে রয়েছে শতবর্ষী গাছ। যদিও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলেছে, গাছের কোনো ক্ষতি না করেই এখানে হাসপাতাল নির্মাণ করা হবে, কিন্তু বাস্তবিক পক্ষে সেটি অসম্ভব।

আমরা জানি কোনো স্থাপনার সাধারণত ৫০ বছর বা ১০০ বছর হয়ে গেলে এবং সেটি যদি পাবলিক ইন্টারেস্ট থাকে তাহলে সেই জায়গাটিকে হেরিটেজ হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

সিআরবি জনবহুল হিসেবে চিহ্নিত এবং এর বয়স ১৪৯ বছর। প্রত্নতত্ত্ব আইনে বলা হয়েছে, ১০০ বছরের পুরনো হলে কোনো স্থাপনা প্রত্নতত্ত্ব আইনে বিবেচিত হবে। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, এটি একটি পাবলিক প্লেস এবং এখানে একটি সাংস্কৃতিক মঞ্চ রয়েছে। সবকিছু বিবেচনায় সিআরবি এখন হেরিটেজ।

অগণিত মানুষের বিরোধিতার পরেও সিআরবি এর মতো একটি জায়গায় হাসপাতাল নির্মাণের সিদ্ধান্ত থেকে কেন সরে আসছে না বাংলাদেশ রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ সেটিই প্রশ্ন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, সিআরবিতে শুধুমাত্র সেন্ট্রাল রেলওয়ে বিল্ডিং নয় এর সাথে বেশ কয়েকটি ঐতিহাসিক স্থাপনা রয়েছে।

এখানকার হাতির বাংলোটি মুক্তিযুদ্ধের সময় এখানকার হেডকোয়ার্টার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে এবং কাছাকাছি জায়গায় নির্মিত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিফলক।

সিআরবি জনবহুল হিসেবে চিহ্নিত এবং এর বয়স ১৪৯ বছর। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, এটি একটি পাবলিক প্লেস এবং এখানে একটি সাংস্কৃতিক মঞ্চ রয়েছে। সবকিছু বিবেচনায় সিআরবি এখন হেরিটেজ।

সিআরবির শুধুমাত্র প্রাকৃতিক গুরুত্ব রয়েছে তা নয়, এর রয়েছে ঐতিহাসিক গুরুত্ব। ইতিহাস-ঐতিহ্যকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এমন একটি জায়গায় হাসপাতাল নির্মাণের বিষয়ে অবাক হয়েছেন বুদ্ধিজীবী, প্রকৃতিপ্রেমী, সাংস্কৃতিককর্মী এবং সাধারণ মানুষ।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছেন, শিরীষতলার কোনো ক্ষতি না করেই হাসপাতাল নির্মাণ করা হবে কিন্তু ৫০০ শয্যার একটি হাসপাতালকে সহায়তা করার জন্য সেখানে ওষুধের দোকান, রেস্টুরেন্টসহ একটি বিরাট বাজারে পরিণত হবে সাথে সাথে ইতিহাস এবং ঐতিহ্য হারাবে সিআরবি।

নগরীর ক্লান্ত পথিক, সকালে বিকালে হাঁটাচলা করা মানুষ যেখানে ফুসফুস পূর্ণ করতো অক্সিজেনে, সেখানে হাসপাতাল তৈরি হলে কোথায় বুক ভরে নিঃশ্বাস নিবে মানুষ? মানসিক এবং শারীরিক শান্তির জায়গার স্থলে সারাদিন অ্যাম্বুলেন্সের শব্দ, রোগী, লাশ দেখে মানসিকভাবে অস্থির হয়ে পড়বে তারা।

এখানে হাসপাতাল নির্মাণ হলে প্রকৃতি, ইতিহাস ঐতিহ্যের সাথে সাথে ক্ষতিগ্রস্ত হবে সংস্কৃতি। চট্টগ্রামের ফুসফুস হিসেবে খ্যাত এই সিআরবিতে হাসপাতাল না বানিয়ে, চট্টগ্রামে পড়ে থাকা অনেক জায়গাগুলোর মধ্য অন্য কোনো একটিকে বিবেচনায় আনুন। আমি হাসপাতাল নির্মাণের বিরোধিতা করছি না, হাসপাতাল চিকিৎসার জন্য অবশ্যই প্রয়োজন, তবে প্রকৃতি, ইতিহাস-ঐতিহ্যকে ধ্বংস করে হাসপাতাল নয়।

বাণিজ্যিক আগ্রাসনে যেন আমাদের প্রকৃতি-পরিবেশ ও ইতিহাস-ঐতিহ্য ধ্বংস হয়ে না যায় সে বিষয়ে সকলের সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। 


অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার ।। প্রাণিবিদ্যা বিভাগ,  জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

Link copied