বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশের পর্যটন সংকট

দর্শনীয় স্থানের অভাব, নাকি ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা?

দর্শনীয় স্থানের অভাব, নাকি ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা?

প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ঐতিহাসিক ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যে বাংলাদেশের পর্যটনে রয়েছে বিপুল সম্ভাবনা। কিন্তু শুধু আকর্ষণীয় গন্তব্যই যথেষ্ট নয়; দীর্ঘমেয়াদি ও মানসম্মত পর্যটনের জন্য প্রয়োজন নিরাপদ যাতায়াত, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, স্বচ্ছ মূল্যব্যবস্থা, মানসম্মত সেবা, প্রশিক্ষিত গাইড, কার্যকর নিরাপত্তা ও অভিযোগ নিষ্পত্তি—সর্বোপরি একটি সুসংগঠিত গন্তব্য ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা।

দেশের বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্র ঘুরে আসা কোনো বাংলাদেশি পরিবারের সঙ্গে কথা বললে প্রায়ই একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা শোনা যায়। কক্সবাজারে হোটেল মন্দ ছিল না, কিন্তু খাবার নিয়ে সারাক্ষণ একটা অস্বস্তি; আর জিপচালক ভাড়া বললেন এক, গন্তব্যে পৌঁছে চাইলেন আরেক। সিলেটের চা-বাগান চোখ জুড়ানো, অথচ অনেক জায়গায় বসার ব্যবস্থা নেই, ভালো খাবারের দোকান নেই, এমনকি জায়গাটার গল্প শোনানোর মতো কাউকেও পাওয়া যায় না।

রাতারগুলে নৌকায় অতিরিক্ত যাত্রী, পাহাড়পুরে অষ্টম শতকের সোমপুর মহাবিহারের মতো ঐতিহাসিক স্থাপনা—কিন্তু নেই পর্যাপ্ত গাইড, আশপাশে নেই পর্যটন-অভিজ্ঞতা তৈরির আয়োজন। বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির পাহাড়ি সৌন্দর্য ম্লান হয়ে যায় অগোছালো পরিবহন, নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং বিভিন্ন স্থানে বারবার নিবন্ধন ও বিধিনিষেধের ঝামেলায়। সুন্দরবনে লঞ্চে তিল ধারণের জায়গা নেই, আর গাইড বলতে অনেক সময় অপারেটর যাকে জোগাড় করতে পেরেছেন, তিনিই।

অথচ একই পর্যটকেরা যখন নেপাল, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড বা ভারত ঘুরে আসেন, তাদের অভিজ্ঞতার বর্ণনায় শুধু দর্শনীয় স্থানের সৌন্দর্য থাকে না; থাকে একটি সুসংগঠিত পর্যটন ব্যবস্থার কথা। পুরো ভ্রমণজুড়ে বিভিন্ন সেবা যেন একটি সমন্বিত ব্যবস্থার অংশ হিসেবে কাজ করে।

কোথায় যাবেন, কীভাবে যাবেন, কত খরচ হবে, কোথায় খাবেন কিংবা সমস্যায় পড়লে কার কাছে সহায়তা চাইবেন, এসব নিয়ে অনিশ্চয়তা তুলনামূলকভাবে কম। বাংলাদেশের পর্যটনের মূল ঘাটতিটা সম্ভবত এখানেই। আমাদের দর্শনীয় স্থানের অভাব নেই; ঘাটতি হলো সেই সৌন্দর্যকে এমন একটি গোছানো ব্যবস্থার সঙ্গে জুড়ে দেওয়া, যেখানে পর্যটক শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নিরাপদ ও নিশ্চিন্তে ভ্রমণ করতে পারেন।

পরিসংখ্যানও একই গল্প বলে। World Economic Forum-এর Travel and Tourism Development Index 2024-এ ১১৯টি অর্থনীতির মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১০৯তম। মূল্যায়িত ১৯টি Asia-Pacific দেশের মধ্যে বাংলাদেশ সবার নিচে; ৭-এর মধ্যে স্কোর মাত্র ৩.১৯। বিপরীতে ইন্দোনেশিয়া ২২তম, মালয়েশিয়া ৩৫তম, থাইল্যান্ড ৪৭তম এবং ভিয়েতনাম ৫৯তম। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত ৩৯তম; এমনকি পাকিস্তানও ১০১তম অবস্থানে থেকে বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে। আরও অস্বস্তিকর হলো ক্যাম্বোডিয়ার ৮৬তম এবং লাওসের ৯১তম অবস্থান।

পর্যটন খাতে তুলনামূলকভাবে পরে এগিয়ে আসা এই দুই দেশ যার একটি নব্বইয়ের দশকেও গৃহযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে দাঁড়িয়েছে—আজ বাংলাদেশের চেয়ে অনেক এগিয়ে। এমনকি লাওসে কোনো সমুদ্রসৈকত নেই; তবু পর্যটন ব্যবস্থাপনায় দেশটি বাংলাদেশকে পেছনে ফেলেছে। সূচকের ভেতরে ঢুকলে সমস্যাটি আরও স্পষ্ট হয়।

অবকাঠামো ও সেবায় বাংলাদেশের অবস্থান ৮০তম, খুব ভালো নয়, কিন্তু একেবারে তলানিতেও নয়। অথচ পর্যটন নীতি ও সহায়ক পরিবেশে অবস্থান ১১০তম এবং টেকসই পর্যটনে ১১৯তম তালিকার একেবারে শেষে। অর্থাৎ আমরা যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত করেছি, হোটেল ও অবকাঠামো তৈরি করেছি; কিন্তু এগুলো ঘিরে কার্যকর, সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পর্যটন ব্যবস্থাপনা এখনো গড়ে তুলতে পারিনি।

আমাদের দর্শনীয় স্থানের অভাব নেই; ঘাটতি হলো সেই সৌন্দর্যকে এমন একটি গোছানো ব্যবস্থার সঙ্গে জুড়ে দেওয়া, যেখানে পর্যটক শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নিরাপদ ও নিশ্চিন্তে ভ্রমণ করতে পারেন।

এর প্রতিফলন পর্যটন আয়েও দেখা যায়। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের তথ্যমতে, বিদেশি পর্যটকদের কাছ থেকে বাংলাদেশের আয় ২০২৩ সালের ৪৫৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার থেকে কমে ২০২৪ সালে ৪৪০ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। বিপরীতে একই সময়ে ভারতের পর্যটন আয় ছিল ৩৫.০২ বিলিয়ন এবং শ্রীলঙ্কার ৩.১৭ বিলিয়ন ডলার। সমস্যাটা তাই সম্পদের অভাবে নয়; সেই সম্পদকে নিরাপদ, টেকসই ও অর্থনৈতিকভাবে মূল্যবান পর্যটন অভিজ্ঞতায় রূপ দেওয়ার ব্যবস্থাপনায়।

একটি পর্যটনকেন্দ্র শুধু দর্শনীয় স্থান নয়

আমাদের একটি ধারণা বদলাতে হবে, পর্যটনকেন্দ্র মানেই শুধু একটি সৈকত, বন, চা-বাগান কিংবা ঐতিহাসিক স্থাপনা নয়। পর্যটকের কাছে একটি গন্তব্য আসলে পুরো ভ্রমণের সমষ্টিগত অভিজ্ঞতা। কোথাও যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া থেকে বাড়ি ফিরে আসা পর্যন্ত একজন পর্যটক অসংখ্য ছোট ছোট ধাপের মধ্য দিয়ে যান—টিকিট ও হোটেল বুকিং, যাতায়াত, চেক-ইন, খাবার, শৌচাগার, স্থানীয় পরিবহন, ঘোরার কার্যক্রম, কেনাকাটা, নিরাপত্তা, মূল্য পরিশোধ, অভিযোগ এবং ফেরার যাত্রা।

এই ধারাবাহিকতার একটি জায়গায় বড় ধরনের খারাপ অভিজ্ঞতাই পুরো ভ্রমণের স্মৃতিকে নেতিবাচক করে দিতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশে পর্যটন উন্নয়নের আলোচনায় বেশি গুরুত্ব পায় নতুন সড়ক, রেলপথ, হোটেল ও রিসোর্ট। অর্থাৎ পর্যটককে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়া এবং থাকার ব্যবস্থা করার দিকে মনোযোগ বেশি; পৌঁছানোর পর তার অভিজ্ঞতা কেমন হবে, সেই প্রশ্নটি তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে থাকে।

সাম্প্রতিক দুটি ঘটনা এই বৈপরীত্যটি পরিষ্কার করে। একদিকে কক্সবাজারগামী ট্রেনের সংখ্যা বাড়ানো এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথে যাত্রার সময় কমানোর পরিকল্পনা হচ্ছে। এটি অবশ্যই ইতিবাচক। অন্যদিকে একই সময়ে দরিয়ানগর সৈকতে প্যারাসেইলিং করতে গিয়ে একজন পর্যটকের মৃত্যু দেখিয়েছে, শুধু বেশি মানুষকে গন্তব্যে পৌঁছে দিলেই পর্যটন উন্নয়ন হয় না।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বৈরী আবহাওয়ায় প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও ওই কার্যক্রম চলছিল; দুর্ঘটনার পর উদ্ধার ব্যবস্থা, নিরাপত্তা মান ও অপারেটর নিয়ন্ত্রণ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অর্থাৎ যোগাযোগব্যবস্থা পর্যটককে গন্তব্যে পৌঁছে দেয় ঠিকই কিন্তু গন্তব্য ব্যবস্থাপনাই নিশ্চিত করে তিনি নিরাপদে এবং ভালো অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরে যাবেন কিনা।

কক্সবাজারে প্রতিদিন প্রায় ১৪৫ টন বর্জ্য উৎপন্ন হলেও পৌরসভার ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা প্রায় ২০ টন। রাতারগুলে এক শুক্রবারে প্রায় ৪ হাজার ৫০০ পর্যটক যাওয়ার তথ্য রয়েছে, যা বন ও জীববৈচিত্র্যের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করে। বাংলাদেশে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকাভুক্ত তিনটি স্থান—বাগেরহাটের ঐতিহাসিক মসজিদ নগরী, পাহাড়পুরের বৌদ্ধবিহার এবং সুন্দরবন—থাকলেও তথ্যসেবা, প্রশিক্ষিত গাইড ও পর্যটক সুবিধার ঘাটতির অভিযোগ রয়েছে।

নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও একই সমস্যা। ২০২৩ সালে ট্যুরিস্ট পুলিশ জানিয়েছিল, পর্যটন মহাপরিকল্পনায় চিহ্নিত ১ হাজার ৪৯৮টি পর্যটনস্থলের বিপরীতে তাদের সদস্য ছিল ১ হাজার ৩৯৪ জন। তবে শুধু পুলিশের সংখ্যা বাড়ানোই সমাধান নয়। পর্যটক কোনো পরিবহনচালক, নৌকার মাঝি, হোটেল বা সেবাদাতার সঙ্গে বিরোধে পড়লে দ্রুত অভিযোগ জানাতে এবং কার্যকর সমাধান পেতে পারেন কি না সেটিও নিরাপত্তার অংশ।

প্রতিবেশীরা গন্তব্যকে পণ্য নয়, একটি পূর্ণ অভিজ্ঞতা হিসেবে দেখছে

বাংলাদেশের আশপাশের কয়েকটি দেশের পর্যটন ব্যবস্থা দেখলে বোঝা যায়, শুধু দর্শনীয় স্থান বা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নয়, পর্যটকের পুরো অভিজ্ঞতাকে পরিকল্পনার মধ্যে আনাই তাদের সাফল্যের অন্যতম কারণ।

কম্বোডিয়ার আংকর ওয়াট তার একটি ভালো উদাহরণ। ঐতিহাসিক এই এলাকার ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে রয়েছে অপ্সরা ন্যাশনাল অথরিটি, যা ১৯৯৫ সালে গঠিত হয়। প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্ব শুধু প্রত্নসম্পদ সংরক্ষণ নয়; গবেষণা, সুরক্ষা, নগর ব্যবস্থাপনা এবং পর্যটন উন্নয়নও এর আওতাভুক্ত।

আংকর-এর পর্যটন পরিকল্পনায় মন্দির সংরক্ষণের পাশাপাশি গাড়ি পার্কিং, শৌচাগার, খাবারের দোকান, দর্শনার্থী চলাচল এবং পর্যটকের ধারণক্ষমতা নিয়ন্ত্রণের মতো বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। কারণ একটি পর্যটন অভিজ্ঞতা শুধু একটি স্থাপনা দিয়ে তৈরি হয় না; তৈরি হয় পুরো ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে। ভিয়েতনামের হোই আন শহরটির ঐতিহ্য শুধু কয়েকটি পুরোনো ভবনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; স্থানীয় মানুষের জীবনযাপন, সংস্কৃতি এবং পুরো নগর পরিবেশও এর অংশ। তাই সেখানে আলাদা আলাদা স্থাপনার বদলে পুরো ঐতিহাসিক এলাকার জন্য প্যাকেজ টিকিট চালু করা হয়েছে, যাতে পর্যটক একটি সমন্বিত অভিজ্ঞতা পান।

শ্রীলঙ্কার উদাহরণ বাংলাদেশের জন্য আরও কাছের। আমাদের মতো সেখানেও বিস্তীর্ণ চা-বাগান রয়েছে। কিন্তু নুওয়ারা এলিয়া ও কেন্দ্রীয় পার্বত্য অঞ্চলে পর্যটন শুধু চা-বাগান দেখানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে রয়েছে পাহাড়ি ট্রেন ভ্রমণ, ঝরনা, হাঁটার পথ, মনোরম দৃশ্য, চা আস্বাদন, চা কারখানা পরিদর্শন এবং চা-বাগানে থাকার অভিজ্ঞতা। পর্যটক সেখানে শুধু চা-গাছ দেখতে যান না; একটি সম্পূর্ণ ‘চা-অঞ্চলের অভিজ্ঞতা’ নিতে যান।

আমাদের চা-বাগানও কোনো অংশে কম সুন্দর নয়। অথচ অধিকাংশ ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা সীমাবদ্ধ থাকে, গাড়ি থেকে নামা, ছবি তোলা এবং ফিরে যাওয়া। পরিকল্পিত চা-বাগান ভ্রমণ, চা তৈরির প্রক্রিয়া দেখা, চা আস্বাদন, স্থানীয় খাবার, সাইক্লিং পথ, হস্তশিল্প ও প্রশিক্ষিত স্থানীয় গাইড যুক্ত করা গেলে কয়েক ঘণ্টার ভ্রমণ সহজেই এক বা দুই দিনের অভিজ্ঞতায় পরিণত হতে পারে।

কেরালার গ্রামীণ পর্যটন মডেলও বাংলাদেশের জন্য প্রাসঙ্গিক। সেখানে পর্যটনকে শুধু হোটেল বা রিসোর্টকেন্দ্রিক না রেখে স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। পর্যটকেরা গ্রামে হাঁটা, কৃষিকাজ দেখা, স্থানীয় খাবার, নৌভ্রমণ, হস্তশিল্প এবং ঐতিহ্যবাহী কাজের অভিজ্ঞতা পান। এর ফলে পর্যটনের আয় স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কাছেও পৌঁছে যায়।

বাংলাদেশের সিলেট, সুন্দরবনের আশপাশের এলাকা কিংবা পার্বত্য অঞ্চলে এমন মডেল কার্যকর হতে পারে। কারণ পর্যটনের সবচেয়ে বড় শক্তি শুধু একটি সুন্দর গন্তব্য নয়; সেই গন্তব্যকে ঘিরে কত বৈচিত্র্যময় ও অর্থবহ অভিজ্ঞতা তৈরি করা যায়, সেটিই পর্যটকের অবস্থানের সময় ও ব্যয় বাড়ায়। কিন্তু বাংলাদেশের পর্যটন ব্যবস্থাপনা এখনো অনেকটাই বিচ্ছিন্ন।

হোটেলের দায়িত্ব বেসরকারি খাতের, বন ও সৈকতের দায়িত্ব আলাদা সরকারি সংস্থার, প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানের দায়িত্ব অন্য দপ্তরের, স্থানীয় পরিবহন নিয়ন্ত্রণ করে অন্য পক্ষ। ফলে একজন পর্যটকের পুরো ভ্রমণ অভিজ্ঞতার জন্য এককভাবে দায়বদ্ধ কোনো সমন্বিত ব্যবস্থা অনেক ক্ষেত্রেই নেই। একটি দর্শনীয় স্থানকে সফল পর্যটন গন্তব্যে পরিণত করতে শুধু তার সৌন্দর্য যথেষ্ট নয়; এর সঙ্গে প্রয়োজন মানসম্মত সেবা, কার্যকর ব্যবস্থাপনা এবং স্মরণীয় অভিজ্ঞতা।

পর্যটনের আয় আবার পর্যটন ও স্থানীয় অর্থনীতিতে ফিরছে

পর্যটন তখনই দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই হয়, যখন এর অর্থনৈতিক সুফল স্থানীয় মানুষের কাছেও পৌঁছায়।

ইন্দোনেশিয়ার বালি প্রদেশে প্রতিটি বিদেশি পর্যটকের জন্য ১ লাখ ৫০ হাজার ইন্দোনেশিয়ান রুপি (প্রায় ১০ মার্কিন ডলার) বাধ্যতামূলক পর্যটন শুল্ক চালু রয়েছে। এই অর্থ ঐতিহ্যবাহী গ্রাম, সেচব্যবস্থার ঐতিহ্য, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পর্যটন অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যবহার করা হয়। ভিয়েতনামের হোই আন-এ পর্যটন টিকিটের আয়ের ৫৫ শতাংশ ঐতিহ্য সংরক্ষণে এবং ৪৫ শতাংশ ব্যবস্থাপনায় ব্যয় হয়।

কম্বোডিয়ার আংকরে একদিনের পাসের মূল্য ৩৭ ডলার, তিন দিনের ৬২ এবং সাত দিনের ৭২ ডলার। ২০২৪ সালে প্রায় ১০ লাখ ২০ হাজার আন্তর্জাতিক পর্যটকের টিকিট থেকে আয় হয়েছিল প্রায় ৪ কোটি ৭৮ লাখ ডলার। প্রতিটি টিকিট থেকে দুই ডলার একটি শিশু হাসপাতালের জন্য বরাদ্দ করা হয়। অর্থাৎ পর্যটকের কাছ থেকে অর্থ নেওয়া হচ্ছে, আবার সেই অর্থের ব্যবহারও দৃশ্যমান রাখা হচ্ছে।

স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করার আরেকটি উদাহরণ মালদ্বীপ। ২০০৯ সালের আগে জনবসতিপূর্ণ দ্বীপে পর্যটকদের থাকার আইনি সুযোগ ছিল না। বিধিনিষেধ উঠে যাওয়ার পর দ্রুত স্থানীয় গেস্টহাউস ব্যবসা গড়ে ওঠে। বর্তমানে সেখানে প্রায় ১৭৯টি রিসোর্টের পাশাপাশি প্রায় ৯১১টি গেস্টহাউস রয়েছে। ফলে পর্যটনের আয় শুধু বড় রিসোর্ট বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি।

ভারতের কেরালাতেও গ্রামীণ স্বনির্ভর গোষ্ঠীগুলোকে হোটেলের সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। এর ফলে স্থানীয় কৃষিপণ্যের চাহিদা, মানুষের আয় এবং স্থানীয় অর্থনীতির সঙ্গে পর্যটনের সংযোগ বেড়েছে।

ছোট সেবাই বড় পার্থক্য গড়ে দেয়

খাবার, নিরাপত্তা কিংবা সন্ধ্যার বিনোদনের মতো বিষয়গুলো ছোট মনে হলেও পর্যটকের সামগ্রিক অভিজ্ঞতায় এগুলোর প্রভাব বড়।

থাইল্যান্ডের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ১৯৯৮ সালে রেস্তোরাঁ, খাবারের দোকান, ক্যানটিন ও রাস্তার খাবার বিক্রেতাদের জন্য ক্লিন ফুড গুড টেস্ট নামে জাতীয় স্বাস্থ্যবিধি সনদ চালু করে। সিঙ্গাপুরে লাইসেন্সপ্রাপ্ত খাবারের দোকানগুলোকে স্বাস্থ্যবিধির গ্রেড প্রবেশপথে প্রদর্শন করতে হয় এবং পরিদর্শনের মাধ্যমে তা নির্ধারণ করা হয়।

সত্তরের দশকে স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করতে রাস্তার খাবার বিক্রেতাদের নির্ধারিত হকার সেন্টারে নিয়ে আসা হয়েছিল; পরবর্তীতে এই হকার সংস্কৃতিই ইউনেস্কোর স্বীকৃতি পেয়েছে।

কক্সবাজারে প্রতিদিন প্রায় ১৪৫ টন বর্জ্য উৎপন্ন হলেও পৌরসভার ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা প্রায় ২০ টন। রাতারগুলে এক শুক্রবারে প্রায় ৪ হাজার ৫০০ পর্যটক যাওয়ার তথ্য রয়েছে, যা বন ও জীববৈচিত্র্যের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করে।

নিরাপত্তাকেও থাইল্যান্ড শুধু পুলিশি উপস্থিতি হিসেবে দেখে না। দেশটিতে ২৪ ঘণ্টার বহুভাষিক ট্যুরিস্ট পুলিশ হটলাইন রয়েছে। পর্যটক ও স্থানীয় ব্যবসায়ীর মধ্যে গাড়িভাড়া, প্রতারণা, হোটেল বিল কিংবা অন্যান্য বিরোধ মীমাংসাও তাদের দায়িত্বের অংশ। আবার ভিয়েতনামের হোই আন-এ সন্ধ্যার পর কিছু সড়ক যানবাহনমুক্ত করে লোকজ খেলা, গান, পথনাটক ও সাংস্কৃতিক আয়োজন করা হয়। লাওসের লুয়াং প্রাবাং-এ প্রতি রাতে সড়ক বন্ধ করে হস্তশিল্পের বাজার বসে, যেখানে প্রায় ২৫০ স্থানীয় কারিগর অংশ নেন। Made in Luang Prabang চিহ্ন স্থানীয় পণ্যকে আলাদা পরিচয় দেয়।

তাহলে করণীয়

পর্যটন ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশের প্রশাসনিক সক্ষমতা নেই, এমন ধারণাও পুরোপুরি সঠিক নয়। সেন্ট মার্টিনে বর্তমানে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড অনুমোদিত পোর্টালের মাধ্যমে টিকিট সংগ্রহের ব্যবস্থা রয়েছে। প্রতিটি টিকিটের সঙ্গে ট্রাভেল পাস ও কিউআর কোড থাকে। কিউআর কোড ছাড়া টিকিট জাল হিসেবে বিবেচিত হয়।

জাহাজ চলাচলের জন্য মন্ত্রণালয়ের অনুমতি প্রয়োজন এবং দর্শনার্থীর সংখ্যা মাসভিত্তিক সীমিত রাখা হয়েছে। ২০২৪-২৫ মৌসুমে যে দুই মাস পর্যটকদের রাতযাপনের অনুমতি ছিল, সে সময়ে প্রায় আট বর্গকিলোমিটারের দ্বীপটিতে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার দর্শনার্থী গিয়েছিলেন।

অর্থাৎ, ডিজিটাল অনুমতি, পর্যটকের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ এবং নির্দিষ্ট নিয়ম বাস্তবায়নের সক্ষমতা বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই দেখিয়েছে। এই অভিজ্ঞতা রাতারগুল, সুন্দরবন, বাগেরহাট, বান্দরবান কিংবা কুয়াকাটার মতো পর্যটনকেন্দ্রের প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে পর্যটন উন্নয়নের জন্য সব সমস্যার সমাধানে বিশাল বড় প্রকল্পের প্রয়োজন নেই। অনেক পরিবর্তন তুলনামূলকভাবে কম খরচে এবং দ্রুত আনা সম্ভব।

প্রথমত, পর্যটন সেবাগুলো আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করতে হবে। জনপ্রিয় পর্যটন এলাকার খাবারের দোকানে দৃশ্যমান স্বাস্থ্যবিধির মান নির্ধারণ ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। হোটেল, জিপ, নৌকা, রেস্তোরাঁ এবং অ্যাডভেঞ্চার পর্যটন কার্যক্রমে নির্ধারিত মূল্যতালিকা প্রকাশ বাধ্যতামূলক করতে হবে। নৌকা, লঞ্চ, জিপ, ট্রেকিং এবং অ্যাডভেঞ্চার কার্যক্রম পরিচালনাকারীদের নিবন্ধন ও নিয়মিত নিরাপত্তা যাচাইয়ের আওতায় আনতে হবে।

দ্বিতীয়ত, পর্যটকদের জন্য একটি কার্যকর সহায়তা ও অভিযোগ ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে। প্রতিটি বড় পর্যটনকেন্দ্রে একটি সমন্বিত পর্যটক সহায়তা ব্যবস্থা থাকতে পারে, হটলাইন, মোবাইল অ্যাপ বা কিউআর কোডভিত্তিক অভিযোগ প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে পর্যটকেরা অতিরিক্ত মূল্য আদায়, অনিরাপদ কার্যক্রম, হয়রানি কিংবা সেবার ব্যর্থতার অভিযোগ জানাতে পারবেন। গুরুতর অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বা অনুমোদন স্থগিত করার মতো দৃশ্যমান ব্যবস্থা থাকতে হবে।

তৃতীয়ত, পর্যটন থেকে তৈরি হওয়া অর্থ আবার সেই গন্তব্যের উন্নয়নে ফিরিয়ে দিতে হবে। জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্রে স্বল্প পরিমাণের একটি নির্দিষ্ট পর্যটন বা সংরক্ষণ ফি চালু করা যেতে পারে। তবে সেই অর্থ সংশ্লিষ্ট এলাকার পরিচ্ছন্নতা, শৌচাগার, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, লাইফগার্ড, উদ্ধার ব্যবস্থা এবং পর্যটক তথ্যকেন্দ্র পরিচালনায় ব্যয় করতে হবে। পাশাপাশি আয় ও ব্যয়ের হিসাব নিয়মিতভাবে জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে।

সিলেটের চা-বাগানসংলগ্ন এলাকা, সুন্দরবনের আশপাশের গ্রাম এবং পার্বত্য অঞ্চলে স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণে ছোট আবাসন, স্থানীয় গাইড, ঐতিহ্যবাহী খাবার, হস্তশিল্প, নৌভ্রমণ, চা-অভিজ্ঞতা এবং সাংস্কৃতিক কার্যক্রম গড়ে তুলতে হবে। কারণ পর্যটন যদি শুধু বড় হোটেল মালিক, পরিবহন ব্যবসায়ী বা রিসোর্ট বিনিয়োগকারীদের আয় বাড়ায়, তাহলে স্থানীয় মানুষের কাছে পর্যটন সংরক্ষণের অর্থনৈতিক প্রণোদনা তৈরি হয় না।

পঞ্চমত, একটি গন্তব্যকে শুধু একটি আকর্ষণে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না; পুরো অঞ্চলের জন্য বৈচিত্র্যময় অভিজ্ঞতা তৈরি করতে হবে। বর্তমানে অনেক পর্যটকের ভ্রমণ কক্সবাজারে শুধু সৈকত দেখা বা সিলেটে শুধু চা-বাগান ঘোরার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। আশপাশের ছোট গন্তব্য, স্থানীয় সংস্কৃতি, খাবার, হস্তশিল্প ও কমিউনিটি-ভিত্তিক কার্যক্রমকে যুক্ত করতে হবে। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের মাধ্যমে সহজ যোগাযোগ, স্থানীয় গাইড ও নির্ভরযোগ্য সেবা নিশ্চিত করা গেলে পর্যটকের অবস্থানের সময় বাড়বে এবং স্থানীয় অর্থনীতিও লাভবান হবে। এর অংশ হিসেবে সন্ধ্যার পর্যটনও গড়ে তুলতে হবে। স্থানীয় বাজার, খাবার, সাংস্কৃতিক আয়োজন ও হস্তশিল্পের মাধ্যমে দিনের পরেও পর্যটকের জন্য অভিজ্ঞতা তৈরি করা সম্ভব। হোই আন বা লুয়াং প্রাবাং-এর মতো উদাহরণ দেখায়, রাতের আয়োজনও একটি গন্তব্যের গুরুত্বপূর্ণ আকর্ষণে পরিণত হতে পারে।

সবশেষে, পর্যটনের সাফল্য মাপার মানদণ্ডও বদলাতে হবে। শুধু বছরে কতজন পর্যটক এলেন, তা দিয়ে কোনো গন্তব্যের সাফল্য বিচার করা যাবে না। দেখতে হবে একজন পর্যটক গড়ে কত দিন অবস্থান করছেন, স্থানীয় অর্থনীতিতে কী পরিমাণ অর্থ ব্যয় করছেন, কতজন পুনরায় ফিরে আসছেন, তাদের সন্তুষ্টির মাত্রা কেমন এবং অভিযোগ কত দ্রুত সমাধান হচ্ছে। কারণ, পর্যটনের আসল সাফল্য পর্যটকের সংখ্যা নয়; বরং কতটা ভালো অভিজ্ঞতা নিয়ে তারা ফিরে যাচ্ছেন, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।

ড. প্রসেনজিৎ সাহা : সহকারী অধ্যাপক, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়