‘চিজ দিয়ে পিজা খাই, চিজ দিয়ে বার্গার খাই, পোড়া তেলের সমুচা খাই। এগুলো খেতে খেতে আজকে আমাদের দেশটা রোগে ভরে গেছে।’ স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুলের এই বক্তব্য নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। ঢাকার ন্যাশনাল বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ‘বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ-২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, তা কেবল একটি অনুষ্ঠানের বক্তব্য হিসেবে দেখলে ভুল হবে। বরং এটি আমাদের খাদ্যাভ্যাস, খাদ্যনিরাপত্তা এবং জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার গভীর সংকটেরই প্রতিচ্ছবি।
মন্ত্রী ঠিকই বলেছেন, অস্বাস্থ্যকর খাদ্য আমাদের নানা রোগের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। তবে এখানে একটি বিষয় আরও স্পষ্ট করে বলা প্রয়োজন। শুধু পিজা, বার্গার কিংবা ফাস্টফুডকে দায়ী করলে সমস্যার পুরো চিত্রটি সামনে আসবে না। বাংলাদেশের মানুষের জন্য আরও বড় বিপদ হলো ভেজাল খাদ্য, নিম্নমানের উপকরণ, দূষিত পানি, ক্ষতিকর রাসায়নিকের ব্যবহার এবং একই তেল বারবার পুড়িয়ে খাবার তৈরি করা।
বিশেষ করে পোড়া তেলের বিষয়টি ভয়াবহ। শহরের অলিগলি থেকে শুরু করে ফুটপাত, বাজার, রেস্তোরাঁ অসংখ্য স্থানে দিনের পর দিন একই তেল গরম করে সমুচা, পুরি, সিঙ্গারা, পেঁয়াজু কিংবা অন্যান্য ভাজাপোড়া খাবার তৈরি করা হচ্ছে। তেল একবার ব্যবহারের পর তার মান পরিবর্তিত হয়। বারবার উচ্চ তাপমাত্রায় গরম করলে তেলের রাসায়নিক গঠনে পরিবর্তন ঘটে এবং ক্ষতিকর যৌগ তৈরি হতে পারে। অথচ এ বিষয়ে আমাদের নজরদারি কোথায়?
একজন সাধারণ মানুষ দোকানে গিয়ে কীভাবে বুঝবেন যে তার সামনে যে সমুচাটি পরিবেশন করা হচ্ছে, সেটি কোন তেলে ভাজা হয়েছে? তেলটি কতবার ব্যবহার করা হয়েছে? খাবারে ব্যবহৃত উপকরণ নিরাপদ কি না? দোকানটি স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলছে কি না? বাস্তবে অধিকাংশ ভোক্তারই এসব জানার সুযোগ নেই। ফলে তাঁরা অজান্তেই প্রতিদিন এমন খাবার গ্রহণ করছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে তাদের স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, খাদ্যে ভেজাল শুধু ভোক্তাকে প্রতারণা করার বিষয় নয়; এটি জনস্বাস্থ্যের বিরুদ্ধে এক ধরনের অপরাধ। একটি পরিবার যদি প্রতিদিন ভেজাল বা নিম্নমানের খাবার গ্রহণ করে, তার প্রভাব হয়তো একদিনে বোঝা যায় না। কিন্তু বছরের পর বছর এর ধারাবাহিকতা মানুষকে নানা অসংক্রামক রোগের ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে। কিডনি, লিভার, হৃদ্যন্ত্রসহ শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ওপর এর বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে।
সমস্যার সমাধান কী? আমার মনে হয়, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা আইন না থাকা নয়; আইন থাকা সত্ত্বেও তার যথাযথ প্রয়োগ না হওয়া। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশে আইন রয়েছে, প্রতিষ্ঠান রয়েছে, ভ্রাম্যমাণ আদালত রয়েছে, অভিযান রয়েছে। খাদ্য নিরাপত্তা আইনসহ বিভিন্ন আইনে অপরাধের জন্য শাস্তির বিধানও রয়েছে। তাহলে এত অভিযান, এত আইন, এত প্রতিষ্ঠান থাকার পরও বাজারে ভেজাল কমছে না কেন? আগে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে।কোনো বাজারে একদিন অভিযান চালিয়ে জরিমানা করে দায়িত্ব শেষ করলে খাদ্য ভেজাল বন্ধ হবে না।
আজ একটি দোকানে অভিযান হলো, কাল অন্য দোকানে একই কাজ শুরু হলো এভাবে ভেজালের বিরুদ্ধে স্থায়ী লড়াই সম্ভব নয়। প্রয়োজন নিয়মিত, সমন্বিত এবং কঠোর তদারকি। বিশেষ করে খাবার তৈরির প্রতিষ্ঠানগুলোতে তেলের ব্যবহার নিয়ে নিয়মিত পরীক্ষা করা যেতে পারে। কোথায় কী ধরনের তেল ব্যবহার হচ্ছে, কতবার ব্যবহার করা হচ্ছে এসবের ওপর নজরদারি বাড়ানো দরকার। বড় রেস্তোরাঁ থেকে ছোট ভাজাপোড়ার দোকান সব ক্ষেত্রেই স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করতে হবে। শুধু রাজধানী বা বড় শহরে অভিযান চালালে চলবে না; জেলা, উপজেলা, পৌরসভা ও গ্রাম পর্যায়েও খাদ্য নিরাপত্তার তদারকি জোরদার করতে হবে।
খাদ্য ভেজালের বিরুদ্ধে অভিযানকে লোক দেখানো কার্যক্রমে পরিণত করা যাবে না। খাদ্য ভেজালের বিরুদ্ধে পরিচালিত বিভিন্ন অভিযানকে কোনোভাবেই কেবল সাময়িক প্রচার বা লোক দেখানো কার্যক্রমে পরিণত করার সুযোগ নেই। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, গণমাধ্যমে এসব অভিযানের খবর বড় করে প্রকাশিত হওয়ার পর কিছুদিন অসাধু দোকানদার ও ব্যবসায়ীরা কিছুটা সতর্ক থাকেন, আর কিছুদিন পার হতেই পুরো ব্যবস্থা আবার আগের সেই বিপজ্জনক অবস্থায় ফিরে যায়। বছরের পর বছর ধরে চলে আসা এই ক্ষতিকর চক্রটি যেকোনো মূল্যে ভাঙতে হবে।
কোনো ব্যবসায়ী বা প্রতিষ্ঠান একই অপরাধ বারবার করলে তাদের শাস্তির মাত্রা কেবল জরিমানা বা সতর্কবার্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না, বরং অপরাধের পুনরাবৃত্তির সাথে সাথে শাস্তির বিধানও ধাপে ধাপে আরও অনেক বেশি কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক করতে হবে। প্রয়োজনে ভেজালকারীদের ট্রেড লাইসেন্স স্থায়ীভাবে বাতিল করা, কারখানা বা প্রতিষ্ঠানটি পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া এবং বারবার অপরাধের ক্ষেত্রে জামিনঅযোগ্য ও অত্যন্ত কঠোর আইনি ব্যবস্থা তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর করতে হবে।
এর পাশাপাশি, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে হলে ভেজালবিরোধী তদারকি ব্যবস্থা কেবল উৎসবকেন্দ্রিক বা সাময়িক না রেখে বছরজুড়ে নিয়মিত অভিযানের আওতায় আনতে হবে। খাদ্যে রাসায়নিক মেশানো বা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ বজায় রাখার মতো অপরাধ প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট তদারকি সংস্থাগুলোর দক্ষতা ও স্বচ্ছতা যেমন নিশ্চিত করা জরুরি, তেমনি অপরাধীদের ছাড় না দেওয়ার নীতি বাস্তবায়ন করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। যখন অপরাধীরা দেখবে যে ভেজাল দিয়ে পার পাওয়ার আর কোনো ফাঁকফোকর অবশিষ্ট নেই এবং তাদের ব্যবসা পুরোপুরি ধ্বংসের মুখে পড়বে, তখনই কেবল খাদ্য সরবরাহ শৃঙ্খলে সত্যিকারের পরিবর্তন আসবে। জনস্বাস্থ্য নিয়ে এই অনৈতিক খেলা বন্ধে আইন প্রয়োগের এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি।
তবে শুধু ব্যবসায়ীদের দোষ দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। ভোক্তারও সচেতনতা প্রয়োজন। মানুষকে বুঝতে হবে, সস্তা খাবারের পেছনে কখনো কখনো বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি লুকিয়ে থাকতে পারে। শিশুদের হাতে প্রতিদিন ফাস্টফুড তুলে দেওয়া, অতিরিক্ত কোমল পানীয় ও অতিরিক্ত চিনি গ্রহণ, অতিরিক্ত লবণ ও তেলযুক্ত খাবারের অভ্যাস এসব নিয়েও পরিবারকে সচেতন হতে হবে।
মন্ত্রী মাতৃদুগ্ধের গুরুত্বের কথাও বলেছেন। শিশুর সুস্বাস্থ্যের জন্য মায়ের শালদুধ যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, সে বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়ানো দরকার। একই সঙ্গে শিশুদের বেড়ে ওঠার সময় থেকেই স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। একটি শিশু যদি ছোটবেলা থেকেই অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার, অতিরিক্ত চিনি ও ভাজাপোড়ায় অভ্যস্ত হয়ে যায়, বড় হয়ে তার খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করা কঠিন হয়ে পড়ে। তবে স্বাস্থ্যসচেতনতার পাশাপাশি রাষ্ট্রের দায়িত্বও কম নয়। একজন নাগরিক যদি বাজার থেকে নিরাপদ খাবার কিনতে না পারেন, তাহলে শুধু তাঁকে সচেতন হতে বললে হবে না। রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে যে বাজারে বিক্রি হওয়া খাদ্য নিরাপদ। ভোক্তার সচেতনতা এবং রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ দুটিই একসঙ্গে প্রয়োজন।
এখানে স্থানীয় প্রশাসন, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার মধ্যে আরও কার্যকর সমন্বয় দরকার। একই সঙ্গে খাদ্য পরীক্ষার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। শুধু অভিযান নয়, নমুনা সংগ্রহ, পরীক্ষাগারে পরীক্ষা, ফলাফল প্রকাশ এবং অপরাধীর বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা পুরো প্রক্রিয়াটিকে শক্তিশালী করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সদিচ্ছা। খাদ্যে ভেজালের সঙ্গে যদি কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি, ব্যবসায়ী কিংবা সিন্ডিকেট জড়িত থাকে, তাহলে তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে। আইন সবার জন্য সমান এই বার্তা বাস্তবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বক্তব্য তাই আমাদের নতুন করে ভাবার সুযোগ দিয়েছে। পিজা-বার্গার খাওয়া নিয়ে বিতর্ক হতে পারে। কেউ পরিমিত পরিমাণে খাবেন, কেউ খাবেন না এটি ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয়। কিন্তু ভেজাল খাবার, দূষিত উপকরণ ও পোড়া তেল দিয়ে মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ানোর সুযোগ কারও নেই।
আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে মানুষ বাজারে গিয়ে নিশ্চিন্তে খাবার কিনতে পারবেন। একজন মা তাঁর সন্তানের হাতে খাবার তুলে দিয়ে সন্দেহ করবেন না এতে বিষাক্ত কোনো উপাদান আছে কি না। একজন বৃদ্ধ ভাজাপোড়া খাবার খেলে তাঁর স্বাস্থ্যের কী হবে এ নিয়ে আতঙ্কিত হবেন না। একজন সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করবেন, রাষ্ট্র তাঁর খাবারের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিয়েছে।
আজ হাসপাতাল বাড়ছে, চিকিৎসার খরচ বাড়ছে, রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু একই সঙ্গে যদি বাজারে অনিরাপদ খাবারের বিস্তার চলতেই থাকে, তাহলে শুধু হাসপাতাল বাড়িয়ে জনস্বাস্থ্যের সংকট সমাধান করা যাবে না। রোগ হওয়ার পর হাসপাতাল বাড়ানোর চেয়ে রোগ প্রতিরোধ করা অনেক বেশি জরুরি। প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবাকে যদি সত্যিই অগ্রাধিকার দেওয়া হয়, তাহলে খাদ্য নিরাপত্তাকে তার কেন্দ্রীয় অংশ করতে হবে। তাই সময় এসেছে খাদ্য ভেজালের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণের। আইন নতুন করে বানানোর চেয়ে বিদ্যমান আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। নিয়মিত অভিযান, দ্রুত বিচার, কঠোর শাস্তি, খাদ্য পরীক্ষার সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জনসচেতনতা সবকিছুকে একসঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী যথার্থই বলেছেন, আমাদের খাদ্যাভ্যাস বদলাতে হবে। এজন্য স্বাস্থ্যমন্ত্রীকেও দায়িত্ব নিতে হবে অনেক। তবে তার সঙ্গে রাষ্ট্রকেও বদলাতে হবে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পদ্ধতি। কারণ মানুষ কী খাবে, সেটি শুধু মানুষের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়; সে যে খাবারটি বাজার থেকে কিনছে, সেটি নিরাপদ কি না তার নিশ্চয়তা দেওয়াও রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
পিজা-বার্গার হয়তো আমাদের খাদ্যসংস্কৃতির একটি নতুন বাস্তবতা। কিন্তু ভেজাল খাবার ও পোড়া তেলের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের নিষ্ক্রিয়তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। আইন আছে এখন প্রয়োজন আইনের কঠোর প্রয়োগ। তাহলেই হয়তো হাসপাতালের বিছানা কমবে, কমবে রোগীর দীর্ঘ সারি, আর একটি সুস্থ বাংলাদেশ গড়ার পথ কিছুটা হলেও সহজ হবে।
মীর আব্দুল আলীম : সাংবাদিক, কলামিস্ট
/এমএসএ
