বিজ্ঞাপন

জ্বালানি সংকট ও বৈশ্বিক সংহতি : বাংলাদেশের করণীয়

জ্বালানি সংকট ও বৈশ্বিক সংহতি : বাংলাদেশের করণীয়

একবিংশ শতাব্দীর এই তৃতীয় দশকে বিশ্ব এক অভূতপূর্ব জ্বালানি সংকটের মুখোমুখি। কোভিড-১৯ মহামারির ধাক্কা সামলে ওঠার আগেই ইউক্রেন যুদ্ধ এবং পরবর্তীতে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে শুরু হওয়া সংঘাত বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারকে এক চরম অস্থিরতার মধ্যে ঠেলে দিয়েছে।

এই সংকট কেবল একটি অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, এটি একটি বহুমাত্রিক ভূরাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ, যা বিশ্বজুড়ে উন্নয়নশীল ও উন্নত উভয় দেশেরই স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলেছে। এই প্রেক্ষাপটে ‘জ্বালানি সংকট ও বৈশ্বিক সংহতি’ বিষয়টি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।

আমদানিনির্ভর জ্বালানি খাতের কারণে বাংলাদেশও এই বৈশ্বিক সংকটের সরাসরি ভুক্তভোগী। এই সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নীতি এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতি উভয় ক্ষেত্রেই সুনির্দিষ্ট ও সাহসী পদক্ষেপ গ্রহণ করা অপরিহার্য।

বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট

বর্তমান বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের মূলে রয়েছে কয়েকটি প্রধান ভূরাজনৈতিক সংঘাত ও প্রতিযোগিতা। এর মধ্যে অন্যতম হলো চলমান ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংকট। ইরান বিশ্বের অন্যতম প্রধান তেল ও গ্যাস উৎপাদনকারী দেশ। যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা নিষেধাজ্ঞা এবং পরবর্তীতে হরমুজ প্রণালি ঘিরে সামরিক উত্তেজনা বৈশ্বিক তেল সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটিয়েছে।

হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়। এই পথে কোনো ধরনের বাধা সৃষ্টি হলে তা মুহূর্তের মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে, যার প্রভাব বাংলাদেশের মতো দুর্বল অর্থনীতির দেশের ওপর মারাত্মক হয়।

সাম্প্রতিক সময়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পাল্টাপাল্টি সামরিক হামলা আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামকে ব্যারেল প্রতি ১১০ ডলারের ওপরে নিয়ে গেছে, যা বাংলাদেশের বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করেছে।

জ্বালানি সংকটের আরেকটি উল্লেখযোগ্য কারণ হলো চীন-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য যুদ্ধ। বিশ্বের শীর্ষ দুই অর্থনৈতিক শক্তির মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী এই প্রতিযোগিতা বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনকে অস্থির করে তুলেছে।

আমদানিনির্ভর জ্বালানি খাতের কারণে বাংলাদেশও এই বৈশ্বিক সংকটের সরাসরি ভুক্তভোগী। এই সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নীতি এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতি উভয় ক্ষেত্রেই সুনির্দিষ্ট ও সাহসী পদক্ষেপ গ্রহণ করা অপরিহার্য।

চীন বিশ্বের বৃহত্তম জ্বালানি আমদানিকারক, আর যুক্তরাষ্ট্র বৃহত্তম উৎপাদনকারী ও আমদানিকারক। তাদের মধ্যে বাণিজ্য সংঘাতের ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির চাহিদা ও সরবরাহ উভয় ক্ষেত্রেই অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এছাড়া, এই বাণিজ্য যুদ্ধের ফলে প্রযুক্তি ও বিনিয়োগের প্রবাহও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, যা নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের উন্নয়নকে ধীরগতি করে দিচ্ছে। এই দুই পরাশক্তির দ্বন্দ্বের ফলে তৈরি হওয়া বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার আশঙ্কাও জ্বালানি বাজারের অস্থিরতাকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি পরিস্থিতি ও চ্যালেঞ্জ

বৈশ্বিক এই অস্থিরতার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের ওপর। বাংলাদেশ তার প্রাথমিক জ্বালানির, বিশেষ করে অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) সিংহভাগ আমদানির ওপর নির্ভরশীল। দেশের মোট জ্বালানি ব্যবহারের ৬৫ শতাংশের বেশি আমদানি করতে হয়।

দীর্ঘ সময় ধরে দেশীয় গ্যাস ক্ষেত্র অনুসন্ধানে অবহেলা এবং বাপেক্সকে নিষ্ক্রিয় রাখার ফলে বাংলাদেশ আজ এলএনজি আমদানিনির্ভর হয়ে পড়েছে। স্পট মার্কেট থেকে চড়া দামে এলএনজি কেনা সীমিত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করছে।

সাম্প্রতিক সময়ে রিজার্ভের পরিমাণ কমে যাওয়ায় জ্বালানি আমদানির বিল পরিশোধে জটিলতা তৈরি হচ্ছে। এর ফলে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে, যা শিল্প উৎপাদন এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে। লোডশেডিং আবার নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে উঠেছে।

এছাড়া, বাংলাদেশে চলমান অভ্যন্তরীণ ভূরাজনৈতিক সংকটও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে একটি বড় বাধা। রাজনৈতিক অস্থিরতা, সুশাসনের অভাব এবং আমলাতান্ত্রিক ধীরগতি জ্বালানি খাতের প্রয়োজনীয় সংস্কার ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নকে বাধাগ্রস্ত করছে। ভোলায় গ্যাস শনাক্ত হওয়ার দীর্ঘ আট বছর পরও তা পাইপলাইনে করে নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব এ ধরনের ধীরগতির একটি দৃষ্টান্ত।

বৈশ্বিক সংহতি ও বাংলাদেশের করণীয়

এই বহুমাত্রিক সংকট মোকাবিলায় কেবল অভ্যন্তরীণ প্রচেষ্টা যথেষ্ট নয়। বাংলাদেশের জন্য বৈশ্বিক সংহতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার স্থিতিশীল রাখতে এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে সংহতি ও সহযোগিতা অপরিহার্য। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সুনির্দিষ্ট করণীয় নিম্নে আলোচনা করা হলো:

জ্বালানি আমদানির উৎস বহুমুখীকরণ ও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি: কেবল মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভর না করে জ্বালানি আমদানির উৎস বহুমুখীকরণ করতে হবে। রাশিয়া, কাতার, মালয়েশিয়া ছাড়াও বিকল্প দেশগুলোর সাথে দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি ও তেল আমদানির চুক্তি করতে হবে। স্পট মার্কেটের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিতে সাহায্য করবে।

দেশীয় সম্পদ অনুসন্ধানে জোরালো পদক্ষেপ: দীর্ঘদিনের অবহেলা কাটিয়ে দেশীয় গ্যাস ক্ষেত্র অনুসন্ধান ও উত্তোলনে বাপেক্সকে শক্তিশালী করতে হবে। স্থলভাগ ও সমুদ্রভাগে অবিলম্বে গ্যাস অনুসন্ধানে নতুন রিগ কেনা এবং আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানিগুলোকে (আইওসি) উৎসাহিত করতে হবে। দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি সার্বভৌমত্ব নিশ্চিতে দেশীয় সম্পদ আহরণের বিকল্প নেই।

নবায়নযোগ্য জ্বালানির দ্রুত সম্প্রসারণ: বৈশ্বিক অস্থিরতা থেকে মুক্ত থাকতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিশেষ করে সৌর ও বায়ু বিদ্যুতের দ্রুত সম্প্রসারণ করতে হবে। বাংলাদেশের গার্মেন্টস ও টেক্সটাইল খাতের মতো শিল্পকারখানাগুলোর ছাদে সোলার প্যানেল স্থাপনের মাধ্যমে ‘রুফটপ বিপ্লব’ ঘটাতে পারে। সরকার এই খাতে স্থানীয় ও বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে কর ছাড় ও স্বল্প সুদে ঋণের ব্যবস্থা করতে পারে।

বাংলাদেশ কোনো পরাশক্তির দ্বন্দ্বের অংশ নয়, বরং একটি শান্তিপূর্ণ ও নিরপেক্ষ দেশ হিসেবে বৈশ্বিক সংহতির ডাক দিতে পারে। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র বা চীন-যুক্তরাষ্ট্র দ্বন্দ্বের ফলে বাংলাদেশের মতো দেশগুলো যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেজন্য আন্তর্জাতিক ফোরামে জোরালো আওয়াজ তুলতে হবে।

জ্বালানি কূটনীতি জোরদার: আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জ্বালানি কূটনীতি জোরদার করতে হবে। বাংলাদেশ কোনো পরাশক্তির দ্বন্দ্বের অংশ নয়, বরং একটি শান্তিপূর্ণ ও নিরপেক্ষ দেশ হিসেবে বৈশ্বিক সংহতির ডাক দিতে পারে। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র বা চীন-যুক্তরাষ্ট্র দ্বন্দ্বের ফলে বাংলাদেশের মতো দেশগুলো যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেজন্য আন্তর্জাতিক ফোরামে জোরালো আওয়াজ তুলতে হবে। আঞ্চলিক জ্বালানি সহযোগিতা (যেমন ভারত, নেপাল, ভুটানের সাথে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ) জোরদার করতে হবে।

সুশাসন ও দক্ষতা বৃদ্ধি: অভ্যন্তরীণ জ্বালানি খাতে সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নের গতি বাড়াতে হবে। জ্বালানি খাতের লোকসান কমাতে এবং দক্ষতা বৃদ্ধিতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে সংস্কার করতে হবে। বিদ্যুৎ ও গ্যাসের অপচয় রোধে জনসাধারণের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে।

পরিশেষে, জ্বালানি সংকট বাংলাদেশের উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার জন্য একটি বড় হুমকি। এই সংকট মোকাবিলায় অভ্যন্তরীণ নীতি, সুশাসন এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতি উভয় ক্ষেত্রেই সুনির্দিষ্ট ও সাহসী পদক্ষেপ গ্রহণ করা অপরিহার্য। কেবল বৈশ্বিক সংহতি ও অভ্যন্তরীণ একতার মাধ্যমেই বাংলাদেশ এই সংকট কাটিয়ে উঠতে এবং একটি নিরাপদ ও টেকসই জ্বালানি ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে পারবে। জ্বালানি নিরাপত্তা আজ কোনো বিলাসিতা নয়, এটি বাংলাদেশের অস্তিত্বের প্রশ্ন।

ড. সুজিত কুমার দত্ত : অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও পরিচালক, হংকং রিসার্চ সেন্টার ফর এশিয়ান স্টাডিজ-বাংলাদেশ সেন্টার