বিজ্ঞাপন

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার নিদারুণ দূষণ

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার নিদারুণ দূষণ

শিক্ষার বিষয়টি তো মানুষের মৌলিক অধিকারের একটি অংশ। সেই অধিকার থেকে একটি দেশের বিরাট জনগোষ্ঠী যখন বঞ্চিত থাকে, তখন সেই দেশের অগ্রগতি পদে পদে বিঘ্নিত হয়। এখন প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক যে, শিক্ষা বলতে আমরা কী বুঝি?

জগতের বহু বিষয়ের অন্তত একাংশ নিজের এখতিয়ারে আনা, তাকে অধিগত করা, আর একটা পর্যায়ে সেই শিক্ষাকে ব্যবহারিক জীবনে প্রয়োগ করে বেঁচে থাকার মধ্য দিয়ে আমরা এর একটা সফলতা আপাত দৃষ্টিতে দেখতে পাই।

প্রায়োগিক শিক্ষার এই বিষয়টি আমরা হাতে রেখেছি। কিন্তু প্রায়োগিক শিক্ষার এই অধিকার থেকেও বঞ্চিত আমাদের দেশের মতো তৃতীয় দুনিয়ার বিরাট একাংশ। কেন সেটা?

ফিরতে হবে ইতিহাসের দিকে। ১৭৫৭ সালে ইংরেজের হাতে স্বাধীনতা বিক্রির কারিগরেরা একজন সিরাজউদ্দৌলাকে হত্যা করে ১৯০ বছরের যে জিঞ্জিরের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে আমাদের বন্দি হতে বাধ্য করেছিল, সেই বন্দিত্ব থেকে মুক্তির পথও আমাদের সামনে খুলে দিয়েছিল শিক্ষার অনস্বীকার্য চাবিকাঠি।

টমাস ব্যাবিংটন মেকলের ধূর্তবুদ্ধি শিক্ষাব্যবস্থাকে সম্পূর্ণভাবে অতিক্রম করে ১৯ শতকে সর্বগ্রাসী বিদ্যাচর্চার এক মগ্ন পাঠ আর তাকে প্রায়োগিক ক্ষেত্রে প্রসারিত করার বিরাট অনুশীলন শুরু করেছিলেন আমাদের প্রকৃত শিক্ষিত পূর্বজরা। তার ফলে বড় মাপের জাগরণ সম্ভব হয়ে উঠেছিল। একেই আমরা উনবিংশ শতাব্দীর নবজাগরণ বলে ইতিহাসে চিহ্নিত করেছি।

বহু বছর পর পেছনে ফিরে তাকালে দেখা যায়, ইংরেজ-পূর্ব আর ইংরেজের শাসন ও শোষণ সময়কার অবস্থার খুব একটা পরিবর্তন একটা ক্ষেত্রে ঘটেনি। ইংরেজ বিদায়ের পরও আমাদের দুইবার স্বাধীনতার চিহ্নিত সময়টুকুর মধ্যেও, এক্ষেত্রে অবস্থা ও অবস্থান সম্পূর্ণ অপরিবর্তিত।

বরং বলা চলে এর অধোগতি হয়েছে ক্রমাগত। আর একে রোধের কোনো প্রচেষ্টাই দৃশ্যমান ছিল না। না পাকিস্তান আমলে, না বাংলাদেশ আমলে। আর সেই উনিশ শতকের নবজাগরণ পর্যায়ে যেমন ছিল, বাংলার বড় অংশের মানুষের নিরুত্তাপ অংশগ্রহণ বা তাদের বাইরে থাকার ভয়ংকর বাস্তবতা, তেমনি আজও সেই একই নৃশংস বাস্তবতা আরও বিশাল আকার ধারণ করে তার বিকট মুখ ব্যাদান করে আমাদের ক্ষুদ্র ‘শিক্ষিত জনগোষ্ঠী’কে অট্টহাস্যে উপস্থিত করছে।

বহুভাষী রামমোহন, প্রকৃত শিক্ষিত হয়েই চলমান বহু মূল্যবোধকে পদদলিত করে, কুসংস্কারাচ্ছন্ন সেই সময়ের মানুষের বিশ্বাসের বিপ্রতীপে সতীদাহ প্রথা রোধে নেতৃত্ব দিয়ে সেটা রদ করিয়েছিলেন, বহুভাষী বিদ্যাসাগর যেমন একইভাবে, তার প্রকৃত শিক্ষার আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে বাঙালি মেয়েদের দিয়েছিলেন নতুন জীবন—বিধবাবিবাহের প্রচলনের মাধ্যমে; শুষ্ক, রুক্ষ, নিস্তরঙ্গ আর মর্মন্তুদ জীবনের বিপরীতে এনে দিয়েছিলেন দীর্ঘশ্বাস মোচনকারী এক মুক্তির হাওয়া, ঠিক তেমনি ব্রিটিশদের দিয়ে রদ করিয়েছিলেন বহুবিবাহের মতো এক অমানবিক, বর্বর, ঘৃণ্য প্রথা।

এভাবে যদি আমরা এগোতে থাকি, তবে নিঃসন্দেহে আমরা শত শত আলোকোজ্জ্বল মনীষীকে পাবো, যারা শিক্ষার মহান আলোয় নিজেরা যেমন আলোকিত হয়েছিলেন, ঠিক তেমনি সমাজ মানসকে চক্ষুষ্মান ও ঋদ্ধ করেছিলেন, তাদের বহুমুখী কর্মে আর সাধনায়।

শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি তাদের অভিভাবকদের ওপর কতটা মানসিক, সামাজিক চাপ এই অসুস্থ প্রতিযোগিতার কারণে পড়ে, আমরা কখনোই তা ভাবি না। এই চাপ সামাল দিতে না পেরে আত্মহত্যাকামী আর আত্মহত্যাকারীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। কারণ, শিক্ষার ঠিক বিপরীত স্রোতে চলছি আমরা দীর্ঘকাল। প্রকৃত শিক্ষিত না হয়েই আমরা মেনে নিচ্ছি আত্মহননকে।

এভারেস্টের উচ্চতা নির্ণয়ের অভূতপূর্ব কাজটি করেছিলেন রাধানাথ শিকদার, গজ ফিতা ছাড়াই, এটাও শিক্ষার অনস্বীকার্য এক নমুনা। আসলে, ভারতীয় ঐতিহ্য আর সংস্কৃতির পাশাপাশি শিক্ষার সংযোগ ঘটেছিল পাশ্চাত্য শিক্ষার। সংস্কৃতির। জ্বলে উঠেছিল এক ভিন্নতর তৃতীয় মাত্রার আগুন।

এ আগুন বিস্তৃত হয়েছে কলকাতা নগরকেন্দ্রিক পরিধির ভেতর। বাইরের, বিশেষ করে গ্রামগঞ্জের সাধারণ মানুষ, প্রান্তিক জনসাধারণ এ আগুনের আঁচ থেকে সম্পূর্ণতাই বিযুক্ত ছিল। যে জাগরণ সারা বাংলায় ছড়িয়ে পড়ার কথা, মানুষের মধ্যে নতুন ভাবুকতার জন্ম দেওয়ার কথা, হয়তো কোনো অনুল্লেখ্য ব্যতিক্রম ছাড়াই, এ জাগরণ ততটা, বৃহত্তর বাঙালি জীবনে তেমন কোনো তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেনি।

এখান থেকে আমাদের একটা শিক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, শিক্ষার কাজ কেবল নিজের বলীয়ান, জ্ঞানবান, সমৃদ্ধিমান হওয়া নয়, অন্যকেও সমান অগ্রসরসরমান করার দায় পালনের মধ্যেও আছে। যেটা রামমোহন আর বিদ্যাসাগরের মধ্যে দেখা যায়। সাহিত্য আর সমাজচিন্তার মেলবন্ধন ঘটিয়ে পরবর্তী সময়ে বঙ্কিম, রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্ররা নতুনতর দিগোন্মোচন করেছিলেন।

বিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগেই বিশ্বযুদ্ধের মুখোমুখি হয় পৃথিবীর মানুষ। দুই দশক পার হতে না হতেই সত্যিকার বিশ্বব্যাপ্ত নতুনতর বিশ্বযুদ্ধের শুরু, যার সমাপ্তি ঘটে পরমাণু বোমার ভয়াবহ চেহারা দেখার মধ্য দিয়ে। আমরা দেখলাম, বিজ্ঞানের বিধ্বংসী বিস্তার আর সভ্যতার অমানবিক বিকার।

সক্রেটিস থেকে আজ অব্দি পৃথিবীতে বহু দার্শনিকের জন্ম হয়েছে। সবাই মানুষের মঙ্গল আর ভালো হোক এটাই চেয়েছেন। কিন্তু, তারপরও কেন অস্থির আজ পৃথিবী? কেন কুড়ি ভাগ মানুষের হাতে আশি ভাগ সম্পদ আর কেনইবা আশি ভাগ মানুষের হাতে অপর্যাপ্ত, তাদের জন্যে ভীষণ অপ্রতুল মাত্র কুড়ি ভাগ? আর এখানেই আসে শিক্ষার আসল সংকটের স্বরূপ। যাদের আছে, তাদের সবকিছুই বেশি বেশি আছে। যাদের নেই, তাদেরটা এমনই কম যে, সেটা প্রায় উল্লেখ অযোগ্য।

শিক্ষার অর্থ আমাদের কাছে ‘কেবল জানা’র অর্থে থাকলে, তার কার্যকারিতা কতটা, তা হয়তো পরিমাপের একটা সূত্র আছে। কিন্তু যে শিক্ষা অন্যের কাজে লাগে না, সমাজের কাজে আসে না, মানুষকে উপরের দিকে, আলোর দিকে টেনে আনার দিশারি হয় না, সে শিক্ষা নিশ্চিতভাবেই সীমাবদ্ধ।

এই সীমাবদ্ধতাকে আরও ক্ষুদ্র করেছে আমাদের নির্মম নিষ্ঠুর রাজনীতির ধর্মভিত্তিক পাশাখেলা। এই বিভাজনের খেলাটা ইংরেজের। আমাদের রাজনীতির লোকেদের অনাকাঙ্ক্ষিত উচ্চাকাঙ্ক্ষা খেলাটাকে বীভৎস রূপ দিয়েছে। ব্যক্তিস্বার্থের যূপকাষ্ঠে নিধন হয়েছে সমষ্টির জীবন, তাদের আলোকিত হওয়ার বাসনা, সমৃদ্ধির স্বপ্নবিভোর কামনা।

টমাস ব্যাবিংটন মেকলের ধূর্তবুদ্ধি বাঙালি বামন তৈরির কারখানা দুইশ বছরে বিস্তৃত হয়েছে শত শত বাঙালি মেকলেদের হাতে। ষাটের দশকের এক গভর্নর নাকি বলেছিলেন, সবাই লেখাপড়া শিখলে আমাদের গাড়ি চালাবে কারা, ঘরের কাজের লোক পাবো কোথায়? রহস্য কি শুধু এই বিকৃত মানসিকতায়?

রামমোহন আর বিদ্যাসাগরদের শত বছর পর এ কোন আলোকপ্রাপ্তির চেহারা! এই চেহারা আমাদের বলে দেয় এক অদৃশ্য অসুস্থ প্রতিযোগিতার কথা। আর এর পথ বেয়ে আমরা সন্তানের ফলাফল জনসমক্ষে প্রকাশ করি। জিপিএ ফাইভে সন্তুষ্ট না থেকে ‘গোল্ডেন জিপিএ ফাইভ’ বলে গৌরব(!) প্রচার করি।

সারা পৃথিবীর মানুষ যেখানে সামনের দিকে, নতুন উচ্চতার দিকে যাচ্ছে, আমরা হাঁটছি তার উল্টোদিকে। এর মূল কারণের দুটো হচ্ছে সদিচ্ছার অভাব আর অর্থনৈতিক অপ্রতুলতা।

ফেল করা, ফলাফল খারাপ করা সেই ছেলেমেয়েগুলোর কথা আর ভাবি না। এভাবেই আমাদের সমাজ চলেছে নির্বিকার ভঙ্গিতে। শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি তাদের অভিভাবকদের ওপর কতটা মানসিক, সামাজিক চাপ এই অসুস্থ প্রতিযোগিতার কারণে পড়ে, আমরা কখনোই তা ভাবি না। এই চাপ সামাল দিতে না পেরে আত্মহত্যাকামী আর আত্মহত্যাকারীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। কারণ, শিক্ষার ঠিক বিপরীত স্রোতে চলছি আমরা দীর্ঘকাল। প্রকৃত শিক্ষিত না হয়েই আমরা মেনে নিচ্ছি আত্মহননকে।

এই প্রেক্ষাপট মাথায় রাখলে, এই সত্য বেরিয়ে আসে যে, সারা পৃথিবীর মানুষ যেখানে সামনের দিকে, নতুন উচ্চতার দিকে যাচ্ছে, আমরা হাঁটছি তার উল্টোদিকে। এর মূল কারণের দুটো হচ্ছে সদিচ্ছার অভাব আর অর্থনৈতিক অপ্রতুলতা। দুইবার দুর্ভাগ্যজনক দেশ বিভাজনের কারণেই আমাদের সামাজিক স্থিতি স্ফটিক-দৃঢ় হওয়ার আগেই আমরা বিভক্ত হয়েছি, আমাদের লক্ষ্য বিচ্যুত হয়েছে, আর আমরা পিছিয়ে পড়েছি।

প্রথম দেশ বিভাজনে আমরা বিরাট এক শিক্ষক গোষ্ঠী দেশত্যাগ করতে দেখেছি। আর ঠিক তেইশ বছর পর একেবারেই হারিয়েছি আরও এক প্রতিভাবান শিক্ষক বলয়কে। এই দুই দুর্ভাগ্যজনক ক্ষতির পরও আমরা সচেতন হইনি। কিংবা আমাদের সদিচ্ছা ও পরিকল্পনার পরিকাঠামোগত সমস্যা ছিল।

‘যে নদী মরুপথে হারালো ধারা’র মতোই আমরাও হারিয়ে ফেললাম দিশা। শিক্ষাঙ্গনগুলো হয়ে উঠলো অস্থির, দিশাহীন। এছাড়াও, একের পর এক সামরিক শাসন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহের লাগাতার বন্ধের সরকারি নির্দেশ ভারসাম্যহীন করে তোলে পুরো শিক্ষাব্যবস্থাকে। এই ভারসাম্যহীনতার পথ বেয়ে ধেয়ে আসে একের পর এক সব কিছুই আবিল করা ঢেউ।

দেশ-যাত্রার শুরুতে সারাদেশে নকলের মহোৎসব, অতএব মস্তিষ্কের পুষ্টিহীন সার্টিফিকেটধারীদের বিশাল প্রজন্ম, এরপর প্রশ্নপত্র ফাঁস, নানা ধরনের নম্বরপত্র ও সার্টিফিকেট জালিয়াতি, উচ্চশিক্ষার বিভাগে বিভাগে অনুর্বর মস্তিষ্কের দাপট ও তাদের পোষ্যদের শিক্ষক নিয়োগ, শিক্ষার পুরো বিষয়টাকে নিয়ে গেছে সার্বিক দূষণের ঘৃণ্য পথে।

প্রকৃত শিক্ষক ছাড়া শিক্ষার মুক্তি নেই। আর তা শুরু করতে হবে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গোড়া থেকেই। প্রাথমিক গঠনের পুষ্টি এড়িয়ে মহিরুহ গড়ে তোলার কাজ কঠিন। আর সমাজের বড় অংশকে শিক্ষার বাইরে রেখে জাতিগত কোনো অর্জন অসম্ভব। কারণ, পিছিয়ে থাকা অংশ পেছন থেকেই আমাদের টানবে। সামনে এগোতে দেবে না।

তুষার দাশ : কবি, প্রাবন্ধিক, সমালোচক