মাত্র পাঁচ মাসের ব্যবধানে হাজারের কাছাকাছি শিশুর মৃত্যু এবং হাজার হাজার শিশুর আক্রান্ত হওয়ার তথ্য একটি নির্মম সত্যকে উন্মোচিত করেছে—আমাদের অর্জিত স্বাস্থ্য সুরক্ষাবলয়ে মারাত্মক ফাটল ধরেছে। দীর্ঘদিনের ধারাবাহিক টিকাদান ও নিবিড় তদারকির মাধ্যমে আমরা হাম নিয়ন্ত্রণে যে সাফল্য অর্জন করেছিলাম, তা আজ বড় ধরনের সংকটের মুখে।
হাম অত্যন্ত ছোঁয়াচে ভাইরাসবাহিত রোগ। এর ‘বেসিক রিপ্রোডাকশন নম্বর’ বা R0 মান ১২ থেকে ১৫। সহজ কথায়, একজন আক্রান্ত শিশু তার চারপাশে থাকা ১২ থেকে ১৫ জন স্পর্শকাতর বা অনাক্রম্যতাহীন ব্যক্তির মধ্যে এই সংক্রমণ অতি দ্রুত ছড়িয়ে দিতে সক্ষম। জনগোষ্ঠীর একটি ছোট অংশও যদি সুরক্ষিত না থাকে (টিকা না পায়), তবে ভাইরাসটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার পথ পেয়ে যায়।
একটা জনগোষ্ঠীকে অত্যন্ত ছোঁয়াচে হামের প্রাদুর্ভাব থেকে রক্ষা করতে কমপক্ষে ৯৫ শতাংশ ‘হার্ড ইমিউনিটি’ বা সামষ্টিক প্রতিরোধ ক্ষমতা প্রয়োজন। কিন্তু ইউনিসেফ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বাংলাদেশে প্রথম ডোজের (MR1) কভারেজ ৮৬ শতাংশে এবং দ্বিতীয় ডোজের (MR2) কভারেজ ৮০.৭ শতাংশে নেমে এসেছে।
এই ঘাটতির ফলে বিগত কয়েক বছরে লাখ লাখ শিশু টিকার আওতার বাইরে থেকে গেছে, যা তৈরি করেছে এক বিপজ্জনক ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’। এর মাশুল হিসেবে ২০২৬ সালের শুরু থেকে দেশের ৬১টিরও বেশি জেলায় হাম তীব্র আকারে ছড়িয়ে পড়েছে।
হামকে কেবল একটি সাধারণ ভাইরাসের আক্রমণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এটি অপুষ্টি, অনাক্রম্যতার দুর্বলতা, চিকিৎসায় বিলম্ব এবং দ্বিতীয় কোনো মারাত্মক জীবাণুর যৌথ আক্রমণের ফলে তৈরি হওয়া এক জীবনঘাতী ফাঁদ।
একটি সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য রোগে শত শত শিশুর এই অকালমৃত্যু রোধ করতে আমাদের অণুজীববিজ্ঞানের বিজ্ঞানসম্মত ব্যাখ্যা এবং জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার ত্রুটিগুলো একসঙ্গে টেবিলটকে এনে জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে।
অর্ধেকের বেশি শিশুর টিকা পাওয়ার বয়সই হয়নি
সাম্প্রতিক উপাত্তের একটি উদ্বেগজনক দিক হলো—হামে মৃতদের ৫১ শতাংশেরই বয়স ৯ মাসের কম (যার ২০ শতাংশের বয়স ৬ মাসের নিচে এবং ৩১ শতাংশের বয়স ৬ থেকে ৯ মাস)। অর্থাৎ, আক্রান্ত ও মৃত শিশুদের অর্ধেকের বেশি শিশুই প্রাতিষ্ঠানিক টিকা পাওয়ার বয়সে পৌঁছায়নি।
হাম শরীরের সঞ্চিত ভিটামিন ‘এ’ দ্রুত নিঃশেষ করে দেয়। এতে কেবল দৃষ্টিশক্তি হারানোর ঝুঁকিই তৈরি হয় না, ফুসফুস ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে নিউমোনিয়ার মতো জটিলতা দেখা দেয়।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের নিয়ম অনুযায়ী, জীবনের প্রাথমিক দিনগুলোয় শিশুরা মায়ের শরীর থেকে নিষ্ক্রিয় অনাক্রম্যতা বা প্রতিরোধ ক্ষমতা লাভ করে। তবে করোনাকালীন স্থবিরতার সময় যেসব কিশোরী ও তরুণী সময়মতো টিকা পাননি বা প্রাকৃতিক সংক্রমণের মুখোমুখি হননি, তারা এখন মা হচ্ছেন। ফলে গর্ভধারণের পর তারা সন্তানকে পর্যাপ্ত প্রতিরোধ ক্ষমতা হস্তান্তর করতে পারছেন না। এতে একদম কম বয়সী শিশুরা কোনো জন্মসূত্রীয় প্রতিরক্ষা ছাড়াই অরক্ষিত অবস্থায় ভাইরাসের মুখোমুখি হচ্ছে।
‘ইমিউন আমনেসিয়া’ বা অনাক্রম্যতার স্মৃতিভ্রংশ
হাম ভাইরাসের সবচেয়ে ভয়াবহ কৌশল হলো এটি শিশুর শরীরে ‘ইমিউন আমনেসিয়া’ বা অনাক্রম্যতার স্মৃতিভ্রংশ ঘটায়। হামের ভাইরাস প্রতিরোধ ব্যবস্থার ‘মেমোরি লিম্ফোসাইট’ কোষগুলো ধ্বংস করে দেয়। ফলে শিশু অতীতে যেসব রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জন করেছিল (যেমন অ্যাডেনোভাইরাস, নিউমোকক্কাস ইত্যাদি), সেই স্মৃতি মুছে যায়। এর পরিণতিতে শিশুটি অন্যান্য ব্যাকটেরিয়াল ও ভাইরাল সহ-সংক্রমণের (যেমন সেকেন্ডারি নিউমোনিয়া, ডেঙ্গু বা অ্যাডেনোভাইরাস) সামনে একেবারেই দুর্বল হয়ে পড়ে এবং মৃত্যুর ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
নীতি-প্রশাসনিক ও জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার প্রতিবন্ধকতা
হামের এই সাম্প্রতিক পুনরুত্থান হঠাৎ করে একদিনে ঘটেনি। প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, সরবরাহ শৃঙ্খলের জটিলতা এবং আবহাওয়ার বৈরী প্রভাবের সমন্বিত ফাটল দিয়েই এই ভাইরাস পুনরায় প্রবেশ করেছে—
সরবরাহ শৃঙ্খল ও ক্রয়নীতি পরিবর্তন: টিকার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা আনতে উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতির নীতি গ্রহণ করা হয়েছিল। কিন্তু আন্তর্জাতিক সরবরাহ শৃঙ্খলের সাময়িক জটিলতা ও আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতার কারণে দেশের কেন্দ্রীয় গুদামে টিকার তীব্র ঘাটতি দেখা দেয়।
কর্মসূচির অগ্রাধিকার রদবদল: জরুরি জনস্বাস্থ্য প্রয়োজন মেটাতে টাইফয়েড টিকাদান কর্মসূচির মতো বিস্তৃত জাতীয় উদ্যোগ পরিচালনা এবং প্রশাসনিক পুনর্গঠনের ফলে পূর্বনির্ধারিত জাতীয় হাম-রুবেলা গণটিকাদান প্রায় সাত মাস পিছিয়ে যায়। এই সময়ক্ষেপণ অনাক্রম্যতার ঘাটতি বাড়িয়ে তুলেছিল।
আরও পড়ুন
কোল্ড চেইন রক্ষা ও প্রাকৃতিক চ্যালেঞ্জ: দুর্গম ও প্রান্তিক অঞ্চলে চরম প্রতিকূল তাপপ্রবাহের সময় টিকার আদর্শ তাপমাত্রা (২ থেকে ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস) রক্ষা করা মাঠপর্যায়ের ইপিআই কর্মীদের জন্য বড় কারিগরি পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কোল্ড চেইন সামান্য ব্যাহত হলেও টিকার কার্যকারিতা কমে যায়।
ডেটা ট্র্যাকিংয়ের দুর্বলতা: মাঠপর্যায়ে ‘জিরো-ডোজ’ (এক ডোজও না পাওয়া) কিংবা বাদ পড়ে যাওয়া শিশুদের সঠিকভাবে চিহ্নিত করতে ডিজিটাল ট্র্যাকিংয়ে প্রাথমিক বিলম্ব ঘটেছে।
সংকট উত্তরণে জরুরি ও টেকসই করণীয়
হাম সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য একটি রোগ এবং গবেষণা নিশ্চিত করেছে যে ভাইরাসের জিনগত পরিবর্তনের কারণে টিকা অকার্যকর হয়নি। নিয়মিত ও সময়মতো টিকা না দেওয়াই প্রাদুর্ভাবের মূল কারণ। তাই কেবল ভাইরাসের ওপর দায় না চাপিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক ত্রুটি মেরামত, অপুষ্টি দূরীকরণ ও কৌশলগত টিকাদান পুনরুজ্জীবিত করতে আমাদের অবিলম্বে নিম্নোক্ত রোডম্যাপে হাঁটতে হবে—
(ক) ক্লিনিক্যাল ব্যবস্থাপনা ও তাৎক্ষণিক চিকিৎসা
উচ্চমাত্রার ভিটামিন ‘এ’ প্রদান: হাম শরীরের সঞ্চিত ভিটামিন ‘এ’ দ্রুত নিঃশেষ করে দেয়। এতে কেবল দৃষ্টিশক্তি হারানোর ঝুঁকিই তৈরি হয় না, ফুসফুস ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে নিউমোনিয়ার মতো জটিলতা দেখা দেয়। প্রয়োজনে আক্রান্ত শিশুর লক্ষণ দেখামাত্রই চিকিৎসকের পর্যবেক্ষণে নিবিড়ভাবে উচ্চমাত্রার ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল প্রদান নিশ্চিত করতে হবে। এটি চোখের ক্ষতি রোধ করার পাশাপাশি ভাইরাসের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত মিউকাস মেমব্রেন পুনর্গঠনে ভূমিকা রাখে।
শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিতকরণ: অপুষ্ট শিশুদের শরীরে টিকা দিলেও পর্যাপ্ত প্রতিরোধ সাড়া তৈরি হয় না। তাই অপুষ্ট শিশুদের বিশেষ পুষ্টি ও বুস্টার ডোজ নিশ্চিত করতে হবে।
দ্রুত চিকিৎসা: লক্ষণ দেখা দেওয়ার পরও হাসপাতালে না এনে বাড়িতে চিকিৎসায় দেরি করাও অকালমৃত্যুর বড় কারণ। এক্ষেত্রে জ্বর ও ফুসকুড়ি (র্যাশ) দেখা দিলে দেরি না করে হাসপাতালে নিতে হবে।
...লক্ষণ দেখা দেওয়ার পরও হাসপাতালে না এনে বাড়িতে চিকিৎসায় দেরি করাও অকালমৃত্যুর বড় কারণ। এক্ষেত্রে জ্বর ও ফুসকুড়ি (র্যাশ) দেখা দিলে দেরি না করে হাসপাতালে নিতে হবে।
সহ-সংক্রমণ রোধ ও পৃথকীকরণ: ইউনিসেফের তথ্যমতে, টিকার কাভারেজ কমায় দেশে হামের প্রকৃত সংক্রমণ ক্ষমতা (Rt) বেড়ে ২.৪ হয়েছে। এর ফলে ১ জন আক্রান্ত শিশু থেকে আরও ২-৩ জন শিশু সংক্রমিত হচ্ছে। তাই আক্রান্ত শিশুকে অনতিবিলম্বে অন্য শিশুদের থেকে আলাদা করতে হবে। একই সঙ্গে হাসপাতালে বিশেষায়িত নিউমোনিয়া ব্যবস্থাপনা, অক্সিজেন সাপোর্ট এবং ভিটামিন-এ সাপ্লিমেন্টেশন সুনিশ্চিত করা প্রয়োজন।
(খ) টিকাদান ও সরবরাহ শৃঙ্খল পুনর্গঠন
জরুরি ক্যাচ-আপ ও বিশেষ ড্রাইভ: আন্তর্জাতিক সংস্থা ইউনিসেফের সরাসরি ক্রয় পদ্ধতির (DPM) মাধ্যমে দ্রুত টিকার নিরবচ্ছিন্ন জোগান নিশ্চিত করে ৬ মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী ১ কোটি ৭৮ লাখের বেশি শিশুকে বিশেষ টিকাদান ড্রাইভের আওতায় আনতে হবে।
মায়ের সুরক্ষার পরীক্ষা ও প্রজননক্ষম নারীদের টিকাদান: সন্তান ধারণের পূর্বেই তরুণী ও নারীদের শরীরে পর্যাপ্ত অ্যান্টিবডি আছে কিনা তা নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজনে তাদের সম্পূরক টিকা দিতে হবে। মায়েদের সুরক্ষিত রাখতে পারলে ৯ মাসের কম বয়সী শিশুদের নিষ্ক্রিয় অনাক্রম্যতা বহুগুণ সুসংহত হবে।
(গ) গবেষণা ও নীতিগত সিদ্ধান্ত
ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল ও গবেষণা: যেহেতু ৬ থেকে ৯ মাস বয়সী শিশুরা বেশি আক্রান্ত হচ্ছে, তাই প্রচলিত টিকাদান সূচির বাইরে ৬ বা ৭ মাস বয়সে প্রথম ডোজ টিকা প্রদানের কার্যকারিতা এবং অপুষ্ট শিশুদের বাড়তি কোনো বুস্টার ডোজ লাগবে কি না, সে বিষয়ে নিজস্ব বাস্তবমুখী ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল পরিচালনা করা জরুরি।
ডিজিটাল ট্র্যাকিং: প্রতিটি ‘জিরো-ডোজ’ শিশু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে রিয়েল-টাইম ডিজিটাইজেশনের মাধ্যমে নজরদারিতে আনতে হবে।
হামে একটি শিশুর মৃত্যু কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি আমাদের জনস্বাস্থ্য সুরক্ষাবলয়ের সাময়িক ব্যর্থতার স্মারক। তবে আমাদের ভিত্তি ও অভিজ্ঞতা এখনো মজবুত। নীতিপ্রণেতা, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও অণুজীববিজ্ঞানীদের সমন্বিত প্রয়াসে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, ভিটামিন ‘এ’ ও অপুষ্টি দূরীকরণ এবং শূন্য-টিকা শিশুদের চিহ্নিত করে শতভাগ টিকাদান নিশ্চিত করাই পারে এই অনাকাঙ্ক্ষিত অকালমৃত্যুর মিছিল বন্ধ করতে। আমাদের অর্জিত ঐতিহ্য ও সুরক্ষাবলয়কে পুনরুজ্জীবিত করার এটিই উপযুক্ত সময়।
ড. আনোয়ার খসরু পারভেজ : অধ্যাপক, মাইক্রোবায়োলজি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]
