বিজ্ঞাপন

সুন্দরবনে বেড়েছে হরিণ শিকারের ফাঁদ, বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য নিরাপদ কি?

সুন্দরবনে বেড়েছে হরিণ শিকারের ফাঁদ, বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য নিরাপদ কি?

সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় হরিণ শিকারের ফাঁদ উদ্ধার হচ্ছে যা নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক খবর। সাম্প্রতিক সময়ে বন বিভাগের অভিযানে হাজার হাজার মিটার হরিণ শিকারের ফাঁদ উদ্ধার করা হয়েছে।

বন বিভাগের কর্মকর্তারাও বলছেন, পায়ে হেঁটে টহল বাড়ানোর ফলে ফাঁদ শনাক্ত ও উদ্ধারের হার বেড়েছে। সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের তথ্যমতে, ২০২৪ সালের মে থেকে ২০২৫ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ২৪ হাজার ৬৪৮ ফুট ‘মালা ফাঁদ’ উদ্ধার করে বন বিভাগ। 

একই সময়ে শিকার করা হরিণের মাংস জব্দ হয় ৭৯৩ কেজি। এর পরের এক বছরে ১ লাখ ১৪ হাজার ৫৫৩ ফুট ফাঁদ উদ্ধার করেছেন বন বিভাগের কর্মীরা। এই সময়ে হরিণের মাংস জব্দের ঘটনা কমে ২৫০ কেজি হয়। এই সময়ে বহু শিকারির বিরুদ্ধে মামলা ও গ্রেপ্তারের তথ্যও উঠে এসেছে (প্রথম আলো, ১০ আগস্ট ২০২৬)। 

সুন্দরবনের মাঠ পর্যায়ের কর্মীরা এমনকি সুন্দরবন পূর্ব অঞ্চলের বিভাগীয় বন কর্মকর্তাও মনে করছেন, বিগত দেড় বছরে তাদের তৎপরতার কারণে হরিণের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে।

এখানে একটা বিষয় খুব পরিষ্কারভাবে মনে রাখা দরকার ফাঁদ উদ্ধার হচ্ছে মানেই সুন্দরবনের হরিণ ভালো আছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর কোনো কারণ নেই। বরং বিপুলসংখ্যক ফাঁদ উদ্ধার হওয়ার ঘটনাই আমাদের জানান দিচ্ছে যে, সুন্দরবনের ভেতরে হরিণ শিকারের চাপ যথেষ্ট গুরুতর। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, হরিণ শিকারের জন্য পাতা ফাঁদ শুধু হরিণের জন্যই বিপজ্জনক নয়।

৩ জানুয়ারি ২০২৬ সুন্দরবনে হরিণ শিকারের ফাঁদে একটি বাঘ আটকা পড়ে। পরদিন বন বিভাগ বিশেষজ্ঞ দলের সহায়তায় বাঘটিকে উদ্ধার করে (প্রথম আলো, ৪ জানুয়ারি ২০২৬)। 

হরিণ শিকারের ফাঁদ বাঘের জন্য দুই ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে, একদিকে হরিণের মতো গুরুত্বপূর্ণ শিকারের প্রাপ্যতা কমছে, অন্যদিকে বাঘ নিজেই ফাঁদে আটকা পড়ে আহত বা মারা যেতে পারে।

আয়তনে সুন্দরবন বিশাল। এর প্রতিটি খাল, নদী, চর ও গভীর বনাঞ্চলে নিয়মিত ও সমান মাত্রায় ফুট প্যাট্রোলিং করা অত্যন্ত কঠিন। ফলে যে এলাকায় নিয়মিত টহল হচ্ছে, সেখানে ফাঁদ বেশি উদ্ধার হচ্ছে এটি হয়তো শিকারের প্রকৃত মাত্রার একটি অংশমাত্র। 

যে এলাকায় টহল হচ্ছে না বা খুব কম হচ্ছে, সেখানকার পরিস্থিতি সম্পর্কে আমাদের ধারণাইবা কতটুকু? এই কারণেই ফাঁদ উদ্ধারের সংখ্যাকে শুধু সাফল্যের সূচক হিসেবে না দেখে শিকারের চাপের একটি সূচক হিসেবেও দেখা প্রয়োজন।

এখানে মূল প্রশ্নটি হওয়া উচিত আরও বড়, আমরা যে ফাঁদগুলো উদ্ধার করতে পারছি, তার বাইরে কতগুলো ফাঁদ এখনো সুন্দরবনের ভেতরে রয়ে গেছে আর কি পরিমাণ নতুন ফাঁদ প্রতিনিয়ত পাতা হচ্ছে?

হরিণের সামগ্রিক সংখ্যার দিকে তাকালে অবশ্য আশাবাদী হওয়ার মতো তথ্য আছে। ২০২৩ সালের জরিপে বাংলাদেশ অংশের সুন্দরবনে চিত্রা হরিণের সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৪১ হাজার ৩৫৭টি (বন বিভাগ/IUCN, ২০২৩)। 

এই তথ্য অবশ্যই ইতিবাচক। কিন্তু সামগ্রিক সংখ্যা দিয়ে সুন্দরবনের প্রতিটি এলাকার হরিণের অবস্থা বোঝা যায় না। বিশাল বনাঞ্চলে মোট হরিণের সংখ্যা বাড়তে পারে, অথচ নির্দিষ্ট কোনো ব্লক বা এলাকায় তাদের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যেতে পারে।

মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষণে এমন অনেক এলাকা রয়েছে যেখানে ১০ বছর আগেও তুলনামূলক ভালো সংখ্যায় হরিণ দেখা যেত, এখন সেখানে হরিণের উপস্থিতি আশংকাজনক ভাবে কম। আবার কিছু ব্লকে এখনো ভালো সংখ্যায় হরিণ দেখা যায়। 

এই পার্থক্যগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় শিকারের চাপ বেশি হলে সেখানে হরিণের সংখ্যা কমে যেতে পারে, যদিও পুরো সুন্দরবনের সামগ্রিক সংখ্যা তখনো স্থিতিশীল বা ঊর্ধ্বমুখী থাকতে পারে। তাই আমাদের জানতে হবে কোন ব্লকে কতটি হরিণ আছে, কোথায় সংখ্যা কমছে, কোথায় বাড়ছে এবং কেন কমছে।

হরিণ সুন্দরবনের খাদ্যজালের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। রয়েল বেঙ্গল টাইগারের প্রধান শিকারগুলোর একটি চিত্রা হরিণ। সরকারের টাইগার অ্যাকশন প্ল্যান ২০১৮-২০২৭-এ বাঘের আবাসস্থলে পর্যাপ্ত শিকারের প্রাপ্যতাকে বাঘ সংরক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। 

ফলে হরিণের সংখ্যার দীর্ঘমেয়াদি পতন হলে তার প্রভাব শুধু হরিণের ওপর সীমাবদ্ধ থাকবে না; সুন্দরবনের পুরো শিকারি-শিকার প্রাণী সম্পর্ক তথা বাস্তুতন্ত্রের ওপরও পড়তে পারে। সুতরাং সামগ্রিকভাবে বললে, সুন্দরবন ভালো নেই, অন্তত আত্মতুষ্ট হওয়ার মতো ভালো নেই।

হরিণের সামগ্রিক সংখ্যা বেড়েছে, এটি অবশ্যই আশার কথা। কিন্তু একই সঙ্গে বিপুলসংখ্যক ফাঁদ উদ্ধার, হরিণের মাংস জব্দ এবং হরিণ শিকারের ফাঁদে বাঘ আটকা পড়ার ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে সুন্দরবন এখনো প্রবল মানবসৃষ্ট চাপের মধ্যে আছে।

এখানে বন বিভাগের দায়িত্ব ও সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে ভাবা জরুরি। মাঠপর্যায়ের কর্মীদের ওপর শুধু দায়িত্ব চাপিয়ে দিলেই হবে না। প্রয়োজন পর্যাপ্ত জনবল, নিয়মিত প্রশিক্ষণ, কাজের উপযুক্ত প্রণোদনা, ঝুঁকি ভাতার ব্যবস্থা এবং আধুনিক সরঞ্জাম সরবরাহ করা। 

দুর্গম সুন্দরবনে দায়িত্ব পালন করা কর্মীদের জন্য পর্যাপ্ত ও নিরাপদ জলযান, রাতের নজরদারি ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ও যোগাযোগ সরঞ্জাম নিশ্চিত করতে হবে। সুন্দরবন সুরক্ষা প্রকল্পের আওতায় বেশ কিছু ফরেস্ট স্টেশনে নতুন নতুন অফিস কাম বাসস্থানের ব্যবস্থা হয়েছে যা বনকর্মীদের জন্য ইতিবাচক। একই সঙ্গে ফুট প্যাট্রোলিং আরও বাড়াতে হবে।

সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা বলছে, পায়ে হেঁটে বন তল্লাশি করলে ফাঁদ শনাক্তের সুযোগ বাড়ে (প্রথম আলো, ৯ আগস্ট ২০২৬)। এর পাশাপাশি স্মার্ট পেট্রোল, ক্যামেরা ট্র্যাপিং, ড্রোন সার্ভিলেন্স এবং জিপিএসভিত্তিক নজরদারি আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যেতে পারে। 

হরিণের জন্য শুধু কয়েক বছর পরপর একটি সামগ্রিক জনসংখ্যা প্রাক্কলন বা জনসংখ্যা অনুমান যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন ব্লকভিত্তিক দীর্ঘমেয়াদি মনিটরিং। কোথায় হরিণের ঘনত্ব কত, কোন এলাকায় কমছে বা বাড়ছে, প্রজননের অবস্থা কী, শিকারের চাপ কোথায় বেশি এবং টুরিস্ট ও বন নির্ভরশীল মানুষের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে এসব পরিবর্তনের সম্পর্ক কী।

মনে রাখতে হবে আমরা যে ফাঁদটি উদ্ধার করেছি, সেটি আমাদের চোখে পড়েছে। যে ফাঁদটি উদ্ধার করতে পারিনি, তার খবর আমরা জানি না। তাই ফাঁদ উদ্ধার অবশ্যই সাফল্য। একটি ফাঁদ সরানো মানে সম্ভাব্য কিছু প্রাণহানি ঠেকানো। কিন্তু ফাঁদ উদ্ধারের সংখ্যা নিয়ে আত্মতুষ্ট হওয়ার পরিবর্তে আমাদের ভাবতে হবে কেন এত ফাঁদ এখনো বনে পাতা হচ্ছে এবং আমাদের নজরদারির বাইরে বনের কতটা অংশ পড়ে আছে।

সুন্দরবন সংরক্ষণে তাই এখন প্রয়োজন আরও শক্তিশালী মাঠপর্যায়ের বন ব্যবস্থাপনা, প্রশিক্ষিত ও প্রণোদিত বনকর্মী, পর্যাপ্ত সরঞ্জাম, নিয়মিত বিজ্ঞানভিত্তিক মনিটরিং এবং তথ্যনির্ভর সংরক্ষণ পরিকল্পনা। সুন্দরবনের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আমরা এখন এই কাজগুলো কতটা গুরুত্ব দিয়ে করছি তার ওপর।

আশীষ দত্ত : সহকারী অধ্যাপক, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]