শিশু সবসময় কোনো ঘটনার সরাসরি শিকার হয়ে ভুক্তভোগী হয় না, অনেক সময় সে শুধু দেখে, কিন্তু সেই দেখাও তার মনে এমন এক ধরনের অভিজ্ঞতা তৈরি করে, যার প্রভাব হয়তো আমরা তাৎক্ষণিকভাবে বুঝতে পারি না। ধীরে ধীরে তার প্রকাশ পায়।
কোথাও একটা শিশু নির্যাতনের শিকার হলো। ঘটনাটি সংবাদমাধ্যমে এলো। তারপর তা ছড়িয়ে পড়ল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। ভিডিওটি কেউ একজন দেখল, তারপর আরেকজনকে পাঠাল। কেউ ক্ষোভ প্রকাশ করল, কেউ আলোচনা করল, কেউ আবার কৌতূহলবশত ভিডিওটি দেখতে শুরু করল। এভাবেই একটা ঘটনা তার ঘটনার স্থান থেকে বেরিয়ে এসে প্রবেশ করল হাজার হাজার মানুষের ঘরে। সেই ঘরগুলোর কোনো কোনো ঘরে এক বা একাধিক শিশুও বসে ছিল।
সে হয়তো ঘটনাটি পুরোপুরি বুঝতে পারেনি। কিন্তু সে দৃশ্যটি দেখেছে। সে দেখেছে তার বয়সী আরেকটি শিশু কষ্টে আছে। সে দেখেছে বড়রা ঘটনাটি নিয়ে উদ্বিগ্ন। সে হয়তো রাতে মাকে প্রশ্ন করেছে, ‘আমার সঙ্গেও কি এমন হতে পারে?’
একটা শিশু আক্রান্ত হলো, কিন্তু আরেকটি শিশু আতঙ্কিত হয়ে উঠল। আজকের বাস্তবতায় শিশুদের ভুক্তভোগী হওয়ার ধারণাটিকে তাই নতুন করে ভাবতে হবে। ভুক্তভোগী শুধু সেই শিশু নয়, যার ওপর সরাসরি নির্যাতন হয়েছে। ভুক্তভোগী সেই শিশুটিও, যে প্রতিদিন অন্য শিশুদের ওপর ঘটে যাওয়া সহিংসতা দেখে বড় হচ্ছে, যে টেলিভিশনের পর্দায় দুর্ঘটনা দেখে, যে বাবার মোবাইলে মারামারির ভিডিও দেখে, যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার বয়সী কোনো শিশুকে অপমানিত হতে দেখে, যে স্কুলে যাওয়ার পথে দুর্ঘটনার খবর শোনে এবং মনে মনে ভাবে, আজ আমি নিরাপদ তো?
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ইতিহাসে এই প্রশ্নের উত্তরে বিভিন্ন চিন্তাবিদ বিভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন। টমাস হবস-এর চিন্তায় মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অন্যতম প্রধান যুক্তি। মানুষ এমন এক অনিরাপদ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে চায়, যেখানে নিজের নিরাপত্তা সে নিজে নিশ্চিত করতে পারে না। তাই একটি রাজনৈতিক কর্তৃত্বের প্রয়োজন হয়, যা নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।
আজকের রাষ্ট্র টমাস হবস-এর সময়ের রাষ্ট্রের চেয়ে অনেক বেশি জটিল। এখন রাষ্ট্র শুধু বাহ্যিক শত্রুর হাত থেকে নাগরিককে রক্ষা করে না। একটি আধুনিক রাষ্ট্রের কাছে নাগরিকের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অধিকার, সামাজিক নিরাপত্তা এবং মানবিক বিকাশও গুরুত্বপূর্ণ।
আর শিশুর ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের দায়িত্ব আরও বেশি। কারণ শিশুরা রাষ্ট্রের সবচেয়ে দুর্বল নাগরিকদের মধ্যে অন্যতম। তাদের ওপর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, কিন্তু তারা সব সিদ্ধান্তে অংশ নিতে পারে না। তারা বিপদ সম্পর্কে সবসময় সচেতন নয়। তারা জানে না কোন তথ্যটি সত্য, কোনটি মিথ্যা। তারা বোঝে না কোন ভিডিওটি তাদের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তারা অনেক সময় জানেই না, অনলাইনে কোনো সমস্যায় পড়লে কোথায় সাহায্য চাইতে হবে।
একজন প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক হয়তো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে বেরিয়ে আসতে পারেন। কিন্তু একটা শিশু যখন ভিডিও দেখতে শুরু করে এবং তার সামনে একের পর এক, একই ধরনের কনটেন্ট আসতে থাকে, তখন বিষয়টি শুধু ব্যক্তিগত পছন্দের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না।
এখানেই এসে দাঁড়ায় অ্যালগরিদমের প্রশ্ন। আগে আমরা ভাবতাম, শিশু কী দেখবে, তা নির্ভর করে তার পরিবার, স্কুল কিংবা টেলিভিশনের ওপর। এখন তার সামনে কী আসবে, তার একটা বড় অংশ নির্ধারণ করছে এমন সব অদৃশ্য প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা, যেগুলো সে নিজেও বোঝে না।
একটা শিশু হয়তো কৌতূহলবশত দুর্ঘটনার ভিডিও দেখল। এরপর তার সামনে আরও দুর্ঘটনার ভিডিও আসতে পারে। সে সহিংস ঘটনার খবর দেখল। এরপর একই ধরনের আরও কনটেন্ট তার সামনে হাজির হতে পারে। একটা ভয়াবহ ঘটনার প্রতি কয়েক সেকেন্ড বেশি মনোযোগ দেওয়ার অর্থ হতে পারে, প্রযুক্তিগত সুপারিশব্যবস্থা তাকে ধরে নিয়েছে, এই ধরনের কনটেন্টে তার আগ্রহ আছে।
এ প্রসঙ্গে উল্লেখ না করলেই নয় যে, অতি সম্প্রতি ক্যালিফোর্নিয়ার ওকল্যান্ডের একটা আদালতে মেটার বিরুদ্ধে এযাবৎকালের সবচেয়ে বড় আইনি লড়াই শুরু হয়েছে। ক্যালিফোর্নিয়া ও নিউইয়র্কসহ যুক্তরাষ্ট্রের ২৯টি অঙ্গরাজ্য মেটার বিরুদ্ধে যৌথভাবে মামলাটি দায়ের করেছে।
আগে ধারণা ছিল, রাষ্ট্র সিদ্ধান্ত নেবে এবং নাগরিক তা অনুসরণ করবে। কিন্তু আধুনিক শাসনব্যবস্থায় একটি জটিল সামাজিক সমস্যার সমাধানে রাষ্ট্রের পাশাপাশি পরিবার, বিদ্যালয়, গণমাধ্যম, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিক সমাজের ভূমিকা থাকে। শিশুদের ডিজিটাল নিরাপত্তাও তেমন একটি বিষয়।
তাদের অভিযোগ একটাই—শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি হতে পারে জেনেও লাভজনক ব্যবসার জন্য মেটা ইচ্ছাকৃতভাবে তাদের অ্যাপগুলোয় কিশোর-কিশোরীদের আটকে রেখেছে। তাহলে একটি প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই আসে, যে ডিজিটাল পরিবেশ প্রতিদিন কোটি কোটি শিশুর চিন্তা, আচরণ, তথ্যগ্রহণ এবং সামাজিক বিকাশকে প্রভাবিত করছে, সেই পরিবেশে রাষ্ট্রের কোনো দায়িত্ব থাকবে না কেন?
এখানে রাষ্ট্রের দায়িত্ব অবশ্যই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধ করে দেওয়া নয়। শিশুর হাতে মোবাইল নিষিদ্ধ করে দেওয়াও বাস্তবসম্মত সমাধান নয়। প্রযুক্তি আজকের বাস্তবতা। শিক্ষা, যোগাযোগ, সৃজনশীলতা এবং জ্ঞান অর্জনের অসংখ্য সুযোগও প্রযুক্তি তৈরি করেছে।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব প্রযুক্তিকে নিষিদ্ধ করা নয়; বরং প্রযুক্তির মধ্যে নাগরিকের, বিশেষত শিশুর, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এখানেই কল্যাণরাষ্ট্রের ধারণাটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্র শুধু অপরাধ ঘটার পর অপরাধীকে শাস্তি দিয়ে দায়িত্ব শেষ করে না। সে এমন একটি পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করে, যেখানে নাগরিকের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনাই কমে আসে।
বাংলাদেশে প্রায়ই দেখা যায়, একটি বড় ঘটনা ঘটার পর আমরা নড়েচড়ে বসি। আলোচনা হয়, প্রতিবাদ হয়, তদন্ত হয়, নির্দেশনা দেওয়া হয়। কিছুদিন পর আরেকটি ঘটনা এসে আগের ঘটনাকে সরিয়ে দেয়। কিন্তু শিশুর নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এই ‘ঘটনার পর ব্যবস্থা’ নেওয়ার সংস্কৃতি যথেষ্ট নয়। রাষ্ট্রকে এমন একটি শিশু সুরক্ষা কাঠামো তৈরি করতে হবে, যেখানে একটি ঘটনা ঘটার আগেই ঝুঁকিকে চিহ্নিত করার চেষ্টা করা হবে। শিশুর জন্য নিরাপদ স্কুল দরকার, আবার নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশও দরকার। নিরাপদ রাস্তা দরকার, আবার নিরাপদ অনলাইন যোগাযোগও দরকার। বাস্তব জীবনে অভিযোগ করার ব্যবস্থা দরকার, আবার অনলাইনে বিপদে পড়লে দ্রুত সাহায্য পাওয়ার ব্যবস্থাও দরকার।
আরও পড়ুন
রাষ্ট্রকে এখানে একটি সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করতে হবে। কিন্তু রাষ্ট্র একা এই দায়িত্ব পালন করতে পারবে না। এখানেই আধুনিক শাসনব্যবস্থার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা সামনে আসে, সেটি হলো গভর্ন্যান্স। আগে ধারণা ছিল, রাষ্ট্র সিদ্ধান্ত নেবে এবং নাগরিক তা অনুসরণ করবে। কিন্তু আধুনিক শাসনব্যবস্থায় একটি জটিল সামাজিক সমস্যার সমাধানে রাষ্ট্রের পাশাপাশি পরিবার, বিদ্যালয়, গণমাধ্যম, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিক সমাজের ভূমিকা থাকে। শিশুদের ডিজিটাল নিরাপত্তাও তেমন একটি বিষয়।
পরিবার যদি শিশুর ডিজিটাল জীবন সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ থাকে, রাষ্ট্র একা তাকে রক্ষা করতে পারবে না। বিদ্যালয় যদি ডিজিটাল নাগরিকত্ব সম্পর্কে শিক্ষা না দেয়, শুধু আইন দিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান যদি শিশুদের নিরাপত্তাকে গুরুত্ব না দেয়, শুধু বাবা-মাকে দায়ী করাও যুক্তিসঙ্গত নয়।
শিশুদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলা খুব সহজ। কিন্তু শিশুদের বর্তমানকে নিরাপদ করা অনেক বেশি জরুরি। আমরা প্রায়ই বলি, শিশুরাই জাতির ভবিষ্যৎ। কিন্তু একটি শিশু কেমন ভবিষ্যৎ তৈরি করবে, তা নির্ভর করে সে আজ কেমন সমাজ দেখছে তার ওপর। যদি সে প্রতিদিন সহিংসতা দেখে, সে সমাজ সম্পর্কে কী শিখবে?
যদি সে প্রতিদিন অন্যের অপমানকে বিনোদন হিসেবে দেখছে, সে মানবিকতা সম্পর্কে কী ধারণা তৈরি করবে? যদি সে বারবার ভয়াবহ খবর দেখে বড় হয়, সে পৃথিবীকে কতটা নিরাপদ মনে করবে? আর যদি সে এমন একটি ডিজিটাল পরিবেশে বড় হয়, যেখানে তার কৌতূহলকে ব্যবহার করে অ্যালগরিদম তাকে একের পর এক নেতিবাচক কনটেন্টের দিকে নিয়ে যায়, তাহলে সেখানে শুধু পরিবারকে দায়ী করে রাষ্ট্র তার দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে পারে না।
আজ শিশু সুরক্ষার অর্থ শুধু শিশুকে ঘরের ভেতরে নিরাপদ রাখা নয়। শিশুকে এমন একটি সমাজ দিতে হবে, যেখানে অন্যায়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এমন একটি বিদ্যালয় দিতে হবে, যেখানে সে সম্মান পায়। এমন একটি রাস্তা দিতে হবে, যেখানে সে নিরাপদে চলতে পারে এবং এমন একটি ডিজিটাল পৃথিবী দিতে হবে, যেখানে তার কৌতূহল, সরলতা ও দুর্বলতাকে ব্যবহার করে তাকে ক্ষতিকর অভিজ্ঞতার দিকে ঠেলে দেওয়া হবে না।
ইউনিসেফ-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি ১০ জন শিশুর প্রায় ৯ জন কোনো না কোনোভাবে পরিচর্যাকারী, যার মধ্যে বাবা-মা ও শিক্ষকও কর্তৃক শারীরিক শাস্তি বা মানসিক আগ্রাসনের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই বাস্তবতাকে আরও জটিল করেছে। ২০২৫ সালে বাংলাদেশে ইউনিসেফ-এর প্রায় ২৯ হাজার শিশু ও তরুণকে নিয়ে পরিচালিত এক জরিপে দুই-তৃতীয়াংশ উত্তরদাতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত ভুয়া ও বিভ্রান্তিকর তথ্যকে মানসিক চাপের প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে; বুলিং, নেতিবাচক মন্তব্য এবং ক্ষতিকর বা উদ্বেগজনক কনটেন্টও গুরুত্বপূর্ণ চাপের উৎস হিসেবে উঠে এসেছে।
এই সমস্যাকে আমরা যদি কেবল পারিবারিক সমস্যা হিসেবে দেখি, তাহলে তার রাজনৈতিক তাৎপর্যটি আমাদের চোখ এড়িয়ে যাবে। কারণ আজকের শিশুরাই আগামী দিনের নাগরিক, ভোটার, প্রশাসক, শিক্ষক, উদ্যোক্তা, বিচারক এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের অংশ। তারা কেমন মানুষ হিসেবে গড়ে উঠবে, রাষ্ট্র ও সমাজ সম্পর্কে তাদের ধারণা কী হবে, অন্যের প্রতি তাদের সহনশীলতা ও আস্থা কতটুকু হবে- এসবের সঙ্গে তাদের শৈশবের সামাজিক অভিজ্ঞতার গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
প্রাসঙ্গিকভাবে এখানে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের রাজনৈতিক সামাজিকীকরণের ধারণাটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। রাষ্ট্র সম্পর্কে মানুষের ধারণা শুধু পাঠ্যবই থেকে তৈরি হয় না। পরিবার, বিদ্যালয়, গণমাধ্যম, সামাজিক প্রতিষ্ঠান এবং এখন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম-সবকিছু মিলেই একজন মানুষের মূল্যবোধ ও নাগরিক চেতনা গড়ে তোলে। অর্থাৎ, শিশু আজ যে সমাজ দেখছে, আগামী দিনে সেই অভিজ্ঞতার আলোতেই সে রাষ্ট্র ও সমাজকে বিচার করতে শিখবে। তাই শিশুর মানসিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু মানবিক দায়িত্ব নয়; এটি একটি রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক বিনিয়োগ।
আমরা প্রায়ই বলি, শিশুরাই জাতির ভবিষ্যৎ। কিন্তু একটি শিশু কেমন ভবিষ্যৎ তৈরি করবে, তা নির্ভর করে সে আজ কেমন সমাজ দেখছে তার ওপর। যদি সে প্রতিদিন সহিংসতা দেখে, সে সমাজ সম্পর্কে কী শিখবে?
রাষ্ট্রের শিক্ষা নীতিতে তাই শিশুর মানসিক ও সামাজিক সুস্থতাকে আরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশে ইতিমধ্যে স্কুলভিত্তিক মানসিক স্বাস্থ্য ও সাইকোসোশ্যাল সহায়তা কর্মসূচি নিয়ে কাজ শুরু হয়েছে এবং জাতীয় পাঠ্যক্রমে মানসিক ও মনোসামাজিক সুস্থতার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। তবে এই ধরনের উদ্যোগকে বিচ্ছিন্ন প্রকল্প হিসেবে না দেখে একটি দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় নীতির অংশে পরিণত করা প্রয়োজন।
প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এমন একটি পরিবেশ থাকা দরকার, যেখানে একটি শিশু অপমানিত বা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হলে তাকে শুধু ‘দুর্বল’ বলে চিহ্নিত করা হবে না। সে যেন নিরাপদভাবে তার সমস্যার কথা বলতে পারে। শিক্ষক ও অভিভাবকদের এমন প্রশিক্ষণও প্রয়োজন, যাতে তারা বুঝতে পারেন-শিশুর নীরবতা সবসময় ভালো থাকার লক্ষণ নয়। অনেক সময় একটি শিশুর আচরণগত পরিবর্তনের পেছনে ভয়, অপমান বা সামাজিক চাপ কাজ করতে পারে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো মানবাধিকারের ভিত্তিতে রাষ্ট্রের দায়িত্ব। আধুনিক রাষ্ট্রে নাগরিক কেবল রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রিত ব্যক্তি নয়; সে অধিকারসম্পন্ন ব্যক্তি। শিশুর ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। শিশুকে শুধু ভবিষ্যতের নাগরিক হিসেবে দেখলে ভুল হবে। সে আজও একজন অধিকারসম্পন্ন নাগরিক।
আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অংশগ্রহণমূলক শাসনব্যবস্থা ধারণা বলে, যাদের জীবনকে কেন্দ্র করে নীতি তৈরি করা হয়, তাদের অভিজ্ঞতাও নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ। শিশুদের জন্য নীতি তৈরি করার সময় শিশু ও কিশোরদের অভিজ্ঞতা, ভয়, উদ্বেগ এবং মতামত জানার প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।
একটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ শেষ পর্যন্ত তার শিশুদের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে। আজ যে শিশু অপমান, ভয় ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে বড় হচ্ছে, সে আগামী দিনে সেই অভিজ্ঞতা নিয়েই সমাজে প্রবেশ করবে। আর যে শিশু সম্মান, নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার এবং মতামত প্রকাশের সুযোগ নিয়ে বড় হয়, তার কাছ থেকে আমরা একটি দায়িত্বশীল নাগরিকত্বের আশা করতে পারি।
শিশুদের নিরাপদ করা মানে শুধু একটি প্রজন্মকে রক্ষা করা নয়। এর অর্থ হলো আগামী দিনের সমাজ, গণতন্ত্র, নাগরিক সংস্কৃতি এবং রাষ্ট্রকে নিরাপদ করার ভিত তৈরি করা। কারণ আজকের শিশুর মানসিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হলে, ভবিষ্যতের রাষ্ট্রের কাছ থেকে আমরা কোন ধরনের নাগরিক সমাজ আশা করব-সেই প্রশ্নের উত্তর আমাদের আজই খুঁজতে হবে।
ড. সুলতান মাহমুদ রানা : অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]
