বিজ্ঞাপন

বিপর্যস্ত নেপালের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

বিপর্যস্ত নেপালের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

ভয়াবহ এক বিপর্যয়ে বিধ্বস্ত নেপাল, তবে এই প্রাকৃতিক বিপর্যয় এবারই প্রথম নয়। মার্কিন এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০০০ সালের পর হিমালয়ের হিন্দুকুশ পর্বতমালায় হিমবাহের বরফ গলে যাওয়ার হার আগের সময়ের তুলনায় দ্বিগুণ হয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের এক তথ্যমতে, অতীতে ২৪টি এধরনের হিমবাহ ধসের ঘটনা ঘটেছে। পাহাড়ে এই হিমবাহ গলে অজস্র কৃত্রিম হ্রদের সৃষ্টি হয়েছে, যা এক একটা টাইমবোমার মতো হয়ে আছে বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত।

বড় হিমবাহের ধসের ফলে জমে থাকা এসব হ্রদের পানি ভাসিয়ে নেয় লোকাঞ্চল, ডেকে আনে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়, জলের সাথে, মানুষের সাথে ভেসে যায় অজস্র স্বপ্ন। এমন একটি ঘটনার ফলে এবারের দুর্ঘটনা-এখন পর্যন্ত এটাই বিশ্লেষণ। এই দুর্যোগ নিয়ে ইতিমধ্যে অনেক বিশ্লেষণ হয়েছে এবং আগামী দিনগুলোয়ও এধরনের গবেষণা চলতে থাকবে।

আজকের আলোচনার বিষয়, ভয়াবহ এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং দেশটির ভবিষ্যৎ পুনর্বাসন সংক্রান্ত বিষয়গুলো মোকাবিলা করতে গিয়ে নেপালকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যেতে হবে।

আমরা জানি, হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত নেপালে সমতল ভূমি তেমন একটা নেই, তারপরও ৩ কোটি মানুষের দেশে কৃষি অন্যতম আয়ের উৎস, একসময় দেশের চালের উৎপাদন অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানি হতো, যা আজ অলীক কল্পনায় পরিণত হয়েছে। চারপাশে পাহাড়ে ঘেরা দেশটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে আকৃষ্ট হয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার বিদেশি পর্যটক ভ্রমণে আসেন দেশটিতে, যা তার আয়ের অন্যতম বড় উৎস।

পর্যটন খাত নেপালের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। হিমালয়, এভারেস্ট, লুম্বিনিসহ নানা ঐতিহাসিক ও প্রাকৃতিক আকর্ষণ দেশটিকে বিশ্ব পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয় করেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপের কারণে পর্যটক সংখ্যা কমে গেছে। 

সারা বছরব্যাপী বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে পর্যটক আসলেও নেপালের পর্যটনের ভরা মৌসুম বলতে ১৫ আগস্ট থেকে ১৫ জানুয়ারি পর্যন্ত সময়কে। এই সময়ের মধ্যে পর্যটকের সংখ্যা সারা বছরের অন্যান্য মাসগুলোর তুলনায় কয়েকগুণ বেশি। কেবল ভারত থেকেই নেপালে ৫ থেকে ৬ লাখ পর্যটক ভ্রমণ এবং তীর্থস্থান দর্শনে যান।

এবারের বিপর্যয়টা বলা যায় পর্যটন মৌসুমের শুরুতেই ঘটল। এমন একটি স্থানে এই ঘটনা ঘটল, যেখানে বছরের এই সময়টাতে হিমালয়ের মানস সরোবরে হিন্দু এবং বৌদ্ধদের একটা বড় সংখ্যা ভ্রমণ করেন, তাও আবার যেপথ দিয়ে এই ভ্রমণটি হয়, সেখানেই আকস্মিক পাহাড়ি ঢলে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় গ্রামের পর গ্রাম, অসংখ্য স্থাপনা এবং অবকাঠামো।

সারা বছরব্যাপী বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে পর্যটক আসলেও নেপালের পর্যটনের ভরা মৌসুম বলতে ১৫ আগস্ট থেকে ১৫ জানুয়ারি পর্যন্ত সময়কে। এই সময়ের মধ্যে পর্যটকের সংখ্যা সারা বছরের অন্যান্য মাসগুলোর তুলনায় কয়েকগুণ বেশি।

আহত ও নিহতের সংখ্যা বাড়ছে ক্রমশ। এই সংখ্যা কোথায় গিয়ে ঠেকবে তা বলা যাচ্ছে না। কয়েক বছর ধরেই পর্যটন শিল্প বিশেষ ভালো যাচ্ছে না দেশটির। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে জেন-জি নেতৃত্বাধীন দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনে পুরো পর্যটন মৌসুমে অর্থনৈতিকভাবে ধুঁকেছে দেশটি। ২০২৪ সালেও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যায় পর্যটন শিল্প বাধাগ্রস্ত হয়েছিল। সাথে কয়েকবছরে যুক্ত হয়েছে ২টি বড় বিমান দুর্ঘটনা।

তারও আগে কোভিডের কারণে কয়েকবছর ধুঁকেছে পর্যটন শিল্প। ফলে এই খাতের উপর নির্ভরশীল অসংখ্য মানুষ, বিশেষত দেশটির অর্থনীতিতে অন্য কোনো বিকল্প না থাকাতে দারিদ্র্যের হার বেড়েছে।

৩ কোটি মানুষের দেশ নেপালের ৩০ শতাংশই, অর্থাৎ প্রায় ১ কোটি মানুষ দরিদ্র্সীমার নিচে বসবাস করেন। বছরের পর বছর ধরে অর্থনৈতিক এই মন্দাবস্থার ধারাবাহিকতায় এবারের দুর্যোগ আগামী বছরগুলোয়ও দেশটিতে বিদেশি পর্যটক আকর্ষণ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করবে, এনিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই।

তার ওপর অব্যাহত রাজনৈতিক সহিংসতা, বিকল্প রাজস্ব আহরণের সীমাবদ্ধতা এবং প্রতিবেশীদের সাথে, বিশেষ করে ভারতের সাথে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের অবনতি, চীনের ওপর অতি নির্ভরতা এবং বৈদেশিক সাহায্যের অপ্রতুলতা ইত্যাকার বিষয়গুলো নেপালের জন্য এই দুর্যোগ কাটিয়ে উঠে সাধারণ মানুষকে একটি স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে।

সেই সাথে দুর্যোগের যে কারণ এখন পর্যন্ত চিহ্নিত হয়েছে, এই কারণগুলো রোধ করা না গেলে আগামী বছরগুলোতেও দেশটিকে আরও নানাবিধ প্রাকৃতিক দুর্যোগে নাকাল হতে হবে।

সবকিছু মিলিয়ে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় পর্যটন নির্ভর নেপালকে কঠিন অবস্থার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। এই মুহূর্তে দেশটির জন্য সবচেয়ে জরুরি হয়ে পড়েছে দুর্যোগ কবলিত এলাকা এবং সেখানকার মানুষের পুনর্বাসন এবং পুনর্গঠন।

নেপাল ইলেক্ট্রিসিটি অথরিটি-র তথ্যানুযায়ী, ১১টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ও একটি সৌর প্রকল্প মিলিয়ে ৪৩১.১ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছে। ক্ষতি শুধু উৎপাদন কেন্দ্রেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। ত্রিশূলি ২২০ কেভি ৩বি হাব সাবস্টেশন ধ্বংস হয়েছে এবং একাধিক ট্রান্সমিশন লাইন ব্যাহত হয়েছে।

জলবিদ্যুৎ ছাড়াও রাস্তা, সীমান্ত-বাণিজ্য, ব্যাঙ্ক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান, পর্যটন কেন্দ্র—সব মিলিয়ে ক্ষতির পরিমাণ এখনো পুরোপুরি মাপা যায়নি। এত দ্রুত তা সম্ভবও নয়। চূড়ান্ত হিসাব আসতে আরও কিছুটা সময় লাগবে। দেশটির পরিকাঠামো মন্ত্রীর দেওয়া এক হিসাব অনুযায়ী প্রায় ২ বিলিয়ন ডলারের পরিকাঠামোগত ক্ষতি হয়েছে, যদিও এটা এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত হিসাব নয়।

সবকিছু মিলিয়ে জরুরি উদ্ধারকার্য, পরিষেবা এবং পরিকাঠামোগত উন্নয়ন ব্যয় এসব দেশটির সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। নেপালের অর্থনীতির অন্যতম বিদ্যুৎ খাতে এই ধসের ফলে বর্ষা মৌসুমে অতিরিক্ত উৎপাদিত বিদ্যুতের যে অংশটি ভারত ও বাংলাদেশে রপ্তানি করে কয়েক মিলিয়ন ডলার আয় হতো, সেটা বাধাগ্রস্ত হবে, যা সার্বিক অর্থনীতিতে চাপ আরও বাড়িয়ে দেবে।

মূলত যে আকাঙ্ক্ষা, অর্থাৎ অর্থনৈতিক সংকট উত্তরণের স্বপ্ন নিয়ে আন্দোলন হয়েছিল, বাস্তব পরিস্থিতি সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণকে অনেক কঠিন করে তুলেছে। এই মুহূর্তে দরকার জাতীয় ঐকমত্য, যার ওপর ভিত্তি করে অভ্যন্তরীণ উৎসের বাইরে কীভাবে আন্তর্জাতিক সহযোগিতাকে আরও মসৃণ উপায়ে কাজে লাগানো যায় সেই পথ অন্বেষণ করা জরুরি।

সাম্প্রতিক বছরগুলোয় নেপালের জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে বিদেশি বিনিয়োগের আগ্রহের ফলে ১৬ হাজার মেগাওয়াটের অধিক অতিরিক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনের অপেক্ষায় আছে, যা মূলত বিদেশে রপ্তানির উদ্দেশ্যে, এই দুর্যোগ বিদেশি বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ক্ষতিগ্রস্ত হবে চীন-নেপাল আন্তঃদেশীয় বাণিজ্যও। দুর্যোগকবলিত রাসুয়ার রাসুয়াগাড়ি সীমান্ত নেপাল-চীন বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট। গত অর্থবর্ষে এই কাস্টম পয়েন্ট দিয়ে নেপাল প্রায় ৪৫৭৩ কোটি নেপালি টাকার পণ্য আমদানি এবং ৮৯.৪৬ কোটি টাকার পণ্য রপ্তানি করেছিল।

কৃষি ও শিল্পে উৎপাদন কমে যাওয়া, বেকারত্বের সমস্যাসহ বাণিজ্য ঘাটতি বৃদ্ধি, শেয়ারবাজারে পতন, রিয়েল এস্টেটের ব্যবসা থমথমে অবস্থায় থাকা এবং রেস্তোরাঁ ও হোটেল ছাড়াও অন্যান্য ব্যবসায়িক কার্যক্রম হ্রাসের কারণে দেশটি মারাত্মক অর্থনৈতিক সঙ্কটের মুখোমুখি হচ্ছে। তার উপর ২০২৪ সালের হিসাবে ৮.১৯ শতাংশ মূল্যস্ফীতি জনগণের ক্রয়ক্ষমতাকে দ্রুত ক্ষয় করছে।

আগামী বছরগুলোয় এই অবস্থার উত্তরণ ঘটাতে হলে দরকার সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ, এরচেয়েও বেশি দরকার রাজনৈতিক স্থিতিশীল পরিবেশ। ২০২৫ সালের জেন-জি আন্দোলন পরবর্তী সময়ে বালেন্দ্র শাহর নেতৃত্বে সরকার গঠিত হলেও সম্প্রতি আবারও আন্দোলন দানা বেঁধে উঠছে।

মূলত যে আকাঙ্ক্ষা, অর্থাৎ অর্থনৈতিক সংকট উত্তরণের স্বপ্ন নিয়ে আন্দোলন হয়েছিল, বাস্তব পরিস্থিতি সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণকে অনেক কঠিন করে তুলেছে। এই মুহূর্তে দরকার জাতীয় ঐকমত্য, যার ওপর ভিত্তি করে অভ্যন্তরীণ উৎসের বাইরে কীভাবে আন্তর্জাতিক সহযোগিতাকে আরও মসৃণ উপায়ে কাজে লাগানো যায় সেই পথ অন্বেষণ করা জরুরি।

মনে রাখতে হবে, নেপালের এই দুর্যোগ জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বিরূপ প্রভাবের ফলে সৃষ্ট, যার জন্য তারা এককভাবে দায়ী নয়। বৈশ্বিক ফোরামে বিষয়টা সজোরে উচ্চারণের মাধ্যমে এর জন্য বৈশ্বিক দায়বদ্ধতার জন্য নিজেদের প্রস্তুত করতে হবে। পরিস্থিতি সামাল দিতে কোন সাময়িক ব্যবস্থাই এখন আর কার্যকর নয়, প্রয়োজন সমন্বিত বৈশ্বিক উদ্যোগ।

ড. ফরিদুল আলম : অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়