১ সেপ্টেম্বর ২০২৬। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। ১৯৭৮ সালের এই দিনে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের রাজনৈতিক দর্শনকে সামনে রেখে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। চার দশকের বেশি সময় পেরিয়ে আজ দল বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায়। ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ বাঁকে দাঁড়িয়ে বিএনপি যখন প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করছে, তখন এটি নিছক একটি রাজনৈতিক দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী নয়; বরং একটি রাজনৈতিক ধারার অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবার উপলক্ষ।
বিএনপির রাজনৈতিক ইতিহাসে তিনটি নাম অবিচ্ছেদ্য—শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া এবং বর্তমান চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনটি ভিন্ন সময়, ভিন্ন রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং ভিন্ন ধরনের নেতৃত্বের মধ্য দিয়ে বিএনপির রাজনৈতিক পরিচয় গড়ে উঠেছে।
জিয়ার প্রতিষ্ঠিত দলকে দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে সাংগঠনিক ভিত্তি দিয়েছেন খালেদা জিয়া; আর আজ সেই রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে নতুন বাস্তবতায় এগিয়ে নেওয়ার পরীক্ষা তারেক রহমানের সামনে।
জিয়াউর রহমান: প্রতিষ্ঠার দর্শন ও জাতীয়তাবাদী রাজনীতি
বিএনপির জন্ম বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি অস্থির সময়ে। ১৯৭৫ পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতায় জিয়াউর রহমান যে রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলেছিলেন, তার অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদকে রাজনৈতিক পরিচয়ের কেন্দ্রে নিয়ে আসা। ১৯ দফা কর্মসূচিকে সামনে রেখে তিনি একটি আত্মনির্ভর, উৎপাদনমুখী ও জাতীয় স্বার্থকেন্দ্রিক বাংলাদেশের ধারণা তুলে ধরেন।
জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠিত বিএনপি পরবর্তী সময়ে দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। দলটির দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রার ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবে জিয়ার জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক দর্শন আজও বিএনপির পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতিষ্ঠাতার উত্তরাধিকার শুধু স্মৃতিচারণে টিকে থাকে না। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সেই দর্শনের নতুন ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ প্রয়োজন হয়।
১৯৭৮ সালের বাংলাদেশ আর ২০২৬ সালের বাংলাদেশ এক নয়। অর্থনীতি, প্রযুক্তি, তরুণ প্রজন্ম, বিশ্বরাজনীতি, ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা এবং নাগরিক প্রত্যাশা-সবকিছুই বদলে গেছে। ফলে জিয়ার জাতীয়তাবাদী দর্শনের আধুনিক প্রয়োগই আজ বিএনপির সামনে বড় প্রশ্ন।
খালেদা জিয়া: সংগ্রাম, গণতন্ত্র ও দীর্ঘ রাজনৈতিক নেতৃত্ব
বিএনপির ইতিহাসে দ্বিতীয় বড় অধ্যায় বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্ব। জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর তিনি যে রাজনৈতিক দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তা কেবল একটি দলের নেতৃত্ব গ্রহণ ছিল না; বরং দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশের রাজনীতির অন্যতম কেন্দ্রীয় চরিত্র হয়ে ওঠার সূচনা।
খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন ছিল ক্ষমতা ও বিরোধী রাজনীতির দুই অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ। তিনি একাধিকবার প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন, আবার দীর্ঘ সময় বিরোধী দলীয় নেতার ভূমিকাতেও থেকেছেন। তার নেতৃত্বে বিএনপি বাংলাদেশের দ্বি-দলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান শক্তিতে পরিণত হয়।
তার রাজনৈতিক জীবনের শেষ অধ্যায় ছিল আরও কঠিন। রাজনৈতিক মামলা, কারাবন্দিত্ব, দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রতিকূলতা এবং শেষ পর্যন্ত ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর তার মৃত্যু—সব মিলিয়ে খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার আজ বিএনপির জন্য একই সঙ্গে আবেগ ও দায়িত্বের বিষয়।
খালেদা জিয়ার সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক উত্তরাধিকার সম্ভবত এই যে, তিনি বিএনপিকে একটি ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠাকালীন দল থেকে একটি দীর্ঘস্থায়ী সাংগঠনিক রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরের প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তার রাজনৈতিক সংগ্রাম বিএনপির সমর্থকদের কাছে গণতান্ত্রিক অধিকার ও রাজনৈতিক প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে আছে। কিন্তু ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো—একজন নেতার জনপ্রিয়তা বা ত্যাগের ওপর একটি দল অনন্তকাল নির্ভর করতে পারে না। উত্তরাধিকারকে প্রতিষ্ঠান, নীতি ও কার্যকর রাষ্ট্রব্যবস্থায় রূপান্তর করাই প্রকৃত পরীক্ষা।
তারেক রহমান: উত্তরাধিকার থেকে দায়িত্বের রাজনীতি
২০২৬ সালের বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আগের যেকোনো প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী থেকে আলাদা। কারণ এবার দলের প্রতিষ্ঠাতা ও দীর্ঘদিনের নেতৃত্বের উত্তরাধিকার বহনকারী তারেক রহমান শুধু দলের চেয়ারম্যান নন, তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীও।
বিএনপির চেয়ারম্যান হিসেবে তারেক রহমানের দায়িত্ব শুরু হয় ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে। এর কিছুদিন পর ১৭ ফেব্রুয়ারি তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন এবং সরকার গঠন করেন। এখানেই বিএনপির জন্য নতুন অধ্যায়ের সূচনা।
বিরোধী দলের রাজনীতি এবং রাষ্ট্র পরিচালনার রাজনীতি এক নয়। বিরোধী অবস্থানে সরকারের সমালোচনা করা অপেক্ষাকৃত সহজ; কিন্তু ক্ষমতায় থেকে অর্থনীতি পরিচালনা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা নিশ্চিত করা, দুর্নীতি মোকাবিলা, প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়ানো, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা করা অনেক বেশি কঠিন।
ফলে তারেক রহমানের সামনে এখন সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্রশ্ন হলো—তিনি কি পারিবারিক রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালনার সক্ষমতায় রূপ দিতে পারবেন? এই প্রশ্নের উত্তর বক্তৃতা বা রাজনৈতিক স্লোগানে নয়, সরকারের কার্যক্রমের মধ্যেই পাওয়া যাবে।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর সবচেয়ে বড় বার্তা: এবার কর্মের মূল্যায়ন
ক্ষমতায় আসার পর বিএনপির সামনে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি হলো-দলটি এখন আর শুধু পরিবর্তনের দাবি জানানো রাজনৈতিক শক্তি নয়; পরিবর্তন বাস্তবায়নের দায়িত্বও তার হাতে। ২০২৬ সালের নির্বাচনে বিএনপির বিজয় এবং তারেক রহমানের প্রধানমন্ত্রী হওয়া দলটির জন্য বড় রাজনৈতিক ম্যান্ডেট তৈরি করেছে। কিন্তু নির্বাচনী বিজয় কোনো সরকারের চূড়ান্ত সাফল্য নয়। এটি সাফল্যের পরীক্ষার শুরু।
মানুষ এখন জানতে চাইবে—বাজারে স্বস্তি ফিরছে কি না; তরুণদের কর্মসংস্থান বাড়ছে কি না; শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নত হচ্ছে কি না; বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি হচ্ছে কি না; প্রশাসন দলীয় প্রভাবের বাইরে থেকে কাজ করছে কি না; আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ হচ্ছে কি না।
সবচেয়ে বড় কথা, জনগণ দেখতে চাইবে—বিএনপি কি এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে পারে, যেখানে রাষ্ট্র দলীয় সম্পত্তি নয়, বরং জনগণের প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করবে?
জাতীয়তাবাদকে ২০২৬-এর বাস্তবতায় ব্যাখ্যা করতে হবে
জিয়াউর রহমানের সময় জাতীয়তাবাদের যে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা ছিল, আজকের বাংলাদেশ তার থেকে অনেক দূর এগিয়েছে। এখন জাতীয়তাবাদের অর্থ শুধু ভূখণ্ড, সার্বভৌমত্ব বা রাজনৈতিক পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
আরও পড়ুন
আজ জাতীয়তাবাদ মানে হতে পারে-দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা, দেশের মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানো, খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, প্রবাসীদের অধিকার রক্ষা করা এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করা। অর্থাৎ জাতীয়তাবাদকে আবেগ থেকে উন্নয়ন ও সক্ষমতার দর্শনে রূপান্তর করায় হতে পারে বিএনপির আগামী দিনের অন্যতম বড় রাজনৈতিক কাজ।
গণতন্ত্রের প্রশ্নে বিএনপির পরীক্ষা
বিএনপি দীর্ঘদিন ধরে গণতন্ত্র, ভোটাধিকার ও রাজনৈতিক অধিকারের কথা বলে এসেছে। আজ দলটি রাষ্ট্রক্ষমতায়। ফলে গণতন্ত্রের প্রতি তার অঙ্গীকারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা এখনই। গণতন্ত্র শুধু নির্বাচন নয়। গণতন্ত্রের সঙ্গে জড়িত বিরোধী দলের অধিকার, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের অধিকার, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা এবং শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা।
ক্ষমতাসীন দলের প্রকৃত গণতান্ত্রিক মানসিকতা বোঝা যায় তখনই, যখন সে নিজের সমালোচকের অধিকার রক্ষা করে। তাই বিএনপির জন্য প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর একটি গুরুত্বপূর্ণ আত্মসমালোচনার জায়গা হতে পারে—দলটি এমন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারছে কি না, যা ভবিষ্যতে ক্ষমতার বাইরে থাকলেও সমানভাবে গ্রহণযোগ্য থাকবে।
প্রতিপক্ষকে পরাজিত করা নয়, রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করাই চূড়ান্ত লক্ষ্য
বাংলাদেশের রাজনীতির একটি পুরোনো সমস্যা হলো—রাজনৈতিক সাফল্যকে প্রায়ই প্রতিপক্ষকে পরাজিত করার সঙ্গে এক করে দেখা হয়। কিন্তু একটি আধুনিক রাষ্ট্রের জন্য রাজনৈতিক দলের চূড়ান্ত সাফল্য প্রতিপক্ষের দুর্বলতা নয়; রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর শক্তিশালী হওয়া।
বিএনপি যদি সত্যিই দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়, তাহলে দলীয় কর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে রাজনৈতিক সহনশীলতা, আইনের প্রতি শ্রদ্ধা এবং নাগরিক অধিকার রক্ষার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। কারণ ইতিহাস দেখিয়েছে—কোনো দলই চিরকাল ক্ষমতায় থাকে না। ক্ষমতার পরিবর্তন গণতন্ত্রের স্বাভাবিক নিয়ম। কিন্তু শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান টিকে থাকে।
নতুন প্রজন্মের বিএনপি কেমন হবে?
বিএনপির সামনে আরেকটি বড় প্রশ্ন নতুন প্রজন্ম। ১৯৭৮ সালে যে প্রজন্ম বিএনপির রাজনীতি দেখেছিল, তাদের অনেকেই আজ প্রবীণ। বাংলাদেশের বড় একটি অংশের তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্মই হয়েছে ডিজিটাল যুগে।
এই প্রজন্ম শুধু রাজনৈতিক বক্তৃতা শুনতে চায় না। তারা জানতে চায়—তাদের চাকরি কোথায়? উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ কোথায়? দক্ষতা অর্জনের ব্যবস্থা কী? প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান কী? বিদেশে কাজ করতে যাওয়া তরুণদের জন্য রাষ্ট্র কী করছে?
তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপির জন্য তাই একটি ‘ইয়ুথ পলিটিক্যাল কন্ট্রাক্ট’ প্রয়োজন-যেখানে তরুণদের শুধু রাজনৈতিক কর্মী নয়, দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক রূপান্তরের অংশীদার হিসেবে দেখা হবে।
প্রতিষ্ঠার ৪৮ বছরে বিএনপির সামনে নতুন দায়িত্ব
৪৮ বছরের ইতিহাস বিএনপিকে অনেক কিছু দিয়েছে—ক্ষমতা, জনপ্রিয়তা, বিরোধী রাজনীতির অভিজ্ঞতা, আন্দোলন এবং রাজনৈতিক প্রতিকূলতার স্মৃতি। একই সঙ্গে এই ইতিহাস কিছু শিক্ষা দিয়েছে।
সেই শিক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণটি হলো—রাজনৈতিক দল শুধু নির্বাচনে জিতে বড় হয় না; রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণের মাধ্যমে দীর্ঘস্থায়ী হয়। জিয়াউর রহমান বিএনপির ভিত্তি নির্মাণ করেছিলেন। খালেদা জিয়া সেই ভিত্তির ওপর দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের ইতিহাস নির্মাণ করেছেন। তারেক রহমানের সামনে এখন সেই ইতিহাসকে রাষ্ট্র পরিচালনার সাফল্যে রূপ দেওয়ার দায়িত্ব।
এটি নিঃসন্দেহে একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত। কিন্তু ইতিহাসের উত্তরাধিকার পাওয়া আর ইতিহাস সৃষ্টি করা এক বিষয় নয়। তারেক রহমানের সামনে তাই চ্যালেঞ্জ শুধু তার পিতা জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বহন করা নয়, শুধু তার মা খালেদা জিয়ার দীর্ঘ সংগ্রামের মর্যাদা রক্ষা করাও নয়। সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো—তার নিজের সময়ের জন্য একটি কার্যকর, গণতান্ত্রিক, জবাবদিহিমূলক ও অর্থনৈতিকভাবে সক্ষম বাংলাদেশ নির্মাণ করা।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী হোক আত্মসমালোচনার দিন
বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী তাই শুধু উৎসবের দিন নয়; আত্মসমালোচনারও দিন। জিয়ার স্বপ্নের বাংলাদেশ, খালেদা জিয়ার সংগ্রামের বাংলাদেশ এবং তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশের মধ্যে একটি ঐতিহাসিক যোগসূত্র রয়েছে। কিন্তু প্রতিটি প্রজন্মের সামনে বাংলাদেশের সংজ্ঞা নতুন করে নির্ধারণের দায়িত্ব থাকে।
১৯৭৮ সালের বিএনপির প্রধান প্রশ্ন ছিল—বাংলাদেশ কোন রাজনৈতিক দর্শনে এগোবে। আজকের প্রশ্ন আরও বিস্তৃত—বাংলাদেশ কীভাবে একটি শক্তিশালী অর্থনীতি, কার্যকর গণতন্ত্র, আইনের শাসন, মানবিক রাষ্ট্র এবং বিশ্বমঞ্চে মর্যাদাপূর্ণ দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে? এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে আগামী দিনে বিএনপির ইতিহাস কীভাবে লেখা হবে।
জিয়াউর রহমান বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। খালেদা জিয়া দলটিকে দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ধরে রেখেছেন। আর এখন তারেক রহমানের হাতে এসেছে সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়—উত্তরাধিকারকে সাফল্যে রূপ দেওয়ার অধ্যায়।
৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে বিএনপির জন্য সবচেয়ে বড় বার্তা তাই হতে পারে—ইতিহাসের গৌরব স্মরণ করায় যথেষ্ট নয়; ইতিহাসের প্রতি সুবিচার করতে হলে ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে হয়।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিএনপির পরবর্তী অধ্যায়ের মূল্যায়ন হবে তার প্রতিষ্ঠার ইতিহাস দিয়ে নয়, বরং আগামী দিনের বাংলাদেশকে তারা কতটা উন্নত, গণতান্ত্রিক, নিরাপদ ও সম্ভাবনাময় করে তুলতে পারে—সেই ফলাফল দিয়ে।
মো. কামরুল ইসলাম : ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, ঢাকা পোস্ট
