বিজ্ঞাপন

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে বদলাতে হবে নীতি

মশা মারার বদলে মশার জন্ম বন্ধ করতে হবে

মশা মারার বদলে মশার জন্ম বন্ধ করতে হবে

ডেঙ্গু এখন বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য, নগর ব্যবস্থাপনা, অর্থনীতি এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য দীর্ঘমেয়াদি সংকটে পরিণত হয়েছে। চলতি বছরের ৩১ আগস্ট পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন ৩৫ হাজার ৮৪৬ জন এবং মারা গেছেন ৯৭ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় এক দিনে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ১৬৩ জন, যা এ বছরের সর্বোচ্চ দৈনিক সংখ্যা। একই সময়ে আরও চারজনের মৃত্যু হয়েছে।

এটি বিশেষভাবে উদ্বেগের কারণ, কারণ বাংলাদেশের ডেঙ্গুর প্রধান সংক্রমণ মৌসুম এখনো শেষ হয়নি। ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী সেপ্টেম্বর-অক্টোবর ডেঙ্গুর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়। ফলে আগামী দুই মাসে রোগীর সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

২০২৩ সালে দেশে ৩ লাখ ২১ হাজারের বেশি ডেঙ্গু রোগী এবং ১ হাজার ৭০৫ জনের মৃত্যু হয়েছিল; ২০২৪ সালে রোগী ছিল ১ লাখের বেশি এবং মৃত্যু ৫৭৫ জন। ২০২৫ সালেও ডেঙ্গুতে ৪১৩ জনের মৃত্যু এবং ১ লাখের বেশি আক্রান্তের তথ্য রয়েছে। প্রশ্ন হলো, প্রতিবছর এত মানুষ আক্রান্ত ও মৃত্যুবরণ করার পরও আমরা কেন ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে একটি কার্যকর দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারছি না?

মৃত্যু শুধু একটি সংখ্যা নয়

ডেঙ্গুতে একজনের মৃত্যু মানে একটি পরিবারের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। বিশেষ করে কর্মক্ষম বয়সের একজন সদস্য মারা গেলে পরিবারের আয় কমে যায়, সন্তানদের শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে এবং পরিবারকে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সংকটে পড়তে হয়। একজন মা, বাবা, সন্তান বা উপার্জনক্ষম সদস্যের মৃত্যু কোনো পরিসংখ্যান দিয়ে পরিমাপ করা যায় না।

ডেঙ্গুতে মৃত্যুর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, অনেক ক্ষেত্রেই দ্রুত শনাক্তকরণ, যথাযথ পর্যবেক্ষণ এবং সময়মতো চিকিৎসা জটিলতা কমাতে পারে। ২০২৩ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ডেঙ্গুতে মৃত্যুর ক্ষেত্রে ডেঙ্গু শক সিনড্রোম ছিল প্রধান কারণ; পাশাপাশি গুরুতর ডেঙ্গু ও অন্যান্য জটিলতাও মৃত্যুর সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল।

অন্যদিকে সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, ডেঙ্গুতে যারা মারা গেছেন তাদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ রোগের অবনতি হওয়ার পর চিকিৎসা নিয়েছেন এবং অনেক রোগী একাধিক হাসপাতাল ঘুরে শেষ পর্যন্ত চিকিৎসা পেয়েছেন। বিশেষ করে ঢাকার বাইরে গুরুতর রোগীর দ্রুত ও বিশেষায়িত চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

অতএব ডেঙ্গুতে মৃত্যু কমাতে শুধু হাসপাতালের শয্যা বাড়ালেই হবে না। প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তকরণ, ঝুঁকিপূর্ণ রোগীর দ্রুত রেফারেল, জেলা পর্যায়ে দক্ষ চিকিৎসা ব্যবস্থা এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে রোগীর স্বজনদেরও কখন দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে সে বিষয়ে কার্যকর জনস্বাস্থ্য বার্তা দিতে হবে।

ডেঙ্গুতে একজনের মৃত্যু মানে একটি পরিবারের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। বিশেষ করে কর্মক্ষম বয়সের একজন সদস্য মারা গেলে পরিবারের আয় কমে যায়, সন্তানদের শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে এবং পরিবারকে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সংকটে পড়তে হয়। একজন মা, বাবা, সন্তান বা উপার্জনক্ষম সদস্যের মৃত্যু কোনো পরিসংখ্যান দিয়ে পরিমাপ করা যায় না।

ডেঙ্গুর অর্থনৈতিক ক্ষতি কতটা?

ডেঙ্গুকে আমরা সাধারণত স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে দেখি; কিন্তু বাস্তবে এটি একটি বড় অর্থনৈতিক সমস্যা। একটি ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসায় শুধু হাসপাতালের বিলই খরচ হয় না। এর সঙ্গে যুক্ত হয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ওষুধ, যাতায়াত, খাবার, পরিচর্যাকারীর সময় ও আয়হানি। গুরুতর রোগীর ক্ষেত্রে ICU বা দীর্ঘমেয়াদি হাসপাতালে অবস্থানের ব্যয় আরও বেড়ে যায়।

ঢাকায় পরিচালিত এক গবেষণায় একটি ডেঙ্গু পর্বের জন্য সমাজের গড় ব্যয় প্রায় ৪৭৯ মার্কিন ডলার পাওয়া গেছে। এই হিসাবের মধ্যে প্রত্যক্ষ চিকিৎসা ব্যয়ের পাশাপাশি রোগী ও পরিবারের ওপর পড়া অন্যান্য সামাজিক ও অর্থনৈতিক ব্যয়ও বিবেচনা করা হয়েছিল।

তবে এই গড় ব্যয়কে সরাসরি বর্তমান জাতীয় রোগীর সংখ্যার সঙ্গে গুণ করে বাংলাদেশের মোট অর্থনৈতিক ক্ষতি নির্ধারণ করা ঠিক হবে না। কারণ রোগীর তীব্রতা, চিকিৎসার ধরন, অঞ্চল, পরিবার ও আয়ের স্তর অনুযায়ী ব্যয় ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হয়। তবু এই গবেষণা আমাদের একটি বিষয় পরিষ্কারভাবে বুঝিয়ে দেয়, ডেঙ্গুর অর্থনৈতিক বোঝা শুধু সরকারের স্বাস্থ্য বাজেটে সীমাবদ্ধ নয়; এর বড় অংশ বহন করে রোগী, পরিবার, কর্মক্ষেত্র এবং সামগ্রিক অর্থনীতি।

একজন কর্মজীবী মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহ কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকতে পারেন। তার ওপর নির্ভরশীল পরিবারও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একজন শিক্ষার্থী আক্রান্ত হলে শিক্ষা ব্যাহত হয়। আবার একই পরিবারের একাধিক সদস্য আক্রান্ত হলে অর্থনৈতিক চাপ বহুগুণ বেড়ে যায়। হাসপাতালে রোগীর চাপ বাড়লে অন্যান্য রোগীর চিকিৎসার ওপরও প্রভাব পড়ে। অর্থাৎ ডেঙ্গু শুধু একজন রোগীকে আক্রান্ত করে না; এটি স্বাস্থ্যব্যবস্থার সুযোগ-ব্যয়ও বাড়িয়ে দেয়।

রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও রয়েছে মশা নিয়ন্ত্রণ, রোগ নজরদারি, জনসচেতনতা, হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা, ওষুধ ও চিকিৎসা অবকাঠামোর অতিরিক্ত ব্যয়। তাই ডেঙ্গু প্রতিরোধে আগে বিনিয়োগ করা অনেক ক্ষেত্রে রোগীর চিকিৎসা ও মৃত্যুর পর যে সামাজিক ব্যয় তৈরি হয় তার তুলনায় অধিক সাশ্রয়ী হতে পারে।

সমস্যা কোথায়মশা নিয়ন্ত্রণের কৌশলেই কি ভুল?

বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে মূলত পূর্ণবয়স্ক মশা নিধন, বিশেষ করে ফগিংয়ের ওপর যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যে মশা মানুষের বাড়ির ভেতরে জন্মাচ্ছে, তাকে রাস্তা বা উন্মুক্ত স্থানে ফগিং করে কতটা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব?

ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ উদ্যোগে দুই বছর পরিচালিত নিয়মিত এন্টোমোলজিক্যাল সার্ভেইল্যান্সে দেখা গেছে, প্রায় ৭০ শতাংশ এডিশ মশার প্রজনন মানুষের বাসাবাড়ি ও সংশ্লিষ্ট স্থাপনার ভেতরে বা আশপাশে। পানির ড্রাম, পানির ট্যাংকি, ফ্লোরে জমে থাকা পানি, গাড়ির পার্কিং ও বেজমেন্ট, বালতি, পানির মিটারের গর্তসহ বিভিন্ন আধার গুরুত্বপূর্ণ প্রজননস্থল হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

এই তথ্য ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের প্রচলিত ধারণা পরিবর্তনের জন্য যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এডিস মশার প্রজনন বা উৎপাদন যদি মূলত মানুষের বসতবাড়িতে হয়, তাহলে বাড়ির বাইরে পরিচালিত অভিযান দিয়ে বাড়ির ভেতরের উৎপাদনশীল প্রজননস্থল নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।

ডেঙ্গু ইতিমধ্যে ঢাকার সীমানা পেরিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিস্তৃত হয়েছে। বর্তমান তথ্য অনুযায়ী ঢাকা, খুলনা, চট্টগ্রাম, পিরোজপুর, ময়মনসিংহ, ঝালকাঠি, গাজীপুর, বরিশাল ও বাগেরহাটসহ বেশ কয়েকটি জেলা এখন উল্লেখযোগ্য ঝুঁকিতে।

তাই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত ‘মশা নিধন’ থেকে ‘মশার উৎপাদন বন্ধ করা’। একটি পূর্ণবয়স্ক মশা মারা গেলে সাময়িকভাবে মশার ঘনত্ব কমতে পারে। কিন্তু তার প্রজননস্থল অক্ষত থাকলে সেখানে আবার নতুন মশা জন্ম নেবে। ফলে উৎপাদনশীল প্রজননস্থল শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণ না করে শুধু পূর্ণবয়স্ক মশা নিধনের ওপর নির্ভর করা টেকসই সমাধান নয়।

জেলাভিত্তিক কৌশল এখন সময়ের দাবি

ডেঙ্গু ইতিমধ্যে ঢাকার সীমানা পেরিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিস্তৃত হয়েছে। বর্তমান তথ্য অনুযায়ী ঢাকা, খুলনা, চট্টগ্রাম, পিরোজপুর, ময়মনসিংহ, ঝালকাঠি, গাজীপুর, বরিশাল ও বাগেরহাটসহ বেশ কয়েকটি জেলা এখন উল্লেখযোগ্য ঝুঁকিতে। পাশাপাশি কক্সবাজার, নারায়ণগঞ্জ, পটুয়াখালী, বরগুনা, কুমিল্লা, বান্দরবান, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ, যশোর, নরসিংদী, চাঁদপুর ও মানিকগঞ্জসহ আরও অনেক জেলায় সংক্রমণ রয়েছে। অতএব ঢাকাকেন্দ্রিক ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ঝুঁকিভিত্তিক ভেক্টর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

দরকার জাতীয় ডেঙ্গু ভেক্টর কন্ট্রোল প্রটোকল

বাংলাদেশের জন্য এখন একটি স্বতন্ত্র জাতীয় ডেঙ্গু ভেক্টর কন্ট্রোল পলিসি ও প্রটোকল প্রণয়ন করা জরুরি। এই নীতিতে নিয়মিত এন্টোমোলজিক্যাল সার্ভেইল্যান্সকে কেন্দ্রীয় গুরুত্ব দিতে হবে। কোন এলাকায় মশার ঘনত্ব বেশি, কোন ধরনের পাত্রে বেশি লার্ভা পাওয়া যাচ্ছে, কোন প্রজননস্থল থেকে বেশি পূর্ণবয়স্ক মশা তৈরি হচ্ছে এবং কোন নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি কতটা কার্যকর, এসব তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। একই সঙ্গে ইনসেক্টিসাইড রেজিস্ট্যান্স সার্ভেইল্যান্স বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। কোনো কীটনাশক মাঠে কার্যকর না হলে শুধু প্রচলিত বলে সেটি বারবার ব্যবহার করা বৈজ্ঞানিকভাবে যুক্তিযুক্ত নয়।

আগামী দুই মাসকে তাই কেবল হাসপাতাল প্রস্তুতির সময় হিসেবে দেখলে চলবে না। এখনই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নিবিড় মশা জরিপ, উৎপাদনশীল প্রজননস্থল শনাক্তকরণ ও নিয়ন্ত্রণ, রোগ নজরদারি এবং হাসপাতাল প্রস্তুতি একসঙ্গে জোরদার করতে হবে।

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আমাদের ব্যর্থতার প্রধান কারণ হয়তো সম্পদের অভাব নয়; বরং সম্পদ কোথায় এবং কীভাবে ব্যবহার করছি, সেই প্রশ্নটি। মশা নিয়ন্ত্রণে আমাদের লক্ষ্য হতে হবে, কোথায় মশা জন্মাচ্ছে, কেন জন্মাচ্ছে এবং কীভাবে সেই জন্ম বন্ধ করা যায়।

ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে বাংলাদেশের এখন আর বিচ্ছিন্ন অভিযান নয়, দরকার তথ্যনির্ভর জাতীয় কর্মসূচি। ফগিংকে কেন্দ্র করে মশা নিয়ন্ত্রণের পুরোনো ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে প্রজননস্থলভিত্তিক ইন্টিগ্রেটেড ভেক্টর ম্যানেজমেন্ট, শক্তিশালী এন্টোমোলজিক্যাল সার্ভেইল্যান্স, কার্যকর রোগ নজরদারি এবং দ্রুত চিকিৎসা—এই চারটি স্তম্ভের ওপর ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কৌশল দাঁড় করাতে হবে। কারণ ডেঙ্গুতে একটি মৃত্যুও শুধু একটি সংখ্যা নয়। প্রতিটি মৃত্যু একটি পরিবারের ক্ষতি, প্রতিটি রোগী অর্থনৈতিক ব্যয় এবং প্রতিটি নতুন সংক্রমণ আমাদের নীতিগত ব্যর্থতার সম্ভাব্য সতর্কবার্তা।

অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার : কীটতত্ত্ববিদ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]