ভারতীয় ধর্ম, দর্শন ও সংস্কৃতির ইতিহাসে শ্রীকৃষ্ণ এক অনন্য ও বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্ব। ভদ্র মাসের শুক্লা পঞ্চমী তিথিতে তাঁর জন্ম। তিনি একাধারে ঈশ্বরের অবতার, দার্শনিক, রাষ্ট্রনায়ক, কূটনৈতিক, বন্ধু, প্রেমিক, পথপ্রদর্শক এবং মানবকল্যাণের প্রতীক। ভারতীয় ঐতিহ্যে তাঁকে ‘যুগাবতার’ বলা হয়।
অর্থাৎ, এমন এক মহামানবীয় দৈবসত্ত্বা, যিনি যুগের সংকটকালে আবির্ভূত হয়ে ধর্ম, ন্যায় ও মানবিক মূল্যবোধকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন। তার জীবন ও কর্মকে কেবল ধর্মীয় বিশ্বাসের আলোকে দেখলে শ্রীকৃষ্ণের বিশাল ব্যক্তিত্বের তাৎপর্যের একটি অংশই কেবল উপলব্ধি করা সম্ভব।
তাঁকে সম্পূর্ণরূপে উপলব্ধি করতে হলে মানবতাবাদী দৃষ্টিকোণ থেকেও তাঁর মূল্যায়ন করা যুক্তিযুক্ত। কারণ তাঁর শিক্ষা ও ধর্মের কেন্দ্রে রয়েছে মানুষের কল্যাণ, ন্যায় প্রতিষ্ঠা, দুর্বলের সুরক্ষা, কর্তব্যবোধ, আত্মসংযম, পরার্থপরতা ও জীবনের প্রতি মমত্ববোধ।
মানবতাবাদ বলতে সাধারণভাবে মানুষের মর্যাদা, স্বাধীনতা, কল্যাণ, যুক্তিবোধ, নৈতিকতা ও পারস্পরিক সহমর্মিতাকে গুরুত্ব দেওয়ার জীবনদর্শনকে বোঝায়। পাশ্চাত্য চিন্তায় মানবতাবাদ একটি বিশেষ দার্শনিক আন্দোলন হিসেবে বিকশিত হলেও, ভারতীয় দর্শনে মানুষের কল্যাণ ও জীবনের প্রতি মমত্ববোধের ধারণা বহু প্রাচীন।
শ্রীকৃষ্ণের শিক্ষা সেই দীর্ঘ মানবকল্যাণমুখী ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ। বিশেষত শ্রীমদ্ভগবত গীতায় তিনি যে কর্মযোগ, জ্ঞানযোগ, ভক্তিযোগ, সমদৃষ্টি, আত্মসংযম, ন্যায় ও কর্তব্যের কথা বলেছেন, তার মধ্যে মানবজীবনকে অর্থবহ ও কল্যাণমুখী করার গভীর নির্দেশনা রয়েছে।
শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাবের পটভূমি ছিল সামাজিক ও রাজনৈতিক সংকটপূর্ণ। অত্যাচারী শাসক, ক্ষমতার অপব্যবহার, পারিবারিক কলহ, অন্যায়, দুর্বলদের ওপর নিপীড়ন এবং অনৈতিক অবক্ষয় সমাজকে তখন বিপন্ন করে ফেলেছিল। এই পরিস্থিতিতে শ্রীকৃষ্ণ কেবল ধর্মীয় উপদেশ দেননি, তিনি বাস্তব জীবনের সংকটের মধ্যেই ন্যায় প্রতিষ্ঠার পথ দেখিয়েছেন। তাই তাঁর মানবতাবাদ কোনো বিমূর্ত তত্ত্ব নয়; বরং তা জীবন, সমাজ ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন সমস্যার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
হিন্দু ধর্মদর্শনে অবতারতত্ত্বের একটি সুগভীর ধারণা রয়েছে। যখনই পৃথিবীতে ধর্মের অবক্ষয় এবং অধর্মের উত্থান ঘটে তখনই ঈশ্বর যুগের প্রয়োজন অনুযায়ী আবির্ভূত হন—এমন বিশ্বাস ভারতীয় ধর্মচিন্তায় সুপ্রতিষ্ঠিত।
শ্রীমদ্ভগবত গীতায় শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন,
‘যদা যদা হি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত।
অভ্যুত্থানম অধর্মস্য তদাত্মানং সৃজাম্যহম্।।’ (শ্রীমদ্ভগবত গীতা, ৪/৭)
অর্থাৎ, যখনই ধর্মের গ্লানি ও অধর্মের উত্থান হয়, তখনই দুষ্টের দমন ও সাধুদের রক্ষার জন্য আমি আবির্ভূত হই।
তার এই যে আবির্ভাবের উদ্দেশ্য, কেবল কোনো একটি সম্প্রদায় বা গোষ্ঠীকে রক্ষা করা নয়, বরং ন্যায়, সত্য ও ধর্মের পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। এ কারণেই শ্রীকৃষ্ণকে যুগাবতার বলা হয়। তিনি একটি নির্দিষ্ট সংকটপূর্ণ সময়ে জন্মালেও তাঁর বাণীর আবেদন যুগ অতিক্রমী। অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রাম, নিজের কর্তব্যপালন, কর্মফলের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি ত্যাগ সব মানুষের প্রতি সমদৃষ্টি এবং নৈতিক সাহস—এসব মূল্যবোধ আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।
যুগাবতার হিসেবে শ্রীকৃষ্ণের বিশেষত্ব হলো, তিনি মানুষের মতো জীবনযাপন করেছেন। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত তাঁর জীবনে আনন্দ, দুঃখ, সংগ্রাম, বন্ধুত্ব, প্রেম, রাজনীতি, যুদ্ধ, কূটনীতি ও নৈতিক দ্বন্দ্বের নানা অভিজ্ঞতা রয়েছে। ফলে তাঁর জীবন মানুষের বাস্তব সমস্যার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
মানবতাবাদের মূলকথা হচ্ছে মানুষের মর্যাদা ও কল্যাণকে গুরুত্ব দেওয়া। একজন মানুষ অন্য মানুষের প্রতি সম্মান, সহমর্মিতা ও ন্যায়বোধ নিয়ে আচরণ করবে, অন্যায়, নিপীড়ন ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে এবং নিজের সামর্থ্যকে বৃহত্তর কল্যাণে ব্যবহার করবে-এগুলোই মানবতাবাদের মূল বৈশিষ্ট্য।
তবে মানবতাবাদকে কেবল মানুষের স্বার্থের মধ্যে সীমাবদ্ধ করলে শ্রীকৃষ্ণের দর্শনের সম্পূর্ণতা ধরা পড়ে না। কারণ তিনি শুধু মানুষের প্রতি নয়, সব জীবের প্রতি সমদৃষ্টির শিক্ষা দিয়েছেন। সুখ-দুঃখ, লাভ-ক্ষতি, মান-অপমানের ঊর্ধ্বে উঠে যে ব্যক্তি সব প্রাণীর মধ্যে এক পরম সত্তাকে উপলব্ধি করেন, তাঁর দৃষ্টিই প্রকৃত সমদৃষ্টি।
এই দৃষ্টিভঙ্গি মানবতাবাদকে আরও বিস্তৃত করে। মানুষ প্রকৃতির অংশ, আর অন্যান্য জীবও সেই অস্তিত্বের অংশ-এই উপলব্ধি থেকেই সহমর্মিতা ও দায়িত্ববোধের জন্ম নেয়। ফলে শ্রীকৃষ্ণের দর্শনকে একধরনের আধ্যাত্মিক মানবতাবাদের দর্শন হিসেবে গণ্য করা শ্রেয়।
শ্রীকৃষ্ণের জন্ম রাজা কংসের কারাগারে। পুত্রের জীবনশঙ্কায় এবং দৈবনির্দেশে তাঁকে পিতা বসুদেব রেখে আসেন নন্দগোপের বাড়িতে। মা যশোদার নয়নমণি শ্রীকৃষ্ণ বেড়ে ওঠেন সেখানে। তাঁর বাল্যজীবনে দেখা যায় তিনি সর্বদা গোকুল তিনি অত্যন্ত সাধারণ জীবনযাপন করতেন।
শ্রীকৃষ্ণের শিক্ষা সেই দীর্ঘ মানবকল্যাণমুখী ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ। বিশেষত শ্রীমদ্ভগবত গীতায় তিনি যে কর্মযোগ, জ্ঞানযোগ, ভক্তিযোগ, সমদৃষ্টি, আত্মসংযম, ন্যায় ও কর্তব্যের কথা বলেছেন, তার মধ্যে মানবজীবনকে অর্থবহ ও কল্যাণমুখী করার গভীর নির্দেশনা রয়েছে।
গোপালক হিসেবে তিনি জীবনযাপন করেন এবং অন্যান্য গোপবালক ও সেখানকার সব সাধারণ মানুষ ছিল তাঁর জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এখান থেকে শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে সাধারণ মানুষের নিবিড় সম্পর্কের প্রতিচ্ছবি দেখতে পাওয়া যায়। তিনি সবসময় গোকুলের সাধারণ মানুষদের সুখ-দুঃখের অংশী হয়েছেন এবং যেকোনো সংকটে তাঁদের পাশে দাঁড়িয়েছেন।
তিনি সবসময় অত্যাচারের বিরুদ্ধে লড়েছেন। যদিও তাঁর মনুষ্য জীবনের লক্ষ্যই ছিল অত্যাচারের বিনাশ, কিন্তু একজন সাধারণ মানুষের মতো করেই তিনি লড়াই লড়েছেন। মথুরায় রাজা কংসকে পরাজিত ও হত্যা করে তিনি সেখানকার সাধারণ মানুষদের রক্ষা করেন। তিনি জরাসন্ধ, শিশুপাল প্রভৃতি অত্যাচারী রাজাকে নিধন করে একদিকে যেমন সাধারণ মানুষকে রক্ষা করেন, ন্যায় প্রতিষ্ঠা করেন, অন্যদিকে এসব অত্যাচারীদেরও মুক্তিলাভের ব্যবস্থা করেন।
তার মানে শোষক এবং শাসিত উভয়ের মুক্তির ব্যবস্থাই তিনি করেছেন। অনেক সময় অধিক ক্ষমতা আমাদের মোহান্ধ করে ফেলে। হিতাহিত জ্ঞানশূন্য করে ফেলে। আর তখনই প্রয়োজন পড়ে আলোকবর্তিকার। শ্রীকৃষ্ণের সমদৃষ্টি সেই আলোকবর্তিকার প্রকৃত উদাহরণ।
আরও পড়ুন
মহাভারতের অন্যতম চরিত্র দ্রৌপদী। ভরা সভায় দুষ্ট কৌরবরা যখন দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণের চেষ্টা করে, অলৌকিক মায়াবলে তিনি দ্রৌপদীর সম্মান রক্ষা করেন। দ্রৌপদীর প্রতি কৌরবদের আচরণ কেবল একজন নারীকে অপমান করার চেষ্টা কেবল নয়, এটি ছিল সভ্যতা, ন্যায় ও মানবিক মর্যাদার ওপর আঘাত!
আজকের সমাজে এই আঘাতের চিত্র ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। শ্রীকৃষ্ণ যেমন দ্রৌপদীর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, তেমনি বর্তমান সমাজে যখন নারী আক্রান্ত হন, অন্যায়, অবিচারের স্বীকার হন, তখন তার মর্যাদা রক্ষায় সমাজের নৈতিক শক্তিকে এগিয়ে আসতে হবে। বর্তমান পৃথিবীতে নারী নির্যাতন, যৌন হয়রানি, পারিবারিক সহিংসতা এসবের ক্ষেত্রে এই মানবিক মূল্যবোধ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। শ্রীকৃষ্ণের শিক্ষা থেকে আমার উপলব্ধি করতে পারি যেকোনো মেয়ের মর্যাদাহানি মেনে নেওয়া মানবিকতার পরিপন্থি।
শ্রীকৃষ্ণ ছিলেন অর্জুনের সখা। মহাভারতে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে অর্জুন নিজের সব আত্মীয় ও প্রিয়জনদের সামনে দেখে যুদ্ধ করতে অনীহা প্রকাশ করেন। তখন শ্রীকৃষ্ণ একজন বন্ধু হিসেবে অর্জুনের কথা মেনে না নিয়ে বরং তাঁকে যুদ্ধ করতে উদ্বুদ্ধ করেন।
শ্রীকৃষ্ণ তাঁকে বোঝান ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য এই যুদ্ধের বিকল্প নেই। অর্জুনকে মানাতে তাঁর সেই উপদেশ একটি স্বতন্ত্র গ্রন্থ হিসেবে মূল্যায়িত হয়। কারণ মানবজীবনে চলার জন্য যা কিছু প্রয়োজন তাঁর সব ব্যাখ্যা এই গ্রন্থ শ্রীমদ্ভগবত গীতায় রয়েছে। শুধু কর্মই ধর্ম। কর্মফলের আশা করা যাবে না, সেটা ঈশ্বরের পায়ে সমর্পণ করতে হবে, এই একটি উপদেশেই লুকিয়ে আছে মানবজীবনের সব প্রশ্নের উত্তর। শ্রীমদ্ভগবত গীতায় শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন,
‘কর্মণ্যেবাধিকারস্তে মা ফলেষু কদাচন।
মা কর্মফলহেতুর্ভূর্মা তে সঙ্গোহস্ত্বকর্মণি।।’ (শ্রীমদ্ভগবত গীতা, ২/৪৭)
এই ঘটনাটি মানবতাবাদের দৃষ্টিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য, সমাজ এবং রাষ্ট্রের মঙ্গলের জন্য প্রয়োজনে আপনজনদের সাথেও যুদ্ধ করা অনিবার্য। মহাভারতের কৌরবরা ছিল অত্যন্ত লোভী এবং হিংসাপরায়ণ। সমাজ এবং রাষ্ট্রের কোনো মঙ্গলের চিন্তা তারা কখনো করেনি, শুধু সবসময় নিজেদের স্বার্থের চিন্তাই করেছে। আর তাই ন্যায়ভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার জন্য তাদের যুদ্ধ করে পরাস্ত করতেই হতো।
বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটেও আমরা এ ধরনের ব্যাপার দেখতে পাই। ক্ষমতার অপব্যবহারের একধরনের প্রবণতা কাজ করে মানুষের মধ্যে। অনেক সময় দেখা যায় যিনি ক্ষমতার অধিকারী, তিনি হয়তো কোনো অন্যায় করছেন না, কিন্তু তার আত্মীয়স্বজন, পরিজন তারা তার ক্ষমতার অপব্যবহার করে অন্যায় করছেন!
এসব ক্ষেত্রে যদি ক্ষমতাবান ওই ব্যক্তিটি সজাগ থাকেন কিংবা কৃষ্ণের ন্যায় এমন একজন বন্ধুর সাহচর্যে থাকেন বা কৃষ্ণের এই দর্শন মেনে চলেন যে, আপনজন হলেও অন্যায়কারীকে শাস্তি পেতে হবে, তাহলে সমাজ এবং রাষ্ট্র থেকে অনেক অন্যায়ই কমে যেতে পারে।
শ্রীকৃষ্ণ এই সভ্যতার এমন এক মহৎ চরিত্র, যার প্রভাব ধর্মের সীমানা অতিক্রম করে দর্শন, সাহিত্য, শিল্প, রাজনীতি, নৈতিকতা ও মানবজীবনের নানাক্ষেত্রে বিস্তৃত। তিনি সংকটের মধ্যেও মানুষকে ন্যায়, কর্তব্য, জ্ঞান, প্রেম ও আত্মসংযমের পথে চলার শিক্ষা দিয়েছিলেন।
কৃষ্ণের কর্মযোগ মানবতাবাদের অন্যতম ভিত্তি। কর্মযোগের মূল শিক্ষা হলো-কর্তব্য পালন করতে হবে, কিন্তু ব্যক্তিগত স্বার্থ ও অহংকারের দ্বারা পরিচালিত হওয়া যাবে না। যে মানুষ নিজের কর্মকে বৃহত্তর কল্যাণের সঙ্গে যুক্ত করতে পারেন, তিনিই কর্মযোগী। কৃষ্ণের মতে কর্ম থেকে পালিয়ে যাওয়া মুক্তির পথ নয়। বরং নিষ্কামভাবে, ন্যায়ের পথে নিজের কর্তব্য পালন করাই মহৎ জীবন।
আধুনিক মানবতাবাদী সমাজে এই শিক্ষা মানবসেবার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। একজন চিকিৎসক রোগীর সেবা করবেন, শিক্ষক জ্ঞান বিতরণ করবেন, বিজ্ঞানী মানবকল্যাণে গবেষণা করবেন, প্রশাসক ন্যায় বজায় রাখবেন, নাগরিক সমাজের প্রতি দায়িত্ব পালন করবেন-এই কর্ম নৈতিকতাই সমাজকে উন্নত করে।
সমদৃষ্টি কৃষ্ণের মানবতাবাদের অন্যতম অঙ্গ। তাঁর মতে প্রকৃত জ্ঞানী ব্যক্তি সমাজের ধনী, দরিদ্র, শিক্ষিত, অশিক্ষিত এমনকি একটি পশুকেও সমভাবে দেখেন। সবার মাঝেই এক পরম সত্যের উপস্থিতি উপলব্ধি করেন।
শ্রীমদ্ভগবত গীতায় শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন,
‘বিদ্যাবিনয়সম্পন্নে ব্রাহ্মণে গবি হস্তিনি ।
শুনি চৈব শ্বপাকে চ পণ্ডিতাঃ সমদর্শিনঃ।।’ (শ্রীমদ্ভগবত গীতা, ৫/১৮)
অর্থাৎ, প্রকৃতজ্ঞানী ব্যক্তি বিদ্যাবিনয়সম্পন্ন ব্রাহ্মণ, গরু, হাতি,কুকুর কিংবা সমাজের নিম্ন শ্রেণির মানুষের মাঝেও সমদৃষ্টি রাখেন। এই শিক্ষা সামাজিক সাম্যের ভিত্তি তৈরি করে। আজকের পৃথিবীতে জাতি, বর্ণ, ধর্ম, ভাষা, লিঙ্গ, অর্থনৈতিক অবস্থান বা সামাজিক পরিচয়ের ভিত্তিতে বৈষম্য এখনো বিভিন্নভাবে বিদ্যমান। শ্রীকৃষ্ণের সমদৃষ্টির শিক্ষা এসব সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠতে সাহায্য করতে পারে।
শ্রীকৃষ্ণের দর্শনে মানুষের আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য বিভিন্ন পথের কথা বলা হয়েছে। গীতায়জ্ঞান, কর্ম ও ভক্তির বিভিন্ন পথের আলোচনা রয়েছে। মানুষের স্বভাব ও যোগ্যতা অনুযায়ী তার সাধনার পথ ভিন্ন হতে পারে। এই বহুমাত্রিক ভাবনা চিন্তার উদারতার পরিচায়ক। মানবতার সমাজে বিভিন্ন মত, বিশ্বাস ও জীবনদর্শনের মানুষের সহাবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি সভ্য সমাজে নিজের বিশ্বাস পালন করার অধিকার যেমন থাকতে হবে, তেমনি অন্যের বিশ্বাসের প্রতি সম্মানও থাকতে হবে। শ্রীকৃষ্ণের দর্শনের উদারতা এই সহিষ্ণুতার পথকে শক্তিশালী করে।
শ্রীকৃষ্ণ শুধু আধ্যাত্মিক শিক্ষক ছিলেন না, তিনি একজন বাস্তববাদী রাষ্ট্রচিন্তকও ছিলেন। দ্বারকার প্রতিষ্ঠা ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে তাঁর সংগঠনশক্তি, দূরদর্শিতা ও নিরাপত্তাবোধ প্রকাশ পায়। একজন রাষ্ট্রনায়কের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হলো জনগণের নিরাপত্তা ও কল্যাণ নিশ্চিত করা।
শ্রীকৃষ্ণের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকে এই দৃষ্টিতে দেখলে বোঝা যায় তিনি ক্ষমতার কেন্দ্র হিসেবে নিজের স্বার্থের চেয়ে জনগণের নিরাপত্তা ও বৃহত্তর রাজনৈতিক ভারসাম্যকে গুরুত্ব দিয়েছেন। বর্তমান গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায়ও শাসনের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত নাগরিকের নিরাপত্তা, অধিকার, মর্যাদা ও কল্যাণ।
শ্রীকৃষ্ণ এই সভ্যতার এমন এক মহৎ চরিত্র, যার প্রভাব ধর্মের সীমানা অতিক্রম করে দর্শন, সাহিত্য, শিল্প, রাজনীতি, নৈতিকতা ও মানবজীবনের নানাক্ষেত্রে বিস্তৃত। তিনি সংকটের মধ্যেও মানুষকে ন্যায়, কর্তব্য, জ্ঞান, প্রেম ও আত্মসংযমের পথে চলার শিক্ষা দিয়েছিলেন।
তাঁর মানবতাবাদের কেন্দ্রে রয়েছে মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা এবং বৃহত্তর কল্যাণের জন্য নিজের কর্মকে উৎসর্গ করা। আজকের পৃথিবীতে প্রযুক্তির অগ্রগতি যতই হোক, মানুষের মধ্যে যদি সহমর্মিতা, ন্যায়বোধ ও দায়িত্ববোধ না থাকে, তাহলে সভ্যতার প্রকৃত উন্নতি সম্ভব নয়। যুদ্ধ, বৈষম্য, দুর্নীতি, ধর্মীয় বিদ্বেষ, পরিবেশ সংকট ও নৈতিক অবক্ষয়ের এই সময়ে কৃষ্ণের শিক্ষা নানাভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।
ড. সঞ্চিতা গুহ : অধ্যাপক, সংস্কৃত বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
