আট বছরের জোয়াল ঘালে যখন বুঝতে পারল পানির সঙ্গে কাদা, পাথর আর ধ্বংসাবশেষ তার স্কুলের দিকে ছুটে আসছে, সে জঙ্গলের দিকে দৌড়েছিল। তারপর একটি গাছে উঠে নিজেকে বাঁচায়। পরে ভাঙা পা ও মুখে আঘাত নিয়ে তাকে উদ্ধার করে হেলিকপ্টারে হাসপাতালে নেওয়া হয়।
তার মা মত্তি মায়া তামাং তখন এক আশ্রয়কেন্দ্র থেকে আরেকটিতে ছুটছেন। একসময় তিনি ধরে নিয়েছিলেন, তার দুই সন্তানই আর বেঁচে নেই। দুইদিন পর ফোনে ছেলের কণ্ঠ শুনে তার প্রথম প্রশ্নটি ছিল খুব সাধারণ, ‘তোমার জন্য কী নিয়ে আসব? কী খেতে ইচ্ছে করছে?’
বিরাট বিপর্যয়ের মাঝখানে মানুষের জীবন কখনো কখনো এমন একটি ছোট প্রশ্নে ফিরে আসে, তুমি কী খেতে চাও? কিংবা শেষবারের মতো দেখা হবে তো?
২৬ আগস্ট ২০২৬ নেপাল ও তিব্বতের সীমান্তঘেঁষা হিমালয়ে যে বিপর্যয় নেমে আসে, এক সপ্তাহ পরও উদ্ধারকাজ চলছিল। প্রতিনিয়ত মানুষের আহত আর নিহত হওয়ার খবর আসছে, বাড়ছে সংখ্যা, বাড়ছে শঙ্কাও। রাস্তা, সেতু, জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, বসতি—সবকিছু ধ্বংসস্তূপের মধ্যে।
সংবাদমাধ্যমের পরিচিত ভাষায় এটি একটি ‘প্রাকৃতিক দুর্যোগ’। কিন্তু নৃবিজ্ঞানের জায়গা থেকে প্রশ্নটি একটু অন্যভাবে করা যায়, ঘটনাটি ঠিক কতটা প্রাকৃতিক?
ইউএসজিএস-এর প্রাথমিক বিশ্লেষণ বলছে, নেপালের লাংটাং জাতীয় উদ্যানের উচ্চ পাহাড়ে হিমবাহ-সম্পৃক্ত একটি বিশাল ঢাল দ্রুত ভেঙে পড়ে। এর শক্তি প্রায় ৫.২ মাত্রার ভূমিকম্পের সমতুল্য কম্পন তৈরি করেছিল; বরফ, পাথর, কাদা ও পানি প্রায় ১০০ কিলোমিটার নিচে ছুটে যায়। বিজ্ঞানীরা এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত নন, এটি মূলত হিমবাহের পতন ছিল, নাকি এমন এক ভূমিধস যা হিমবাহের অংশকেও সঙ্গে নিয়ে নেমেছিল।
তাই এই নির্দিষ্ট ধসের একমাত্র কারণ হিসেবে জলবায়ু পরিবর্তনকে ঘোষণা করা এখনই বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক নয়। কিন্তু বৃহত্তর সংকটটি স্পষ্ট। হিন্দুকুশ-হিমালয়ে ২০১১ থেকে ২০২০-এর মধ্যে হিমবাহ আগের দশকের তুলনায় ৬৫ শতাংশ দ্রুত বরফ হারিয়েছে। এই পর্বতব্যবস্থা থেকে বের হওয়া নদীগুলোর অববাহিকায় প্রায় দুইশ কোটি মানুষের জীবন নির্ভরশীল। অস্তিত্বের প্রশ্ন।
এখানেই ‘অ্যানথ্রোপোসিন’—অর্থাৎ মানুষের কর্মকাণ্ডে গভীরভাবে বদলে যাওয়া পৃথিবী—ধারণাটি কাজে লাগে। আমরা আর প্রকৃতির বাইরে দাঁড়ানো দর্শক নই। আমাদের কার্বন, রাস্তা, বাঁধ, পর্যটন, বিদ্যুৎ, শহর, বাজার এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত পৃথিবীর জীবন্ত ব্যবস্থার মধ্যে ঢুকে গেছে। কিন্তু এখানেই আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা আছে।
নেপালের সাংবাদিক এবং হিমাল সাউথএশিয়ান-এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক কনক মণি দীক্ষিত সাম্প্রতিক আলোচনায় নেপালের দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতার সঙ্গে দুর্যোগের জন্য পরিকল্পনা করার রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার দুর্বলতার সম্পর্ক তুলেছেন। তার আলোচনার মূল কথাটি খুব গুরুত্বপূর্ণ, প্রকৃতি বিপদ তৈরি করতে পারে, কিন্তু সেই বিপদ কত বড় মানবিক বিপর্যয়ে পরিণত হবে, সেটি শুধু প্রকৃতি নির্ধারণ করে না।
আমি আরেকটু এগিয়ে নিয়ে বলতে চাই, এই সময়ে মানুষই মনে হয় বেশি বিপদ তৈরির অপ-সক্ষমতা রাখে। একই ভূমিধস দুটি সমাজে একই সংখ্যক মানুষকে হত্যা করে না। আগাম সতর্কতা আছে কি না, কোথায় বসতি হয়েছে, রাস্তা কীভাবে তৈরি, স্থানীয় প্রশাসন কতটা প্রস্তুত, উদ্ধার ব্যবস্থা কত দ্রুত পৌঁছায়—এসবও ঠিক করে কে বাঁচবে আর কে মরবে।
সহজ করে বললে, বিপদ প্রকৃতি থেকে আসতে পারে; অসহায়ত্ব সমাজ ও রাজনীতি তৈরি করে। আর এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাষ্ট্রের স্মৃতি। একটি বন্যার পর তদন্ত হয়, রিপোর্ট লেখা হয়, সুপারিশ করা হয়। কিন্তু প্রতিষ্ঠান যদি সেই শিক্ষা ধরে না রাখে, পরের বিপর্যয়ে রাষ্ট্র আবার যদি প্রথমবারের মতো শেখে। তাহলে জ্ঞান মুখ থুবরে পড়ে। রাজনৈতিক অস্থিরতা তাই শুধু সরকার বদলের ঘটনা নয়; তা তৈরি করে প্রাতিষ্ঠানিক বিস্মৃতি।
নদী অবশ্য ভুলে যায় না। সে তার পুরোনো পথ, নিচু ভূমি, বন্যার সমভূমি চিনে রাখে। এই জায়গাটিই আমাদের উন্নয়ন-চিন্তার একটি পুরোনো প্রশ্নের দিকে নিয়ে যায়। কনক মণি দীক্ষিত কোসি নদী নিয়ে আগের এক লেখায় স্থানীয় মানুষের বহু প্রজন্মের বন্যার সঙ্গে সহাবস্থানের জ্ঞানকে গুরুত্ব দিয়ে বড় বাঁধকেন্দ্রিক ‘বন্যা নিয়ন্ত্রণ’ চিন্তার সমালোচনা করেছিলেন। জলবিজ্ঞানী অজয় দীক্ষিত-এর ভাষায়, দক্ষিণ এশিয়ার সমুদ্র, বাষ্পীভবন, বৃষ্টি, পাহাড় ও নদী আসলে একটি বিরাট চলমান জলচক্র। তাকে টুকরো টুকরো করে দেখলে সমস্যাও তৈরি হয়।
আমরা আর প্রকৃতির বাইরে দাঁড়ানো দর্শক নই। আমাদের কার্বন, রাস্তা, বাঁধ, পর্যটন, বিদ্যুৎ, শহর, বাজার এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত পৃথিবীর জীবন্ত ব্যবস্থার মধ্যে ঢুকে গেছে।
অর্থাৎ প্রশ্ন শুধু ‘নদীকে কীভাবে আটকাব?’ নয়। প্রশ্ন হতে পারে, নদীর জন্য জায়গা রেখে আমরা কীভাবে বাঁচব? এই প্রশ্নটি কৈলাসেও ফিরে আসে।
কৈলাস বর্তমান রাজনৈতিক মানচিত্রে চীনের তিব্বত স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলে। কিন্তু তার সাংস্কৃতিক ভূগোল রাষ্ট্রের সীমান্তের চেয়ে অনেক পুরোনো। হিন্দু, তিব্বতি বৌদ্ধ, জৈন এবং বন ধর্মীয় ঐতিহ্যে কৈলাস পবিত্র—যদিও তাদের বিশ্বাস ও ব্যাখ্যা এক নয়। তীর্থযাত্রার অন্যতম মূল আচরণ পাহাড়টির চারদিকে পরিক্রমা; তাকে জয় করা নয়। ইউনেস্কো-র বর্ণনায় কৈলাস-মানসসরোবরের এই ভূদৃশ্য একই সঙ্গে হিমবাহ, হ্রদ, জলাভূমি, তৃণভূমি এবং বহু ধর্মীয় ঐতিহ্যের শ্রদ্ধার স্থান।
এই ছোট পার্থক্যের মধ্যে বড় একটি দর্শন লুকিয়ে আছে। আধুনিক উন্নয়নের ভাষা প্রায়ই জয় ও ব্যবহারের ভাষা—পাহাড় কেটে রাস্তা, নদী থেকে সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ, জমি থেকে সর্বোচ্চ বাজারমূল্য। যদিও বহু পুরোনো ধর্মীয় ঐতিহ্যে একই ভূদৃশ্যের সামনে মানুষকে কখনো একটু ছোট হতে হয়, বিনয়ী হতে হয়।
পৃথিবীর বহু আদিবাসী সমাজ এই সম্পর্ককে আরও প্রত্যক্ষ ভাষায় প্রকাশ করেছে। নিউজিল্যান্ডের হুয়াঙ্গানুই মাওরি জনগোষ্ঠীর পরিচিত কথা—Ko au te Awa, ko te Awa ko au অর্থাৎ ‘আমি নদী, নদী আমি।’
২০১৭ সালে নিউজিল্যান্ডের আইন হুয়াঙ্গানুই মাওরি-কে পাহাড় থেকে সমুদ্র পর্যন্ত একটি ‘অবিভাজ্য ও জীবন্ত সমগ্র’ এবং আইনি সত্তা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এর অর্থ আদিবাসী সমাজকে রোমান্টিক করে পরিবেশের সাধু বানানো নয়। শিক্ষা অন্য জায়গায়, নদীকে সম্পত্তি ছাড়াও সম্পর্ক হিসেবে কল্পনা করা যায়।
আরও পড়ুন
সেই প্রশ্ন করতে আমাদের নিউজিল্যান্ড পর্যন্ত যেতে হয় না। আমরা নিজেরাই তো বলি, বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। কিন্তু নদীর প্রতি আমাদের সাংস্কৃতিক ভালোবাসা এবং বাস্তব আচরণের মধ্যে ভয়ংকর ব্যবধান। বিশ্বব্যাংকের ২০২৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার ৮০ শতাংশের বেশি অপরিশোধিত বর্জ্যপানি ও পয়োবর্জ্য সংযুক্ত জলপথে যায়; শহরের অর্ধেকের বেশি খাল হারিয়ে গেছে অথবা বন্ধ হয়ে আছে।
আমরা নদী ভরাট করি, তারপর জলাবদ্ধতায় বিস্মিত হই। জলাভূমির ওপর বাড়ি বানাই, তারপর বন্যাকে শত্রু বলি। নদীতে শিল্পবর্জ্য ফেলি, আবার নিজেদের নদীর দেশ বলেও গর্ব করি। অর্থাৎ আমরা শুধু বৈশ্বিক জলবায়ু অন্যায়ের শিকার নই; নিজেদের কিছু দুর্বলতা ও দুর্নীতি নিজেরা তৈরি করি। প্রকৃতিকে ভালোবাসা সহজ। প্রকৃতির জন্য জায়গা ছেড়ে দেওয়া কঠিন।
আমাদের বিপর্যয়ের কল্পনাতেও সমস্যা আছে। ‘২০১২ (২০০৯)’ কিংবা ‘দ্য ডে আফটার টুমোরো (২০০৪)’-এর মতো সিনেমায় বিপর্যয় আসে বিশাল দৃশ্য হয়ে—শহর ডুবে যায়, পাহাড় ভেঙে পড়ে, মানুষ পালায়। বাস্তব অ্যানথ্রোপোসিন প্রায়ই এত নাটকীয়ভাবে শুরু হয় না। একটি হিমবাহ দশকের পর দশক বদলায়। একটি খাল ধীরে ধীরে হারায়। কার্বন নিঃশব্দে জমে। তারপর একদিন বিপর্যয়, মহাবিপর্যয়, প্রলয় বা দুর্যোগ দৃশ্যমান হয়।
সিনেমা আমাদের বিপর্যয়ের মুহূর্ত দেখতে শেখায়; নৃবিজ্ঞান আমাদের বিপর্যয়ের সম্পর্কগুলো দেখতে শেখায়। গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যম আবার কখনো এই সম্পর্ককে আরও ছোট করে ফেলে। নেপালের ঘটনার পর চীনা অবকাঠামো, বাঁধ কিংবা নাশকতা নিয়ে দ্রুত নানা দাবি ছড়িয়েছে। অন্যদিকে নেপাল যে বিপর্যয়ের আগেই চীনের সঙ্গে হিমবাহ-ঝুঁকির তথ্য ও আগাম সতর্কতা আরও শক্তিশালী করার কথা তুলেছিল, সেটিও সত্য। সুতরাং প্রশ্ন করা আর ষড়যন্ত্র তৈরি করা এক জিনিস নয়।
যখন একটি জটিল পরিবেশগত বিপর্যয়কে দ্রুত চীন বনাম ভারত কিংবা ‘কে করেছে?’—এই পরিচিত গল্পে নামিয়ে আনা হয়, তখন ঘটে বিপর্যয়ের ভূরাজনৈতিক দখল। পাহাড়, নদী, দীর্ঘমেয়াদি উষ্ণায়ন, স্থানীয় জ্ঞান, শ্রমিক, কৃষক ও তীর্থযাত্রী সরে যায়; সামনে আসে নৃশংস রাজনীতি।
তিব্বতকেও তাই শুধু ‘চীনের দিক’ বলা ঠিক নয়। একই ভূদৃশ্য রাষ্ট্রের মানচিত্রে চীন, সংস্কৃতি ও ইতিহাসের মানচিত্রে তিব্বত, তীর্থযাত্রীর মানচিত্রে কৈলাশ, আর পরিবেশের মানচিত্রে বৃহত্তর হিমালয়। সাম্প্রতিক বিপর্যয়ে গ্যিরোং অঞ্চলের মানুষ ও অবকাঠামোও ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সমস্যা হয় যখন একটি মানচিত্র অন্য সব মানচিত্রকে গিলে ফেলে। রাজনীতি প্রকৃতিকে অতিক্রম করতে চায়। এরপর আসে সবচেয়ে অস্বস্তিকর প্রশ্ন, এই উষ্ণ পৃথিবীর মূল্য কে দিচ্ছে?
আমরা নদী ভরাট করি, তারপর জলাবদ্ধতায় বিস্মিত হই। জলাভূমির ওপর বাড়ি বানাই, তারপর বন্যাকে শত্রু বলি। নদীতে শিল্পবর্জ্য ফেলি, আবার নিজেদের নদীর দেশ বলেও গর্ব করি।
বাংলাদেশের বৈশ্বিক গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গমনে অংশ ০.৫ শতাংশেরও কম; ২০২২ সালের হিসাবে মাথাপিছু নির্গমনও বৈশ্বিক গড়ের প্রায় চার ভাগের এক ভাগ। নেপালের পুরোনো সরকারি হিসাব অনুযায়ী বৈশ্বিক নির্গমনে তার অংশ ছিল মাত্র প্রায় ০.০২৭ শতাংশ। তবু হিমালয়ের পরিবর্তন, বন্যা, নদীভাঙন, তাপ, লবণাক্ততা কিংবা সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির মূল্য এই অঞ্চলের মানুষ, প্রাণ-প্রকৃতিকে বহন করতে হচ্ছে।
রূপক অর্থে এটি এক ধরনের জলবায়ু-ভর্তুকি, যেসব অর্থনীতি দীর্ঘ জীবাশ্ম-জ্বালানিনির্ভর শিল্পায়ন থেকে সম্পদ তৈরি করেছে, তাদের সমৃদ্ধির পরিবেশগত বিলের একটি অংশ এসে পড়ছে এমন মানুষের ঘরে, যাদের কার্বন পদচিহ্ন তুলনামূলকভাবে ছোট।
কার্বন সীমান্ত মানে না; কিন্তু তার ক্ষয়-ক্ষতির বিল ঠিকই ঠিকানা খুঁজে নেয়। কখনো নেপালের একটি পাহাড়ি গ্রাম। কখনো ব্রহ্মপুত্রের চর। কখনো বাংলাদেশের উপকূল।
বাংলাদেশ তাই এই গল্পের দর্শক নয়। ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্ট-এর হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলের আট সদস্য দেশের একটি বাংলাদেশ; এই পর্বতমালা থেকে উৎসারিত দশটি প্রধান নদী ব্যবস্থা প্রায় দুইশ কোটি মানুষের জীবনকে যুক্ত করেছে।
ঢাকা থেকে হিমবাহ দেখা যায় না। যদিও সারা দেশের মানুষ তেতুলিয়া থেকে অন্নপূর্ণা দেখার জন্য আগ্রহভরে অপেক্ষা করে থাকে। ঢাকার জলজ ইতিহাস পাহাড় পর্যন্ত যায়।
তিব্বতের উচ্চভূমি, নেপালের পাহাড়, ভারতের সমতল, বাংলাদেশের বদ্বীপ—রাজনৈতিক মানচিত্রে আলাদা। জলচক্রে তারা সম্পর্কিত। জীবনচক্রে তারা একই সুতোয় বাঁধা।
মানুষ দক্ষিণ এশিয়াকে রাষ্ট্র দিয়ে ভাগ করেছে; পানি তাকে অববাহিকা দিয়ে যুক্ত করেছে। এই জায়গায় সার্ক-এর স্থবিরতা প্রায় বিদ্রূপের মতো। ২০১০ সালের থিম্পু সম্মেলনের মূল বিষয়ই ছিল জলবায়ু পরিবর্তন। তখন সদস্য রাষ্ট্রগুলো স্বীকার করেছিল যে সমস্যাটিতে কম অবদান রেখেও দক্ষিণ এশিয়ার উন্নয়নশীল দেশগুলো বড় বোঝা বহন করছে এবং একটি যৌথ আঞ্চলিক অবস্থান প্রয়োজন।
অথচ ২০১৪ সালের পর আর সার্ক শীর্ষ সম্মেলন হয়নি। কিন্তু নদী বৈঠক বন্ধ করেনি। বরফ গলা বন্ধ করেনি। মৌসুমি বায়ু কূটনৈতিক সম্পর্ক ভালো হওয়ার অপেক্ষা করেনি। তাই আঞ্চলিক সহযোগিতা এখন কেবল সৌজন্য নয়—বেঁচে থাকার প্রয়োজন। হিমবাহ পর্যবেক্ষণ, নদীর তথ্য, আগাম সতর্কতা, ভূমিধস, জলবিদ্যুৎ ঝুঁকি এবং ভাটির প্রভাব নিয়ে সহযোগিতা দরকার। সার্ক-কে সক্রিয় করা তার একটি পথ; কিন্তু চীন সদস্য নয় বলে নদী-অববাহিকাভিত্তিক সহযোগিতা ও ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্ট-এর মতো প্রতিষ্ঠানও অপরিহার্য।
শেষ পর্যন্ত নেপালের বিপর্যয় আমাদের সামনে দুটি সত্য পাশাপাশি রাখে। পৃথিবীর ক্ষতির জন্য আমরা সবাই সমানভাবে দায়ী নই। ইতিহাস, শিল্পায়ন, সম্পদ ও কার্বন নির্গমনের অসমতা ভুলে গেলে জলবায়ু ন্যায়বিচার সম্ভব নয়। কিন্তু একই সঙ্গে আমরা পরিবেশগতভাবে বিচ্ছিন্নও নই।
আমাদের জীবন গাছ, মাছ, পাখি, পোকা, মাটি, নদী, বরফ, বৃষ্টি এবং সমুদ্রের সঙ্গে বাঁধা। ফলে ক্রমাগত বিভেদের চাষাবাদ শেষ পর্যন্ত আত্মঘাতী। প্রতিবেশীর নদীকে অসুস্থ রেখে নিজের পানি নিরাপদ রাখা যায় না। উজানের কথা না শুনে ভাটি নিরাপদ হয় না। আবার বৈশ্বিক অন্যায়ের কথা বলে নিজের শহরের নদী হত্যা করার অধিকারও আমাদের নেই।
ভবিষ্যতের রাজনীতিকে তাই শুধু সার্বভৌমত্বের রাজনীতি হলে চলবে না; তাকে যত্নের রাজনীতিও হতে হবে—মানুষের জন্য, নদীর জন্য, পাহাড়ের জন্য, অন্য জীবনের জন্য জায়গা রাখার রাজনীতি।
জোয়াল ঘালের মা শেষ পর্যন্ত ছেলেকে ফিরে পেয়েছিলেন। হাজারও পরিবার পায়নি। তাদের শোকের সামনে হয়তো আমাদের বড় বড় ধারণাগুলোও একটু ছোট হয়ে যাওয়া উচিত। অহমের বদলে বিনয়ী হওয়া উচিত।
মানচিত্রে আমরা রেখা এঁকেছি। পাখি সেই রেখাটি দেখে না। মেঘ ভিসার লাইনে দাঁড়ায় না। নদী কাস্টমস ক্লিয়ার করে না। কার্বন পাসপোর্ট দেখায় না। পাসপোর্ট বহন করি আমরা। পাহাড়ের কোনো পাসপোর্ট নেই।
ড. মঈন জালাল চৌধুরী : নৃবিজ্ঞানী, শিক্ষক ও গবেষক
