বিজ্ঞাপন

ডায়াবেটিস সেবা দিবস

ডায়াবেটিস নিয়ে কেমন জীবনযাপন করবেন

ডায়াবেটিস নিয়ে কেমন জীবনযাপন করবেন

বাংলাদেশে ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা দিন দিন বেড়ে চলছে। একটা সময় ছিল যখন ডায়াবেটিস প্রধানত শহুরে মানুষ, ধনবান, মোটাসোটা এবং শারীরিক শ্রমবিমুখ মানুষের অসুখ হিসেবে বিবেচিত হতো। তখন গ্রামেগঞ্জে ডায়াবেটিসকে বড়লোকের অসুখ বলা হতো। কিন্তু এখন দৃশ্যপট বদলে গিয়েছে।

বর্তমানে শহর-গ্রাম, ধনী-দরিদ্র, মোটা-চিকন ইত্যাদির তফাত ঘুচে গিয়ে ডায়াবেটিস প্রায় সব শ্রেণির মানুষের অসুখে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশে এখন একজন সদস্যেরও ডায়াবেটিস নেই এমন পরিবার বিরল। জনসাধারণের মধ্যে ডায়াবেটিস নিয়ে এখনো নানাধরনের ভ্রান্ত ধারণা বিরাজ করছে। এমতাবস্থায় একজন ডায়াবেটিস রোগীর জীবনযাপন কেমন হবে সে প্রশ্নটি অতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

আমরা যেসব খাদ্য গ্রহণ করি তার প্রধান উপাদান হচ্ছে শ্বেতসার জাতীয় খাবার। আমাদের গ্রহণকৃত শ্বেতসার জাতীয় খাবার হজম প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গ্লুকোজে রূপান্তরিত হয়। শরীরে গ্লুকোজের ভারসাম্য রক্ষা করে ইনসুলিন নামের একটি হরমোন। ইনসুলিনের অভাব, অকার্যকারিতা ইত্যাদি কারণে শরীরে গ্লুকোজের পরিমাণ বেড়ে যাওয়াই হচ্ছে ডায়াবেটিস।

এটি অন্য অনেক রোগের মতো কোনো সাধারণ অসুখ নয়। মূলত ডায়াবেটিস হচ্ছে একটি জীবনব্যাপী অবস্থা। এই রোগটি শরীরে বাসা বাঁধলে একে পুরোপুরি নির্মূল করা যায় না। সঠিক জীবনযাপন এবং চিকিৎসার মাধ্যমে রোগটিকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে থাকলে একজন মানুষ অন্য সবার মতো স্বাভাবিক জীবনযাপনে করতে পারে। অনেকে মনে করেন ডায়াবেটিস মানে জীবনের সব আনন্দ আহ্লাদ শেষ, খাওয়া-দাওয়ায় কঠোর নিষেধাজ্ঞা ইত্যাদি। ধারণাটি একেবারে ভুল।

ডায়াবেটিস রোগীকে একটি সুশৃঙ্খল, স্বাস্থ্যকর এবং সচেতন জীবনযাপন করতে হয়। আসলে সুশৃঙ্খল এবং স্বাস্থ্যকর জীবন প্রতিটি মানুষেরই যাপন করা উচিত।

ডায়াবেটিস রোগীর প্রথম কাজ হচ্ছে আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনা এবং রোগটি সম্পর্কে পুরোপুরি জেনে নেওয়া। ডায়াবেটিস মূলত দুই প্রকার। একটি হচ্ছে টাইপ-১, যেখানে শরীরে ইনসুলিন একেবারেই তৈরি হয় না এবং অন্যটি হলো টাইপ-২, যেখানে ইনসুলিন তৈরি হলেও তা ঠিকমতো কাজ করে না।

বাংলাদেশে ৯০ শতাংশের বেশি রোগীই টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। সাধারণত শিশু এবং কমবয়সীদের টাইপ-১ ডায়াবেটিস হয়ে থাকে। এজন্য এটাকে জুভেনাইল ডায়াবেটিস বলা হয়। রক্তের কিছু পরীক্ষা দ্বারা ডায়াবেটিসের ধরণ শনাক্ত করা হয়।

ডায়াবেটিস আক্রান্ত রোগীর প্রথম কাজ হচ্ছে খাবারকে ওষুধে পরিণত করা। যে খাবারগুলো শরীরে গ্লুকোজ বা সুগারের মাত্রা দ্রুত বাড়িয়ে দেয় একজন ডায়াবেটিস রোগী সেসব খাবারের বড় অংশ এড়িয়ে যাবেন। এজন্য বলা হয় ডায়াবেটিস রোগী না খেয়ে থাকবেন তা নয়, বরঞ্চ তিনি বুঝে শুনে খাবেন। 

ডায়াবেটিস রোগীকে খাবারের তালিকা করে দেওয়া হয়। রোগীর বয়স, ওজন, রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা ইত্যাদির ভিত্তিতে এই তালিকা তৈরি করা হয়। রোগীদের সময় মেনে খাবার খেতে হয়। ডায়াবেটিস রোগীকে দিনে তিনবেলা প্রধান খাবার এবং এর মাঝে ২-৩ বার হালকা খাবার—এই নিয়মটি কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে।

মূলত ডায়াবেটিস হচ্ছে একটি জীবনব্যাপী অবস্থা। এই রোগটি শরীরে বাসা বাঁধলে একে পুরোপুরি নির্মূল করা যায় না। সঠিক জীবনযাপন এবং চিকিৎসার মাধ্যমে রোগটিকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।

দীর্ঘক্ষণ না খেয়ে থাকলে সুগার কমে যেতে পারে (হাইপোগ্লাইসেমিয়া), আবার একবারে বেশি খেলে সুগার বেড়ে যাবে। একজন ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞ অথবা ডায়াবেটিস পুষ্টিবিদ রোগীদের খাবারের তালিকাটি তৈরি করেন।

ডায়াবেটিসের রোগীর খাবারের কিছু বিশেষত্ব আছে। যেমন সাদা ভাত, সাদা রুটি ও  ময়দার পরিবর্তে ডায়াবেটিসের জন্য লাল চালের ভাত, লাল আটার রুটি, ওটস ইত্যাদি অনেক কার্যকর। এগুলো ধীরে ধীরে রক্তে মিশে সুগারের মাত্রাকে স্থিতিশীল রাখে।

ভাত বা রুটির পরিমাণ চিকিৎসক যেভাবে ঠিক করে দেয় সেভাবেই খেতে হবে। এই রোগীদের প্রচুর আঁশযুক্ত খাবার যেমন শাক-সবজি খেতে হয়। করলা, ঢেঁড়স, পালং শাক, লাউ, শসা ডায়াবেটিসের জন্য খুবই উপকারী। খোসাসহ ডাল এবং মিষ্টি নয় এমন এবং টক জাতীয় ফল যেমন পেয়ারা, জাম্বুরা, আমলকী এদের জন্য ভালো।

ডায়াবেটিস রোগীরা প্রোটিন ও ভালো ফ্যাট যেমন মাছ, ডিমের সাদা অংশ, মুরগির মাংস (চামড়া ছাড়া), ডাল ইত্যাদি খাবেন। এদের জন্য রান্নায় সরিষার তেল বা সয়াবিন তেল অল্প পরিমাণে ব্যবহার করতে হয়। বাদাম, যেমন চিনাবাদাম, কাঠবাদাম অল্প পরিমাণে খাওয়া যেতে পারে। ডায়াবেটিস রোগী আম, জাম, কলা, কাঁঠাল, লিচু, আনারস,আঙুর ইত্যাদি ফল পরিমিত পরিমাণে খেতে পারে।

ডায়াবেটিস রোগীর জন্য ক্ষতিকর হচ্ছে—চিনি, মিষ্টি, গুড়, মধু, মিষ্টি বিস্কুট, কেক, কোমল পানীয়, প্যাকেটজাত জুস, প্রক্রিয়াজাত খাবার ইত্যাদি। যে খাবারগুলো পরিমিত পরিমাণে খেতে হবে—আলু, কচু, মিষ্টি কুমড়া ইত্যাদি। গরু বা খাসির মাংস, ঘি, ডালডা, ফাস্টফুড, ভাজাপোড়া যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলতে হবে। ডায়াবেটিস রোগীর উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বেশি থাকে বিধায় লবণ কম খেতে হবে।

ব্যায়াম হলো ডায়াবেটিসের জন্য প্রাকৃতিক ইনসুলিন। প্রতিদিন কমপক্ষে ৩০-৪৫ মিনিট হাঁটা, সাইকেল চালানো, সাঁতার কাটা বা হালকা জগিং ইনসুলিনের কার্যকারিতা বাড়ায়, ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং মন ভালো রাখে।

হাঁটাই সবচেয়ে ভালো ব্যায়াম। সপ্তাহে অন্তত ৫ দিন, একটানা ৩০ মিনিট দ্রুতগতিতে হাঁটুন। হাঁটার সময় এমন গতিতে হাঁটবেন যাতে ঘাম হয় কিন্তু কথা বলতে কষ্ট না হয়। ব্যায়াম শুরু করার আগে ও পরে রক্তের সুগার মেপে দেখা ভালো। যদি সুগার ২৫০ এর বেশি থাকে বা ১০০ এর কম থাকে, তবে সেদিন ভারী ব্যায়াম না করাই ভালো। জুতা অবশ্যই নরম এবং আরামদায়ক হতে হবে।

নিয়মিত রক্তে সুগারের মাত্রা মাপা ডায়াবেটিস রোগীর জন্য একটা দরকারি বিষয়। এজন্য বাড়িতে একটি গ্লুকোমিটার রাখলে ভালো হয়। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সপ্তাহে ২-৩ দিন খালি পেটে এবং খাওয়ার ২ ঘণ্টা পরে সুগার মাপুন এবং একটি ডায়েরিতে লিখে রাখুন। প্রতি ৩ মাস পরপর HbA1c পরীক্ষা করান। এটি গত ৩ মাসের সুগারের গড় চিত্র দেয়।

ডায়াবেটিস রোগীর জন্য ক্ষতিকর হচ্ছে—চিনি, মিষ্টি, গুড়, মধু, মিষ্টি বিস্কুট, কেক, কোমল পানীয়, প্যাকেটজাত জুস, প্রক্রিয়াজাত খাবার ইত্যাদি। যে খাবারগুলো পরিমিত পরিমাণে খেতে হবে—আলু, কচু, মিষ্টি কুমড়া ইত্যাদি। গরু বা খাসির মাংস, ঘি, ডালডা, ফাস্টফুড, ভাজাপোড়া যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলতে হবে।

চিকিৎসক যে ওষুধ বা ইনসুলিন দিয়েছেন তা সময়মতো এবং সঠিক মাত্রায় নিতে হবে। নিজে থেকে ওষুধ বন্ধ করা বা ডোজ কমানো-বাড়ানো অত্যন্ত বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। ইনসুলিন নিলে তা কীভাবে সংরক্ষণ ও প্রয়োগ করতে হয় সেটা ভালোভাবে শিখে নিতে হবে। ডায়াবেটিস রোগীরা অবশ্যই সময় অনুযায়ী চিকিৎসকের সাথে দেখা করবেন এবং তার পরামর্শ অনুযায়ী পরীক্ষা নিরীক্ষা করবেন।

ডায়াবেটিস রোগীর পায়ে সামান্য ক্ষত থেকেও বড় ঘা (ডায়াবেটিক ফুট আলসার) হতে পারে। তাই প্রতিদিন গোসলের পর পা ভালো করে মুছে, বিশেষ করে আঙুলের ফাঁকগুলো শুকিয়ে রাখতে হয়। খালি পায়ে হাঁটা উচিত নয়। নখ কাটার সময় সাবধানে কাটতে হবে। পায়ে কোনো ফোসকা, কাটা বা রঙের পরিবর্তন দেখলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

একজন ডায়াবেটিস রোগীর প্রতিদিন ৭-৮ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন ঘুম প্রয়োজন। ঘুম কম হলে শরীরে কর্টিসল হরমোন বাড়ে, যা সুগার বাড়িয়ে দেয়। মানসিক চাপ বা দুশ্চিন্তা সরাসরি রক্তে সুগারের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। তাই দুশ্চিন্তা কমাতে মেডিটেশন, গান শোনা, বই পড়া, পরিবারের সাথে সময় কাটানো, পছন্দের শখের চর্চা ইত্যাদি করতে হবে। ধূমপান ডায়াবেটিস রোগীর জন্য বিষের সমান - এটি রক্তনালী বন্ধ করে দেয়। তাই ধূমপান ও মদ্যপান সম্পূর্ণ বর্জন করতে হবে।

ডায়াবেটিস মানেই ঘরে বন্দি থাকা নয়। অবশ্য আনন্দ  ভ্রমণে যেতে হবে। তবে যাওয়ার সময় ওষুধ, গ্লুকোমিটার, কিছু শুকনো খাবার (যেমন বিস্কুট, চিনাবাদাম) এবং চিনি কমে গেলে খাওয়ার জন্য গ্লুকোজ সাথে রাখতে হবে। পরিচয়পত্রে লিখে রাখুন যে আপনি ডায়াবেটিস রোগী। যেকোনো নিমন্ত্রণে গেলে খাবার বেছে খান—মিষ্টি ও ভাজাপোড়া এড়িয়ে সালাদ, সবজি, মাছ বেশি নিন।

ডায়াবেটিস নিয়ে ভয় নয়, সচেতনতা প্রয়োজন। এই সচেতনতার কাজটি বাংলাদেশে শুরু করেছিল জাতীয় অধ্যাপক ডা. মো. ইব্রাহিম। তার মৃত্যু দিবস স্মরণীয় করে রাখতে প্রতিবছর ডায়াবেটিক হাসপাতালগুলোতে ৬ সেপ্টেম্বর ডায়াবেটিক সেবা দিবস পালন করা হয়। এদিন রোগীদের মধ্যে ডায়াবেটিস রোগ নিয়ে সচেতনতা তৈরি করা, কীভাবে একে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায় সে বিষয়ে রোগীদের জানানো হয়।

ডায়াবেটিস রোগী যদি খাবার, ব্যায়াম, ওষুধ, ঘুম—এই চারটি স্তম্ভকে সঠিকভাবে মেনে চলে, তবে ডায়াবেটিস নিয়েও সে একজন সুস্থ মানুষের মতোই ৮০-৯০ বছর পর্যন্ত স্বাভাবিক, কর্মক্ষম ও আনন্দময় জীবনযাপন করতে পারবেন। মনে রাখবেন, ডায়াবেটিসকে আপনি নিয়ন্ত্রণ করবেন, ডায়াবেটিস আপনাকে নয়।

ডা. লেলিন চৌধুরী : চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ