পেশাগত, সামাজিক, পারিবারিক, বংশগত বা ব্যক্তিগত অবস্থানের ভিত্তিতে প্রত্যেক মানুষ আত্মসম্মান নিয়ে বসবাস করতে চান। কিন্তু বর্তমানে আমরা সবাই খুব দ্রুত আইন-আদালত বা বিচারিক কার্যক্রম উপেক্ষা করে মনে মনে একটি রায়ে পৌঁছে যাই, যাকে বলা হয় ‘জাজমেন্টাল’ (Judgmental)।
বাংলায় জাজমেন্টাল শব্দের অর্থ হলো বিচারপ্রবণ, দোষসন্ধানী বা খুব দ্রুত অন্যকে নিয়ে সমালোচনামূলক মতামত তৈরি করা। যেসব মানুষ অন্যের ভালো-মন্দ বা ঠিক-ভুল নিয়ে অতিরিক্ত বিচার করেন এবং যাচাই না করেই নেতিবাচক ধারণা পোষণ করেন, তাদের জাজমেন্টাল বলা হয়।
যুগের সাথে তাল মিলিয়ে প্রতিটি দেশ বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তিতে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ ও তার ব্যতিক্রম নয়। প্রত্যেকের হাতে রয়েছে স্মার্টফোন, ইলেকট্রনিক ডিভাইস এবং দ্রুতগতির ইন্টারনেট যার মাধ্যমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে মুহূর্তেই যেকোনো ঘটনাকে ভাইরাল করে দিচ্ছে।
প্রশ্ন হলো, ভাইরাল হওয়া প্রত্যেক ঘটনা কি সত্য? বা মনের অজান্তে আমরা সবাই অপরিচিত কারও ব্যাপারে নেতিবাচক/ইতিবাচক সিদ্ধান্তে পৌঁছাচ্ছি এবং আলোচনা/সমালোচনা করছি অথবা বিনোদন নিচ্ছি, এটা কি সঠিক প্রক্রিয়া?
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হিসেবে আমি মনে করি, প্রতিটা ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত না হয়ে বিচারপ্রবণ হওয়া উচিত নয়। ঘটনার অন্তর্নিহিত কারণ জানতে হবে, যদি সত্য অন্বেষণ করা না যায় তাহলে একপাক্ষিকভাবে সমালোচনা করা যাবে না। যদি কোনো বিষয় সমাজ এবং জাতির জন্য ক্ষতিকারক হয় তাহলে এক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী আদালতে বিচারের সম্মুখীন হয়ে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করা যাবে। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ছবি/ভিডিও বা স্ট্যাটাস দেখে এককভাবে সিদ্ধান্তে যাওয়া কখনো সমীচীন নয়।
আমাদের মধ্যে প্রায়ই দেখা যায় যে, প্রতিটা জিনিসেই আমরা নিজেদের একটা মতামত দিতে পছন্দ করি। যা অনেকেরই অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। হয়তো অনেক সময় সেটা কাজে লাগে, আবার অনেক সময় কারও জন্য তা বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কখনোবা এতে অনেকে কষ্ট পেয়ে থাকেন অথচ কষ্ট দেওয়ার উদ্দেশ্য অনেক সময় থাকে না। কিন্তু এই অভ্যাস যে আসলে খুব একটা ভালো অভ্যাস, তা নয়।
সবার আগে যে জিনিসটা বোঝা দরকার তা হলো, নির্দিষ্ট কোনো বিষয়ে জাজমেন্ট দেওয়া আর জাজমেন্টাল আচরণ হচ্ছে কিনা তা বলার আগে বা কাউকে জাজ (Judge) করার আগে নিজেকে সেই অবস্থানে বসানো উচিত। সেই একই আচরণ আপনার সাথে অন্য কেউ করলে আপনার অনুভূতি কেমন হবে? বেশিরভাগ সময়ই দেখবেন ভালো লাগছে না। তাহলে, অন্যদের কীভাবে ভালো লাগবে?
ধরা যাক, একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারী পার্কে তার বন্ধুদের সাথে গল্প করছেন, অথবা একজন প্রাপ্তবয়স্ক ছেলে রাস্তার ধারে চায়ের দোকানে চা খাচ্ছেন, অন্যদিকে একজন বিত্তবান মানুষ গরিব অসহায়কে সাহায্য/দান করছেন, যেটা তিনি গোপন রাখতে চেয়েছিলেন, সেই ছবি/ভিডিও তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হলো।
সামাজিকভাবে শ্লীলতা, অশ্লীলতা, নৈতিকতা ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার মূল্যায়নে ব্যক্তি ও সামাজিক প্রেক্ষাপটভেদে পার্থক্য রয়েছে, যেহেতু আমাদের সমাজে শ্লীলতা এবং অশ্লীলতার মানদণ্ড নেই তাই এই ছবিগুলো ছড়ানোর কারণে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিকার হলেন বা হেয় প্রতিপন্ন হলেন, তার বিরুদ্ধে মানহানিকর বক্তব্য দেওয়া হলো, তখন যে উদ্দেশ্যেই ছবি বা ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, বিষয়টি তখন আইনের আওতায় চলে আসে।
এতে যদি কারও মানহানি ঘটে, কেউ যদি বলে যে আমি চাইছিলাম না আমার ব্যক্তিগত জীবনের ছবি-ভিডিও সামনে আসুক, তাহলে তার তখন মামলা করার সুযোগ চলে আসে।
সাইবার সুরক্ষা আইন ২০২৬ ধারা ২৫(১)-এ স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি ওয়েবসাইট বা অন্য কোনো ডিজিটাল বা ইলেকট্রনিক মাধ্যমে ইচ্ছাকৃতভাবে বা জ্ঞাতসারে অন্য কোনো ব্যক্তিকে ব্ল্যাকমেইলিং বা যৌন হয়রানি বা রিভেঞ্জ পর্ন বা ডিজিটাল শিশু যৌন নিপীড়ন সংক্রান্ত উপাদান (চাইল্ড সেক্সুয়াল অ্যাবিউজ ম্যাটেরিয়াল) বা সেক্সটর্শন করার অভিপ্রায়ে সৃষ্ট বা প্রাপ্ত বা সংরক্ষিত কোনো তথ্য, ভিডিও চিত্র, অডিও ভিজ্যুয়াল চিত্র, স্থির চিত্র, গ্রাফিক্স বা অন্য কোনো উপায়ে ধারণকৃত, এডিটকৃত, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দ্বারা নির্মিত অথবা এডিটকৃত ও প্রদর্শনযোগ্য এইরূপ কোনো তথ্য-উপাত্ত প্রেরণ, প্রকাশ বা প্রচার করেন বা প্রেরণ, প্রকাশ বা প্রচার করার হুমকি প্রদান করেন, যা ক্ষতিকর বা ভীতি প্রদর্শক, তাহলে উক্ত ব্যক্তির অনুরূপ কার্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।
অপরাধ প্রমাণিত হলে অনধিক দুই বৎসর এবং সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড বা উভয় হতে পারে। শুধু তাই নয় (Penal Code), ১৮৬০ অনুযায়ী মানহানি সম্পর্কেও বলা হয়েছে ধারা ৪৯৯তে।
মানহানির সংজ্ঞায় বলে হচ্ছে, কোনো ব্যক্তি সম্পর্কে মিথ্যা বা ক্ষতিকর বক্তব্য, লেখা, ইঙ্গিত, ছবি বা প্রকাশনার মাধ্যমে তার সুনাম নষ্ট করার উদ্দেশ্যে বা জেনেশুনে কিছু বলা বা প্রচার করা হলে তা মানহানি হতে পারে।
কোনো ব্যক্তির সম্পর্কে এমন অভিযুক্তি প্রকাশ করা হলে, যা আইনগতভাবে নির্ধারিত পরিস্থিতিতে তার সুনাম ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যে বা জ্ঞানসহ করা হয়েছে, তা মানহানির প্রশ্ন সৃষ্টি করতে পারে।
আরও পড়ুন
ধারা ৫০০ : মানহানির শাস্তি
ধারা ৪৯৯ অনুযায়ী মানহানি প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ ২ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড অথবা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে।
সংশ্লিষ্ট আরও ধারা অভিযোগ ভেদে সেটি হতে পারে বাংলাদেশে প্রচলিত আইনের যেকোনো ধারা যেমন পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১২ অথবা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ইত্যাদি যার মাধ্যমে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে ভুক্তভোগী সবাই আইনি প্রতিকার পেতে সক্ষম।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী আর্টিকেল ৩৯ এ বলা হয়েছে, Freedom of thought and conscience and freedom of speech and expression (চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা এবং বাক-স্বাধীনতা)
৩৯ (২) রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, বিদেশি রাষ্ট্রসমূহের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, জনশৃঙ্খলা, শালীনতা ও নৈতিকতার স্বার্থে কিংবা আদালত-অবমাননা, মানহানি বা অপরাধ-সংঘটনে প্ররোচনা সম্পর্কে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ-সাপেক্ষে।
তার অর্থ কোনো স্বাধীনতাই অবাধ নয় [Ramlila Maidan Incident v Home Secretary, UOI, (2012) 5 SCC 1]। বাক-স্বাধীনতার চর্চার ক্ষেত্রে চূড়ান্ত স্বাধীনতা প্রদান করা হয়নি বরং যুক্তিসঙ্গতভাবে কিছু বাধা-নিষেধ আরোপ করার বিধান রাখা হয়েছে। কোনো মাধ্যমে বাক-স্বাধীনতার প্রকাশ যদি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, বিদেশি রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কের অবনতি ঘটায়, জনশৃঙ্খলার ব্যাঘাত ঘটায়, নৈতিকতা বিরোধী বলে প্রতীয়মান হয়, আদালত অবমাননা, মানহানি বা অপরাধ সংঘটনে প্ররোচনা দেয়-তবে এসব ক্ষেত্রে বাক-স্বাধীনতার অধিকারের যুক্তিসঙ্গত বিধি-নিষেধ আরোপ করা যাবে এবং অনুচ্ছেদ ৩৯ (২) অনুযায়ী রাষ্ট্র তার আইন প্রণয়ন ক্ষমতা প্রয়োগ করে বাক-স্বাধীনতায় সীমাবদ্ধতা আরোপ করে আইন প্রণয়ন করতে পারবে।
কোনো আইন ছাড়া প্রশাসনিক ক্ষমতাবলে বিধি-নিষেধ আরোপ করা যাবে না [N.K. Bajpai v. UOI, (2012) 4 SCC 653, Para 16]। তবে বিধি-নিষেধগুলো অবশ্যই অনুচ্ছেদ ৩৯-এ উল্লেখিত বিধি-নিষেধের আওতাভুক্ত হতে হবে।
সংবিধানের আর্টিকেল ৩২
জীবন ও ব্যক্তি-স্বাধীনতার অধিকার-রক্ষণ-এর কথা বলা হয়েছে, যা আমাদের মৌলিক অধিকারগুলোর মধ্যে একটি।
প্রখ্যাত সংবিধান বিশেষজ্ঞ ডি. ডি. বসু বলেন, ‘There cannot be any such thing as absolute or uncontrolled libel wholly free from restrain for that would lead to anarchy and disorder. The possession and enjoyment of all rights are subject to such reasonable conditions as may be deemed to the governing authority of the country to be essential to the safety, health, peace, general order and moral of the community.’
অর্থাৎ সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণমুক্ত নিরঙ্কুশ বা অনিয়ন্ত্রিত অধিকার বলে কিছু থাকতে পারে না, কারণ তা নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলার জন্ম দেবে। সব অধিকারের অধিকারী হওয়া ও ভোগ করা এমন সব যুক্তিসঙ্গত শর্ত সাপেক্ষে হবে, যা দেশের শাসক বা কর্তৃপক্ষের কাছে সমাজের নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, শান্তি, সাধারণ শৃঙ্খলা এবং নৈতিকতার জন্য অপরিহার্য বলে বিবেচিত হতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা অন্য কোনো মাধ্যমে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা যেমন সাংবিধানিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি সেই স্বাধীনতা অন্যের সুনাম, ব্যক্তিগত মর্যাদা ও আইনগত অধিকার বঞ্চিত করে নয়। এই অধিকার হতে হবে নিয়ন্ত্রিত, যুক্তিসংগত, শর্তসাপেক্ষ যা সমাজে নৈরাজ্য, বিশৃঙ্খলা, ব্যক্তিগত অধিকার লঙ্ঘনের সীমারেখা অতিক্রম করে নয়।
পরিশেষে বলা যায়, আমাদের সঠিক সত্য না জেনে কারও ব্যাপারে ভালো-খারাপ বিচার করা থেকে নিজেকে বিরত রাখা উচিত এবং বাংলাদেশের প্রচলিত আইন, আদালত এবং সংবিধানের মৌলিক অধিকারের উপর আস্থা রাখা উচিত। প্রতিটা মানুষের অবস্থান ভিন্ন হতে পারে তাই আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি সেই অনুপাতে পরিবর্তন করতে হবে।
কারও প্ররোচনায় প্ররোচিত না হয়ে নিজের অবস্থান বিবেচনা করে ‘বিচারপ্রবণ’ বা ‘দোষ সন্ধানী’ আচরণ কমিয়ে আনা সম্ভব। আমাদের মনে রাখতে হবে বিচারপ্রবণ আর বিচারিক রায় এর মধ্যে অনেক তফাৎ আছে অর্থাৎ সামাজিক বিচার আর আদালতের বিচারকের বিচার কখনো এক নয়।
তাই কবি শামসুর রাহমান তার পণ্ডশ্রম কবিতায় লিখেছেন ‘কান নিয়েছে চিলে, চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে।’ এর অর্থ কোনো গুজবে কান না দিয়ে আগে সত্য জানা উচিত, কান নিজের জায়গায় আছে কিনা তা না দেখে চিলের প্রতি জাজমেন্টাল বা ‘বিচারপ্রবণ’ বা ‘দোষ সন্ধানী’ হওয়া উচিত নয়।
ব্যারিস্টার পল্লব আচার্য্য : আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট
